পেনাল্টি

রমাকান্ত দে স্মৃতি শিল্ডের ফাইনাল শেষ হতে মিনিটখানেক বাকি। এমন সময়। পেনাল্টি।
সবুজগ্রাম ইউনিয়নের তিরিশের এপাশে ওপাশে থাকা অপেশাদারদের বেশ কয়েক মিনিট আগেই দম ফুরিয়ে গেছে। কুড়াইলের দুটো ছেলে এমনিতেই কলকাতায় থার্ড ডিভিশন, ফোর্থ ডিভিশনে খেলে। তারা আবার টালিগঞ্জ অগ্রগামীর একজনকে খেপ খেলাতে নিয়ে এসেছে। এদের সাথে কখনো দশটা পাঁচটা অফিস করা লোকে পারে?

এ অঞ্চলের দলগুলোর মধ্যে বরাবর ভদ্রলোকের চুক্তি ছিল — রমাবাবু এলাকার গর্ব ছিলেন, তাঁর নামের টুর্নামেন্টে নিজেদের মধ্যেই খেলা হবে। কোন দল বাইরের খেলোয়াড় এনে খেলাবে না। কিন্তু সেসব আর কেউ মানে না। সবাইকেই যে কোন মূল্যে জিততে হবে। জিতে পাবে তো একটা সাত পুরনো শিল্ড আর এক হাজার এক টাকা, তবু এত কান্ড করা চাই। কুড়াইলের লোকজনের বাজে খরচের সাধ বেশি, সাধ্যও। তাই ওরাই পাঁচ বছর ধরে নিজেদের এলাকার খেলোয়াড়দের সাথে বাইরে থেকে সবচেয়ে ভাল ভাল খেলোয়াড় নামিয়ে শিল্ড জিতে নিয়ে যাচ্ছে। অন্য দলগুলো আপত্তি করলেই বলে এ অমুকের ভাগ্নে বা তমুকের ভাইপো। সবাই সব বোঝে, কিন্তু প্রমাণ করবে কী করে? ফলে সবুজগ্রামের সবাই জানত যতই ফাইনালে ওঠা হোক, শিল্ড সেই কুড়াইল ব্রাদার্সই জিতবে। তবু পাড়া থেকে যারা কালীতলার মাঠে খেলা দেখতে গেছিল, তারা গেছিল দলের সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটার জন্যে।
চেহারায় বা হাবেভাবে অবশ্য বোঝার উপায় নেই যে ও সবার ছোট। সবে ক্লাস এইট, এর মধ্যেই প্রায় ছ ফুট, আবার দিব্যি গোঁফও গজিয়েছে। দলের সবার চেয়ে লম্বা। আর গোলে দাঁড়িয়ে যেভাবে সবাইকে চিৎকার করে এটা করিস না, ওটা কর বলে, রেগে গিয়ে খিস্তি করে, তাতে অচেনা লোকে ভাববে ও-ই সবার বড়। ওর থেকে অনেক বড় ছেলেরা সব মুখ বুজে সহ্য করে কারণ বলটা গোলের দিকে এলেই বোঝা যায় এ যে সে ছেলে নয়।

সবুজগ্রাম যে ফাইনালে পৌঁছেছে সে অনেকটাই ওর প্রসাদে। তিনটে ম্যাচে মোটে একটা গোল খেয়েছে। আগেই বলে রাখে “একটা গোল কোন ভাবে দিয়ে দাও, বাকি আমি বুঝে নেব। গোল হয়ে গেলে পরে আর কেউ হাফের উপর উঠবে না বলে দিলাম। উঠলে কিন্তু আমিও উঠে যাব। অন্য কাউকে গোলে দাঁড়াতে হবে।“ সে সাহস, বলাই বাহুল্য, কেউ করে না। তাতে যদিও বিশেষ লাভ হয় না। ওকে একের পর এক অবধারিত গোল বাঁচাতে হয়। ও একটা করে গোল বাঁচায় আর অপদার্থ ডিফেন্ডারদের ধমকায়।

বছরদুয়েক ধরে স্কুলের ইন্টার ক্লাস খেলা থেকে শুরু করে গোটা মহকুমার যে কোন খেপ খেলায় বারের নীচে ও থাকলে দল নিশ্চিন্ত। তাই এলাকায় ছেলেটার নাম হয়ে গেছে অতনু। মানে ইস্টবেঙ্গলের অতনু ভটচায আর কি। সবুজগ্রাম হল বাঙালদের পাড়া। তাই স্কুলের রেজিস্টারে যতই ওর নাম হোক নীলাঞ্জন; বাবা, মা, ঠাকুমা যতই ডাকুক নীলু; স্কুলের স্যারেরা বলেন অতনু, বন্ধুরা বলে অতনু, সাত মুল্লুকের লোক বলে অতনু, যারা খেপ খেলতে নিয়ে যায় তারাও বলে অতনু।

রমাকান্ত দে স্মৃতি শিল্ডের ফাইনালে ফার্স্ট হাফেই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা কর্নার থেকে জটলার মধ্যে একটা গোল করে ফেলেছিল সবুজগ্রাম। তারপর থেকেই কুড়াইল বনাম অতনু। দিব্যি চলছিল। কিন্তু খেলা শেষের মিনিট তিনেক আগে, রাইটার্সের আপার ডিভিশন ক্লার্ক মোটা সুধীর ঐ টালিগঞ্জের ছেলেটাকে আর সামলাতে না পেরে বক্সের মধ্যে মারল টেনে লাথি। ফাইনালের জন্যে পয়সা খরচা করে ভাল রেফারি আনা হয়েছিল। এদিককার লোক হলে হয়ত পেনাল্টিটা দিত না।
অতনু যদি পাতালেও খেলতে যায় তাহলেও একটা ঝাঁকড়া পাকা চুলের, ঘোলাটে চশমা পরা সাড়ে ছ ফুট লোককে মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে অনর্গল চেঁচাতে দেখা যায়। খেয়াল করে শুনলে বোঝা যাবে উনি অতনুকে নির্দেশ দিচ্ছেন কী করতে হবে। ও সেদিকে কান না দেওয়ার চেষ্টা করে, যখন অসহ্য হয়ে যায় তখন চেঁচিয়ে বলে “থাম তো। জীবনে পায়ে বল দিল না, আমায় জ্ঞান দিচ্ছে।“ এতে অবশ্য মিনিট দুয়েকের বেশি চুপ করিয়ে রাখা যায় না লোকটাকে। ম্যাচ জিতলে মাঠের ভেতর ঢুকে পড়ে উনি ঐ ধেড়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকেন, হারলে অতনু নিজের এবং দলের ভুলগুলোর জন্যে কাঁদতে কাঁদতে যায় আর উনি পাশে বলতে বলতে যান “ঠিক আছে”, “খেলায় হারজিত আছেই”, “পরের ম্যাচে ঠিক হয়ে যাবে”, “ওরা আরো ভাল খেলেছে” ইত্যাদি। একমাত্র তখনই বোঝা যায় যে বারের নীচে সে যতই মহীরুহ হোক, অতনু আসলে একটা বাচ্চা ছেলে। ঐ ভদ্রলোক হলেন কাছের বড়িহাটা হাইস্কুলের হেডমাস্টার শিবরাম গাঙ্গুলি। এমন হেডমাস্টার যে হয় যারা চোখে দ্যাখেনি তারা কক্ষনো বিশ্বাস করবে না।

তা রমাকান্ত দে স্মৃতি শিল্ডের ফাইনালে রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেওয়া মাত্রই, শিবরামবাবু এসে দাঁড়ালেন গোলের ঠিক পেছনে। অতনুর ততক্ষণে গোটা দলকে খিস্তি দেওয়া সারা। সেই টালিগঞ্জের ছেলেটি বলটা স্পটে বসিয়ে শট নেবে বলে পিছিয়ে যাচ্ছে, শিবরামবাবু বললেন “চোখদুটো দ্যাখ। কোনদিকে মারবে ঠিক করেছে বোঝার চেষ্টা কর।”

অতনু পেছন ঘুরে আঙুল উঁচিয়ে বলল “মুখ বন্ধ না করলে কিন্তু মাঠ থেকে বার করে দেব।”

রেফারি ধমকাল “অ্যাই ছেলে, তুমি দর্শকের সাথে কথা বলছ কেন? কার্ড দেখাব কিন্তু।”

অতনু কটমট করে তাকিয়ে, গলাটা খাদে নামিয়ে বলল “ওটা আমার বাবা।”

ভ্যাবাচ্যাকা রেফারি কোনমতে বললে “যাকগে, এখন পেনাল্টি নেওয়া হবে।”

অতনু ভুরু কুঁচকে টালিগঞ্জের ছেলেটার চোখে চোখ রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে দুদিকে হাত ছড়িয়ে দাঁড়াল। সাধারণত ওকে ওভাবে দেখেই যে পেনাল্টি মারবে তার গলা শুকিয়ে যায়, গোলটা ছোট দেখায়। কিন্তু এ ছেলে কলকাতায় খেলে। অতনু দেখল সে ওর দিকে তাকাচ্ছেই না, একদৃষ্টে বলের দিকে তাকিয়ে আছে। অস্ফূটে “যাঃ শালা” বলে ও ছেলেটার পা দুটো দেখতে লাগল।

রেফারি দিল বাঁশি, ছেলেটা একবার আলগোছে গোলের দিকে তাকাতেই অতনু বুঝে গেল ওর ডানদিকে মারবে। ঝাঁপটা মেরেই টের পেল শটটা ঠিক হয়নি। বলটা যত না ডাইনে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি উপরে উঠছে। কী আর করা। পড়ে যেতে যেতে কোনমতে বাঁহাতটা মুঠো করে উপর দিকে তুলে দিল সে। শটে জোর ছিল। বলটা আঙুল টাটিয়ে বার কাঁপিয়ে সামনে ড্রপ খেল। এবার টালিগঞ্জ পার্টি এসে গোলে মেরে দেবে ভেবে চোখ বন্ধ করে ফেলতে যাবে, মাটি ফুঁড়ে সুধীর তার বিরাট ভুঁড়ি নিয়ে প্রাণপণে দৌড়ে এসে বলটাকে বহুদূরে উড়িয়ে দিল। টালিগঞ্জের ছেলেটার আগে কী করে যে ও বলের কাছে পৌঁছল সে কথা ভেবে অতনু লাফিয়ে উঠে চকাম করে এক চুমুই খেয়ে ফেলল মোটা সুধীরের গালে। থ্রো ইন হতে না হতেই শেষ বাঁশি বেজে গেল। পাড়াসুদ্ধু লোক মাঠে ঢুকে পড়ে অতনুকে কাঁধে তুলে সে কি নাচ! তার মধ্যে ওর বাবা এসে একখানা মালা পরিয়ে দিল।

বিকেলবেলায় রজনীগন্ধার মালা। আচ্ছা পাগলামি বটে। ভাবতে ভাবতে হেসে ফেলল নীলাঞ্জন। এখন আর ওকে কেউ অতনু বলে না। এতক্ষণ স্ট্যাচুর মত গম্ভীর হয়ে বসে থাকা লোকটা হঠাৎ হেসে গড়িয়ে পড়ায় বাসের সহযাত্রীরা যে তাকাচ্ছে, সেসব খেয়ালই করল না ও। ওর চোখে তখন ভাসছে মালা পরানোর পরে বাবার সেই চেহারাটা। ধাক্কাধাক্কির চোটে চশমাটা একদিকে বেঁকে গেছে সে খেয়ালই নেই, কেবল সবার সাথে মিলে “সবুজগ্রাম জিন্দাবাদ, অতনু জিন্দাবাদ” বলে চলেছে আর মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুঁড়ছে আকাশে।

বাস থেকে নেমে ছেলেমেয়ের হাত ধরে হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করেই নীলাঞ্জনের বউ শ্রাবণী গর্জে উঠল “তোমার মাথাটা কি পুরো খারাপ হয়ে গেছে?”

“কেন? কী করলাম আবার?”

“কী করলাম! দিব্যি চুপচাপ ভালমানুষ বসেছিলে, হঠাৎ খ্যাকখ্যাক করে হাসতে শুরু করলে কেন?”

“আমি!”

“না তো কি আমি? ছি ছি ছি। আমার পাশের মহিলা তার সাথের জনকে বলল ‘কোন পাগলা গারদ থেকে পালিয়েছে রে? কামড়ে টামড়ে দেবে না তো?’”

নীলাঞ্জন দমে গিয়ে জিজ্ঞেস করল “সত্যি খুব জোরে হেসেছি?”

শ্রাবণী দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলল “পোড়া কপাল।”

নীলাঞ্জন জানে বউ বানিয়ে বলছে না। আজকাল ও এমন এমন কান্ড করে ফেলে না বুঝে, বুঝলে সেসব কখনো করত না। কিন্তু কোথা দিয়ে যে কী হয়ে যায়! মনেও থাকে না ঠিক করে। এই যেমন শ্রাবণী বলার পরে ওর শুধু মনে পড়ছে ও বাসে আসতে আসতে ছবির মত দেখতে পাচ্ছিল জীবনের অন্যতম সেরা দিনটা। বাবার নাচটা মনে পড়ে মনটা আনন্দে ভরে আছে এখনো। কিন্তু খ্যাকখ্যাক করে হাসছিল ও? কিছুতেই মনে পড়ছে না তো!

সেদিন দোকানে বসেও এরকম হল। একটা মেশিনে উইন্ডোজ ইনস্টল করতে দিয়ে ও বসেছিল। থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখে যে মেয়েটার ল্যাপটপ, সে ওর চোখের সামনে খুব হাত নাড়ছে। তাকাতেই বলল “দাদা আপনি ঠিক আছেন? কিছু হয়েছে?”

“হ্যাঁ, ঠিকই তো আছি। ও হো, ইনস্টল হয়ে গেছে, না? সরি, খেয়াল করিনি।”

“না না, সেজন্যে না।”

“তাহলে?”

“আসলে… যেন মনে হল আপনি কাঁদছেন…”

নীলাঞ্জন চমকে চোখে হাত দিয়ে দ্যাখে চোখটা ভিজে ভিজেই বটে। অপ্রস্তুত হয়ে রুমাল দিয়ে চোখ মুখ মুছে নিতে মেয়েটা জিজ্ঞেস করে “কিছু মনে করবেন না, আপনার কি কোন কারণে মন খারাপ?”

মাথা নেড়ে “না” বললেও নীলাঞ্জন ভাবে, মনটা তো খারাপ ছিল না, এখন খারাপ হয়ে গেল।

আবছা মনে পড়ছে একটা দিনের কথা। সকাল সকাল কোথায় যেন যাওয়ার ছিল? রাতেই খেলার বুটজোড়া আর গ্লাভসদুটো কেচেকুচে ঝকঝকে করে রাখা ছিল। রাতটা এপাশ ওপাশ করেই কেটেছে। কেন যেন? একটু আগেই মনে ছিল, তখন আর নেই। ভোর রাত্তিরে কে যেন ঘুম থেকে তুলে দিল, তারপর বাবাকে নিয়ে শ্মশানে যাওয়া হল এইটুকু মনে পড়ছে। সেদিনই তাহলে বাবার মৃত্যুদিন। সেটা মনে পড়েই কি চোখে জল এসে গেছিল? তা আর বুঝে উঠতে পারেনি নীলাঞ্জন।
শ্রাবণীর এক জামাইবাবু ডাক্তার। তার মেয়ের জন্মদিনে গিয়েও একটা গোলমাল হয়েছিল। সেটা বেশ কিছুদিন আগেকার কথা। কিছুই মনে নেই প্রায়। শুধু মনে আছে শ্রাবণী খুব রেগে গেছিল। বাড়ি এসেও চেঁচামেচি। বলেছিল “কী ব্যাপারটা কী? শ্বশুর শাশুড়িদের তুই তোকারি করছ… আর কী নোংরা নোংরা সব কথা! কোন ভদ্রলোক ঐ ভাষায় কথা বলে? ছেলেমেয়েই বা কী শিক্ষা পেল? ভূতে ভর করেছিল নাকি?”

শুনে নীলাঞ্জনের খুবই লজ্জা লেগেছিল। শ্রাবণী না বললেও ও নিজে থেকেই পরদিন ডাক্তার ভায়রাভাইকে ফোন করে ক্ষমা চেয়েছিল। বলেছিল একদমই ইচ্ছা করে করেনি, বুঝতে পারছে না কী করে হল। সে অবশ্য খুবই ভাল। অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানা প্রশ্ন করে তারপর বলেছিল “দ্যাখো নীলাঞ্জন, আমি তো ডাক্তার। আমার একটা কথা শোন। তোমার একটা মানসিক সমস্যা হচ্ছে। এটার কিন্তু চিকিৎসা দরকার। নইলে বিপদ হবে।”

নীলাঞ্জন বুঝতেই পেরেছিল ভায়রা ইঙ্গিত করছে ও পাগল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ও কী করে বোঝাবে যে ওসব কিছু নয়, আসলে ওর আর কিছুই ভাল লাগছে না। যত দিন যাচ্ছে ততই ও বুঝতে পারছে জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। যার তিনকাঠির নীচে দাঁড়িয়ে একা কুম্ভের মত দলকে রক্ষা করার ক্ষমতা ছিল, সে কম্পিউটারের দোকান সামলাচ্ছে, এ যে কী যন্ত্রণা সেটা কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।

ফুটবলই জীবন ছিল নীলাঞ্জনের, কিন্তু বাবা বলত ফুটবলের সাথে জীবন কাটাতে হলে শুধু ভালবাসলে হয় না, পরিশ্রম করতে হয়। সে তো কম করেনি ও। সেই দশ বারো বছর বয়স থেকে বারো মাস ভোর চারটেয় উঠে দৌড়তে শুরু করেছে, এটা খায়নি, সেটা খায়নি, এমনকি ক্লাস সেভেনে বিড়ি ধরেও যেদিন শুনেছে বিড়ি খেলে দম কমে যায়, সেইদিন ছেড়ে দিয়েছে। কোন কোচ ছিল না তখনো, কোথায় কোচিং পাওয়া যায় তাও জানা ছিল না। শুধু বাবা কানের কাছে বলে যেত “তুই সাধনাটা কর, গুরু নিজেই তোকে খুঁজে নেবে।” সেই ভরসায় লেখাপড়া প্রায় শিকেয় তুলে দিয়ে দিনরাত খেলেছে।

তা বাবা তো নেহাত ভুল বলেনি। খেলার জন্যে গোটা জেলাটা চষে ফেলতে ফেলতেই তো একদিন বিভূতি ঘোষের চোখে পড়ে গেছিল। সে মাঠে যাওয়াও কি কম কষ্ট? পাঁচটার ট্রেন ধরে চারটে স্টেশন পেরিয়ে যাওয়া, ফিরে স্কুল, বিকেলে আবার প্র‍্যাকটিস। কিন্তু কষ্ট তো গা করেনি সেইসময়। স্পোর্টসস্টারের সাথে পাওয়া একটা পিটার শিল্টনের পোস্টার বাবা বাঁধিয়ে দেয়ালে টাঙিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল “যা-ই কর, জানবি শিল্টন তোর থেকে বেশি পরিশ্রম করত। তবে চল্লিশ বছর বয়সেও বিশ্বকাপ খেলতে পেরেছে। ঐরকম হতে হবে।” একেকবার সারা গায়ে ব্যথা নিয়ে নীলাঞ্জন অবশ্য মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছে “হ্যাঁ, শিল্টন তোমার কানে কানে বলে গেছে তো।” কিন্তু মনে মনে জানত বাবা ভুল বলে না। দিনরাত খেলার বই পড়ে যখন, নিশ্চয়ই কোথাও পড়েছে।

মায়ের একদম পছন্দ ছিল না লেখাপড়া বাদ দিয়ে বাপ-ছেলের এই ফুটবল পাগলামি। একে নীলুর মামারা সব ডাক্তার, উকিল, ইঞ্জিনিয়ার, তার উপর বাবা হেডমাস্টার। মা মাঝেমাঝেই বলত “লোকের কাছে আমার মুখ দেখানোর উপায় রাখবে না তোমরা। ঘষটে ঘষটে ক্লাসে ওঠে, কোনদিন ফেল করবে। তুমি একটা ইস্কুলের হেডমাস্টার না? তোমার সম্মানটাই বা কোথায় থাকবে?”

বাবা পাত্তাই দিত না।

“ও এক আধবার ফেল করলে কিচ্ছু এসে যায় না। বড় বড় গোলকিপাররা কেউ পণ্ডিত লোক ছিল না। আর হলেও সেসব কেউ মনে রাখে না। লেভ ইয়াশিন কোন পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিল কিনা কেউ জানে? গর্ডন ব্যাঙ্কস যদি পি এইচ ডি ও হত, কী এসে যেত তাতে? আমাদের থঙ্গরাজ কি মহাপণ্ডিত? তারপর ধর শিবাজী ব্যানার্জি। সে তো বড় চাকরি করে। কিন্তু শুধু সেইটে হলে কে চিনত তাকে? কিন্তু এত গোল বাঁচিয়েছে, যে ভোলবার জো নেই।”

“তুমিই কানের কাছে বড় বড় নাম করে ছেলেটার মাথা খাচ্ছ। অত বড় কি সবাই হয় নাকি? ওর দ্বারা কদ্দূর কী হবে কে বলতে পারে? কিছুই যদি না হয় তখন খাবে কী? ভদ্দরলোকের ছেলে রিকশাও তো টানতে পারবে না।”

“আরে বাবা, তোমার ছেলেও অনেক বড় হবে। আমি নিজে না খেললেও কম তো দেখিনি আর পড়িনি। আমার ভুল হয় না। আচ্ছা আমি নয় ফালতু লোক। কিন্তু বিভূতি ঘোষ? মস্ত লোক। সে তোমার ছেলেকে নিজে ডেকে নিয়েছে।”

“হ্যাঁ, বিভূতি ঘোষের তো দিব্যদৃষ্টি আছে…”

“তার চেয়েও বেশি। কত ফুটবলারকে লোকটা নিজে হাতে তৈরি করেছে তা জান? আর নিজে কত বড় ফুটবলার ছিল তাও যদি জানতে। রেলের গোলে যখন খেলতেন তোমাদের ঘটিদের দলের সব বড় বড় স্ট্রাইকার মাথা ঠুকে মরত। জিজ্ঞেস করে দেখো না, তোমার বড়দা, মেজদাকে। তেনারা না বললে তো আবার তোমার বিশ্বাস হয় না।”

বিভূতি ঘোষের কোচিংয়ে নীলাঞ্জন ততদিনে বুঝে গেছে যে ও সত্যিই অনেক বড় গোলকিপার হতে পারে। ওঁর কাছে প্র্যাকটিস করতে যাওয়ার এক বছরের মধ্যে ওঁর ক্লাবের এক নম্বর গোলকিপার হয়ে গেছে ও। বয়স তখন মোটে সতেরো। আগের বছর মাধ্যমিকটা সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করায় মা বলল “বাপের বাড়ি যাওয়ার আর মুখ রইল না আমার।” মামারা বাড়ি বয়ে বলে গেল “দিনকাল তো ভাল নয়, এই রেজাল্ট নিয়ে কী করবে তোর ছেলে? দ্যাখ যদি শিবরামদার কোন ছাত্র টাত্রর দোকানে কাজে ঢুকিয়ে দিতে পারিস।”

নীলাঞ্জনের এমন গা পিত্তি জ্বলছিল যে ভেবেছিল মাঠে শেখা সব খিস্তি উজাড় করে দেবে। সেই ভয়েই বাবা ওকে ঠেলেমেলে দোতলায় পাঠিয়ে দিয়েছিল। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সিঁড়ির মুখে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ও শুনেছিল মামারা যা তা বলেই চলেছে আর বাবা মুখ বুজে শুনছে। শেষে শুধু একটাই কথা বলেছিল।

“নীলুর চাকরি নিয়ে কারোর ভাবনাচিন্তা করার দরকার নেই। ওর খেলাই ওর চাকরি জুটিয়ে দেবে। আপনারা পনেরো কুড়ি বছর হল মাঠের ধারেকাছে যান না তো। জানবেন কোত্থেকে?”

তাতে মামারা খুব চোটপাট করে বিদেয় হয়েছিল। বাবা উপরের ঘরে এসে ফিক করে হেসে বলেছিল “শালা কি আর এমনি বলে? তুই যেদিন ইস্টবেঙ্গলকে লিগটা জেতাবি সেইদিন বাড়িতে ডেকে ইলিশের তেল খাওয়াব, ঝোল খাওয়াব, ঝাল খাওয়াব। তারপর বলব ‘দ্যাখ শালারা, বলেছিলিস না এ ছেলের কিস্যু হবে না?’”

“কি গো? ছেলেটা তখন থেকে বলছে পায়খানায় যাবে, তোমার কানে কথা যাচ্ছে না?” শ্রাবণীর ধমকে চমকে ওঠে নীলাঞ্জন। তাড়াতাড়ি ছেলের প্যান্টটা খুলিয়ে বাথরুমে দৌড়য়। রান্নাঘর থেকে শ্রাবণী গজগজ করে “রুদ্রদা ঠিকই বলেছিল। তোমার মাথাটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”

গত এক দেড় বছরে এই কথাটা এতবার শুনতে হয়েছে এতজনের মুখে যে মাথাটা ঝট করে গরম হয়ে যায় নীলাঞ্জনের। “হ্যাঁ, আমারই তো মাথা খারাপ। তোমরা সকলে তো সুস্থ লোক। তাই জন্যে তো সবাই মিলে আমার খেলাটা ছাড়িয়েছিলে। কতকগুলো অশিক্ষিতর পাল্লায় পড়ে… আজকে খেলায় থাকলে আমার গাড়ি, বাড়ি সব হত। দিনরাত এটা নেই ওটা নেই বলে খোঁটা দেওয়া বার করে দিতাম। তর সইল না কারোর। তক্ষুণি চাকরি করতে হবে। শা…”

“অ্যাই অ্যাই, খবরদার। ছেলেমেয়ের সামনে মুখ খারাপ করবে না,” শ্রাবণী রান্নাঘর থেকে খুন্তি উঁচিয়ে ছুটে আসে। নীলাঞ্জনের মা ঘর থেকে চিৎকার করে “আমাদের তর সইছিল না, না তোমারই তর সইছিল না? শ্রাবণীকে বিয়ে করার জন্যে কে ক্ষেপে উঠেছিল? আমি?”

“বাঃ! আমি জানতাম আমারই দোষ হবে শেষ অব্দি। দিতেন না বিয়ে। আমি কি পায়ে ধরেছিলাম? অনেক ভাল ভাল সম্বন্ধ আসত আমার। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার — কী না।”

রাগের চোটে ছেলেটাকে কমোডে বসিয়ে রেখেই জলভর্তি বালতিটা লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বাথরুম থেকে ছাদে চলে যায় নীলাঞ্জন। মা আর বউ দুজনে সুর সপ্তমে চড়িয়ে দেয়। অঙ্ক ফেলে নীলাঞ্জনের পিছু পিছু দৌড়য় মেয়েটা। সেদিন পূর্ণিমা। ছাদে গিয়ে আলসেয় হেলান দিয়ে বসে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে নীলাঞ্জন। মেয়েটা ভয়ে ভয়ে পাশে এসে বসে। “বাবা, রাগ কোর না। বাবা!” জ্যোৎস্নায় মেয়েটার মুখ দেখে রাগ পড়ে আসে। বুকে জড়িয়ে ধরে। মেয়ে সাহস পেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এইভাবে নীলুর বাবা হাত বুলিয়ে দিতেন, হারা ম্যাচের পরে।
শ্রাবণীর সেই জামাইবাবু ঠিকই বুঝেছিলেন যে এ দেশের শতকরা পঁচানব্বইটা লোকের মতই নীলাঞ্জন মনের ডাক্তার দেখানোর পরামর্শটার মানে বুঝবে তাকে পাগল বলা হল। তাই আলাদা করে শালীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে মানসিক রোগী মানেই উন্মাদ নয়, তবে নীলাঞ্জনের যেটা হয়েছে সেটার চিকিৎসা না করালে ফলাফল মারাত্মক হবে। শ্রাবণী নিমরাজি হয়েছিল, কারণ তার মনে হয়েছিল ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়। নীলু মানুষটা বরাবরই তো একটু রগচটা। বিয়ের আগের থেকেই শ্রাবণী তা জানে। তবু জামাইবাবুর কথায় সে ডাক্তার দেখাতে তৈরি ছিল। কিন্তু শাশুড়ি একেবারে হাঁকড়ে দিলেন। তাঁর ছেলের অনেক দোষ আছে ঠিকই, তা বলে তাকে পাগল ঠাওরাবে ছেলের শ্বশুরবাড়ির লোক এটা তিনি মেনে নেন কী করে? “আমার ছেলে লেখাপড়া বেশিদূর করেনি, আমিও গোমুখ্যু। বিপদের সময় তোর বাবা আমায় সাহায্য করেছিলেন বলে আমি চিরঋণী, সেও ঠিক। তা বলে এইভাবে তোরা আমাদের অপমান করতে পারিস না, শ্যামু। ভগবান আছেন,” ইত্যাদি বলে তিনি বাড়িতে মহা অশান্তি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আর কার সাধ্য নীলুকে ডাক্তার দেখায়?

ফুটবল ছেড়ে দিতে হওয়ার জন্যে যেদিন মা আর বউ মিলে নীলাঞ্জনকেই দায়ী করেছিল, সেদিন ওর মুখে কথা যোগায়নি। কারণ ঠিক কোন ঘটনার জন্যে শেষ অব্দি ওকে খেলা ছেড়ে দিতে হয়েছিল সেকথা ঠিক করে মনেই পড়ছিল না। পড়ল একদিন দোকানে বসে থাকতে থাকতে।
সবুজগ্রামের সবচেয়ে পুরনো কম্পিউটারের দোকানটার মালিক শিবরামবাবুর এক সময়ের ছাত্র রঘু সেন। শুরু করেছিল অল্প পুঁজিতে ছোট্ট দোকান দিয়ে। বছর পাঁচেক আগে যখন রেললাইনের ওপারে বড়িহাটায় সুপার মার্কেট তৈরি হল তখন তার দোতলায় ‘সেন’স আই টি শপ’ বলে বিশাল দোকান করে বসেছে। সেই ছোট দোকানের আমল থেকেই নীলাঞ্জন ওর কর্মচারী। হেড স্যারের অনেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় অবদান রঘুর জীবনে, তাছাড়া নীলু পরিশ্রমী ছেলে। তাই ওকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিজের ডান হাত করে নিয়েছিল রঘু। ইদানীং অবশ্য নীলুর হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত আচরণ রঘুকে একটু চিন্তায় রেখেছে।

সেদিন প্রচন্ড গরম, সন্ধ্যের পরেও খদ্দের টদ্দের বেশি নেই। দোকানের এ সি তে বেশ আরামেই চুপচাপ বসেছিল নীলাঞ্জন। পাশেই একটা কম্পিউটারে দুটো অল্পবয়সী কর্মচারী মিলে ইউটিউবে মারাদোনার খেলার ভিডিও দেখছিল। এসে পড়ল সেই সাতজনকে কাটিয়ে গোল দেয়ার দৃশ্য। ওটা যতবার দেখেছে ততবার শিল্টনের জন্যে বড় কষ্ট হয়েছে নীলাঞ্জনের। লোকটা আগের গোলটা দিয়ে গেল হাত দিয়ে, রেফারিটা দেখলই না! তখনই লাল কার্ডটা দেখিয়ে দিলে তো আর দ্বিতীয় গোলটা হয় না। শিল্টনের আর কী করার ছিল? একটা লোকের পায়ে যদি বলটা আঠার মত লেগে থাকে তো গোলকিপার কী করবে? অথচ লোকে চিরকাল বলবে “শিল্টন দু গোল খেয়েছিল।” সেদিন দেখতে দেখতে চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

তখনো আলো ফোটেনি। সারারাত পাঁচটার অ্যালার্মের জন্যে কান খাড়া করে থাকতে থাকতে একটু ঘুম এসেছিল। ভেঙে গেল মায়ের ডাকে। “নীলু, ও নীলু! শিগগির ওঠ বাবা। দ্যাখ তোর বাবা কিরকম করছে!” নীলাঞ্জন দৌড়ে গিয়ে দ্যাখে বাবা কেমন গোঁ গোঁ শব্দ করছে। ডাকতে বুঝতে পারল বলেও মনে হল না। দুটো বাড়ি পরেই মিহির ডাক্তার থাকে। নীলাঞ্জন হাঁকাহাঁকি করে ডেকে আনল। ততক্ষণে সব শেষ।

সেদিন সাতটার মধ্যে এরিয়ান্স মাঠে পৌঁছনোর কথা। বিভূতিদা থাকবেন। এরিয়ান্স কোচ বিভূতিদার সাথে দীর্ঘদিন খেলেছেন। নিজে ট্রায়াল নেবেন নীলাঞ্জনের। পছন্দ হলেই এই মরসুমে কলকাতা লিগে কুড়ি বছরের নীলাঞ্জন গাঙ্গুলি। ওদের এক নম্বর গোলকিপার এবারে মোহনবাগানে সই করেছে। যেগুলো আছে সেগুলোর উপর কোচের ভরসা নেই বিশেষ। দলে নিলে খেলাবেনই। বাবা বলে দিয়েছে, ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে এরিয়ান্সকে সমর্থন করবে না। গোলের নীচে নীলু থাকলেও না। বিভূতি ঘোষ নটা নাগাদ এরিয়ান্স মাঠ থেকে সোজা শ্মশানে এলেন।
দু তিনদিন পরে বাড়িতেও এসেছিলেন। এক ফাঁকে নীলাঞ্জন আর ওর মাকে আলাদা করে নিয়ে বোঝালেন, অনেক কষ্টে এরিয়ান্সকে আটকে রেখেছেন। ওকে একদিন গিয়ে ট্রায়ালটা দিয়ে আসতেই হবে। নইলে ওরা অন্য কাউকে নিয়ে নেবে এবার। মা কিছুতেই বুঝল না। বলল “নীলুর দিদির পাত্র ঠিক করে গেছেন ওর বাবা। অঘ্রাণেই বিয়ে। ওনারা এক বছর পেছোতে পারবেন না বলে দিয়েছেন, আমাদের কন্যাদায় তাই মেনে নিয়েছি। যোগাড়যন্ত্র কী করে কী হবে সেসব ছেলে হিসেবে নীলুর দায়িত্ব। বিয়েটা মিটলে ও যেখানে ইচ্ছে খেলে বেড়াক আমি কিচ্ছু বলব না।”

যাবার সময় বিভূতিদা পিঠ চাপড়ে বলে গেলেন “কুছ পরোয়া নেই। কলকাতায় পরের সিজনে খেলবি। এদিককার ঝামেলাগুলো মিটিয়ে নে। যদ্দিন প্র্যাকটিসে আসতে না পারিস নিজে প্র্যাকটিসটা করিস। আর ফিটনেসটা যেন থাকে। ফোন করিস আমায়।”

ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার মামাদের দেখা গেল খুবই টানাটানির সংসার। ভাগ্নির বিয়ের খরচ উঠতেই চায় না। শেষে লজ্জার মাথা খেয়ে নীলাঞ্জনের মা গেলেন শ্রাবণীর বাবার কাছে। বছর তিনেক হল গোটা সবুজগ্রাম জানে তাদের অতনুর হবু গিন্নী হচ্ছে শিবরামবাবুর স্কুলের সেক্রেটারি গণেশ মুখার্জির মেয়ে শ্রাবণী। বাবা-মায়েদের আপত্তি নেই। পাকে পড়লে হবু কুটুমের কাছেও হাত পাতে মানুষ। নীলুর খুব রাগ হয়েছিল কিন্তু দিদির বিয়ে বাতিল হয়ে যায় যে। শেষ অব্দি শ্রাবণীর বাবাই উদ্ধার করলেন ধার দিয়ে। তিনি অবশ্য বলেছিলেন ওটা আগাম যৌতুক, ফেরত দেয়ার দরকার নেই। শুধু ওদের মেলামেশা নিয়ে লোকে নানা কথা বলে। তাই পরের বছরেই নীলু-শ্যামুর বিয়েটাও তিনি দিয়ে দিতে চান।

এভাবে গোল খাওয়া হজম হয়নি অতনুর। তাই পণ করেছিল যত তাড়াতাড়ি পারে শ্বশুরের পাইপয়সা চুকিয়ে দেবে। পারতে গেলে একটা চাকরি লাগে। যা পাওয়া যায়। পি ডিভিশনে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ ছেলেকে কে আর কী বড় চাকরি দেবে? তখন দেবদূতের মত কাজটা দিল রঘুদা। বিয়ের আগেই চাকরিতে ঢুকে গেল। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এইসব তালেগোলে এরিয়ান্সে ট্রায়ালটা দিতে যাওয়া হয়নি আর।

খেয়াল হতেই লাফ দিয়ে উঠে পড়ল নীলাঞ্জন। নাঃ, আর অপেক্ষা করা যাবে না। এখনই চলে যাওয়া ভাল। কোণে রাখা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে হনহনিয়ে হাঁটা দিল। পেছন থেকে কে যেন জিজ্ঞেস করল “নীলুদা, বাড়ি চললে?” ও দৌড়তে দৌড়তেই উত্তর দিল “মাঠে, মাঠে।”

খাবার টেবিলে ওর জন্যে অপেক্ষা করে করে নীলাঞ্জনের মেয়ে আর বউ ঘুমিয়েই পড়ল।

অলঙ্করণ: চন্দ্রা সরকার, দেবজ্যোতি পাত্র

প্রকাশ: আমার কাগজ, শারদীয়া ১৪২৫

Advertisements

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply