উদ্বাস্তু

যে হালার পো অসমে বাঙালিরা খ্যাদানি খাওয়ায় দুইহাত তুইল্যা নাচতাছে, হেয়া য্যান নিজের এদেশীয় হওয়ার প্রমাণটা খুঁইজ্যা রাখে। নইলে বাংলায় এন আর সি হইলে হালার অবস্থা ডনের অমিতাভ বচ্চনের মত হইব গিয়া

আমার ঠাকুর্দা শচীন্দ্র কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্যাশ ভাগ হইবার আগে থিকাই, জীবিকার প্রয়োজনে, উদ্বাস্তু। রেল কোম্পানিতে কাজ। টিটির চাকরি, মানে আমরা ডেলি প্যাসেঞ্জাররা যাদের “মামা” কই। ঢাকা বিক্রমপুরে তেনার পৈতৃক বাড়ি আছিল। কিন্তু মানুষ হইছেন আবার মামাবাড়িতে। আমার বাবা প্রশান্ত সে দুই বাড়ির কোনটাই দ্যাখেন নাই। কেন না তেনার জন্ম দ্যাশ ভাগের পরের বছর। তিনি সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তবে আমার জ্যাঠা, পিসিরাও কেউ তেনাদের পৈতৃক বাড়ি দ্যাখেন নাই।
আমার বাবারে নিয়া ঠাকুর্দা শচীন্দ্র আর ঠাকুমা সুবর্ণলতার নয়টি সন্তান হয়। একটি মেয়ে অবশ্য ছোটবেলাতেই মইর‍্যা গেছিল। বাকি আটজনের কেউ তেনাদের পৈতৃক বাড়ি দ্যাখেন নাই। তাঁরা সকলে এক জায়গায় জন্মানও নাই। রেল কোম্পানির ঠ্যালায় আমার ঠাকুর্দা যহন যেহানে আছিলেন এনারা সেইহানেই হইছেন। জন্ম থিকাই উদ্বাস্তু আর কি।
কিন্তু রিটায়ারমেন্টের পর তো আর রেল কোয়ার্টারে থাকতে দিব না। নিজের বাড়ি লাগব। কোথায় যাওন যায়? ঠাকুর্দা, ঠাকুমা জানতেন দ্যাশ থিকা আত্মীয়স্বজনেরা আইস্যা হুগলী জিলায় রেললাইনের বাঁদিকে এক জায়গায় বসত করছে। এখনো সেহানে সন্ধ্যাবেলা শিয়াল ডাকে। স্টেশন থিকাও বহুদূর। কিন্তু বিদেশ বিভুঁইয়ে আত্মীয়স্বজনের আশেপাশে থাকাই ভাল। নইলে বিপদে আপদে দেখব কেডা?
তাই রিটায়ার কইর‍্যা যৎসামান্য যা টাকাপয়সা পাইছিলেন ঠাকুর্দা, তাই দিয়া নবগ্রামে আমাগো বাড়ি হইল।
সে বাড়ির জমি ঠাকুর্দায় কার থিকা কিনছিল, সে এদেশীয় নাকি হেয়াও পূর্ববঙ্গ থিকা আইছিল, সেসব জানে এমন কেউ বোধহয় বাইচ্যা নাই।
যে হালার পো অসমে বাঙালিরা খ্যাদানি খাওয়ায় দুইহাত তুইল্যা নাচতাছে, হেয়া য্যান নিজের এদেশীয় হওয়ার প্রমাণটা খুঁইজ্যা রাখে। নইলে বাংলায় এন আর সি হইলে হালার অবস্থা ডনের অমিতাভ বচ্চনের মত হইব গিয়া। ডিটেনশন ক্যাম্পের বাইরে পুলিশে কিলাইব, ভিতরে আমরা।

বিঃ দ্রঃ এই পোস্টের ভাষা নিয়া যার আপত্তি আছে তারে আমি কাঁচকলা দ্যাখাই। বাঙাল আছিলাম, বাঙাল আছি, শ্যাষ নিঃশ্বাস ফেলা অব্দি বাঙালই থাকুম। মাইর‍্যাই ফেলাও আর কাইট্যাই ফেলাও।

প্রকল্প এখন প্রকাশ্যে

যেন একটা আলাদা আইন থাকলে গরুগুলোর চেয়ে রাকবরের প্রাণের মূল্য ঝাড়খন্ড পুলিশের কাছে বেশি হত

রাজস্থানে শুনেছি জল খুব সুলভ নয়। তবু পাছে পুলিশের গাড়ি নোংরা হয়, মৃতপ্রায় রাকবরকে ধুয়ে মুছে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গাড়িতে তোলা হয়েছিল। তবে বেদম পিটুনির পর ধুয়ে দিলেই রক্তপাত বন্ধ হয় না। তাই সম্ভবত তার পরেও গোটা রাস্তায় রাকবরের রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতাল — এই দীর্ঘ ছ কিলোমিটার পথে নিশ্চয়ই তার রক্তের রেখা এখনো মিলিয়ে যায়নি। রাজস্থানে তো জল সুলভ নয়।
তা রাকবর খানের রক্তের রেখা মিলিয়ে যেতে না যেতেই উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে সাহিল মার খেয়ে মরতে মরতে বেঁচে গেলেন। রাকবর আর সাহিলের মধ্যে চট করে কোন মিল চোখে পড়ে না। প্রথমজনের পেশা পশুপালন, দ্বিতীয়জন একটা চাকরি করেন। প্রথমজন গাঁয়ের লোক, দ্বিতীয়জন মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালের বাসিন্দা। প্রথমজন বিবাহিত এবং ইতিমধ্যেই বাবা হয়েছিলেন, দ্বিতীয়জন গিয়েছিলেন পছন্দের মানুষের সাথে ঘর বাঁধতে। দুজনের মধ্যে বস্তুত একটাই মিল — দুজনেই মুসলমান। কতটা ধর্মপ্রাণ ওঁরা তাও আমরা জানি না, কিন্তু যাদের কাছে আসল হল ধর্মীয় পরিচিতি তারা আদার ব্যাপারী। জাহাজের খোঁজ তারা নিতে চায় না। গত কয়েকবছরে ঘটে চলা গণপ্রহারে মৃত্যুর মিছিলে চোখ রাখলে ধর্মান্ধ বদমাইশ ছাড়া সকলেই দেখতে পাবেন যে এই সংগঠিত খুনগুলোর লক্ষ্য ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষেরা আর খুনগুলোর করছে ক্ষমতাসীন সঙ্ঘ পরিবার, যারা ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।
একথা এতদিন পর্যন্ত আমার মত দেশদ্রোহী মাকু, সেকুরাই কেবল বলছিল। এখন আর তা নয়। গণপ্রহারের শিকার হওয়া অতিপরিচিত হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী অগ্নিবেশ গত সপ্তাহে টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে একটা সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার বলেছেন “It was a lynch mob, except it was not a faceless lynch mob but one that was sponsored and supported by the powers that be in the state and central governments. I am not the first one to be attacked, many more have been lynched to death. Akhlaq Khan was killed in Dadri, so was Pehlu Khan and Junaid, and not a single murderer has been apprehended.”
রাকবরের খুন যা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তা হল হিন্দুত্ববাদী প্রশাসনের প্রকল্পই হল মুসলমান নাগরিকদের খুন করা। এরপর রেজিস্ট্রি করে হিন্দু প্রেমিকাকে বিয়ে করতে গিয়ে সাহিলের মার খাওয়া প্রমাণ করে মুসলমানদের মারা তাদের মারার জন্যেই। গোরক্ষা, লাভ জিহাদ ইত্যাদি হল নতুন নতুন অজুহাত। আগে তবু মন্ত্রী সান্ত্রীদের চোখের চামড়া বজায় রাখার দায় ছিল। এখন আর সেসব নেই। অভিযুক্তরা জামিনে ছাড়া পেলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড্যাং ড্যাং করে মাল্যদান করতেও চলে যাচ্ছেন।
রাজধানী দিল্লীতে বসে অবশ্য এখনো একটু কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করতে হচ্ছে। সংবিধানটা এখনো বদলানো হয়নি কিনা। তাই আমাদের বিশুদ্ধ হিন্দি বলা নিপাট ভালমানুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন “প্রয়োজনে সরকার গণপিটুনির বিরুদ্ধে আইন করতে প্রস্তুত।” যেন নতুন একখানা আইন করে দিলেই সমস্যা মিটে যাবে। যেন এখনকার আইনে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা আইনসম্মত। যেন অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে না শুধু উপযুক্ত আইন নেই বলে। যেন একটা আলাদা আইন থাকলে গরুগুলোর চেয়ে রাকবরের প্রাণের মূল্য ঝাড়খন্ড পুলিশের কাছে বেশি হত। “ও মন্ত্রীমশাই, ষড়যন্ত্রীমশাই… যত চালাকি তোমার, জানতে নাইকো বাকি আর।”
ধর্মীয় পরিচয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকা যেসব লোকেরা এখনো বেড়ার উপর বসে পা দোলাচ্ছেন আর “নিরপেক্ষতা”, “ডায়লগ” — এইসব ন্যাকা শব্দ কপচাচ্ছেন তাঁরা স্বামী অগ্নিবেশের সাবধানবাণীটা একবার পড়ে নেবেন “What they call hardline Hindutva is the greatest threat to Hindu culture, or sanatan dharam… The hardline approach of causing harm to whoever disagrees is a kind of nascent fascism.”
অবশ্য সাবধান হবে কে? অনেক লেখাপড়া জানা লোকের মতে তো আবার ফ্যাসিবাদ খুব ভাল জিনিস, দেশের ওটাই দরকার, হিটলার দারুণ লোক ছিল ইত্যাদি।

সায়েবসুবোদের ছবি

বাংলা ছবির ফেস্টিভ্যাল অভিযান ঋতুপর্ণ পরবর্তী যুগেই শুরু হয়েছে। এমনকি সত্যজিৎ, মৃণালের ছবিও কখনো ফেস্টিভ্যাল দর্শন করেনি, পুরস্কৃতও হয়নি

কাল হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় একটা বাংলা ছবি দেখতে চলে গেলাম সপরিবারে। বেশ ভাল লাগল ছবিটা। যতটা আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশিই ভাল লাগল। কিন্তু এক বালতি দুধে একফোঁটা চোনা। ছবির কলাকুশলীদের নামের তালিকা পুরোটাই রোমানে লেখা। বেশ কয়েকবছর হল বাংলার ছবিতে এটা বাংলার পাশাপাশি রোমানেও লেখার চল হয়েছে। অনেক ছবিতেই দেখেছি বাংলা লেখাটা পর্দার এককোণে অবহেলায়। এখানে দেখলাম বাংলা একদম বাদ।
বাংলা বর্ণমালার প্রতি ছবি করিয়েদের এই অনীহার কারণ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি। চটজলদি উত্তর আসে “আসলে ফেস্টিভ্যালে পাঠাতে হয় তো।” যেন বাংলা ছবির ফেস্টিভ্যাল অভিযান ঋতুপর্ণ পরবর্তী যুগেই শুরু হয়েছে। এমনকি সত্যজিৎ, মৃণালের ছবিও কখনো ফেস্টিভ্যাল দর্শন করেনি, পুরস্কৃতও হয়নি। একথা বললে আবার উত্তর আসে “বাংলা করার অনেক খরচ তো।” এতেও প্রশ্ন ওঠে সত্যজিৎ, মৃণালের কি মাটির নীচে রূপোর কলসীতে গুপ্তধন পোঁতা ছিল? আচ্ছা ফেস্টিভ্যালের দর্শক, বিচারকদের জন্যে বিদেশী ভাষায় সাবটাইটেল করাতে কোন খরচ হয় না? তাছাড়া ফেস্টিভ্যাল মাথায় রেখে যাঁরা ছবি বানান আজকাল, তাঁরা কত কাঁড়ি কাঁড়ি পুরস্কার আনছেন, বাংলা ছবি সারা বিশ্বে কেমন অগ্রগণ্য হয়ে উঠেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি। আরো একটা প্রশ্ন করি। বাংলাদেশের ছবিগুলো ফেস্টিভ্যালে যায় না? যাকগে।
পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র শিল্পের যে ভাঁড়ে মা ভবানী সেটা অনেকদিন হল কোন গোপন তথ্য নয়। কলাকুশলীরা নিজেরাই তো সংবাদমাধ্যমকে বলে বেড়ান যে ছবি করার খরচ তুলতেই বেশ কষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে এই রোমানে টাইটেল কার্ড করে ইংরিজি না জানা দর্শককে অচ্ছুত করে রাখার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, যাকে ইংরিজিতে elitism বলাই সঙ্গত, সেটা বাংলা ছবির নিয়ামকরা পান কোথায়? নাকি ব্যাপারটা আসলে এই যে বাংলা ছবির উচ্চশিক্ষিত শহুরে নির্মাতারা নিজেদের নামের সঠিক বাংলা বানানটাও জানেন না, জানার প্রয়োজনও বোধ করেন না? সে না হয় না-ই জানলেন। এ নিয়ে বেশি বললে আবার ব্যাপারটা শেষ অব্দি ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু কথা হচ্ছে বাংলা ভাষাটা যখন এতই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বস্তু তখন এই সায়েবসুবোরা নিজেদের সায়েবসুবো দর্শকদের জন্যে ইংরিজি ছবিই বানান না কেন? তাহলে তো ফেস্টিভ্যালের বিচারকদের আরো সুবিধা হয় আর ইংরিজিতে যাকে wider audience বলে, আপনাদের প্রশ্নাতীত প্রতিভা সেটাও পেতে পারে আর আর্থিক ক্ষতির মাত্রাও কমে যেতে পারে।

অনধিকার প্রবেশ

যেন কলেজ বা ইউনিভার্সিটি হল বারোয়ারী দুর্গাপুজো। পাড়ার কাউন্সিলর সবচেয়ে বেশি টাকা চাঁদা দেয় বলে সে চাইলে মুম্বাইয়ের মিস টিনাকে দিয়ে নবমীর দিন নাচের ব্যবস্থা করতেই হবে। যতই পাড়ার লোকে মনে করুক এটা অশ্লীল

যাদবপুরে প্রবেশিকা পরীক্ষা হওয়া উচিৎ না অনুচিত এই নিয়ে মতপার্থক্য আছে বিভিন্ন মহলে এবং থাকারই কথা। সরকারপোষিত একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংজ্ঞানুযায়ী আমার, আপনার মত করদাতাদের যৌথ সম্পত্তি। ফলে তার কার্যকলাপ নিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের সকলের মতামত থাকবে। এটা আমাদের অধিকার। কর্পোরেটচালিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁকজমক দেখে যতই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকুন, তাদের পরীক্ষা পদ্ধতি, ভর্তির প্রক্রিয়া, পাঠক্রম নিয়ে চেঁচামেচি করার অধিকার আমার আপনার নেই, এটা মনে রাখবেন।
যাদবপুরের প্রতি আমাদের সে অধিকার আছে বলেই যাদবপুরকে তথা সরকারপোষিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বুক দিয়ে আগলানো আমাদের কর্তব্য। এবং আমাদের সকলের অধিকার রক্ষা করার জন্যেই সরকারের কথায় যাদবপুর উঠবে বসবে, এমনটা হতে দেওয়া উচিৎ না।
সরকার মানেই নাগরিক নয়। সরকারের মতামত গণতন্ত্রের সবচেয়ে উন্নত অবস্থাতেও সব নাগরিকের মতামতের প্রমাণ নয়, বড়জোর সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের মতামতের প্রমাণ। সমস্ত ইস্যুতে তাও নয়। এমতাবস্থায় ঘরে বাইরে, কাগজে, চ্যানেলে, ফেসবুকে, হোয়াটস্যাপে বিতর্ক চলতে থাকুক কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে চলবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র তার শিক্ষক শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীদের হাতেই থাকতে হবে।
কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী রাজ্য সরকার পোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন “সরকার টাকা দিচ্ছে আর সরকারের কথা মানবে না?” যেন কলেজ বা ইউনিভার্সিটি হল বারোয়ারী দুর্গাপুজো। পাড়ার কাউন্সিলর সবচেয়ে বেশি টাকা চাঁদা দেয় বলে সে চাইলে মুম্বাইয়ের মিস টিনাকে দিয়ে নবমীর দিন নাচের ব্যবস্থা করতেই হবে। যতই পাড়ার লোকে মনে করুক এটা অশ্লীল।
এভাবে তো লেখাপড়া হয় না।
উপরন্তু আজকের সরকার একরকম সিলেবাস ঠিক করবে, কাল অন্য সরকার এসে বলবে “এসব বাজে জিনিস পড়ানো হচ্ছে। কাল থেকে অন্য জিনিস পড়ানো হবে।“ আজকের সরকার বলছে “প্রবেশিকা পরীক্ষা তুলে দিতে হবে।“ কালকের সরকার বলবে “প্রবেশিকা পরীক্ষা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় চলে নাকি?” সরকার বদলের সাথে সাথে যদি লেখাপড়ার ধারা বদলায় তাহলে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি থিসিসগুলো যে টোকা নয় সে কথা কে-ই বা বিশ্বাস করবে?
অনেক বড় বড় মাথা দেখতে পাচ্ছি প্রবেশিকা পরীক্ষা কেন ভাল নয় তার পক্ষে অনেক যুক্তি দিচ্ছেন। আমার নিজেরও দু একটা যুক্তি আছে কিন্তু সে বিতর্কে যাবই না। যেতাম যদি বুঝতাম রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আছে যাদবপুরের শ্রীবৃদ্ধি। কিন্তু সরকারের যে ভাবের ঘরে দিনে ডাকাতি। যে সরকারের আমলে সারা রাজ্যে কলেজের আসন কেনাবেচা হয়, সেই সরকারের যাদবপুরের উন্নতির চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না একথা নিঃস্বার্থ কেউ কেন বিশ্বাস করবে? যাদবপুরের অনেক ছাত্রছাত্রী দেখছি প্রশ্ন তুলছেন যে সেন্ট জেভিয়ার্স বা রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরও তো প্রবেশিকা পরীক্ষা নেয়, তাদেরকে সরকার জোর করছে না কেন? শুধু যাদবপুরের উন্নতিই কি সরকারের লক্ষ্য?
খুবই সঙ্গত প্রশ্ন। উত্তর একাধিক, তবে খুব সোজা। সেন্ট জেভিয়ার্সের ইউনিয়ন অরাজনৈতিক, সেখানে টি এম সি পির ঢোকার জায়গা নেই। আর বিদ্যামন্দিরের ছাত্র সংসদ বাতাসের মত। সবাই জানে আছে কিন্তু চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। অতএব সেখানেও টি এম সি পি কে ঢোকানো যাবে না। বিদ্যামন্দিরের উপরি সুবিধা এই যে তাদের চোখ রাঙালে, মুখ্যমন্ত্রী জানেন, বিজেপি “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” বলে তেড়ে আসবে।
যাদবপুরের প্রতি এই অহৈতুকী কৃপার অনেক কারণের একটা, স্পষ্টতই, তাদের তোলাবাজির এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারার ব্যর্থতা। আরো একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করুন। এমন দুটো ঘটনা যুগপৎ ঘটছে — কলেজ ভর্তি নিয়ে প্রকাশ্য দুর্নীতি আর যাদবপুরে অচলাবস্থা — যার প্রভাব রিকশাচালকের পরিবার থেকে উচ্চপদস্থ সরকারী আমলার পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত, অথচ সাম্প্রতিক ভোটগুলোর ফলাফল অনুযায়ী রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি স্পিকটি নট। আসলে ক্ষমতাসীন দলের মত তারাও চায় এ রাজ্যের লেখাপড়া গোল্লায় যাক৷ বিশেষ করে যাদবপুর গোল্লায় গেলে তো নাগপুরে মিষ্টান্ন বিতরণ হবে। মুক্ত চিন্তা এবং বামপন্থী চিন্তার আখড়াগুলো সঙ্ঘ পরিবারের কাছে পরের ছেলে পরমানন্দ। যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ। যাদবপুরের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষককুলের মধ্যে বিভিন্ন তীব্রতার লাল রঙের পোঁচ মমতাদেবী এবং মোদীবাবুর মধ্যে সমান বিবমিষার উদ্রেক করে। ২০০৮-০৯ থেকে শুরু করে বামফ্রন্টকে পছন্দ নয় বলে যে বামপন্থীরা মমতাকেই প্রকৃত বামপন্থী বলে নন্দিত করেছেন, এখনো করেন, তাঁরা এবার ভুলটা বুঝলে ভাল হয়।
এই অসহনীয় অবস্থাতেও, যে কোন আন্দোলন শুরু হলেই যা হয়, আন্দোলনের ধরণ নিয়ে সমালোচনা করতে কেউ ছাড়ছে না। লেখাপড়ার বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে সরকার, তবু যাদবপুরের সুবোধ বালক বালিকাদের উচিৎ ছিল ধর্নায় না বসে, অনশন না করে বই মুখে বসে থাকা — এই কথা অনেকেই বলছেন এবং লিখছেন। যেন ছেলেমেয়েরা রুখে না দাঁড়ালে তাঁরাই ব্যাপারটা নিয়ে সরকারের সাথে কথা বলে বিহিত করতেন। যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা প্রতিবাদ করছে কেন তাই নিয়ে প্রাজ্ঞদের অপার বিস্ময় এবং বিপুল ক্রোধ।
আমার পরিচিত যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের এক প্রাক্তন ছাত্র দুঃখ করে বলল তুলনামূলক সাহিত্যের একজন নাকি অনশন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাতে নাকি অনেকে বলছে ঐ বিভাগটাই ফালতু। ওটা তুলে দেওয়াই উচিৎ কারণ ওটা পড়ে কেউ চাকরি পায় না। ছেলেটি ভেবেছিল আমার সহানুভূতি পাবে কিন্তু আমি তাকে বললাম শুধু তুলনামূলক নয়, সবরকম সাহিত্য পড়ানোই বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। তাতে আমার মত সাংবাদিকদের মস্ত সুবিধা। আমরা রোজ যে ছাইভস্ম লিখি সেগুলোকে ছাইভস্ম বলে চেনার মত আর কেউ থাকবে না। শুধু সাহিত্যও নয়, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগও তুলে দেওয়া উচিৎ। কারণ এদেশে বহু ইঞ্জিনিয়ার বেকার বসে আছে। যত ইঞ্জিনিয়ার আছে তত চাকরি নেই। ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না।
আমার কথা শুনে ছেলেটির মুখের যা চেহারা হল তাতে আমার এত অপরাধবোধ হল যে ভাবলাম ওকে সন্দেশ বিস্কুট খাওয়াই। খাওয়াতে খাওয়াতে বললাম যে কাল একটা না তৈরি হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেশের সরকার আই আই টি, আই আই এস সি র সমান মর্যাদা দিয়েছে। যাদবপুরের কী হবে?
বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দেখে আমাদের স্কুলের জহরবাবুর জ্যামিতি ক্লাস নেওয়ার ঢঙে বললাম “আসলে একটা সাদা কাগজের উপর কয়েকটা বিন্দু একে অপরের থেকে অনেক দূরে দূরে বসে আছে। কিন্তু এগুলোকে জুড়লে দেখবি আসলে এগুলো একটা চতুর্ভুজের চারটে শীর্ষবিন্দু। একটা হল শিক্ষা ব্যবসায় জাঁকিয়ে বসতে চাওয়া কর্পোরেট, একটা সেই কর্পোরেটের দাসানুদাস ফ্যাসিবাদী সরকার, আরেকটা উচ্চশিক্ষা পুরোপুরি বেসরকারী হাতে চলে গেলেই সর্বোচ্চ যোগ্যতা না থাকলেও পড়িয়ে বা বই লিখে দু পয়সা কামিয়ে নেবে বলে ওঁত পেতে থাকা বুদ্ধিজীবী এবং চতুর্থটা হল এক শ্রেণীর ভদ্রলোক, যারা বরাবর চেয়েছে শুধু তাদের ছেলেমেয়েরাই লেখাপড়া শিখুক। চাষাভুষোর পড়াশোনা শিখে কী হবে?”

%d bloggers like this: