আক্রমণে মৃণাল, রক্ষণে নীতা

পেশায় যৌনকর্মী হওয়ায় আত্মত্যাগের প্রাপ্য প্রতিদান হিসাবে তাঁর নামে রঙ্গালয়ের নামকরণ সে যুগে করা হয়নি। তার প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে এই দলের ক্যাপ্টেনস আর্ম ব্যান্ড নটী বিনোদিনীর পুরোবাহুতেই থাক

সোশাল মিডিয়ায় কদিন হল ভাইরাল হয়েছে একটা ফুটবল দলের ছক। যে দলের সদস্য আমাদের বাংলা সাহিত্যের কিছু জনপ্রিয় চরিত্র। হয় তারা খেলছে বা দলের সঙ্গে অন্য নানা ভূমিকায় যুক্ত আছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ময়দান থেকে বহুদূরে থাকা আমরা এভাবেই দুধের সাধ ঘোলে মেটাই।
দলটার দিকে তাকিয়ে কল্পনার পাখা মেলে দিতে গিয়ে খেয়াল হল, ফিফা ক্রমতালিকায় ৯৭ নম্বরে থাকা ভারতের পুরুষদের জাতীয় দলের তুলনায় মেয়েদের দল কিন্তু অনেক এগিয়ে। এই মুহূর্তে আমাদের মেয়েরা ৬০ নম্বরে। উত্তর আমেরিকায় ২০২৬ থেকে পুরুষদের বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে তেমন হলে (এই মুহূর্তে ২৪ দলের প্রতিযোগিতা) ভারতের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তখনই মনে হল, আমাদের সাহিত্যের জ্বলজ্বলে নারী চরিত্রদের নিয়েও একটা জবরদস্ত ফুটবল দল বানানো যেতেই পারে। তবে সে দল অতটা মজার হবে না, বরং লড়াকু হবে। আমাদের দেশের কজন মেয়েরই বা মজায় বাঁচার সুযোগ হয়।
এখানে স্বীকার্য যে আমার পড়ার পরিধি খুব ছোট। তার উপরে ওপার বাংলার সাহিত্য প্রায় কিছুই পড়া হয়নি। ফলে যাঁরা বেশি পড়েন তাঁরা নিশ্চয়ই আরো ভাল দল বানাতে পারবেন। আরো বলা প্রয়োজন যে খেলোয়াড় ঠিক করার সময়ে সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে যেভাবে এদের কারো কারো চরিত্রচিত্রণ হয়েছে তা ভুলতে পারিনি। সার্থক বাংলা ছবির অনেকগুলোই তো সাহিত্যাশ্রয়ী। ফলে আশা করি মহাপাতক হয়নি।
গোলে রাখলাম বাণী বসুর গান্ধর্বী উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অপালাকে। প্রতিকূল অবস্থাতেও সবদিক সামলে সঙ্গীতের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই মহিলাকে দুর্গ সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। ম্যানুয়েল নয়ারের মত মাল্টি টাস্কিং গোলরক্ষা এঁর পক্ষেই সম্ভব।
দুই সাইড ব্যাকের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের কুমুদিনী আর আশাপূর্ণা দেবীর আইকনিক চরিত্র সুবর্ণলতা। সে যুগে দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্বামীর সাথে দূরত্ব রেখে জীবন কাটানো ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের নায়িকা কুমুদিনী আর আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজির সুবর্ণলতা রক্ষণে যেমন আঁটোসাটো, তেমনি কাফু আর রবার্তো কার্লোসের মত ওভারল্যাপে গিয়ে বিপক্ষকে তছনছ করে দিতেও পারে। মনে করে দেখুন স্বদেশী আন্দোলনের সমর্থনে সুবর্ণ কেমন বাড়ির উঠোনে বিলিতি জামাকাপড় পুড়িয়ে দিয়েছিল।
সেন্ট্রাল ডিফেন্সে আমাদের দরকার তুলনায় কম দুঃসাহসী কিন্তু দৃঢ়চেতা দুজনকে। তাই রইলেন আশাপূর্ণারই ‘অনাচার’ গল্পের সুভাষ কাকিমা, যিনি অসুস্থ, মৃতপ্রায় শ্বশুরমশাইকে মানসিক আঘাত থেকে বাঁচাতে স্বামীর মৃত্যুর খবর গোপন করে সধবার জীবন কাটিয়েছিলেন দীর্ঘকাল, সামাজিক গঞ্জনা বা শাস্ত্রের ভয়কে তোয়াক্কা করেননি। ইনিই আমাদের ফ্রাঙ্কো বারেসি।
এঁর পাশেই থাকবেন শক্তিপদ রাজগুরুর নীতা, পরিবারের জন্যে যার সর্বস্ব ত্যাগকে পর্দায় অমর করে রেখেছেন ঋত্বিক ঘটক। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে এমন নিঃস্বার্থ সৈনিক আর পাব কোথায়?
মাঝমাঠে আমাদের জেনারেল হিসাবে থাকবেন নটী বিনোদিনী। ওখানে দরকার এমন একজনকে যিনি দলের স্বার্থে ডিফেন্সে নেমে আসবেন, আবার স্ট্রাইকারদের ডিফেন্স চেরা পাসও বাড়াবেন প্রয়োজনে। বাংলার সাধারণ রঙ্গালয় তৈরি করার জন্যে যিনি অভিনয় করা ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রবল ব্যথা সহ্য করে, যিনি অমর হয়ে আছেন ব্রজেন দের নাটকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে, সেই নটীই এই কাজের উপযুক্ত। পেশায় যৌনকর্মী হওয়ায় আত্মত্যাগের প্রাপ্য প্রতিদান হিসাবে তাঁর নামে রঙ্গালয়ের নামকরণ সে যুগে করা হয়নি। তার প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে এই দলের ক্যাপ্টেনস আর্ম ব্যান্ড তাঁর পুরোবাহুতেই থাক।
বিনোদিনীর দুপাশে মাঠ আলো করে থাকবে পথের পাঁচালীর দুর্গা আর শেষের কবিতার লাবণ্য।
ভীষণ দুরন্ত দুর্গা এনগোলো কান্তের মত সারামাঠ দৌড়ে ব্যস্তিব্যস্ত করে দেবে প্রতিপক্ষকে। আর অকল্পনীয় পাসে মাঠে ফুল ফোটাবে লাবণ্য। দিয়েগো মারাদোনার মতই যাকে ছকে বাঁধা যায় না, যে দীঘির জল, ঘড়ার জল নয়, সে-ই তো লাবণ্য।
ত্রিফলা আক্রমণে স্ত্রীর পত্রের মৃণাল, দহনের ঝিনুক, আর বঙ্কিমের দেবী চৌধুরানি।
প্রথম জনের সাথে আজীবন শ্বশুরবাড়ির মূল্যবোধের লড়াই চলেছে। শেষে সে পুরী থেকে চিঠি লিখে স্বামীকে জানিয়ে দিয়েছে যে সে শুধু মেজোবউ নয়, জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে তার যে অন্য সম্পর্কও আছে তা সে আবিষ্কার করেছে। সুতরাং সে আর সংসারের শিকলে বাঁধা পড়বে না। দ্বিতীয় জন গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে লড়েছে পুরুষের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে। আর তৃতীয় জন নিরীহ বধূ থেকে ডাকাত সর্দার হয়ে একদা প্রভুত্ব করা পুরুষদের পদানত করেছে। এই আক্রমণভাগ দেখে যে কোন ডিফেন্স কাঁপতে বাধ্য।
আমাদের শক্তিশালী রিজার্ভ বেঞ্চে থাকছে সামাজিক রীতিনীতির বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস রাখে এরকম চারজন — তারাশঙ্করের মহাশ্বেতা, চোখের বালির নায়িকা বিনোদিনী, কাপালিকের কাছে বেড়ে ওঠা বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা এবং শরৎচন্দ্রের রাজলক্ষ্মী।
লীলা মজুমদারের রসিক, প্রবল বুদ্ধিমতী পদিপিসী এই দলকে চালনা করবেন। টেকনিক্যাল পরামর্শ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করবে হাঁটুর বয়সী কলাবতী — মতি নন্দীর চরিত্র। এখানে কোচ আর টিডির অশান্তির কোন সম্ভাবনা নেই। পিসী সম্ভবত ৪-৩-৩ ছকেই খেলাবেন কারণ যাদের হারাবার কিছু নেই, জয় করার জন্যে আছে গোটা জগৎ তাদের রক্ষণাত্মক হয়ে লাভ নেই।

গোলরক্ষক: অপালা। রক্ষণ: কুমুদিনী, সুভাষ কাকিমা, নীতা, সুবর্ণলতা। মাঝমাঠ: লাবণ্য, নটী বিনোদিনী, দুর্গা। আক্রমণ: মৃণাল, ঝিনুক, দেবী চৌধুরানী। অতিরিক্ত: মহাশ্বেতা (গোলরক্ষক), বিনোদিনী, কপালকুণ্ডলা, রাজলক্ষ্মী। কোচ: পদিপিসী। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর: কলাবতী।

সকলের রক্ত

সব হি কা খুন হ্যায় শামিল ইয়াহাঁ কি মিট্টি মে
কিসি কে বাপ কা হিন্দুস্তান থোড়ি হ্যায়।।
— রাহাত ইন্দোরি

হা হা হা। আবার একটা লোককে মেরে ফেলেছে রে।
সে লোকটা কেবল গরু তাড়াচ্ছিল। হো হো হো।
কি হাসি পাচ্ছে রে ভাই! হি হি হি।
আবার দেখলাম মারতে মারতে যখন নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ তাদের এসকর্ট করে নিয়ে যাচ্ছিল। হে হে হে।
এ তো পুরো হিন্দি সিনেমা রে ভাই। যারা মারছিল তারা পুরো অক্ষয় কুমার মাইরি। গুরু গুরু।
লোকটাকে রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে যা স্টাইলে নিয়ে গেল না! দেখে আমার দিদি তো পুরো ফিদা। বলল এবার থেকে সল্লু না, এই অফিসারটার জন্মদিনেই বন্ধুদের খাওয়াব।
আবার লোকটা থেকে থেকে জল চাইছিল। হা হা হা।
কি গাধা মাইরি! ভেবেছে ওকে খতম করার আগে আবার জল খেতে দেবে!
এত নির্বোধও এদেশে ছিল! মরার সময়ও ভেবেছে লোকগুলোর মায়া দয়া আছে! আব্দারটা ভাব!
কী রে, ভাই? কাঁদছিস কেন? আরে ধুর! আমরা এই নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি করতেই পারি। আমাদের কোন ভয় নেই। আমরা কি কাসিমের জাত নাকি? আমাদের গায়ে কে হাত দেবে?
কী বললি? ও, তাই বল। আর্জেন্টিনা হেরে গেছে বলে দুঃখ হচ্ছে। সত্যি রে ভাই, আমারও বড্ড কান্না পাচ্ছে। আয় গলা জড়িয়ে দু ভায়ে কাঁদি। ভেউ ভেউ ভেউ ভেউ…

একটি অসাধু গল্প

পল্টু যদ্দিনে বড় হইল তদ্দিনে ভক্ত পরিবার জনপ্রিয় হইতে শিখিয়া ফেলিয়াছে শুধু নয়, পল্টুর পরিবার অপেক্ষা এলাকায় বেশি জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে

এ অঞ্চলে যজমানি এবং পাঠশালায় শিক্ষকতার কারণে পল্টুদের পরিবারের বিস্তর প্রতিপত্তি ছিল বহুকাল হইতে। কবে হইতে? অন্তত বুড়োশিবতলার বুড়ো বটগাছ যদ্দিন আছে তদ্দিন তো বটেই। এই প্রতিপত্তি আরো বাড়িয়া গেল যখন কয়েক দশক পূর্বে পল্টুর বাপ-জ্যাঠারা লাঠিসোটা এবং বুদ্ধি একত্র করিয়া পার্শ্বস্থ গ্রামের ভক্ত পদবিধারী ডাকাত পরিবারকে কপর্দকশূন্য করিয়া দিলেন। গোড়ায় পল্টুর পিতামহ উহাদের ধোপা নাপিত অবধি বন্ধ করাইয়াছিলেন, অতঃপর শক্তিহীন ভক্তকুল পায়ে ধরিয়া “আর করিব না” বলিয়া নাকখত দেয়ায় আদেশ হইয়াছিল — কোন ঘরে কোন অস্ত্র রাখা চলিবে না, নিজেদের গ্রামের বাহিরে কাহারো সাথে অদরকারে কথা বলা চলিবে না এবং সর্বোপরি নিজগ্রামের বা অন্য কোন গ্রামের মোড়ল হইবার চেষ্টা করা চলিবে না। “জো হুজুর” বলিতে তাহাদের জুড়ি ছিল না। তাই তাহারা এসবই মানিয়া লইল।
অতঃপর আমাদের পল্টু বাড়িয়া উঠিল, সংস্কৃত শিক্ষায় এবং আঁক কষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তির কারণে আমাদের অঞ্চলে বিলক্ষণ দু চার পয়সা করিল এবং খ্যাতির অধিকারী হইল। প্রত্যুৎপন্নমতি হওয়ায় পল্টুর পূর্বপুরুষেরা যাহা চিন্তাও করেন নাই পল্টু তাহাই সম্ভব করিল। সে যজমানি ও শিক্ষকতা ছাড়িয়া দিয়া শুধু মোড়লি করিয়াই বিস্তর ধনী হইয়া উঠিল।
ওদিকে ভক্তরাও বসিয়া নাই। গিরীশ মহাপাত্র যেমন নিজে না খাইলেও অন্যের কাজে লাগিতে পারে বলিয়া গাঁজার কলিকা সংরক্ষণ করিত, ভক্তরাও তেমনি “নিজে শিখিতেছি না, অন্যকে শিখাইতেছি” বলিয়া অস্ত্রশিক্ষা ও মোড়লি শিক্ষা চালু করিয়া দিল আপনাদিগের উঠোনে। পল্টুর বাপ-কাকাদের কাছে কোন কোন ম্লেচ্ছ অভিযোগ করিয়াছিল বটে যে ইহাদের এখনই মাজা ভাঙিয়া দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাবুরা কহিলেন “ম্লেচ্ছগুলার সবেতে বাড়াবাড়ি।” সুতরাং ভক্তদের শক্তি সঞ্চয় নির্বিঘ্নে চলিতে লাগিল।
পল্টু যদ্দিনে বড় হইল তদ্দিনে ভক্ত পরিবার জনপ্রিয় হইতে শিখিয়া ফেলিয়াছে শুধু নয়, পল্টুর পরিবার অপেক্ষা এলাকায় বেশি জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। এ অঞ্চলের লোককে সত্যের সাথে মিথ্যার উত্তম মিশ্রণ পান করাইয়া তাহারা বুঝাইতে সমর্থ হইয়াছে যে পল্টু ও তাহার পিতৃপুরুষ অদ্যাবধি কেবলই নিজেদের ঘর হইতে এ অঞ্চলের কোষাগার পর্যন্ত সিঁধ কাটিয়াছে, অন্য কিছু করে নাই। এই সমস্তের ফলে ভক্ত পরিবার কালে কালে নিজেদের শিষ্যদের মাধ্যমে অঞ্চলের মোড়লি দখল করিতে সমর্থ হইলেন।
আগেই বলিয়াছি আমাদের পল্টু আঁক কষিতে সেই ছোট থেকেই বিশেষ পারদর্শী। এখন প্রবীণ হইলেও সে ঘরের দেয়ালে প্রত্যহ শুভঙ্করী আঁক কষিত। ফলে দেয়ালের লিখন টের পাইয়া সে যথাসময়ে মাটিতে পোঁতা মোহরের কলসগুলিসমেত শহরে সরিয়া পড়িয়াছিল। অধুনা ভক্তকুলপতি নীরেন ভক্ত যখন সদলবলে আসিয়া পল্টুদের ভদ্রাসনের দখল লইল, তখন গহ্বরগুলি দেখিয়াই সে যা বোঝার বুঝিয়া গেল।
নীরেন স্বভাবে ডাকাত হইলেও, খুন, জখম, ফষ্টিনষ্টিতে রুচি থাকিলেও গুণীর কদর জানিত। সে ঠিক করিল তাহাদের গৃহের বিশ্বকর্মাপূজা উপলক্ষে সাক্ষাৎ বিশ্বকর্মা পল্টুকে সংবর্ধনা জানাইবে। শুনিয়া আমরা গ্রামবাসীরা, যাহারা নীরেনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ, ভীত সন্ত্রস্ত ছিলাম, তাহারা আশায় বুক বাঁধিলাম — বুঝি বা রত্নাকরের বাল্মীকি হইবার দিন ঘনাইয়া আসিল।
যথাকালে বিশ্বকর্মা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বহু বৎসর পরে গ্রামে পদার্পণ করিয়া আমাদের সেই ছোট্ট পল্টু নিতান্ত আবেগপ্রবণ হইয়া পড়িল। ভক্তদের দাওয়ায় পা রাখিয়াই সে নীরেনকে জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রুপাত করিয়া কহিল “ওঃ! ছেলে বয়সে এই দাওয়ায় তোমার ঠাকুর্দা বিশ্বনাথ ভক্তের কোলে বসিয়া কত খেলা খেলিয়াছি। অমন স্নেহময় ব্যক্তি ইহজীবনে আর একটিও দেখিলাম না।” শুনিয়া আমরা, এ তল্লাটের বৃদ্ধরা, বাকরুদ্ধ হইয়া গেলাম। প্রথমে তো বুঝি নাই কার কথা হইতেছে। ভাবিতেছিলাম আমার নব্বই বছরের জীবনে এমন সজ্জন আমাদের গাঁয়ে কাহাকে দেখিয়াছি। হঠাৎ পার্শ্বে দন্ডায়মান সুবল খুড়ো, যাঁহার বয়স ১০৩, তিনি অতি অভব্য ভাষায় সরোষে বলিয়া উঠিলেন “শালা বিশে ডাকাতকে সজ্জন বলচে র‍্যা। বিশে লুকিয়ে কিসব ভূত পেরেতের পুজো কত্ত। আমাদের গেরামের বাচ্চা ধরে এনে বলি দিত। পল্টুর বাপ আজ থাকলে ব্যাটার ঠ্যাং ভেঙে দিত।” বুঝিলাম খুড়ো প্রাণের মায়া ত্যাগ করিয়াছেন। আমার এখনো শতবর্ষ হইতে ঢের দেরী, তাই তাঁহার পাশ হইতে ছিটকাইয়া সরিয়া আসিলাম। বলা তো যায় না, কেহ যদি শুনিতে পাইয়া নীরেনের কানে লাগাইয়া দেয়! চাণক্য নাকি বলিয়াছেন রাজার সমালোচকের পাঁচ বিঘতের মধ্যে থাকিতে নাই।
অতঃপর পুজোমন্ডপের অনুষ্ঠানে নীরেন পল্টুকে কিছু বলিতে অনুরোধ করিল। আমরা শিরদাঁড়া সোজা করিয়া বসিলাম। আহা! কি চমৎকার বলিল আমাদের পল্টু!
“আজ আমি আপনাদের কাছে এতদঞ্চলের আদর্শ ও ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু বলিব।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই অঞ্চলকে প্রেম এবং সহমর্মিতার ভিত্তিতে গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। সভ্য, অসভ্য সকল মানুষের সহায়তায় এই অজ গাঁয়ে সভ্যতার গোড়াপত্তন করিয়াছিলেন। আমরা সর্বদাই ভ্রাতৃত্বের পথে চলিয়াছি, কাহাকেও শত্রু জ্ঞান করি নাই। তাই কবি বলিয়াছেন ‘যত মার খাই / পরোয়া তো নাই / মারো মোরে আরবার। / যে মারিছে মাথে / তাহারেও হাতে / দিতে হবে অধিকার।’ অতএব বন্ধুগণ, আমাদের হিংসা পরিহার করিতে হইবে, সকলকে ভালবাসিতে হইবে, বুঝিতে হইবে হিংসার দ্বারা কোন মহৎকার্য হয় না। চালাকির দ্বারা হইলেও হইতে পারে।”
শুনিয়া আমরা সকলেই প্রবল করতালি দিলাম। ভক্তরা এবং তাহাদের ছাত্ররাও দেখিলাম যৎপরোনাস্তি উল্লসিত। কিন্তু বক্তৃতা শেষ হওয়ামাত্রই যাহা ঘটিল তাহা আমাদের স্বপ্নাতীত। নীরেন উঠিয়া দাঁড়াইয়া মাথায় হাত ঠেকাইয়া অশ্রু গদগদ কন্ঠে চিৎকার করিয়া উঠিল “প্রভু, তোমায় আগে কেন চিনতে পারিনি, প্রভু? চিরকাল তোমায় পল্টু বলেই জেনেচি। এ পাপ আমি রাখব কোথায়, প্রভু? ক্ষমা কর, প্রভু, এই অধমের অপরাধ ক্ষমা কর।” বলিতে বলিতে সে দৌড়াইয়া মঞ্চে উঠিয়া পল্টুর পায়ে গিয়া পড়িল। দেখাদেখি সমস্ত ভক্ত পরিবার এবং তাহাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও সাষ্টাঙ্গ হইল। আমরা সকলেই পল্টুর স্বর্ণচশমায় শ্রীচৈতন্যের দিব্যচক্ষু প্রত্যক্ষ করিলাম। এও বুঝিলাম, ত্রেতায় যিনি রাম, দ্বাপরে যিনি কৃষ্ণ, ফাঁপরে তিনিই পল্টু। নীরেন উঠিয়া দাঁড়াইয়া মাইক হস্তে লইয়া ঘোষণা করিল সেই মুহূর্ত হইতে ভক্তরা এবং তাহাদের পারিষদবর্গ ডাকাতি, খুন, জখম, ধর্ষণ, চিটিংবাজি, ফেরেব্বাজি, কালোবাজারি ইত্যাদি সমস্ত অপরাধমূলক কার্য ছাড়িয়া দিল। এরপর হইতে আমাদের অঞ্চলে অখন্ড শান্তি, সচ্ছলতা, সমৃদ্ধি বিরাজ করিবে।
আমরা হর্ষিত হইয়া বুঝিতে পারিলাম দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে সুদিন আসিয়া পড়িয়াছে।

আতঙ্ক

এ রাজ্যে এখন স্কুল কলেজের শিক্ষক, অধ্যাপকরা ভীষণ বিপজ্জনক

আমাদের পাড়ায় একজন আছে যে বহু বছর আগে ইডেন গার্ডেন্সে একটা মোহনবাগান – ইস্টবেঙ্গল খেলা দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়েছিল। সেদিন ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আমার এই পাড়াতুতো কাকু জোর বেঁচে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন সোজা হয়ে হাঁটতে পারেনি। শুধু তাই নয়, এই সেদিনও বসে থাকতে থাকতে অকারণেই হঠাৎ চমকে উঠত — ট্রমা এমনই প্রবল। এত দীর্ঘ না হলেও, একটা স্বল্পমেয়াদী ট্রমা আমারও হয়ে যাচ্ছে বোধহয় — কিছু ছবি, কিছু শব্দ এমনভাবে গেঁথে যাচ্ছে মনে।
সর্বশেষ যে ছবিটা ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল সেটা হচ্ছে আজ সকালের কাগজে দেখা শ্রীরামপুর কলেজের এক অধ্যাপিকার ছবি। আতঙ্কে এভাবে কাঁদতে কোন দিদিমণিকে কখনো দেখিনি। মুহূর্তে প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়কার দিদিমণিদের মুখগুলো ভিড় করতে শুরু করল। খবরে প্রকাশ “আন্দোলনকারী” ছাত্ররা দিদিমণিদের বাথরুমের দরজাও ভেঙে দিয়েছে। প্রাক্তন নয়, বর্তমানদের কীর্তি এটা। এর আগে অন্যত্র এক দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারার ঘটনাও সর্বজনবিদিত। কিন্তু সেখানে সান্ত্বনা ছিল এটুকু যে কান্ডটা ঘটিয়েছে এক নেতা, দিদিমণির কোন ছাত্র বা ছাত্রী নয়। এবারে আর সেকথা ভেবে নিজেকে শান্ত করা যাচ্ছে না। নির্ভয়াকান্ডের পর যখন সেই ধর্ষণের পুঙ্খানুপুঙ্খ আমাদের সামনে আসছিল, তখন যেমন মধ্যে মধ্যে নিজেকেই ধর্ষক মনে হত, তেমনি আজ কেন যেন মনে হল আমিই আমার ছোটবেলার স্নেহময়ী দিদিমণিদের বাথরুমের দরজা ভেঙে দিয়েছি। শিউরে উঠলাম। কি ভয়ঙ্কর ছাত্রকুল তৈরি করেছি আমরা! অন্যায় দাবী আদায়ের জন্যে মাতৃসমা দিদিমণিদেরও চূড়ান্ত লাঞ্ছনা করতে বুক কাঁপে না এদের। শুনছি আজকাল নাকি মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের ভাগে খুন, ধর্ষণের হুমকিও বাদ যায় না।
পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র আন্দোলন, এমনকি উগ্র, হিংসাশ্রয়ী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। নকশাল আন্দোলনের সময়ে (যা ছাত্রদের নেতৃত্ব সত্ত্বেও ছাত্র আন্দোলনের পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না) হিট লিস্টে মাস্টারমশাইদের নাম উঠে যাওয়া, হত্যা — এসবের কথা শুনেছি। কিন্তু তখনো দিদিমণিদের উপর এ হেন আক্রমণ হয়েছে বলে জানি না। তাছাড়া অধ্যাপকদের কারো কারো বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা সত্ত্বেও সেইসব ছাত্ররা যখন পুলিশ বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছে বা পঙ্গু হয়ে গেছে — মাস্টারমশাইদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। যার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ সম্ভবত খুন হওয়া ছাত্রের স্মৃতিতে অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতা

ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্ন শির, তিমির।

কয়েকবছর আগে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হল হোক কলরব আন্দোলনে তখন আলোচিত হয়েছিল একদা উপাচার্য ত্রিগুণা সেনের কথা, যিনি নিজে কংগ্রেসি ছিলেন। কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় একবার তাঁকে ফোন করে বলেন “তোমার ক্যাম্পাসে দুটো কমিউনিস্ট লুকিয়ে আছে। পুলিশ যাচ্ছে, ওদের তুমি বের করে দাও।” উত্তরে উপাচার্য বলেন “আমি বেঁচে থাকতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পুলিশ আমার ছেলেদের গায়ে হাত দিতে পারবে না।” হোক কলরব আন্দোলনেও তো যাদবপুরের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ছাত্রছাত্রীদের সাথেই ছিলেন। ফলে বোঝা যায় যে যা ছাত্র আন্দোলন তা শিক্ষকবিরোধী হয় না। শিক্ষকবিরোধী হয় গুন্ডামি, যা কোন ইতিহাসের তোয়াক্কা করে না।
এ রাজ্যে এখন স্কুল কলেজের শিক্ষক, অধ্যাপকরা ভীষণ বিপজ্জনক। তাঁরা উন্নয়নবিরোধী, তাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁরা প্রচুর ছুটি পান (ঠিক সময়ে ইনক্রিমেন্ট, ডি এ ইত্যাদি যে পান না সেটা বলাও উন্নয়নবিরোধী), সবচেয়ে বড় কথা তাঁরা প্রতিবাদ করেন। অতএব এই বিপজ্জনক মানুষগুলোর হাত থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে গেলে যা যা করার সে তো করতেই হবে। খুন, জখম, মারধোর, শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা যতটা সম্ভব। অতএব একদিকে তাঁরা খুন হচ্ছেন, খুনের সঠিক তদন্ত দাবী করে হাজতবাস করছেন। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের হাতে মার খাচ্ছেন, লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
এই যে অবস্থার অবনতি এর জন্যে অনেকেই আবার শিক্ষককুলকেই দাবী করে থাকেন। শিক্ষকদের রাজনীতিই পশ্চিমবঙ্গের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করে দিয়েছে এই কথাটা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। সেই কারণে কিছু অভিজ্ঞতার কথা এই বেলা বলে ফেলি। আর কিছুদিন পরে এসব বললে হয় লোকে বলবে বানিয়ে বলছি, নয় মারতে আসবে।
আমি যে স্কুলে পড়েছি ক্লাস ফাইভ থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত, সেই স্কুল সেইসময় হুগলী জেলার অন্যতম সেরা স্কুল থেকে রাজ্যের অন্যতম সেরা হয়ে উঠছে। আগ্রহী যে কেউ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের থেকে মাহেশ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ফলাফল যাচাই করে নিতে পারেন। শুধু পরীক্ষার রেজাল্টের দিক থেকেই নয়, আরো নানা দিক থেকেই আমাদের স্কুল ছিল ব্যতিক্রমী। সে নাহয় কোন সুসময়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে লেখা যাবে। এখন এর কৃতিত্ব কার? অবশ্যই একজনের নয়। কিন্তু আমাদের মাস্টারমশাইরা বলতেন “সুধীরবাবু না থাকলে স্কুল এই জায়গায় আসত না।”
সুধীরবাবু অর্থাৎ আমাদের হেডস্যার সুধীরকুমার মুখোপাধ্যায়। ভদ্রলোক ঘোর সিপিএম। আমি যখন ঐ স্কুলের ছাত্র তখন উনি নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (ABTA) র জেলা সম্পাদক। সুধীরবাবুর সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনেছি আমার প্রিয় ইংরিজির মাস্টারমশাই সোমনাথবাবুর মুখে। স্যার একদিন বলেছিলেন “সুধীরবাবুর আগে কমিটি মেম্বাররা মিটিঙে চলে আসত লুঙ্গি পরে। উনি জলদগম্ভীর স্বরে বলেন ‘বাড়ি থেকে প্যান্ট পরে আসুন। সুধীরবাবুকে ছাড়া এমন হতেই পারত না।’” সোমনাথবাবু কোন শিক্ষক সংগঠনের সদস্য ছিলেন জানি না কিন্তু ঘোর গান্ধীবাদী লোক। বারবার বলেছেন “ঘরে দুটো লোকের ছবি রাখবি, আর কাউকে লাগবে না জীবনে — মহাত্মা গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ।”
আমাদের স্কুলের এসিস্ট্যান্ট হেডস্যার তখন পূর্ণবাবু। তিনি ইতিহাসের শিক্ষক, মার্কসবাদীদের ঘোর অপছন্দ করেন। একবার আমায় বলেছিলেন “সুধীরবাবুর সাথে আমার খুব তর্ক হয়। আমি বলেছি, আপনারা তো মুড়ি মিছরি এক দর করে দিতে চান।”
মার্কসবাদী সুধীরবাবু, গান্ধীবাদী সোমনাথবাবু আর দক্ষিণপন্থী পূর্ণবাবুর কখনো মতপার্থক্য হয়নি এমনটা নিশ্চয়ই নয়, কারণ সেটা অসম্ভব। কিন্তু তা বলে আমাদের স্কুলের উন্নতি থেমে থাকেনি, তরতরিয়ে এগিয়েছে। কেউ উলটো উদাহরণ দিতেই পারেন কিন্তু দুরকম উদাহরণেরই উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে সমস্যাটা শিক্ষকদের রাজনীতি করা নয়, খারাপ রাজনীতি করা। অবশ্য যারা অত্যাচারিত হচ্ছে তাদের রাজনীতিকেই দায়ী করা নেহাত গা জোয়ারি। সেখানে এতসব যুক্তি দিয়ে লাভই বা কী?
তপন সিংহের ছবিতে এক নিরীহ শিক্ষক রাজনৈতিক প্রশ্রয়প্রাপ্ত, সমাজবিরোধী হয়ে যাওয়া প্রাক্তন ছাত্রকে খুন করতে দেখে ফেলেন। ছাপোষা, যুবতী মেয়ের বাবা মাস্টারমশাইকে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে মেনে নিতে হয় “আপনি কিন্তু কিছুই দ্যাখেননি, মাস্টারমশাই।” আমাদের মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের এবং আমাদেরও — এখন সেই অবস্থা। মানে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে বেঁচে আছি। ছবিতে শিক্ষকের কন্যার মত আমাদের কতজনের যে মুখ পুড়বে আগামীদিনে কে জানে! তবে সেই মাস্টারমশাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বার্ধক্যের লাঠিটাকে স্কুলজীবনের মত আবার শাস্তি দেওয়ার লাঠি করে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন ভয় দেখাতে আসা মস্তানকে।
মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের হাতে মার যারা খেয়েছে তারাই জানে সে মারের জোর কত। হয়ত এখনো পিঠ পাতার সময় হয়নি।

সভ্যতার ফাঁদ

যতই পাহাড় কমে আসুক, সেইসঙ্গে জঙ্গল, তৎসহ শ্বাস নেওয়ার মত বিশুদ্ধ বাতাস। হোটেল হোক, রিসর্ট হোক, হাইওয়ে হোক, পেট্রল পাম্প হোক। এগুলোই তো সভ্যতার লক্ষণ

কদিনের জন্যে পালিয়ে গেছিলাম। শিক্ষক গ্রেপ্তার, বিরোধী হত্যা, নির্লজ্জ মিথ্যাভাষণ, দ্রব্যমূল্যের অনর্গল বৃদ্ধি, উপনির্বাচন, পেইড নিউজ — এসব ভুলে। পাহাড়ে। মধ্যে মধ্যে পালাতে ইচ্ছে বোধহয় সবারই করে। তবে পালাতে চাইলেই তো আর পালানো যায় না। আমরা সাধারণ মানুষ, মুকেশ আম্বানি তো নই। তাঁর জীবনযাত্রা চলে তাঁর নিয়মে, আমাদের চলতে হয় সমাজ, সংসারের নিয়মে। তবে যা দেখে এলাম, পালানোর জায়গা সকলেরই কমে আসছে।
গেছিলাম গৌহাটি হয়ে শিলং, সেখান থেকে হপ্তাখানেক ধরে এদিকওদিক চেরাপুঞ্জি, ডাউকি, লাইথলুম ইত্যাদি। সাড়ে আট বছর আগেও একবার শিলং গেছি। এবারে একই রাস্তায় যাওয়ার সময়ে সবচেয়ে বড় যে তফাতটা চোখে পড়ল সেটা হল তখন পাহাড় কেটে যে জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ হচ্ছিল তা এবারে সম্পূর্ণ। তা ভাল, তবে মুশকিল হল রাস্তা বানানো হয়ে গিয়ে থাকলেও পাহাড় ফাটানো আর শেষ হচ্ছে না। গৌহাটি থেকে শিলঙের পথে এবং শিলং থেকে চেরাপুঞ্জির পথে বিপুল উদ্যমে পাহাড় ভাঙা চলছে, ভাঙা জায়গাগুলো দগদগে ঘায়ের মত হয়ে আছে বাঁকে বাঁকে। পাহাড়ের গা থেকে রক্ত পড়ে না বলেই বোধহয় কেউ প্রশ্ন তোলে না “এত রক্ত কেন?” এত পাহাড় ফাটানো কেন তার উত্তর খুব শক্ত নয় অবশ্য। অনেক জায়গাতে ইতিমধ্যেই সাইনবোর্ড লেগে গেছে — অমুক হোটেল আর তমুক রিসর্ট। অনেক জায়গাতেই অবশ্য নির্মাণ সম্পূর্ণ। কিসের বলুন তো? পেট্রল পাম্পের। পাহাড়ে নির্মল বাতাস আর নীল আকাশের আশে বেড়াতে গিয়ে যতগুলো পেট্রল পাম্প দেখলাম তত সারাজীবনে দেখেছি কিনা সন্দেহ। টুরিস্ট বাড়ছে, গাড়ি বাড়ছে, সরকারের করপ্রাপ্তি বাড়ছে, পেট্রল পাম্প বাড়লেই বা ক্ষতি কী? আপনি বলবেন, তা ওসব তো করতেই হবে। পাহাড় বেচে তো আর পয়সা হয় না।” আরে আরে! বলেন কী! কে বলেছে পাহাড় বেচে পয়সা হয় না? আলবাত হয়। বেধড়ক পাহাড় ভেঙে ফেলা দেখে আমার গিন্নীর সাথে একটু হা হুতাশ করছিলাম “এইভাবে পাহাড় কাটছে! কী পায় এমন করে?” শুনে আমাদের ভাড়া গাড়ির চালক শর্মাজি বললেন “পত্থর বিকতা হ্যায় না! কাফি আচ্ছা দাম মিলতা হ্যায়।” কপালে ছিল বলে স্বচক্ষে দেখাও হয়ে গেল এক জায়গায়। পাহাড় ভাঙা হচ্ছে আর লরিতে চেপে টুকরো টুকরো পাহাড় চলেছে কিছু দূরে নির্মীয়মাণ রিসর্টের শোভাবর্ধনে। যারা পাথর ভাঙছে তারা খুশি কারণ দিব্য দু পয়সা হচ্ছে। যারা পাথর কিনছে তারা খুশি কারণ তাদের রিসর্ট মজবুত এবং মনোরম হচ্ছে। আমাদের মত টুরিস্টরা খুশি কারণ দুর্গম পাহাড় সুগম হচ্ছে, আমাদের থাকার জায়গা বাড়ছে। সরকার খুশি কারণ যত টুরিস্ট, যত রিসর্ট, তত কর। হিসাব বহির্ভূত আয়ব্যয়গুলোর কথা বাদই দিলাম। তাছাড়া মেঘালয় পিছিয়ে থাকবে কেন? পশ্চিমবঙ্গে হাতিদের যাওয়া আসার পথে হোটেল, রিসর্ট বানানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, উত্তরাখণ্ডে জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে দিয়ে হাইওয়ে হচ্ছে। মেঘালয় ছোট রাজ্য বলে কি মানুষ না? সে যতই পাহাড় কমে আসুক, সেইসঙ্গে জঙ্গল, তৎসহ শ্বাস নেওয়ার মত বিশুদ্ধ বাতাস। হোটেল হোক, রিসর্ট হোক, হাইওয়ে হোক, পেট্রল পাম্প হোক। এগুলোই তো সভ্যতার লক্ষণ।
পাহাড়ের শোক ত্যাগ করে অন্য কথা বলি। প্রকৃতিপ্রেমী বাঙালিদের জলে ফেলা প্লাস্টিক সত্ত্বেও মানতেই হবে ডাউকি ভ্রমণ মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে আমার মত কাঠবাঙালের পক্ষে, যার কয়েক ফুট দূরেই বাংলাদেশের জল, মাটি দেখে বারবার ‘কোমল গান্ধার’ মনে পড়ে যাচ্ছিল। বেসুরো গলায় গেয়েও ফেললাম সেই বিয়ের গান, যা ঋত্বিক দুই বাংলার বিয়ের গান হিসাবে ভেবেছিলেন “আমতলায় ঝামুরঝুমুর / কলাতলায় বিয়া / আইলেন গো সুন্দরী জামাই / মুটুক মাথায় দিয়া।”
সেই স্বপ্নসফর শেষ করে শর্মাজি নিয়ে গেলেন এক প্রত্যন্ত গ্রামে, নাম তার মউলিননং। কেন যাওয়া সেখানে? না সেটা এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। গ্রামে অনেক সাইনবোর্ড। অনেক খুঁজলাম এই সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের তকমাটা কে দিয়েছে কোথাও লেখা আছে কিনা। পেলাম না। আপনারা কোথাও পেলে জানাবেন। অবশ্য গ্রামটা নিঃসন্দেহে খুব পরিচ্ছন্ন। হবে না-ই বা কেন? গ্রামে কোন কাঁচা রাস্তা নেই, কাদা হবে কোত্থেকে? সব বাড়িতে পাকা শৌচাগার, পুরো গ্রামে পাকা নর্দমা। গ্রামটা খাসিদের, যাঁদের জীবিকা মূলত পর্যটনই, ফলে প্রায় সবকটা বাড়িই দোকান হয়ে উঠেছে। ফলক দেখে জানতে পারলাম গ্রামের রাস্তা পাকা হয়েছে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমে (MGNREGS)। এত পাকা শৌচাগার বানানোও গ্রামের লোকের সাধ্যে কুলিয়েছে বলে মনে হয় না, হয়ত সরকারী সাহায্য ছিল। থাকাই উচিৎ। সব গ্রামেই এরকম সাহায্য দিয়ে গ্রামগুলোকে পরিচ্ছন্ন করে না তুলে একটা গ্রামকে পরিচ্ছন্নতম করে তোলা কেন রাষ্ট্রের (সরকারের) উদ্দেশ্য হবে — প্রশ্ন সেটাই। অর্থনৈতিক সঙ্গতির সাথে পরিচ্ছন্নতার যে আবশ্যিক সম্পর্ক সেটা অস্বীকার করতে গিয়ে আরো প্রকট হয়ে পড়েছে এখানে। কী গর্বের দেশ আমাদের! স্বাধীনতার একাত্তর বছর পরে যত্ন করে একটা গ্রামকে পরিষ্কার করেছি আমরা যাতে দেশবিদেশের টুরিস্ট এসে দেখে চোখ কপালে তুলে বলে “ওমা! কি পরিষ্কার! একদম বিদেশের মত।”
ঠিক আগেরদিন লাইথলুম নামে আরেকটা গ্রামের প্রান্তে একটা জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে উঁচুনিচু ঘাসজমি হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে উল্টোদিকের পাহাড়ের সৌন্দর্যে চমকে উঠে। আর আকাশ অমনি নেমে এসে ঠোঁটে আঙুল রেখে বলেছে “কোলাহল তো বারণ হল। এবার কথা কানে কানে।”
সেদিন আমাদের চালক ত্রিপুরার বাঙালি। অগাধ জ্ঞান ভদ্রলোকের (তাঁর কথায় পরে আসছি)। জানালেন এই রূপকথার মত জায়গাটায় রক অন ২ ছবিটার শুটিং হয়েছিল। তাতে জায়গাটায় লোকের আনাগোনা অনেক বেড়েছে কিন্তু গ্রামের রাস্তা সরকারী আশীর্বাদধন্য হয়নি। টুরিস্টদের জন্যে শৌচাগারটার অবস্থা দেখে বোঝা যায় গ্রামটাও পরিচ্ছন্নতম হয়ে ওঠার অদৃশ্য পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি। যাক সে কথা। কবি তো কবেই প্রশ্ন করেছেন “চেরাপুঞ্জির থেকে, একফোঁটা মেঘ ধার দিতে পারো গোবি সাহারার বুকে?” সেই চেরাপুঞ্জির অদূরে এমন অসাম্য তো থাকবেই।
সেদিনের চালক নাথবাবুর কথা দিয়ে আমার প্যানপ্যানানি শেষ করি।
ভদ্রলোক চোস্ত হিন্দিতে কথা বলছিলেন বলে ভেবেছিলাম উনি অবাঙালি নাথ। মাঝে একটা ফোন এল, তাতে বাঙাল ভাষায় কথা বলতে শুনে ভুল ভাঙল। জানা গেল উনি বঙ্গসন্তান ঠিক নন, ত্রিপুরাসন্তান। অযাচিতভাবে জীবন, দাম্পত্য, অপত্যস্নেহ প্রভৃতি ভারী ভারী বিষয়ে অনেক জ্ঞান বিতরণ করলেন, তবে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান যেটা দিলেন সেটা ময়ূরের জনন প্রক্রিয়া সম্পর্কে। নইলে আমার এই ভ্রমণকাহিনীতে তাঁর জায়গা হত না। গভীর প্রত্যয় থেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন “বলুন তো, ময়ূর ডিম দেয় না বাচ্চা দেয়? আগে দাদা বলুন, তারপরে বৌদি বলবেন।”
আমি মূঢ়, অল্প বিজ্ঞানশিক্ষিত সাংবাদিক, বলে ফেলেছি “ডিম দেয়। সেটা ফুটে বাচ্চা হয়।” ভদ্রলোক সজোরে ব্রেক কষে পেছন ঘুরে এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যে নিজেকে নিরক্ষর মনে হল। আমার স্ত্রী, স্কুলে বিজ্ঞান পড়ানোই যার পেশা, তার কাছে উনি অন্যরকম কিছু আশা করেছিলেন। অথচ সে বলল “হ্যাঁ, পাখিমাত্রেরই ডিম থেকে বাচ্চা হয়।” তড়িদাহত নাথবাবু আমার দিকে ফিরে বললেন “এই প্রশ্নটা বৌদিরে করা যায় না। আপনারে করি। এই যে কইতাছেন ময়ূরে ডিম দেয়, ডিম দিতে গ্যালে তো করতে অইব। আপনে কখনো ময়ূর-ময়ূরীরে করতে দ্যাখছেন?” আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে ময়ূর কুকুর বেড়ালের মত আমাদের চারপাশে প্রচুর পরিমাণে ঘুরে বেড়ায় না। ফলে তাদের “করতে” না দেখা না “করার” প্রমাণ হিসাবে দাঁড়ায় না। তিনি আমাকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন “আরে আপনি দ্যাখেন নাই শুদু না, কোন মানুষই দ্যাখে নাই। কারণ ওরা করে না। ময়ূর গিয়া ময়ূরীর কাছে কান্দে। সেই অশ্রু পান কইরাই ময়ূরীর বাচ্চা হয়।” আমার জীবন বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই, যুক্তিবিদ্যার মাস্টারমশাই — সকলের প্রতি মনে মনে “অপরাধ নেবেন না স্যার” বলে চুপ মেরে রইলাম। ঐ পাহাড়ি রাস্তায় বউ, বাচ্চাসমেত নাথবাবু আমাদের অনাথ করে দিলে তো স্যারেরা বাঁচাতে পারবেন না। একটা প্রশ্ন অবশ্য না করে থাকতে পারলাম না। “এখানেই সপরিবারে থাকেন না ত্রিপুরায় কেউ আছে এখনো?” উত্তর এল “না না, ফেমিলি আছে ওখানে। বাবা-মা আছেন না?”
বোঝা গেল বিপ্লব দেবরা এখন অনেকদিন ক্ষমতায় থাকবেন।
ভেবেছিলাম পালাতে পেরেছি কয়েকদিনের জন্যে। উপলব্ধি হল “বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ। কেমনে দিই ফাঁকি?”

%d bloggers like this: