এসব কী?

একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই ধরে নিচ্ছেন

পশ্চিমবাংলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়া নিয়ে যা হচ্ছে তাতে দেখছি অনেক বামবিরোধীও এখন স্বীকার করছেন এমনটা তাঁরা কখনো দ্যাখেননি। অনেকে এও বলছেন যে এমন পরিবর্তন তাঁরা চাননি। ব্যক্তিগতভাবে এসব দেখে আমি যেমন ক্রুদ্ধ, কষ্ট পাচ্ছি তেমনি একটা মৃদু ভাল লাগার জায়গা এইটা যে দেখতে পাচ্ছি বাম দলগুলোর মধ্যে, সিপিএমের মধ্যে এখনো বহু মানুষ আছেন যাঁরা প্রাণের মায়া, মান সম্মানের মায়া ত্যাগ করে প্রতিরোধ করছেন। রঙ বদলে ফ্যালেননি বা আমার মত ফেসবুকিশ বামপন্থী হয়ে যাননি।
সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় যা দেখছি তাতে এটা দেখেও অবাক হচ্ছি বলা যায় যে মার বেশি খাচ্ছেন বামেরাই, বিজেপি নয়। পার্টি অফিস বা ঘরবাড়ি ভাঙচুরও বামেদেরই বেশি হচ্ছে, যারা নাকি প্রধান বিরোধী নয়। বাম রাজনীতির দিক থেকে দেখলে এই মার খাওয়া, লড়ে যাওয়া প্রশংসনীয় নিঃসন্দেহে। ভোট হলে তেমন কিছু বেশি আসন পাব না জেনেও মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্যে এরকম দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে পারে কটা পার্টি?
এসব ভাল লাগছে। কিন্তু একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই বলে ধরে নিচ্ছেন। সত্যি কথা বলতে নেতৃত্বের দিক থেকে এমন সামান্যতম ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি। কোন কোন এলাকায় দেখতে পাচ্ছি বা শুনতে পাচ্ছি গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে “বাম-বিজেপি সমর্থিত”, এমনকি “বাম-তৃণমূল সমর্থিত” কাঁঠালের আমসত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছে। সেরকমটা একেবারে স্থানীয় স্তরে, একজন বা কয়েকজনের স্বার্থের খাতিরে অতীতেও হয়েছে শুনেছি। এখন যখন পার্টি দুর্বল, ২০১১ র পর থেকে কেষ্টেতর প্রাণীদের অত্যাচারে অনেক জায়গায় প্রায় উধাও তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কারো কারো এরকম কান্ড ঘটিয়ে ফেলা অন্যায় হলেও অবাক করার মত নয়। আদর্শগত দেউলিয়াপনা যে আছে সে তো আর আমরা নতুন জানছি না, তা বলে সকলেই ওরকম তা ভাবারও কারণ নেই। সেইজন্যেই ওরকম জোট করাটাই সামগ্রিকভাবে পার্টির অঘোষিত নীতি বলে মনে করার কারণ আছে, এমনটা নিখাদ তৃণমূলী ছাড়া কেউ বলবেন মনে হয় না। ফলত আমার আপত্তির জায়গা অন্য।
এখন গ্রাম, শহর সর্বত্রই হোয়াটস্যাপ আর ফেসবুকের দাপট। রাগ হচ্ছে, শঙ্কিত হচ্ছি তখন যখন দেখছি বিজেপি আই টি সেলের তৈরি ভুয়ো খবর সম্বলিত বার্তা সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা দিব্যি ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছেন। ফেসবুকেও দেখছি অনেক সিপিএম সদস্য সরাসরি শেয়ার বাটন টিপে বিজেপি এবং তার বন্ধু যে দাঙ্গাবাজ সংগঠনগুলো, তাদের পোস্ট শেয়ার করছেন। সেসব পোস্টের মধ্যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষী, বানানো তথ্যসম্বলিত যে পোস্টগুলো আমরা অনেকেই চিনি, সেগুলোও রয়েছে। মমতা কত খারাপ তা প্রমাণ করার জন্যে এসবও যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই। মমতা কত খারাপ তা অনেকেই বুঝতে পারছে। আপনারা বিজেপির ভাষা ধার করে না বোঝালে লোকে বুঝবে না?
যেসব মানুষ বুক চিতিয়ে এখনো নিজেদের সিপিএম সমর্থক বলেন তাঁদের এহেন কার্যকলাপ দেখে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। এমনও সন্দেহ হচ্ছে যে তাঁদের সমর্থন বস্তুত একটাই চিহ্নে বরাবর ভোট দিয়ে আসার অভ্যাস, দলটার নীতি বা আদর্শের প্রতি (আদর্শ শব্দটায় আপত্তি থাকলে কথিত আদর্শ বলা যাক) সমর্থন নয়।
তবু সেটা সমর্থকদের ব্যাপার। একজন সমর্থকের সব কিছু তো আর একটা দল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দল অন্তত তার সদস্যদের শাসন করুক। সি পি আই (এম) এর কোন সোশাল মিডিয়া সেল আছে কিনা আমার জানা নেই। যদি নাও থাকে, এসব যে পার্টি সদস্যরা করছেন তাঁরা বুঝে করছেন, না না বুঝে করছেন সে দিকে নেতৃত্বের নজর দেওয়া উচিৎ নয় কি? নইলে তো ধরে নিতে হবে “মৌনং সম্মতি লক্ষণম।” বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটাই যে বড় লড়াই সে কথা তো আপনাদের পার্টি কংগ্রেসও স্বীকার করল। তাহলে এসব কী?

সব ধর্ষণ সমান নয়

কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?

কথাটা অনেকদিন ধরেই লিখব লিখব করছি। কিন্তু এমনও কথা আছে যা লিখতে হাত সরে না। কেবলই মনে হয় “ভুল ভাবছি। এ সত্যি নয়।“ কিন্তু নিজেকে এ হেন প্রবোধ দিয়েই বা কতদিন চলে? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যখন লিখে গেছেন যুগান্তের কবিকেও মানহারা মানবীর দ্বারে দাঁড়াতেই হবে, তখন আমার — দু পয়সার সাংবাদিক আর ফেসবুকে রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা উগরে দেওয়া মূল্যহীন ব্লগার — সাধ্য কী যে একথা না লিখে থাকি? আর সত্যি বলতে যা লিখি তা তো কোথাও কোন মনের কোণে কোন প্রভাব ফেলে না। লিখি নিজের নিষ্ক্রিয়তার পাপস্খালন হচ্ছে — এই ভেবে। ঐ, এরিস্টটল যাকে catharsis বলতেন আর কি। তাই বুক ঠুকে কথাটা লিখেই ফেলি।
সব ধর্ষণ সমান নয়।
কথাটা খুব আপত্তিকর মনে হচ্ছে, না? হতে পারে। কিন্তু গত কয়েকবছরের ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে সব ধর্ষণ সমান নয়।
২০১২ র ডিসেম্বরের কথা মনে করুন। দিল্লীর সেই মেয়েটি, যার আমরা বাহারী নাম রেখেছি নির্ভয়া (যেন সে নির্ভয়ে বুক ফুলিয়ে ধর্ষিত হতে গিয়েছিল, যেন তার ধর্ষণোত্তর মৃত্যু অত্যন্ত বীরোচিত ঘটনা, যেন একটা তাজা প্রাণের এই মর্মন্তুদ পরিণতি জাতির বিবেক জাগিয়ে তোলার জন্য এক মহান আত্মত্যাগ), সে যখন হাসপাতালে মৃত্যুর চেয়েও বেশি বেদনা নিয়ে শুয়ে ছিল, তখন সারা ভারত জুড়ে কত মোমবাতি মিছিল! ফেসবুকে সরকার কত অপদার্থ সেই নিয়ে লক্ষ লক্ষ পোস্ট! দেশটাকে বদলে ফেলা দরকার — এই মর্মে আমাদের যুবসমাজের কি চিল চিৎকার! বহু মানুষ তো মিছিল করে খোদ দিল্লীতে প্রতিবাদ জানাতে গেলেন ক্ষমতার অলিন্দে। সহসা কি আপাদমস্তক আলোড়ন এই পোড়া দেশটার শরীরে!
সেই একই পরিমাণ আলোড়ন কি হয়েছিল এই বাংলায় যখন কামদুনির মেয়েটা ধর্ষিতা হল? যখন মধ্যমগ্রামে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের মেয়ে ধর্ষণ এবং তারপরেও চলতে থাকা দীর্ঘ লাঞ্ছনার শেষে মারা গেল এবং মৃত্যুটা আত্মহত্যা না হত্যা তা নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিল? সুজেট জর্ডানের ধর্ষক যেন এখন কোথায়?
যদি ঐ ঘটনাগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া ঘেঁটে দেখেন তাহলে হয়ত বলবেন “কম কিছু তো হয়নি।” কিন্তু আমি সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর কথা বলছিই না। বলছি আমাদের মত ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষদের কথা। আমরা কজন ধর্ষণ হলেই মুখ্যমন্ত্রীর সেটাকে “সাজানো ঘটনা” বা “সিপিএমের চক্রান্ত” বলা শুনে শিউরে উঠেছি, বমি বমি লাগায় বেসিনে থুতু ফেলেছি? কী বলছেন? অনেকেই? তাই নাকি? তার প্রতিফলন তো ভোটবাক্সে দেখলাম না। চৌত্রিশ বছর যারা অপশাসন করেছে তাদের তুলনায় পরিবর্তনের সরকার ভালই চলেছে যদি ধরেও নিই, তাহলে সরকারের পতন না হলেও এত সব ঘটনায় সমর্থন তো অন্তত কমে যাওয়া উচিৎ ছিল। হয়েছে তো উলটো। মুখ্যমন্ত্রীর পার্টির সমর্থন বেড়েই গেছে। ২০১৬ র ফলাফল নিয়ে অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি। সকলেই একমত যে ধর্ষণগুলো কোন ইস্যু নয় যতক্ষণ আমার বাড়ির সামনের কাঁচা নর্দমা পাকা হচ্ছে, আমার গাড়ির চাকা রাস্তার গাড্ডায় পড়ে সার্ভিসিঙের খরচ বাড়িয়ে না দিচ্ছে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে যে নির্ভয়ার ধর্ষণ আর কামদুনির মেয়েটার ধর্ষণ এক নয়।
এইসব অপ্রিয় কথা হয়ত লিখতাম না। কিন্তু মুশকিল হল এই যে দেখলাম ধর্ষণের অবমূল্যায়ন চলতেই থাকল (মুখ্যমন্ত্রী সেই যে কত লাখ যেন মূল্য ধার্য করেছিলেন সেই মূল্যের কথা বলছি না কিন্তু) এবং প্রায় দেড় শতক পরে গোপালকৃষ্ণ গোখেলের সেই বিখ্যাত উক্তিকে আবার সত্য প্রমাণ করে এই রোগটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। সংরক্ষণ চেয়ে জাঠরা দক্ষযজ্ঞ করল, সেই বাবদ নাকি ধর্ষণও করল। সেটা নিয়ে একটু হৈ চৈ হতেই সরকারগুলো ঘোষণা করল কিছুই নাকি হয়নি। সব ধর্ষণ কাল্পনিক। তারপর নয়ডায় জাতীয় সড়কের ধারে এক মহিলার ধর্ষণও এক দিনের মধ্যেই পারিবারিক কলহ, আদৌ ধর্ষণ হয়নি — এসবে পর্যবসিত হল। কোনটা যে সত্য, কোনটা উত্তরসত্য কে বা জানে!
কিন্তু তারপর একটা ঘটনা ঘটল যা তীব্রতার কারণে অস্বীকার করার কোন উপায় রাখেনি। অবশ্য কেউ অস্বীকার করতে চায়ওনি। সেটা হল আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত, যৌনবিকৃতিসম্পন্ন, বহু নারীর ধর্ষক এক গুরুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শত শত ভক্তের দাঙ্গা করা। হরিয়ানার রাজ্য সরকার স্পষ্টতই হাত গুটিয়ে বসে রইল। বুঝে নেওয়া শক্ত নয় যে রাষ্ট্রযন্ত্রের এবং, মানুন আর না-ই মানুন, সাধারণ মানুষের এক বিরাট অংশের সমর্থন ঐ গুরমিত রাম রহিমের দিকে ছিল।
এর পরেও ধর্ষণ এবং সে সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতার গল্পটা যেন একতা কাপুরের কে সিরিয়ালের মত — শেষই হয় না। কিন্তু রাম রহিমের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছে আমরা আর শুধু উদাসীনতায় থেমে নেই। আমরা ক্রমশ যৌন অপরাধীদের সমর্থনে সোচ্চার।
কলকাতার নাম করা স্কুলে দুজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল ধর্ষণের। অবিলম্বে সরকারের মদতপুষ্ট লোকেরা গোপনে এবং প্রকাশ্যে বলতে শুরু করল এসব রাজ্যকে অশান্ত করার জন্যে বামপন্থী চক্রান্ত। একটা কাগজে তো প্রতিবাদী অভিভাবকদের ছবি ছেপে দাবী করা হল যে ওঁরা আসলে মাওবাদী। ফেসবুকে যে যা-ই লিখুক নিজেকে প্রগতিশীল প্রমাণ করতে, সেই সময় অন্তত পাঁচজন পরিচিত ব্যক্তিগত কথাবার্তায় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল জি ডি বিড়লা স্কুলের মেয়েটা মিথ্যে বলছে এবং গোটা ব্যাপারটা আসলে তৃণমূল বনাম বিজেপি ছাড়া কিছুই নয়। এমন তাদের যুক্তির বাহার যে একটা সময়ে আমিও ধন্দে পড়ে যাই। তখন আবার বুঝলাম যে সব ধর্ষণ সমান নয়। কোন দলের লোক যুক্ত, কোন দলের শাসনে ঘটেছে ব্যাপারটা সেসব দেখে আমরা, মানে শিক্ষিত, রুচিশীলরা ধর্ষণের দর ঠিক করি।
কিন্তু তখনো বুঝিনি দর ঠিক করার ওটাই একমাত্র মানদণ্ড নয়। সেটা বোঝার জন্যে অপেক্ষা করতে হল একটা আট বছরের মেয়ের ধর্ষণ এবং খুন পর্যন্ত, একটা ধর্ষিত মেয়ের বাবা পুলিশের হাতে খুন হওয়া পর্যন্ত।
স্পষ্ট মনে আছে যখন নির্ভয়ার ঘটনা প্রকাশ হল, দোষীরা গ্রেপ্তার হল তখন নাবালক ছেলেটিকেও প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে বিচার করা হোক, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক — এই দাবীতে আমার কত বন্ধু, পরিজন সোচ্চার ছিলেন। আমি এর বিরোধিতা করেছিলাম বলে তারা আমাকেই ধর্ষক বলে ফেলে প্রায়। এখন কোথায় তারা? কাউকে তো দেখছি না ফেসবুক বিদীর্ণ করে লিখছে “উন্নাওয়ের ধর্ষক বিধায়কের ফাঁসি চাই” বা “আসিফার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক”? এখনো পাড়ায় পাড়ায় মোমবাতি মিছিলের কোন খবর পাইনি। কাল রাতে দিল্লীতে একখানা হয়েছে বটে কিন্তু তার আয়োজক আবার একটা রাজনৈতিক দল। সেখানে রাহুল গান্ধী ছিলেন। কোথায় গেল নির্ভয়াকান্ডে জাগরূক সেই “নাগরিক সমাজ”?
নব্বইয়ের দশকের শেষদিক থেকে ক্রমশ “স্বতঃস্ফূর্ত” কথাটা খুব জনপ্রিয় হয়েছে। প্রতিবাদ নাকি স্বতঃস্ফূর্ত হলে তবেই গ্রাহ্য হবে, নইলে নয়। অর্থাৎ আমি যদি বুদ্ধি খাটিয়ে, শ্রম দিয়ে, সময় দিয়ে আমার বক্তব্যের সমর্থনে আপনাকে রাস্তায় নামাতে পারি তাহলে সে প্রতিবাদ হল সাজানো ঘটনা। আপনার যদি একা একা স্কচ বা ইনস্ট্যান্ট কফিতে চুমুক দিতে দিতে মনে হয় “নাঃ! একটু মিছিলে হেঁটে আসি”, তবেই সেটা প্রতিবাদ হবে। যাদের স্কচ বা কফি খাওয়ার সাধ্য নেই তাদের প্রতিবাদ, অতএব, গ্রাহ্য নয়। তাদের হাতে থাকে পতাকা, অর্থাৎ তারা সংগঠিত। অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ভাগ্যিস এইরকম স্বতঃস্ফূর্ততার ধারণা এমনকি অহিংসার পূজারী মহাত্মা গান্ধীরও ছিল না। থাকলে অসহযোগ, ভারত ছাড়ো ওসব করতেন না। সুভাষচন্দ্রও সাত মুলুক পাড়ি দিয়ে সেনাবাহিনী টাহিনী গড়ার ঝামেলায় যেতেন না। মার্টিন লুথার কিংও অপেক্ষা করতেন কবে সাদা চামড়ার লোকেরা এসে চোখের জল ফেলতে ফেলতে “ভাই রে” বলে কালো মানুষদের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেদের আমোদের জায়গাগুলোয় নিয়ে যাবে। তা সে যাই হোক, কথা হচ্ছে নির্ভয়ার জন্যে যে “স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ” দেখেছিলাম সে আবেগ কিন্তু উন্নাওয়ের মেয়েটির জন্যে দেখতে পাচ্ছি না। আসিফার জন্যে তো আরোই পাচ্ছি না। উলটে দেখছি এদের ধর্ষকদের জন্যে, হত্যাকারীদের জন্যে বেশ একটা সহানুভূতির আবহ।
আবার বলছি, রাষ্ট্রযন্ত্রের যে সক্রিয় সমর্থন ঐ ইতরগুলোর প্রতি তার চেয়েও আমি বেশি আতঙ্কিত আমাদের মত মানুষদের আচরণ নিয়ে। কোন সন্দেহ নেই গত কয়েকবছরে এদেশে খুনী এবং ধর্ষকদের রাষ্ট্র নজিরবিহীন সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই যে এরকম একটা রাষ্ট্রশক্তি তো তৈরি করেছি আমরা। সেজন্যে আমাদের কেউ কি অনুতপ্ত? আমাদের গণতন্ত্রের হাজারটা ত্রুটি আছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবে অন্যদের মনোনয়ন জমা দিতে না দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন? একজনও কি বলবে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে লোকের ভোট দেওয়া আটকে? কেউ বলবে ২০১৪ র লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিতেছিল কাউকে ভোট দিতে না দিয়ে?
তাহলে দাঁড়াল কী? ধর্ষকদের ক্ষমতায়ন করেছি আমরাই। দয়া করে বলবেন না “বুঝিনি এমন হবে।” ২০১১ থেকে ১৬ অব্দি অত ধর্ষণের ঘটনার পরেও আপনি বোঝেননি? যোগী আদিত্যনাথের অনেক দোষ আছে। কিন্তু সে কোনদিন নিজের চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য গোপন করেছে এমন অপবাদ তার চরম শত্রুও দেবে না। সে কোন ধরণের মানুষ সম্পর্কে কী ভাবে, কী করতে চায় সেসব সে প্রকাশ্যেই বহুবার বলেছে। তার ভিডিও আছে, খবরেও প্রকাশিত হয়েছে। ওসব জেনেও উত্তরপ্রদেশে যে লোক তাকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে আর অন্য কোথাও বসে যারা সমর্থন জানিয়েছে তারা উন্নাওয়ের ঐ মানহারা মানবীর দ্বারে কোন মুখে দাঁড়াবে?
আসিফার ঘটনা আরো বেশি অবাক করার মত। এবং তার প্রতিক্রিয়াও চমকপ্রদ। কোন সভ্য দেশে একটা আট বছরের মেয়েকে একমাত্র কোন বিকৃতমনা অপরাধীই অপহরণ করে বন্দী করে রেখে বারবার ধর্ষণ করতে এবং তারপর খুন করতে পারে। ‘Silence of the lambs’ এর বাফেলো বিলের মত কেউ। এ কাজে কোন সঙ্গী পাওয়ার তার কথা নয় এবং যখন সে ধরা পড়বে তখন বিনা বিলম্বে কঠোরতম শাস্তি তার হওয়ার কথা। কিন্তু আসিফার দুর্ভাগ্য সে জন্মেছিল একটা অসভ্য দেশে। যে দেশের মানুষ ধর্মান্ধ, বর্বর। দুধের শিশুকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিগ্রহের সামনে দল বেঁধে ধর্ষণ করে বারবার এবং সেটা হয় তাদের পূজার অঙ্গ। আর কী দারুণ ব্যাপার! যে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আসিফার ধর্মের, এমন এক ধর্ম যা নাকি, ধর্ষকদের ধর্মের লোকেদের কথানুযায়ী ভীষণ হিংস্র, সেই রাজ্যে পুলিশ অনেকদিন অব্দি অভিযোগই না নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতে পারে! শেষ অব্দি যখন নেয়, তখন জানা যায় কর্তাদের আগেই অনেক টাকাপয়সা দেওয়া হয়েছিল চেপে যাওয়ার জন্য। শুধু তাও নয়, ধর্ষণপুজোর পেরসাদ তাঁরাও পেয়েছেন। এতসব আয়োজন কেন? না আসিফার পরিবার পরিজন ভাই বেরাদরদের ঐ এলাকা থেকে সরানোর জন্যে। আচ্ছা এই অব্দিও না হয় বোঝা গেল। দোষীদের যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করুক রাষ্ট্র। এর বেশি আর কী করণীয়? ক্ষতি তো যা হওয়ার হয়েই গেছে। কিন্তু বিপদের শেষ তো সেখানে নয়। লোকে যে মিছিল করতে বেরিয়েছে ধর্ষকদের সমর্থনে! উকিলরা আন্দোলন শুরু করেছেন পুলিশকে চার্জশিটই দাখিল করতে দেবেন না বলে! আসিফার পরিবারের পক্ষের উকিলকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে “ভিটেমাটি চাটি করে দেব”!
তা এসবে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াগুলি কী কী রকমের?

১) নীরবতা
২) নিশ্চয়ই পাকিস্তানের হাত আছে
৩) কাশ্মীরীদের বিশ্বাস করা যায় না। কে জানে আসলে কী ব্যাপার? মিডিয়া তো সবেতেই “ওদের” দিকে ঝোল টানে
৪) হয়েছে বেশ হয়েছে। বেঁচে থাকলে তো বড় হয়ে টেররিস্ট হত
৫) তুমি এত লাফাচ্ছ কেন? তোমার বোনকে তো কেউ রেপ করেনি

দু নম্বর থেকে পাঁচ নম্বর হচ্ছে তাদের প্রতিক্রিয়া যারা ইদানীং হিন্দু বলে গর্বিত। এক থেকে পাঁচ তাদেরও প্রতিক্রিয়া যারা অত গর্বিত টর্বিত নয়, তবে মোগাদিশুতে মুসলমান সন্ত্রাসবাদীরা বোম মারলে মুর্শিদাবাদের মুসলমান সম্পর্কে বলে “কৈ, নিন্দা করল না তো? ওদের ধর্মটাই এইরকম। কোরানে পরিষ্কার লেখা আছে।”
এখন যদি জিজ্ঞেস করি এই যে আপনারা আসিফার ধর্ষণকে নির্ভয়ার ধর্ষণের পাশে রাখছেনই না, নিন্দাও করছেন না — এ থেকে কী বুঝব? হিন্দু ধর্মটাই এরকম? ঐ ধর্ষণপুজোর কথা বেদে পরিষ্কার লেখা আছে? কারা যেন ইংরিজিটা লিখতে পারে বলে মুসলমানদের উঠতে বসতে জ্ঞান দেয় “Educated Muslims should reclaim their religion from fundamentalists?” তেনারা হিন্দুধর্মটাকে মৌলবাদীদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করার কাজটা কবে শুরু করছেন জানতে ভারী ইচ্ছা করছে।
ইতিমধ্যে বুকে হাত রেখে একটা সত্যি কথা বলে ফেলতে পারলে ভাল হয়। সেটা এই যে আমরা অনেকেই জেনেশুনে বিষ করেছি পান। কারণ বাইরে উন্নয়ন ইত্যাদি যা-ই বলে থাকি না কেন, মনে মনে জপছিলাম “মুসলমানগুলোকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার,” “সোনার চাঁদ, সোনার টুকরোগুলোর বড্ড বাড় বেড়েছে” ইত্যাদি। এসব যখন ভেবেছি তখন যোগী আদিত্যনাথের বক্তৃতায় ধর্ষণের হুমকি আমাদের ভালই লেগেছে। এ বিষ বড় মিষ্টি। খাওয়ার সময়ে ভেবেছি আমার কী? আমি তো সংখ্যালঘুও নই, দলিতও নই। এখনো মিষ্টি মিষ্টি লাগছে তাই ধর্ষণগুলোকে সেইভাবেই মাপছি।
এমন বিষ আছে খাওয়ার সাথে সাথে কেউ মরে না, মরে ধীরে ধীরে, অনেক মাস, বছর ধরে। যেমন আর্সেনিক। ঘৃণাও আর্সেনিকের মতই। মনে রাখবেন, যে ধর্ষক একটা আট বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করবে বলে মীরাট থেকে কাঠুয়া যেতে পারে, সে কিন্তু মুসলমান না পেলে ধর্ষণ করা বন্ধ রাখবে না। এ দেশের সব মুসলমান, দলিত, আদিবাসী হিটলারের জার্মানির ইহুদীদের মত হাওয়া হয়ে গেলেও তার চোখ লোভে চকচক করবেই। তা বিষ যখন গিলেছেন এবং আমাদের সক্কলকে গিলিয়েছেন তখন আর কী করা? দরজা, জানালা এঁটে শোবেন দয়া করে আর ছেলেমেয়েদের একা কোথাও ছাড়বেন না। মনে রাখবেন, ধর্ষণকে নানা লোক নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে কিন্তু ধর্ষণ করার ইচ্ছাটি একদম ধর্মনিরপেক্ষ। ওখানে কিন্তু জাতের ভিত্তিতে সংরক্ষণও নেই।
সব ধর্ষণ সমান নয় কিন্তু সব ধর্ষক সমান।

খরচের খাতা

গ্রামে লোকজন চৌত্রিশ বছর ধরে খেতে পেত না, পরতে পেত না, পড়তেও পেত না। কারণ স্কুল কলেজ কিছু ছিলই না। এখন ইস্কুলে ইস্কুলে ছয়লাপ। সেসব সহ্য হচ্ছে না বলে হিংসুটে সিপিএম কাগজগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে রটাচ্ছে যে সরকারী ইস্কুলগুলো নাকি উঠে যাচ্ছে

যারা পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দিতে না দেওয়ার জন্যে গুন্ডামি হচ্ছে বলে চেঁচামেচি করছে তারা বুঝছে না এর মাধ্যমে কত পয়সা বাঁচছে। একটা এতবড় নির্বাচন করতে কত খরচা হয় বোঝেন? বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেশিরভাগ আসনে নির্বাচন হয়ে গেলে কত টাকা বেঁচে যাবে সে খেয়াল আছে? চৌত্রিশ বছরে বামফ্রন্ট তো কোষাগার খালি করে রেখে গেছিল। তা সত্ত্বেও বাংলায় যে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে এরা কি সেটা দেখতে পাচ্ছে না?
ক্লাবগুলো সব ঝিনচ্যাক নীল সাদা হয়েছে, রাস্তায় এত আলো যে পাখিরা রাতে দিন ভেবে কলকাকলিতে ভরিয়ে দিচ্ছে, ভি আই পি রোড, যশোর রোড সব কালীঘাট মন্দিরের চাতালের মত চওড়া হয়ে গেছে, গাছফাছ উড়িয়ে দিয়ে রেলিং বসিয়ে লন্ডন না হোক, কলকাতাকে হনলুলুর মত তো দেখাচ্ছেই। নইলে বিদেশ কিম্বা ব্যাঙ্গালোর থেকে অনেকবছর পর এসে বিশ্ব বাঙালিরা আনন্দে কেঁদে ফেলছে কি এমনি এমনি? গ্রামে লোকজন চৌত্রিশ বছর ধরে খেতে পেত না, পরতে পেত না, পড়তেও পেত না। কারণ স্কুল কলেজ কিছু ছিলই না। এখন ইস্কুলে ইস্কুলে ছয়লাপ। সেসব সহ্য হচ্ছে না বলে হিংসুটে সিপিএম কাগজগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে রটাচ্ছে যে সরকারী ইস্কুলগুলো নাকি উঠে যাচ্ছে। তা সে রটাক। নিন্দুকের রাবণের মত দশটা মাথা হয়। কিন্তু এটা তো বুঝতে হবে এত উন্নয়ন করতে টাকা লাগে। সে টাকা কি আকাশ থেকে পড়বে? বছর বছর ভোটও হবে আবার উন্নয়নও হবে? এ যে খেতে পেলে শুতে চাওয়া দেখছি।
আর ভোট দিতে গেলেই বা দিতেন কাকে? লালেদের তো আর দিতেন না এই বাজারে। আর আছেটা কে? জয় শ্রীরাম পার্টি? আরে জয় শ্রীরাম তো তরোয়াল হাতে নিয়ে যারা মনোনয়ন জমা দেয়া আটকাচ্ছে তারাও বলছে। তবে আর তফাত কী? তাহলে দাঁড়াল কী? দাঁড়াল এই যে ভোট হলেও যাকে দিতেন ভোট না হলেও সে-ই জিতবে। তাহলে আবার অসুবিধেটা কী? খামোকা এক কাঁড়ি টাকা খরচা করার থেকে এইটেই ভাল না? ভাত, ডাল আর ডিমের ঝোলের উপর দিয়ে মিটে যাবে।
কী বললেন? হিংসা? রক্তপাত? ধুর মশাই! ও তো বাম আমল থেকে চলে আসছে। এতটা দ্যাখেননি বলছেন? ওসব চক্রান্ত। চুপিচুপি করেছে, ক্যামেরায় উঠতে দেয়নি। এখনকার সরকার অনেক খোলামেলা, গণতান্ত্রিক। তাই সব দেখতে পাচ্ছেন আর ভয় পাচ্ছেন। এই যে ভয় পাওয়ার স্বাধীনতা — এইটাই তো আগে ছিল না। এটাই তো সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তাছাড়া হিংসা হচ্ছে হিংসা। পাঁচ কোটি চুরি কল্লেই চুরি আর পাঁচ টাকা চুরি কল্লে চুরি না? যত্তসব মাওবাদীর দল! সিপিএম এর ম, মাও এর ও আর বিজেপির পি র কা মিলে হল মওকা। এরা ভেবেছে এই মওকা ক্ষমতা দখল করে উন্নয়নের গতি স্তব্ধ করে দেয়ার। সে গুড়ে বালি। উন্নয়ন চলছে, চলবে।

বিঃ দ্রঃ বিজেপিতে কা নেই সেটা আমরা জানি। বাম বুদ্ধিজীবীদের ভাষার উপর প্রভুত্ব করার স্বভাবটা আর গেল না। ভাষাটা এখন আর রবীন্দ্র সদনের আঁতেলদের নয়, ওটা এখন সবার। অতএব আমরা যখন বলেছি কা আছে তখন আছে। ও নিয়ে দাঁড়কাকের মত কা কা করবেন না বলে দিচ্ছি।

%d bloggers like this: