নিজের দিকে আঙুল তুলুন

আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল

যেহেতু প্রাসঙ্গিক সেহেতু একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করা যাক।
আমার বাড়ির খুব কাছে অধুনালুপ্ত হিন্দমোটর কারখানা, তৎসহ শ্রমিকদের কোয়ার্টার। ঐ এলাকার বাইরেও কিছুটা জায়গা জুড়ে যাঁদের কোয়ার্টারে জায়গা হয়নি বা নিজের সামর্থ্য আছে তাঁদের বাসস্থান। আমার যখন সদ্য অক্ষর পরিচয় হয়েছে তখন কারখানাটা রমরমিয়ে চলছে। আমার বাবা সেইসময় সক্রিয় রাজনীতিবিদ, তার উপরে প্রশাসক। ফলে রোজ সকালে ঐ কারখানার শ্রমিকরা, যাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছেন এবং মূলত হিন্দিভাষী, বাবার কাছে বিভিন্ন দরকারে আসতেন। বাবা বাড়ি ফিরত অনেক রাত করে, ফলে খুব ভোর ভোর উঠতে পারত না। যতক্ষণ না উঠত, ওঁদের সাথে গল্পগুজব করতাম আমি। অন্য ভাষা আমার কাছে ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল আর ওঁদের দিক থেকে দেখলে, ছোটদের সাথে সময় কাটাতে কার না ভাল লাগে? তা এই রোজ সকালে হিন্দি বলার ফলে বাংলার সাথে সাথে হিন্দিটাও তখন আমি দিব্যি বলতে পারি।
যখন হাইস্কুলে পৌঁছেছি তখন ঐ কারখানারই এক শিখ শ্রমিক পরিবার আমাদের প্রায় আত্মীয় হয়ে গিয়েছিল। ওঁরা সপরিবারে আমাদের বাড়ি এসেছেন, ওঁদের ছেলেমেয়েদের বিয়েতে আমরা নেমন্তন্ন খেয়েছি। সেই ঘনিষ্ঠতা বেশিদিন টেকেনি, নইলে গুরুমুখীটাও কিছুটা শিখে নেওয়ার চেষ্টা করতাম।
বরাবর, এমনকি হিন্দমোটর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও, এলাকার হিন্দিভাষী মানুষদের সাথে আমাদের সম্পর্ক একই রকম থেকেছে। খুব ছোটবেলা থেকেই তাই ছটপুজোর ঠেগুয়ার স্বাদ কিরকম সেটা জানি। আমার বাবার যখন ক্যান্সার হয়, তখন যাঁরা নিয়মিত খবর নিতেন, যে কোনরকমভাবে আমাদের সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন তাঁদের মধ্যে অনেকেও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার হিন্দিভাষী শ্রমিক। বাবা মারা যাওয়ার পর ভেবেছিলাম স্বাভাবিক কারণেই ওঁদের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। আমাকে অবাক করে, আমাকে খুব ছোটবেলায় দেখেছেন এমন একজন তাঁর মেয়ের গ্র‍্যাজুয়েশনের পরে কী পড়া উচিৎ তার পরামর্শ করতে আমার কাছে এসেছিলেন বছর দুয়েক আগে। “তুমহারে পিতাজি তো রহে নহি। অব কাঁহা যায়েঁ, কিসসে পুছেঁ? সোচা তুমসে হি পুছ লেতে হ্যাঁয়” বললেন এসে। এই যে জীবিকার তাগিদে, জীবনরক্ষার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে আসা ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ এখানে থাকতে থাকতে এই রাজ্যের মানুষকে ভরসাস্থল মনে করেন — এর চেয়ে গর্বের আর কিছু নেই বলে আমার মনে হয়।
আমি নিজে একসময় হায়দরাবাদের একটা খবরের কাগজে কাজ করতাম। তখন সেই নিউজরুমে বাঙালিরা প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, তেলুগুদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি তো বটেই। একদিন এক তেলুগু সহকর্মী হঠাৎ দাবী করে বসল আমাকে ফোনে ইংরিজিতে কথা বলতে হবে কারণ কানের কাছে অজানা ভাষায় কেউ কথা বললে তার কাজের অসুবিধা হচ্ছে। এই অন্যায় দাবী মেনে নেওয়ার ছেলে আমি নই। ফলে তার সাথে জোর ঝগড়া হল। সে বলল “তাহলে তেলুগু শেখো। এখানে এসে থাকবে, কাজ করবে আর এখানকার ভাষা শিখবে না?” আমি সপাটে জবাব দিয়েছিলাম “শিখতেই পারি। কিন্তু তুমি কলকাতায় এসো, আমরা তোমায় বাংলা শিখতে জোর করব না। আমরা করি না।” সে আর রা কাড়েনি।
বাঙালি হিসাবে অত গর্বিত আমার কখনো লাগেনি। আর সশস্ত্র রামনবমী মিছিল, তজ্জনিত হিংসা, আবুল কালাম আজাদের মূর্তি ভাঙা দেখে বাঙালি হিসাবে এত লজ্জিতও কখনো হইনি। সেই লজ্জা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে সেই বাঙালিরা যারা এখন আমাদের জাতিগত অধঃপতনের দোষ চাপাচ্ছে অবাঙালিদের ঘাড়ে। ভারত এখন বিবিধ আমরা ওরায় বিভক্ত। তার মধ্যে আবার একটা নতুন আমরা-ওরা যোগ করছে এই বাঙালিরা।
নিজের অযোগ্যতা, অপদার্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো ভীতু, ওপরচালাক এবং অলস লোকের লক্ষণ। এই বাঙালিরাও আমাদের সেরকম বলেই প্রমাণ করছে। হাস্যকর কিছু কথা বলা হচ্ছে। “এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”, “আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”, “রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এসে এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ঢোকাল”, “ওরা যেখানে যেখানে থাকে সেখানেই কিন্তু হিন্দুত্ববাদের রমরমা” — এইসব কথা দেখছি বিজেপিবিরোধীরা তো বটেই, নিজেকে বামপন্থী বলে দাবী করা অনেকেও বেশ বুক ফুলিয়ে বলছেন, সোশাল মিডিয়ায় লিখছেনও। মোটের উপর ঐ তিনটেই বক্তব্য এঁদের। কথাগুলো কতটা অন্যায়, কেন অন্যায় সেটা এবার দেখা যাক।

“এত বেশি সহিষ্ণু হওয়াই আমাদের অন্যায় হয়েছে”
কিরকম হওয়া উচিৎ ছিল তাহলে? মুম্বাইয়ের শিবসেনার মত? বিহার বা উত্তরপ্রদেশের লোক দেখলেই ঠ্যাঙানো উচিৎ ছিল? নাকি সব্বাইকে বাংলা শিখতে হবে, নইলে এর লাইসেন্স দেব না, তার লাইসেন্স দেব না — এসব বলা উচিৎ ছিল? প্রথমত, মুম্বাইতে এটা করে কী ফল হয়েছে? মুম্বাই বলতেই বিশ্বসুদ্ধ লোক কী বোঝে? বলিউড। কোন ভাষায় ছবি হয় সেখানে? হিন্দি। চেনা পরিচিত বাঙালি যারা মহারাষ্ট্রে থাকেন তাঁদের কজন মারাঠি জানেন একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন তো। বুঝতে পারবেন ঠ্যাঙাড়ে পদ্ধতি ব্যর্থ। তাছাড়া এই কথা যদি বলেন তাহলে হিন্দুত্ববাদীরা যখন পাকিস্তানের উদাহরণ দেখিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া সমর্থন করে তখন কিন্তু বলা চলবে না “দেশটাকে পাকিস্তান বানাতে চাও তাহলে?”

“আমাদের কালচারটার এরা সব্বোনাশ করে দিল”
এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর নেই। কিসের কালচার? কালচার বলতে আজকের বাঙালি কী বোঝে? কালচারের বাংলা প্রতিশব্দ কী? সঠিক বানানে সেটা লিখতে পারবে চল্লিশের নীচে বয়স এমন কজন আছে? তামিল, তেলুগু ছবি ঝেড়ে বলিউডে ছবি হয় আবার সেই ছবি ঝেড়ে বাংলা ছবি হয়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই চলছে। এর নাম কালচার? ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে তো বাঙালি দেড়শো বছর ধরে পড়ছে কিন্তু আগে তো বাপ-মা গর্ব করে বলত না “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না”? এই অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে বিহারী, মাড়োয়ারিরা? একই স্কুলে পড়া মাড়োয়ারি ছেলেমেয়ের বাবা-মাকে তো বলতে শুনি না গদগদ হয়ে “মেরে বেটে কো না হিন্দি ঠিক সে আতা নহি”? সন্ধ্যের পর তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালি যে সিরিয়ালগুলো দ্যাখে সেগুলোর নাম কালচার? ওসবে তো হিন্দি ছবির গানও চলে। তার মানে যারা বানায় তারা নিজেরা লিখতে তো পারেই না, লাগসই বাংলা গান খুঁজে বের করার মুরোদও তাদের নেই। স্বাভাবিক। কারণ এদের সাক্ষাৎকার যা এদিকওদিক পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় এরা বাংলা বলে গ্রীকদের মত। তা এরকমটা এদের শেখাল কে? হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালা? গলায় পা দিয়ে? বাঙালি হিন্দু মেয়ের বিয়েতে মেহেন্দি চালু করল কে? কোন বিহারী এসে এ কে ৪৭ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল? যে ছেলে সব শাস্ত্রীয় আচার মেনে বিয়ে করে, প্রেমের বিয়েতেও পণ নিতে ছাড়ে না, সে বৌভাতের দিন প্রথাগত ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে শেরওয়ানি পরে কোন মাড়োয়ারির ভয়ে? ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে এমনকি দ্বিতীয় ভাষার জায়গা থেকেও বাংলাকে সরিয়ে হিন্দি ঢোকান যে বাঙালি বাবা-মায়েরা তাদের কোন হিন্দিভাষী ব্ল্যাকমেল করেছে এটা করতে?
তাছাড়া কালচার মানে তো শুধু এসব নয়। ট্রেনে বাসে তরুণ বাঙালিদের ভাষা শুনে দেখেছেন? এমনিতে পাঁচ লাইন কথা বললে দু লাইন ইংরিজি আর আড়াই লাইন হিন্দি থাকে। খিস্তি দেওয়ার সময় কিন্তু এরা পরম বাঙালি। এবং জনসমক্ষে খিস্তিসহ কথা বলাটা বেশ গর্বের ব্যাপার এদের কাছে। বছর কুড়ি আগেও বড়দের সামনে শালা বলে ফেললে যে বাঙালি কানমলা খেয়েছে তারই ছেলেমেয়ে ট্রেনে বসে হেডফোনে বন্ধুকে মহানন্দে কাঁচা খিস্তি দিয়ে যায়, সে কামরাভর্তি যতই বাপ-পিতেমোর বয়সী লোক থাক, মহিলারা থাকুন বা বাচ্চাকাচ্চা থাক।
এই জাতির কালচার শেষ করে দিয়েছে অন্য রাজ্য থেকে আসা দশ বারো শতাংশ লোক? শুনলেই হাসি পায়।

“এ বাংলা রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগরের বাংলা। সেই বাংলায় অবাঙালিগুলো এই সাম্প্রদায়িক, পশ্চাৎপদ রাজনীতি ঢোকাল”
ঐ তিন চারটে নাম মুখস্থ বুলির মত আউড়ে যাওয়া বহুকাল হল বাঙালির বদভ্যেস। কাঁঠালি কলার চেয়েও বেশি ঘটে ব্যবহার করা হয় এই নামগুলো। অথচ এই লোকগুলো কেন বিশিষ্ট তা ছেলেমেয়েকে শেখানোর দায়িত্ব অনেকদিন বাবা-মায়েরা ছেড়ে দিয়েছেন। কি ভাগ্যিস দ্বিতীয় জন কিছু গান, কবিতা লিখে গেছেন। তাই স্ট্যাটাস বজায় রাখতে বাড়িতে রচনাবলী সাজিয়ে রাখা, ছেলেমেয়েকে আবৃত্তি স্কুলে পাঠিয়ে “ভগবান তুমি…” বলতে শেখানো, ঘুরেফিরে গুটিকয়েক গান আর নাচ শেখানো — এসব আছে। বাকিরা তো আক্ষরিক অর্থেই ছবি হয়ে গেছেন। প্রথমজনেরটা থাকে ঠাকুরঘরে। অতএব কী বলেছেন ওসব আর কে পড়তে যাবে? পড়লেও ভাবতে যাবে কেন? গুরুবচন। মুখস্থ করাই কর্তব্য, ভাবতে নেই।
রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন অথচ সঙ্গীতে এবং কাব্যে একেবারে স্বতন্ত্র নজরুলের প্রতি আমরা পশ্চিমবঙ্গীয়রা সযত্নলালিত অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়েছি। আজকাল আর নজরুলগীতি শেখা ঠিক কেতাদুরস্ত নয়। আমাদের ছোটবেলার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যাগুলোও প্রায় অবলুপ্ত। অন্নদাশঙ্করেরই বোধহয় ভুল হয়েছিল। নজরুলকে আমরা বিলকুল ভাগ করে দিয়েছি। আশঙ্কা হয় সেটাও হয়ত তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্যেই।
চতুর্থজনের অবস্থা তো আরো করুণ। এই ভদ্রলোকের নাম আজকাল আর খুব বেশি বাঙালি জানে কিনা আমার সন্দেহ হয়। ছোটদের তো জানার উপায়ও নেই। তারা তো জলি প্রাইমার, এলিমেন্টারি ম্যাথসে ডুবে আছে। তার মধ্যে কি আর বর্ণপরিচয়ের জায়গা আছে? আর বড়রা তো বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বরাবরই জানত দুটো শব্দ —- বিধবাবিবাহ আর বাল্য বিবাহ। আরেকজনকে তো বাঙালি ভুলেই গেছে। তিনি রামমোহন রায়। সেটা অবশ্য একদিকে ভাল। পপকর্ন খেতে খেতে পদ্মাবতী দেখার সময়ে ঐ ভদ্রলোককে মনে পড়লে পুরো আমেজটাই নষ্ট হবে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে এই লোকগুলোকে শালগ্রাম শিলা বানিয়ে ফেলেছি আমরা অনেক আগেই। সুতরাং আমাদের বাংলাটা আর এদের বাংলা নেই। এর জন্যে বিহারী, মাড়োয়ারিদের গাল পাড়ার কোন যুক্তি নেই। তা বাদেও বাংলাকে এদের বাংলা বলা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে অর্ধসত্য বলার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
রামকৃষ্ণের কথা আলাদা। তিনি শত হলেও ধর্মগুরু। তাছাড়া তাঁর এক নম্বর শিষ্য একটা আস্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করে গেছেন। তাই তিনি নিজের সময়ও পূজিত, এখনো পূজিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে গালাগাল দেওয়ার লোক তাঁর সময়েও নেহাত কম ছিল না। যেমন তাঁর যশে দ্বিজেন্দ্রলালের কম গা জ্বলেনি। আর নোবেল টোবেল পাওয়ার পরেও, বাণী বসুর ‘অষ্টম গর্ভ’ পড়লে বোঝা যায়, শিক্ষিত বাঙালিরা অনেকেই মনে করত উনি শুধু একজন বড়লোকের ছেলে যে শান্তিনিকেতনে সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে। এসব যারা মনে করত এ বাংলা তাদেরও। নিজেদের রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি ভাবতে গেলে মনে রাখা উচিৎ আমরা ঐ লোকগুলোরও জাতভাই।
আর বিদ্যাসাগর? এ বাংলা কোনদিনই তাঁর ছিল না। তিনি যেমন আমাদের পূর্বপুরুষ তেমন যারা বিধবাদের বিয়ে দেওয়ার অপরাধে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেছিল, তাঁকে খিস্তি করে গান লিখেছিল, জুতো ছুঁড়েছিল, টাকার লোভে তাঁকে ঠকিয়েছিল তারাও এই আমাদেরই পূর্বপুরুষ। এবং তারা নেহাত এলেবেলে লোকও নয়, অনেকেই তখনকার সমাজের মাথা। এই বাংলা এমনই বিদ্যাসাগরের যে তিনি শেষ বয়সে এই জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে দন্ডকারণ্যে সাঁওতালদের সঙ্গে গিয়ে বাস করতেন।
যে নবজাগরণ বা আলোকপ্রাপ্তি নিয়ে আমরা জাঁক করি সেই আলো যাঁরা নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক ইউরোপীয় অধ্যাপকও। মনে রাখা ভাল যে সেই হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওকে আমাদেরই গণ্যমান্য পূর্বপুরুষরা বিদেশী এবং বিধর্মী বলে অপমানের একশেষ করেছিল। আমাদের সমাজের কুপ্রথাগুলোর দিকে আঙুল তোলার তাঁর অধিকার নেই বলেছিল। ঠিক যেমন আজকের দক্ষিণপন্থীরা বলছে লেনিন তো বিদেশী, এদেশে তার মূর্তি থাকবে কেন? আমাদের সেই পূর্বপুরুষেরা ডিরোজিওকে ভাতেও মেরে এমন অবস্থা করে যে তাঁর অকালমৃত্যু হয়।
আর সাম্প্রদায়িকতা হিন্দিভাষীরা এ রাজ্যে নিয়ে এসেছে, কেবল তাদের এলাকাগুলোতেই হিন্দুত্ববাদের প্রসার ঘটছে এমনটা যদি আপনার মনে হয় তাহলে বলতে হয় আপনি বুদবুদের মধ্যে বাস করছেন বহুকাল ধরেই। ভাল করে তাকিয়ে দেখলে চারপাশে অজস্র আত্মীয়স্বজন পাবেন যারা গাদা ডিগ্রিধারী হয়েও চরম অশিক্ষিতের মত বলে “অমুকের মুসলমানদের সাথে এত কিসের দহরম বুঝি না। বাঙালি ছেলে বাঙালিদের সাথে বন্ধুত্ব কর না।” বাংলা ভাষার জন্যে আজ অব্দি যারা প্রাণ দিয়েছে সীমান্তের দুই পারে, তাদের বেশিরভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বী অথচ আমাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, অধ্যাপক, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশাধারী মূর্খরা বলে তারাই বাঙালি, মুসলমানরা মুসলমান। বিজেপির প্রোপাগান্ডা আর মমতার নিজেকে মুসলমানদের ত্রাতা হিসাবে তুলে ধরার অপচেষ্টা শুরু হওয়ার পর থেকে আশপাশের লেখাপড়া জানা মানুষদের ভেতরের ঘৃণা কিভাবে বেরিয়ে আসছে, কি অনায়াসে তারা ভিত্তিহীন গুজবকে ধ্রুব সত্য হিসাবে বিশ্বাস করছে এবং অন্যকে বিশ্বাস করাচ্ছে তা যদি আপনার চোখে না পড়ে থাকে, একমাত্র তাহলেই আপনি ভাববেন হিন্দুত্ববাদীরা শুধু হিন্দিভাষীদের এলাকায় শক্তিশালী হচ্ছে।
তবে এই সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসও আমাদের সুপ্রাচীন। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের অনন্য প্রতিভা যেমন তাঁর ইহুদীবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি, আমাদের গদ্যের আদিপুরুষ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভাও তেমনি তাঁর মুসলমানবিদ্বেষকে অতিক্রম করতে পারেনি। মুসলমান শাসকরা এদেশে হানাদার এবং সমস্ত অধঃপতনের মূলে, তারা আসার আগে এদেশ স্বর্গরাজ্য ছিল — এই যে অতিসরলীকৃত ইতিহাস আর এস এস আমাদের গেলাচ্ছে, বঙ্কিম যে তার চেয়ে খুব আলাদা কিছু ভাবতেন তা ভাবা শক্ত। রাজসিংহ উপন্যাসের শেষে তবু একটা কৈফিয়ত গোছের লেখা আছে, যেখানে বঙ্কিম লিখেছেন সব হিন্দুই ভাল আর সব মুসলমানই খারাপ এমনটা বলা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। আনন্দমঠ উপন্যাসের শেষে তাও নেই।
বিবেকানন্দ একবার বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সঙ্গে ঐস্লামিক দেহের সমন্বয়ের কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাঁর ইতিহাস পাঠেও “সবই ব্যাদে আছে” এবং সে যুগের পর থেকে ভারতে আর ভাল কিছু হয়নি — এই মনোভাবটা বড় জ্বলজ্বল করে। আর সত্যি বলতে কি, ঐ উক্তি থেকেও এটাই মনে হয় যে বিবেকানন্দ মুসলমানদের একটা বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষ হিসাবে না দেখে একটা বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর লোক হিসাবে দেখতেন। নইলে ঐস্লামিক দেহ কথাটার কোন মানে দাঁড়ায় কি? সব মুসলমানের দেহের গঠন কি একরকম? আমার মাছ ভাত খাওয়া বাঙালি মুসলমান মাস্টারমশাই সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার রোগাসোগা লোক। আবার আমাদের পেস বোলার মহম্মদ শামি। দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ চেহারার উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা মুসলমান। এদের মধ্যে কার দেহের সঙ্গে বৈদান্তিক মস্তিষ্কের সমন্বয় চাইছিলেন বিবেকানন্দ?
অত তত্ত্বকথারও দরকার নেই, বাস্তব উদাহরণ দেখি। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঙ্গা করতে আমরা বাঙালিরা কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকিনি। ১৯৪৬ এর ১৬ই আগস্টের দাঙ্গাও বাইরে থেকে কেউ এসে করে দিয়ে যায়নি।
অতএব শুরু হয়ে যাওয়া ঝড় এবং আসন্ন প্রলয় আটকাতে হলে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে বাঙালি সংস্কৃতিমান, বাঙালি শান্তিপ্রিয়, বাঙালি দাঙ্গাবাজি করে না — এই একমাত্রিক পরিচিতিটা আপন মনের মাধুরী মিশায়ে আমাদেরই তৈরি করা। আসলে বাঙালিদের মধ্যে অন্য কোন জাতের লোকেদের চেয়ে পরধর্মবিদ্বেষী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দাঙ্গাবাজ লোক কম নেই। কোনদিন ছিলও না। বাঙালির বাংলাকে এক রাখতে রাখীবন্ধন করা রবীন্দ্রনাথ আছেন আবার হিন্দু, মুসলমান এক দেশের নাগরিক হতে পারে না — এই মনোভাবের শ্যামাপ্রসাদও আছেন। আমাদের “একই বৃন্তে দুটি কুসুম” লেখা, অসামান্য শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা নজরুল আছেন আবার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস লেলিয়ে দেওয়া সুরাবর্দিও আছেন। আপনি এদের মধ্যে কার উত্তরসূরি সেটা প্রমাণ হয় আপনার কথায় এবং কাজে।
অতএব আঙুলটা এবার নিজের দিকে তোলা যাক। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের দৈত্যটার মুখোমুখি হওয়া যাক। এমনিতেও যে রাজ্যে আমরা বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে অন্য রাজ্যের অন্য ভাষাভাষী মানুষ এসে সবকিছু বদলে দিচ্ছেন — এটা যদি সত্যি বলে মানতে হয় তাহলে এটাও মানতে হয় যে আমরা সব নিরেট মাথার লোক। গোটা ভারতকে ভাগ করা হচ্ছে, বাঙালিকেও ভাগ করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। সেটা ভুলে আরো নতুন ভাগাভাগি তৈরি করবেন না দয়া করে। আদি অনন্তকাল ধরে মানুষ জীবিকার সন্ধানে এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাচ্ছে। এই ধারার বিরুদ্ধে কথা বলা যেমন অনৈতিহাসিক তেমনই অমানবিক। পৃথিবীর কোন প্রগতিশীল মানবগোষ্ঠী এর জন্যে কারো সাথে শত্রুতা করে না। এবং করতে ইচ্ছে করলে মনে রাখবেন, সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া থাকে এবং বহু বাঙালি পেশাগত কারণে সারা ভারতে ছড়িয়ে আছেন।
কী বললেন? হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ? সে তো সঙ্ঘ পরিবার, ভারত সরকার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার করছে। তার জন্যে আপনার হিন্দিভাষী, রাম আর হনুমানের পূজারী প্রতিবেশী দায়ী হবেন কেন? আমাকে ছোট থেকে যাঁরা ঠেগুয়া খাইয়েছেন তাঁরা তো কখনো দাবী করেননি ছটপুজোয় ছুটি দিতে হবে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন দিলেন সে প্রশ্ন তাঁকে করুন। এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নিজেদের মত করে রামনবমী পালনও তো করে আসছেন বরাবর, অস্ত্রমিছিল করেননি তো। রাজনৈতিক দল কেন রাম আর হনুমানের পুজো করবে সে প্রশ্ন দিলীপ ঘোষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে করুন, হিন্দিভাষীরা এর জবাব কেন দেবেন? এ তো আইসিসের অপরাধের জবাব এদেশের সাধারণ মুসলমানের কাছে চাওয়ার মত হয়ে গেল।
সত্যি কথা বলতে, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদকে মালার মত গলায় পরে নিচ্ছি আমরা নিজে — বাংলার চর্চা ক্রমশ কমিয়ে দিয়ে এবং ভাষাটার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে। কয়েক মাস আগে এক টেলিকম কোম্পানি তাদের ইংরিজি বিজ্ঞাপনের বাংলা তর্জমা খবরের কাগজে ছেপেছিল শুধু গুগল ট্রান্সলেটরের ভরসায়। ফলে সেটার হরফটাই যা বাংলা ছিল, ভাষাটা কী তা বোঝা ভগবানেরও অসাধ্য। এই সাহস ওরা তামিলনাড়ু, কর্ণাটক কি কেরালায় পায় না। এখানে যে পায় তার জন্যে দায়ী আমরাই, এ রাজ্যের হিন্দিভাষীরা নন। অন্য ভাষা শিখতে গেলে যে বাংলা ভুলতে হয় না সেটা নিজে বুঝলে এবং ছেলেমেয়েকে বোঝালে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ এমনিই ট্যাঁ ফোঁ করার জায়গা পাবে না।

এক যে ছিল সংসদ

প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন সংসদে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন, বলেছিলেন “এটাই তো আমার মন্দির”

সে এক সংসদ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতেন জহরলাল নেহরু বলে একজন। সাহিত্যিক ই এম ফর্স্টারের ধারণা ছিল, ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ারের যদি পুনর্জন্ম হয় আর তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে একটা চিঠি লিখবেন ঠিক করেন, তাহলে একমাত্র যে রাষ্ট্রনেতা সেটা পাওয়ার যোগ্য, তিনি নেহরু। আর বিরোধী দলনেতার আসনে বসতেন অসামান্য বাগ্মী এবং পণ্ডিত, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। একটু দূরেই ছিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনিও কম বড় বক্তা নন। একবার শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা দিচ্ছেন, নেহরু উঠে বললেন “What nonsense are you talking?” শ্যামাপ্রসাদ জবাব দিলেন “There’s no monopoly of yours in talking nonsense, sir.”
ঘটনাটা শুনেছিলাম হাওড়ার এক সময়কার সিপিএম সাংসদ প্রয়াত সুশান্ত চক্রবর্তীর মুখে। তিনি আরো একটা সংসদীয় বিতর্কের গল্প শুনিয়েছিলেন। সেটা ওরকম মান্ধাতার আমলের ঘটনা নয়, আমাদের সময়ের অনেক কাছাকাছি। কংগ্রেস নেতা এ আর আন্তুলের বিরুদ্ধে সিমেন্ট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। তা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে জোর চেপে ধরেছেন সরকারকে। বিতর্কে এক মন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন, তারপর বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বলতে উঠেছেন। শুরুতেই বললেন “The minister spoke at length, trying to cement his argument. But failed.”
এই গল্পগুলো শুনি ২০০০ সাল নাগাদ। তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ মাস্টারমশাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠিক করলেন আমাদের দিয়ে মক পার্লামেন্ট করাবেন। যেদিন অনুষ্ঠানটা হল সেদিন অতিথি হিসাবে এসে সুশান্তবাবু শুনিয়েছিলেন গল্পগুলো। ওগুলো অবশ্য লোকসভা, রাজ্যসভার অধিবেশনের সরাসরি টিভি সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগের ঘটনা। আমি যে প্রজন্মের লোক, তারাই প্রথম টিভিতে ওসব দেখতে পায়। তখনো কিন্তু সংসদের বিতর্কগুলোর একটা ন্যূনতম মান ছিল।
আমরা ট্রেজারি বেঞ্চে অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথার চেয়ে লম্বা বিরামযুক্ত বক্তৃতা শুনেছি, সাথে তাঁর স্বরচিত কবিতা। যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে আস্থাভোটে জয়যুক্ত হওয়ার আগে বলা “কর্তব্য পথ পর / ইয়ে ভি সহি, উয়ো ভি সহি।” আমরা লালকৃষ্ণ আদবানির সংস্কৃতাশ্রয়ী হিন্দি বক্তৃতা শুনেছি, বিরোধী আসন থেকে জলদগম্ভীর সোমনাথ চ্যাটার্জিকে শুনেছি, পূর্ণ সাংমাকে মনে আছে, ভোজপুরী হিন্দি আর টুকরো রসিকতায় গুরু বিষয়কে লঘু করে বলতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লালুপ্রসাদকেও মনে আছে। আরো পরে সরকারপক্ষের পি চিদম্বরম, কপিল সিবাল আর বিরোধীপক্ষের অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজ, সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্যও কান পেতে শোনার মত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা ওয়াক আউট, বিলের প্রিন্ট আউট ছেঁড়া, ওয়েলে নেমে স্লোগান দেওয়া — এসব সত্ত্বেও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিতর্ক হত। তাতে সব পক্ষের প্রধান নেতারা অংশগ্রহণও করতেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন না, এটা কল্পনাতীত ছিল।
তারপর আচ্ছে দিন এল। কার জানি না, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন সংসদে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন, বলেছিলেন “এটাই তো আমার মন্দির।” এবং তারপর থেকেই ক্রমশ সংসদের অধিবেশন বসার দিন কমেছে, মন্দিরের প্রধান সেবায়েতের উপস্থিতিও কমেছে। অনেক দেশদ্রোহী বলে উনি সংসদটা এড়িয়ে যান কারণ মেঠো বক্তৃতায় হাত-পা নেড়ে, চোখের জল ফেলে উতরে গেলেও সংসদে জোরালো বক্তৃতা দেওয়া ওঁর কম্ম নয়। তবে আমি একথা বিশ্বাস করি না। এটা নেহাতই কুৎসা। আসলে ভদ্রলোক দিনে মোটে চার ঘন্টা ঘুমোন তো। আমার ধারণা সেই চার ঘন্টা হল দুপুর বারোটা থেকে চারটে। তা ঐ সময়টা কি সংসদে বসে নষ্ট করা যায়? ওটুকু না ঘুমোলে মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়বে না?
কিন্তু দেশদ্রোহীরা তো এসব শুনবে না, তারা উল্টোপাল্টা বলবেই। সেটা বন্ধ করতে সরকার ভাল বুদ্ধি বার করেছেন — কোন বিতর্ক হওয়ারই দরকার নেই সংসদে। এই প্রবণতা শুরু থেকেই অল্প অল্প দেখা যাচ্ছিল। বিমুদ্রাকরণের মত বড় বিষয় নিয়েও বিরোধীরা চেঁচামেচি করার পর সরকার আলোচনায় রাজি হয়েছিল। তাও চেয়েছিল যেন সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়, ভোটাভুটির ব্যাপার না থাকে। এবং যেভাবেই আলোচনা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বক্তব্য রাখবেন না।
এবারে আরেক কাঠি সরেস। একটা লোক দেশের এত টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেল যে এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কত টাকা, অথচ সরকারের মনেই হল না এটা নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিরোধীরা আলোচনার দাবীতে বিস্তর চেঁচামেচি করছেন (বেশ করছেন), এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানাচ্ছেন সরকার সবকিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি। কিন্তু একথা বলছেন কবে? না বিনা বিতর্কে অর্থ বিল পাশ হয়ে যাওয়ার পরে। যা যা ছিল তাতে তার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশের টাকায় পুষ্ট হওয়াকে আইনসম্মত করে নেওয়াও আছে। এতবড় কান্ড হয়ে গেল কোন বিতর্ক ছাড়াই। সরকারের যেন কোন দায় নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সংসদকে সচল করার। ফ্লোর ম্যানেজমেন্ট কথাটার যেন কোন অস্তিত্বই নেই।
আসলে বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক — এটা এদেশে কে না চায়? যে কোন বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিৎ”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!
যাঁরা মনে করেন কথাগুলো ঠিকই, তাঁদের জন্যে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে শেষ করি। ঘটনাটার সাথে আমাদের দেশের কোন ঘটনার মিল আছে কিনা আপনারাই ভেবে দেখুন।
ঘটনাটা ঘটে ২১শে মার্চ, ১৯৩৩ এ। সেদিন নাজি পার্টির নেতা হিটলার পটসডাম গ্যারিসন চার্চের বাইরে তদানীন্তন জার্মান রাষ্ট্রপতি পল ফান হিন্ডেনবার্গকে হাঁটু মুড়ে অভিবাদন জানায় এবং করমর্দন করে। উপলক্ষটা ছিল নব নির্বাচিত রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ আর কি) প্রথম অধিবেশন। যেহেতু হিন্ডেনবার্গ রাষ্ট্রপ্রধান আর দিনটা হল রাইখস্ট্যাগের অধিবেশন শুরুর দিন, তাই অনেকে মনে করেছিল হিটলার জার্মান সংবিধান ইত্যাদির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করল। এর পরের বারো বছর প্রমাণ করেছে তাদের ভাবনাটা সঠিক ছিল কিনা।

ঢেউ উঠছে…

সাধারণ মানুষের কাছে লাল পতাকাটারই আলাদা পরিচিতি আছে, ভিন্নমত বাম দলগুলোর সেভাবে নেই। সেজন্যেই এত বছর পরেও বিদ্যাসাগরের মাথা কাটার দায় সিপিএমের ঘাড়ে চেপে যায়। একইভাবে সিপিএমের কুকর্মের দোষ এস ইউ সির ঘাড়ে কেউ চাপিয়ে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই

বামপন্থী, বা বৃত্তটা আরেকটু ছোট করে বললে মার্কসবাদী আন্দোলনে, মাঝেমাঝেই অনেক মতপার্থক্য ঘটে। এ সেই মার্কস, এঙ্গেলসের আমল থেকেই চলে আসছে। আন্দোলনের পথ নিয়ে তো বটেই, এমনকি লক্ষ্য নিয়েও মতান্তর হয়েছে। তার সুগ্রন্থিত ইতিহাস আছে। এদেশেও তো একসাথে যাত্রা শুরু করেও কমিউনিস্টরা পরে নানাভাগে বিভক্ত হয়ে গেছেন।
শুধু আন্দোলনেই নয়, আমার মত বামমনস্ক কিন্তু প্রত্যক্ষ রাজনীতি না করা লোক যারা আছে তাদের মধ্যেও মতপার্থক্য হয়। কয়েকদিন আগেই যেমন লেনিনের মূর্তি ভাঙার পালটা শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি ভাঙা ঠিক হয়েছে কিনা তা নিয়ে হল।
এরকম মতান্তর এবং তা নিয়ে তর্ক আমরা বামপন্থী বন্ধুরা সামনাসামনি করি, দেখা না হলে ফোনে করি, ফেসবুকে করি, সর্বত্র করি। এবং ঝগড়া করে একে অপরের উপর রাগ করি, অভিমান করি। কোন ব্যাপারে মৃণাল হয়ত ভাবল “প্রতীকটা এরকম স্বল্পমেয়াদী চিন্তা করছে! চটজলদি সমাধান ভাবছে! ছিঃ!” আর প্রতীক ভাবল “সিদ্ধার্থকে এতদিন চিনি, আমার চেয়েও বেশি মার্কসবাদ পড়েছে। আর ও কিনা প্রত্যাঘাতের গুরুত্ব বুঝল না!” মণিশঙ্কর হয়ত এদের চেয়ে ঠান্ডা মাথার ছেলে। তাই সে ভাবছে “নাঃ! প্রতীককে সামনে পেলে বোঝাতে হবে। এটা হতে দেয়া যায় না।”
এই যে মতান্তর, আন্দোলনেই হোক বা সমর্থকদের মধ্যে, এটা কিন্তু নেহাত খারাপ নয়। এটা হওয়ার কারণ সমস্যাগুলো নিয়ে এই সব পক্ষই মনপ্রাণ দিয়ে ভাবছে এবং নিজের মত করে ভাবছে। কারোর কাছেই এটা নিছক আড্ডা দিয়ে বা বিতর্কসভা করে ভুলে যাওয়ার বিষয় নয়। আর ইংরিজিতে কথা আছে না “fools seldom differ”? বিজেপি সমর্থকরা যেমন লক্ষ্য করি সব ব্যাপারেই একমত। দুজন সামনাসামনি বসলে এত একরকম কথা বলে যে যে তাড়াতাড়ি বলতে পারে সে-ই বলে যায়, অন্যজনের মাথা নাড়তে নাড়তে ঘাড় ব্যথা হওয়ার যোগাড়।
কিন্তু বামপন্থীদের মধ্যে যত মতপার্থক্যই থাক, দেশের আজকের অবস্থায় যে একত্র হওয়া দরকার সেটা নিয়ে বিরাট কোন মতান্তর নেই। মতান্তর যা আছে, তা বামেরা ছাড়াও আর কাউকে দলে টানা দরকার কিনা তাই নিয়ে। সেই বিতর্কের সমাধান করে দেওয়ার দায়িত্ব বোধহয় সাধারণ মানুষই নিয়ে নিয়েছেন। প্রথমে ত্রিপুরার নির্বাচনে তাঁরা সিপিএম সরকারকে হারিয়ে দিলেন, কংগ্রেসকে একটা আসনও দিলেন না। তারপর মহারাষ্ট্রে, যেখানে বামেরা বিধানসভায় উপস্থিতির বিচারে কোন শক্তিই নয়, সেখানকার হাজার হাজার কৃষক কিনা লাল পতাকা হাতে ছদিন মিছিল করে পৌঁছে গেলেন ভারতীয় পুঁজিবাদের সদর দপ্তর মুম্বাইয়ে! কে জানে, কলকাতার লেনিন সরণির স্ট্যাচুটা হয়ত স্মিত হেসে বলেছে “একটু পা চালিয়ে ভাই।” শুধু মহারাষ্ট্রের কৃষক নয়, আমাদের মিডিয়া পাত্তা দিক আর না-ই দিক, মাত্র কয়েকমাস আগে রাজস্থানের কৃষকরাও লাল ঝান্ডা হাতে বিজেপি সরকারের শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছিলেন।
আইনসভায় উপস্থিতির দিক থেকে অদূর ভবিষ্যতে এদেশে বামেদের ক্ষমতায় আসার কোন সম্ভাবনা নেই, কিন্তু খুব কম সময়ের ব্যবধানে দুটো আন্দোলন ক্ষমতার মেদ জমে যাওয়া বামপন্থীদেরও দেখিয়ে দিল “রাস্তাই একমাত্র রাস্তা।” এম পি, এম এল এ না-ই থাক, বামপন্থীরা মানুষের পাশে থাকলে, রাস্তায় থাকলে এখনো কী করতে পারে টের পেয়ে গেল সবাই।
আজকের মুম্বাইতে লাল ঝান্ডা যেটা করতে পারল সেটা সম্ভবত আজকের কলকাতায় পারত না। গ্রাম থেকে শহর হয়ে ওঠা মফঃস্বলের ছেলে হয়েও তো কৃষক সভার অস্তিত্ব টের পাই না বহুবছর হল। হয়ত পশ্চিমবঙ্গের কৃষকও ঝান্ডাটাকে নিজের মনে করতে পারেন না আর। তার পেছনে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের শেষের দিককার ভূমিকা থাকা স্বাভাবিক। যতটুকু বুঝেছি, সাধারণ মানুষের কাছে লাল পতাকাটারই আলাদা পরিচিতি আছে, ভিন্নমত বাম দলগুলোর সেভাবে নেই। সেজন্যেই এত বছর পরেও বিদ্যাসাগরের মাথা কাটার দায় সিপিএমের ঘাড়ে চেপে যায়। একইভাবে সিপিএমের কুকর্মের দোষ এস ইউ সির ঘাড়ে কেউ চাপিয়ে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
শত্রুরাও কিন্তু লাল পতাকাধারী সব দলকেই এক ও অভিন্ন শত্রু বলে মনে করে। এবং বামপন্থীরা নিজেদের মধ্যে যতই তর্ক করুন কে প্রধান শত্রু তা নিয়ে, ফ্যাসিবাদীরা নিঃসংশয় যে বামপন্থীরাই প্রধান শত্রু। তা নাহলে ২০১৪ থেকেই মূর্তি ভাঙা শুরু হত নেহরু, গান্ধী বা ইন্দিরাকে দিয়ে। একটা বুড়ো আঙুলের সমান রাজ্যে লেনিনের মূর্তি ভেঙে এর সূচনা হত না।
সুতরাং হোক না, যেখানে কোনদিন ক্ষমতায় আসেনি কোন বামপন্থী দল, লড়াইটা সেখান থেকেই নতুন করে শুরু হোক না। আর এই আন্দোলন তো বেশকিছু নতুন জিনিস শেখাচ্ছে, বাকি দেশের বামপন্থীরা, বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজ্যের বামপন্থীরা সেগুলো শিখুন না। যেমন পরীক্ষার্থীদের যাতে অসুবিধা না হয়, তাই মিছিলটা আজাদ ময়দান পৌঁছল রাতেই, সকালে নয়। এটা নিশ্চয়ই শেখার মত। ভরসার কথা তো এটাই যে মহারাষ্ট্রের মত অতবড় রাজ্যের কৃষক লাল ঝান্ডাধারীদের এখনো বিশ্বাস করেন, তাই গলায় দেওয়ার দড়ি ছেড়ে রক্তপতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন।
অনাবশ্যক আশাবাদ মনে হচ্ছে? হতেই পারে, কারণ কিছুদিন আগেই একটি বামপন্থী দলের সর্বক্ষণের কর্মী এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল। সে বলছিল হিন্দি বলয়ের অনেক রাজ্যেই শ্রমিক, কৃষক লাল পতাকাকে বিশ্বাস করেন, কিন্তু বলেন “দাবী আদায় করতে লাল পার্টি, ভোট দেয়ার জন্যে অন্য পার্টি।” কেন হয় এমনটা? ভীষণ কঠিন পরিস্থিতিতে, মার খেয়ে, প্রাণের মায়া ত্যাগ করে, সবচেয়ে বড় কথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবহেলা উপেক্ষা করে, যে পার্টিকর্মীরা ঐসব রাজ্যে সংগঠন চালান তাঁরা কি পারছেন না আশু দাবী আদায় করার চেয়ে বেশি কিছু শ্রমিক, কৃষককে ভাবাতে? সোশাল ডেমোক্রেসির স্বপ্ন দেখাতে না পেরে কি ট্রেড ইউনিয়নবাদে পর্যবসিত হচ্ছে ঐসব রাজ্যের বামপন্থী রাজনীতি (যার বিরুদ্ধে লেনিন বারবার সতর্ক করেছেন)? সক্রিয় বামপন্থীরা ভেবে দেখতে পারেন।
আমরা যারা রাস্তায় নেই, ময়দানে নেই তারা শুধু স্বপ্নই দেখতে পারি। অবশ্য লেনিন রুশ সাহিত্যিক দিমিত্রি পিসারেভকে উদ্ধৃত করে বলেছেন “স্বপ্ন আর বাস্তবের পার্থক্যে কোনই ক্ষতি হয় না, যদি স্বপ্ন যে দেখে সে গভীরভাবে বিশ্বাস করে তার স্বপ্নে, নিবিড়ভাবে অনুধ্যান করে জীবনকে, জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে তার স্বপ্নসৌধকে আর সাধারণভাবে বলতে গেলে, তার আকাশকুসুমগুলিকে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য যদি সে নিষ্ঠাসহকারে কাজ করে।”

ভূতের ভবিষ্যৎ

আমাদের দেশেও কিন্তু বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদ বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের সময়ে ঐ মতবাদ গাড্ডায় পড়েনি, জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে অন্তত কমেনি ২০০৮-০৯ পর্যন্ত।

ভারতীয় ফ্যাসিবাদ ভূত দেখেছে। কমিউনিজমের ভূত।

এই পোস্টটা প্রাথমিকভাবে বন্ধু অমিত এর প্রশ্নমালার উত্তর। তিনটে প্রশ্নেরই উত্তর একবারে দিতে গেলে পোস্টটা অতিদীর্ঘ হয়ে যেত, আমার ওয়ালে কেউ প্রবন্ধ পড়তে আসে বলে মনে হয় না। আর আমার নিজেরও অতখানি লিখতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা। তাই তিনটে প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা তিনটে আলাদা আলাদা পোস্টে করার চেষ্টা করছি। অবশ্য উত্তরগুলো সব আমার কাছে আছে এমন দাবী করার মত মূর্খ আমি নই। সত্যি কথাটা হল অমিতের করা প্রশ্নগুলো আমি নিজেও নিজেকে করি অনেকসময়। সেগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। খুঁজতে খুঁজতে এখন অব্দি যা যা পেয়েছি সেগুলোই এখানে উত্তর হিসাবে লিখছি। আমার ধারণা আমাদের দুজনের মত আরো অনেকেই এই প্রশ্নগুলো নিজেকে বা অন্যদের করেন। তাঁদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই এর চেয়েও জোরালো উত্তর খুঁজে পেয়েছেন। সেগুলো ভাগ করে নিলে সমৃদ্ধ হব।

১) সমাজতন্ত্রের ভবিষ‍্যৎ কি কেবল সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের শ্রেণীকক্ষে অধ‍্যয়ন ও গবেষণার বিষয় হয়ে থাকা? বাস্তব পৃথিবীতে এর প্রয়োগের সম্ভাবনা আজকের দিনে কতটা?

প্রথমেই বলি, এই প্রশ্নটা সেই আশির দশকের শেষে অর্ধেক পৃথিবীজুড়ে কমিউনিস্ট দেশগুলোর পতনের সময় থেকেই করা হয়ে আসছে। তার কারণ মনে করা হয়েছিল ক্ষমতা চলে গেল মানেই মার্কসবাদী/সমাজতন্ত্রবাদী পার্টিগুলো ধ্বংস হয়ে গেল এবং সমাজতন্ত্র নামক ব্যবস্থাটা যে চলে না সেটা প্রমাণ হয়ে গেল। অতএব মানুষের আর এই আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটার প্রতি কোন আকর্ষণই থাকবে না।
কিন্তু সেরকমটা ঘটেনি। মিখাইল গরবাচেভের আমলে নিষিদ্ধ ঘোষিত রুশ কমিউনিস্ট পার্টি, গণশত্রু বলে চিহ্নিত কমিউনিস্ট পার্টি এখন পুতিনের রাশিয়ায় প্রধান বিরোধী শক্তি। ২০১৬য় হওয়া দুমার নির্বাচনে পুতিনের নিজের পার্টি ইউনাইটেড রাশিয়া ছাড়া আর যে তিনটে মাত্র পার্টি দুমায় জায়গা করে নিতে পেরেছিল তার মধ্যে একটা কমিউনিস্ট পার্টি (KPRF)। তাও তো কিভাবে পুতিনের রাশিয়ায় ভোট হয় তা নিয়ে অনেক লেখাপত্র আছে ইন্টারনেটে। ঐ নির্বাচনে যেমন অর্ধেক রাশিয়ান ভোট দিতেই আসেননি। পুতিন ২০১৬ তেই লেনিনকে বেশ গালমন্দ করেছিলেন, তবু গতবছর তাঁর সরকারকে রুশ বিপ্লবে উপলক্ষে একটু নাচনকোঁদন করতেই হল। মোদীকে যেমন এখনো গান্ধী, আম্বেদকরের নাম করতেই হয়। এ থেকে ঐ প্রয়াত আইকনদের আজকের দিনের জনপ্রিয়তার আঁচ পাওয়া যায়।
শুধু রাশিয়ার ব্যাপার নয়, পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে আজ অব্দি কমিউনিস্ট পার্টি বা সাধারণভাবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে বিশ্বাসীরা বিভিন্ন কোয়ালিশন সরকারে থেকেছে। অতএব মানুষ সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে একেবারে বাতিল করে দিয়েছে বলার মত কিছু ঘটেনি।
ইউরোপে যা ছিটেফোঁটা, লাতিন আমেরিকায় তাই-ই সুস্পষ্ট। এক দশক আগে কলকাতা ঘুরে যাওয়া উগো শাভেজের নেতৃত্বে বামপন্থী সরকারগুলো (তাঁর নেতৃত্বাধীন পার্টিগুলো কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি নয়) কিভাবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ভর দিয়ে নিজেদের মধ্যে জোট গড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেজ না ধরেই ঐ মহাদেশে বিকল্প অর্থনীতি চালাচ্ছিল সেগুলো সবাই জানে। শাভেজের অকালমৃত্যুর পর প্রবল প্রতিআক্রমণ হয়েছে। তার উপর নেতৃস্থানীয় ভেনেজুয়েলা, যার মূলধন খনিজ তেলের ভান্ডার, আন্তর্জাতিক বাজারে সেই তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়েছে। ব্রাজিলে দিলমা রুসেফের সরকারকে দুর্নীতির অভিযোগে পদচ্যুত করা হয়েছে অথচ এখনো কিছু প্রমাণ হল না। এইসব বিপর্যয় সত্ত্বেও বামদিকেই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উরুগুয়ে এখনো যথেষ্ট সমৃদ্ধ এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি। বোধহয় সেইজন্যেই সে দেশের কথা আমরা এদেশে বসে বড় একটা শুনতে পাই না। আমিও জানতাম না। সেদিন লাতিন আমেরিকার বর্তমান অবস্থা নিয়ে ইকুয়েডরের বামপন্থী নেতা রাফায়েল কোরেয়ার একটা লেখায় দেখলাম তিনি প্রশ্ন তুলেছেন — ভেনেজুয়েলা যদি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ব্যর্থতার প্রমাণ হয়, তাহলে উরুগুয়ে সাফল্যের প্রমাণ নয় কেন?
কিউবার কথা এখনো বলিনি। পঞ্চাশ বছরের উপর অর্থনৈতিক অবরোধে থাকা একটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে অবরোধকারী আমেরিকাও মুখ খোলে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল তার ভরসার জায়গা। সেটা ভেঙে পড়ার পরেও কিন্তু কিউবা ভেঙে পড়েনি। ফিদেল কাস্ত্রো সম্প্রতি মারা যাওয়ার পর কমিউনিস্টবিরোধী সংবাদমাধ্যমও স্বীকার করেছে যে কিউবানদের একটা ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান আছে। “একনায়ক” কাস্ত্রো মারা যাওয়ার পর যখন রাউল ওবামার সঙ্গে করমর্দন করলেন, তখন এদেশ, ওদেশ, সব দেশেই অনেকে বাঁকা হেসে বলেছিলেন “এইবার ওসব সোশালিজম টিজম ভুলে পুঁজিবাদের কোলেই এসে বসতে হবে।” এখন অব্দি কিউবা কোলে এসে বসেনি বোধহয়, কারণ বসলে তার প্রচারটা এমন জমিয়ে হত যে তার আওয়াজে লাল সন্ত্রাসমুক্ত কলকাতায় বসেও দিব্যি দাঁতকপাটি লেগে যেত।
এই প্রসঙ্গে একবার ব্রিটেনের লেবার পার্টির কথাও বলে নেওয়া যাক। এখন সে পার্টির নেতা জেরেমি করবিন, যিনি দীর্ঘদিন শীর্ষ নেতৃত্বের ধারেকাছে পৌঁছতে পারেননি কারণ তিনি “ভীষণ বামপন্থী”। দুজনেই লেবার পার্টির নেতা কিন্তু টোনি ব্লেয়ারের সাথে করবিনের তফাত ততটাই যতটা রাহুল গান্ধী আর মানিক সরকারের। করবিন যেভাবে সাইকেলে চেপে নিজের এলাকায় ঘুরে বেড়ান আর পকেটের নোটবুক বার করে লোকের অভাব অভিযোগ লিখে নেন, সেটা পড়লে আমাদের এখানকার পুরনো কমিউনিস্ট নেতাদের মনে পড়তে বাধ্য। এই করবিন লেবার পার্টির নেতা হলে পার্টিটা সিপিএমের মত নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দেবে — এই ছিল বেশিরভাগ পন্ডিতের পূর্বানুমান। অথচ গত ভোটে লেবারদের শক্তি বেড়েছে, ব্রেক্সিটের পরে। বিদেশনীতি নিয়ে করবিনের কথাবার্তা নেটে পড়ে দেখা যেতে পারে। প্রকাশ কারাত লিখে দেন বোধহয়।
এদিকওদিক বেশকিছু বন্ধু আছে আমার যারা কোথাও বামপন্থীদের জন্য কিছু উৎসাহব্যঞ্জক দেখলেই লিঙ্কটা আমায় পাঠিয়ে দেয়। তাদের দৌলতে ইদানীং জানতে পারছি আমেরিকাতেও নাকি ছেলেপুলেরা কমিউনিস্ট, সোশালিস্ট শব্দগুলো শুনলে অতটা নাক সিঁটকোচ্ছে না। কিন্তু ওসব আমি এখন কানে তুলছি না। ছোটবেলায় পাড়া প্রতিবেশীরা “তোমার ছেলে/মেয়ে অনেক বড় হবে” বললে মায়েরা যেমন বিড়বিড় করে “বালাই ষাট” বলে আর কি।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, এই যে আমাদের মনে হচ্ছে সমাজতন্ত্র বুঝি পাঠ্যবইয়েই সেঁধিয়ে গেছে, বাইরে কোথাও নেই, সেটা কিন্তু ঘটনা নয়। ব্যবহারিক রাজনীতিতেও সমাজতান্ত্রিক নীতিগুলো লেনিনের মূর্তি যখন প্রথম ভাঙা শুরু হয় তার আড়াই দশক পরেও বহাল তবিয়তে রয়েছে। লক্ষ্য করুন, আমি আগাগোড়া সমাজতান্ত্রিক শব্দটাই ব্যবহার করছি, সমাজতন্ত্র নয়। কারণ লেনিন ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ বইতে বারবার বলেছেন সর্বহারার একনায়কতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রে পৌঁছনোর চেষ্টা করে একটা বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র। সমাজতন্ত্রে পৌঁছলে পর কেমনভাবে চলতে হবে সেটা আমরা জানি না, মার্কসও লিখে যাননি।

“যে রাজনৈতিক রূপের আওতায় সমাজের সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠন সম্ভব হইতে পারে, কল্পনাবিলাসীরা সেই রূপ ‘আবিষ্কার’ করিবার জন্য ব্যস্ত ছিল….
সমাজতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সমগ্র ইতিহাস পর্যালোচনা করিয়া মার্কস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, রাষ্ট্র অন্তর্হিত হইতে বাধ্য, এবং তাহার অন্তর্ধানের সংক্রমণ পর্বে (রাষ্ট্র হইতে অ-রাষ্ট্র সংক্রমণ) রাষ্ট্র গ্রহণ করিবে ‘শাসকশ্রেণী রূপে সংগঠিত মজুরশ্রেণী’র রূপ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ স্তরের রাজনৈতিক রূপ আবিষ্কার করিতে মার্কস আত্মনিয়োগ করেন নাই।” (পৃ ৫৫; রাষ্ট্র ও বিপ্লব; ভি আই লেনিন; ত্রয়োদশ মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর ২০০৮; ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড)

সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনব্যবস্থাও, ভেঙে পড়বার আগে অব্দি সমাজতন্ত্র পর্যন্ত পৌঁছয়নি। সত্তর বছর তার জন্যে যথেষ্ট বলেও মনে হয় না। আমাদের কবির ভাষায় “সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ।”
এখন কেউ বলতেই পারেন “কমিউনিস্টগুলো হচ্ছে এইরকম ফালতু মাল। নিজের দেশে কী হচ্ছে তার ঠিক নেই, কেবল রাশিয়া, চীন, লাতিন আমেরিকা… যত্তসব।” সমালোচনাটা উড়িয়ে দিচ্ছি না। জবাব দিচ্ছি।
প্রথমত, আমি চীনের কথা বলিনি। কারণ চীনে লাল পতাকা টাঙিয়ে রেখে যেটা চলছে সেটা কোন সংজ্ঞা অনুযায়ী কমিউনিজম হতে পারে না। ওটা সমাজতান্ত্রিক পথই নয়। চীন ঘুরে আসা জাপানি কমিউনিস্ট পার্টির এক সদস্য ২০০৪ সালেই আমাকে বলেছিল “পশ্চিমবঙ্গের কৃষক চীনের কৃষকের চেয়ে অনেক ভাল আছে।” এখন চীন সম্পর্কে যা সংবাদ আমরা পাই তাতে সেই বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে কিন্তু বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদ বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের সময়ে ঐ মতবাদ গাড্ডায় পড়েনি, জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে অন্তত কমেনি ২০০৮-০৯ পর্যন্ত। বরং সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর শক্তি বাড়তে বাড়তে ২০০৪ এর লোকসভা নির্বাচনের পরে তারা নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাওবাদীদের হিসাবে আনলামই না।
মজার কথা, এদেশে মার্কসবাদীদের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করল যখন তাদের সরকার সমাজতান্ত্রিক নীতিবিরোধী নানা কাজকর্ম করতে শুরু করল, যার সবচেয়ে হাতেগরম উদাহরণ সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম। ত্রিপুরায় কখনো যাইনি, নির্দিষ্ট করে তেমন কিছু জানি না। কিন্তু ত্রিপুরা তো ভারতের বাইরে নয়, আর ভারতও বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রাচীন ভূখণ্ড নয় কেবল। ফলে আজ ভারতে বামপন্থা যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন সেটা আমার কাছে খুব অবাক করার মত নয়, সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও সন্দিহান করে তুলছে না। এমনিতেও সংসদীয় গণতন্ত্রে কোন দলের সরকার চিরকাল চলতে পারে না। কেরালায় বামপন্থী সরকার আগামীদিনে না-ই থাকতে পারে। আগেও গেছে, ফিরে এসেছে। সরকারে নেই মানে হাপুস নয়নে কাঁদা ছাড়া কিছু করার নেই, আমার নীতি আদর্শ সব বৃথা হয়ে গেল — এরকম চিন্তাভাবনা যারা করে তারা ইতিমধ্যেই পাতলা হতে শুরু করেছে। মনে হয় সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যতের পক্ষে সেটা ভালই।
সামগ্রিকভাবে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবতে গেলে অনেকেই আজকাল বলেন মার্কস-এঙ্গেলস যে শ্রমিকশ্রেণীর কথা বলেছিলেন, সেই শ্রেণী কি আর আছে? আগামীদিনে তো আরো থাকবে না, কারণ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এসে যাচ্ছে। তাহলে বিপ্লবটা করবে কে? সমাজতন্ত্র ব্যাপারটারই বা প্রয়োজন কোথায়? সবকটাই ভাববার মত প্রশ্ন।
আমার ধারণা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যা করবে তা হল বিপুল পরিমাণে কর্মঠ অথচ কর্মহীন শ্রমিকশ্রেণী তৈরি করা (যেটা অটোমেশনের ধাক্কায় ইতিমধ্যেই কিছুটা হয়েছে এবং হচ্ছে)। এবং সে শ্রমিকদের একটা বড় অংশ হবে মার্কসের দেখা শ্রমিকদের থেকে একদম আলাদা। লেখাপড়া না জানা বা কম জানা নয়, বরং আমার মত সেন্ট্রালি এসি অফিসে কাজ করা, এসি ট্যাক্সি চড়া, ছুটির দিনে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় খেয়ে অভ্যস্ত শ্রমিকশ্রেণী। এদের সাথে যোগ হবে বাড়তে থাকা গরিব মানুষ। আজ তাদের যতই ঘেন্না করি, তাদের বিক্ষোভ, তাদের মিছিলকে যতই কর্মনাশা বলে দেগে দিই, সেদিন “অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।” সেই কম্বো বিস্ফোরক হতে পারে, কারণ যে যত বেশি হারায় সে তত বেশি ক্ষিপ্ত হয়। তার ফল কী হবে সেটা নির্ভর করছে সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব প্রয়োগের দায়িত্বে যাঁরা আছেন, মানে যে রাজনীতিবিদরা, তাঁদের উপরে।
আলোচনাটা শেষ করি এরিক হবসবমের কথা বলে। গতবছর এই মার্কসবাদী ঐতিহাসিকের জন্ম শতবর্ষ গেল। ওঁর সম্পর্কে একটা লেখায় পড়ছিলাম, উনি একটা মজার paradox (স্ববিরোধ) এর কথা লিখেছিলেন। সেটা এই যে বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব পুঁজি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে দু দুবার বেঁচে গেছে। দুবারই বাঁচিয়েছে কে? মার্কসবাদ। প্রথমবার জন মেনার্ড কেইন্স গ্রেট ডিপ্রেশনের মুখে এসে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর কিছু কিছু অর্থনৈতিক নীতি পুঁজিবাদী দেশগুলোকে শিখিয়ে দিলেন, জনগণের অসন্তোষ ঠান্ডা হল। দ্বিতীয়বার যুদ্ধের ময়দানে ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাঁচিয়ে দিল বড় বড় পুঁজিবাদী দেশগুলোকে।
এখন কথা হচ্ছে কমিউনিস্ট দেশগুলো তো আর নেই, এদিকে বাজার বাড়তে বাড়তে তার চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। তাই এখন কিউবার পুঁজিবাদের দরকার হোক আর না-ই হোক, পুঁজিবাদের কিউবার বাজারটা দরকার। আর ভারত, চীনকে তো দরকারই। তা লাভের বখরা নিয়ে যদি লেগে যায় যুদ্ধ, ঠেকাবে কে?
ওদিকে মেরুর বরফ গলছে, ট্রাম্প বলছে “ওসব বাজে গল্প। তেল আমি পোড়াবই।” মোদী জঙ্গল কেটে হাইওয়ে বানিয়ে দিচ্ছে যাতে আরো ব্যবসা, আরো মুনাফা হয়। যারা লাভের কড়ি গোনে তারা বলছে “চুলোয় যাক গ্রহটা। আমার লাভের কড়ি বাড়া চাই।” তা গ্রহটা সত্যিই যখন চুলোয় যাবে (স্টিফেন হকিংকে যদি নির্বোধ বলেন, তাহলে আলাদা কথা। নইলে আর শ খানেক বছরের ব্যাপার) তখন ঐ ট্রাম্পসুলভ ধনীরা নাহয় Wall-E ছবিটার মত মহাশূন্যে অত্যাধুনিক মহাকাশযানে ভেসে বেড়াবে। আমাদের সন্তানেরা এবং তাদের সন্তানেরা যাবে কোথায়? তাহলে এখন উপায়?
ভাবতে গেলেই মনে হয় না, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, উদারনৈতিক অর্থনীতি — এসবে লাগাম দরকার? আরো ভাবলে হয়ত মনে হবে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে না ভেবে ভাবা দরকার যে সমাজতন্ত্র প্রয়োগ না করা গেলে সভ্যতার ভবিষ্যৎ কী?

%d bloggers like this: