সপ্তপদী: আমাদের অস্ত্র

“এখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে এস?”
(মেয়েটা মাথা নেড়ে না বলে)
“কেন?”
“আমি বিধর্মী। এ সময়ে আমার তোমার কাছে আসা ঠিক হবে না।“
“এস…….. (ধড়াচূড়া পরা ছেলেটা মেয়েটাকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে) বোস।”
“এ তুমি কী করলে?”
“কী করলাম!”
“এ অবস্থায় তুমি আমাকে স্পর্শ করলে!”
“অস্পৃশ্যতার কথা বলছ? আমার মাকে জানলে তুমি একথা বলতে পারতে না। আজ সারাদিন মনে হয়েছে মায়ের কথা। তখন আমি খুউব ছোট। মা গল্প করতেন ভবিষ্যতের। বলতেন ‘খোকা, তুই মস্তবড় ডাক্তার হবি। বিলেত যাবি।’ শুনে আমি অবাক হয়ে বলতাম ‘বিলেত যাব? বাবা যে বলেন বিলেত গেলে জাত যায়?’ মা হেসে ফেলতেন। বলতেন ‘তুই কি তোর বাবার মত জাত ধুয়ে জল খাবি? আর তোর বাবা যদি একান্তই রাগ করেন, আমি নাহয় তোর বাবাকে নিয়ে আলাদা হয়ে থাকব। তুই তো বড় হবি।”

আজকাল আর রোম্যান্টিকতা আসে না। অথচ কিছুদিন আগেও রোম্যান্টিক হিসাবে আমার দিব্যি নাম ছিল। রাস্তাঘাটে প্রেমিক- প্রেমিকা বা নবদম্পতি দেখলে বিক্ষুব্ধ মনও বেশ পেলব হয়ে আসত, বিভিন্ন সুখস্মৃতি ভিড় করত, জানা গান বা কবিতার লাইন মনে পড়ত। আজকাল আর তেমন হয় না। এখন জোড়া দেখলেই একটা আশঙ্কা কাজ করে এবং অনেক চেষ্টা করেও দেখেছি কিছু প্রশ্ন নিজেকে না করে থাকতে পারি না “দুজন একই ধর্মের তো? নইলে এদের কেউ আক্রমণ করবে না তো?”
এই আশঙ্কা একদিনে তৈরি হয়নি। বেশ মনে আছে বয়সে আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট এক মহিলা সহকর্মী — যাকে পোশাকআশাক, খাদ্যাভ্যাস, নামী স্কুলকলেজের ছাপ ইত্যাদি কারণে আধুনিকাই বলা উচিৎ — বছরদুয়েক আগে আমার সাথে দীর্ঘক্ষণ তর্ক করেছিল যে হিন্দু মেয়েদের ফুঁসলিয়ে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করাটা মুসলমান যুবকদের সুচিন্তিত সঙ্ঘবদ্ধ চক্রান্ত এবং হিন্দু মেয়ের সাথে মুসলমান ছেলের বিয়ে একমাত্র তখনই মেনে নেওয়া যেতে পারে যদি মেয়েটি নিজের ধর্ম পরিবর্তন না করে।
কাল ভ্যালেন্টাইনস ডে তে হৃদয়াকৃতি বেলুন আর চকোলেটের ফাঁক দিয়েও আমার আশঙ্কা আমাকে সারাদিন মুখ ভেংচে গেল, বারবার হাদিয়া আর অঙ্কিত সাক্সেনার মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠতেই থাকল আর কানে বাজতে থাকল সেই প্রাক্তন সহকর্মীর কথাগুলো। এই দৃশ্যশ্রাব্য আতঙ্ক থেকে বাঁচতে আমি আশ্রয় নিলাম বহুবার দেখা একটা পুরনো রোম্যান্টিক ছবিতে। সেখানে দুই ভিন্নধর্মী সহপাঠীর লাঠালাঠি শেষ হয়ে প্রেম শুরু হওয়ার অনুঘটক হিসাবে কাজ করছেন ছেলেটার সদ্যমৃতা মা, যিনি ছেলেকে ছোট থেকেই শিখিয়েছিলেন জাত ধুয়ে জল না খেতে। ভাগ্যিস! শিখিয়েছিলেন বলেই তো কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি হাত ধরে নিজের হোস্টেলের ঘরে নিয়ে আসে রিনা ব্রাউনকে। নইলে যে তৈরিই হতে পারত না আমাদের অতিপ্রিয় প্রেমের ছবিটা, যা ১৯৬১ তে তৈরি, প্রাকস্বাধীনতা যুগের গল্প বলছে অথচ ২০১৮র আমরা যার চেয়ে পিছিয়ে পড়েছি।
কৃষ্ণেন্দুর মায়ের উদারতা (সময়ের গেরো দেখুন — মনুষ্যত্বকে উদারতা বলছি) যে নেহাত গালগল্প নয় তার প্রমাণ আমার পারিবারিক ইতিহাসেই আছে। আমার মায়ের দিদিমা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে এক ইসলাম ধর্মাবলম্বী স্বাধীনতা সংগ্রামীকে বাড়ির ঠাকুরঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন, হিন্দু দারোগা বাকি বাড়িটা তল্লাস করে তাকে পায়নি কারণ সে কল্পনাও করেনি ওখানে ঐ লোককে লুকনো যেতে পারে।
তবে তার মায়ের তুলনায় কৃষ্ণেন্দুর কাছে ধর্ম বা বিগ্রহের গুরুত্ব যে আরো কম, ‘সপ্তপদী’ দেখলে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। শুধু মেডিকাল কলেজ পর্বে তার সোচ্চার ঘোষণা থেকেই নয়, যে রিনার জন্য সে ধর্মান্তরিত হল তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরেও কৃষ্ণেন্দুর আচরণ বারবারই প্রমাণ করে মুখুজ্যে বামুন থেকে রেভারেন্ড হওয়ার পরেও তার বিশ্বাস মানবধর্মেই সবচেয়ে জোরালো। সেইজন্যেই একটা মুমূর্ষু গরীব ছেলেকে সারিয়ে তোলার পরে যখন তার বাবা আশীর্বাদ করেন “ভগবান আপনার ভাল কোরেন,” কৃষ্ণেন্দু উত্তরে বলে “ভগবান আর কোথায়, রামশরণ? তোমরাই তো আমার ভগবান।”
কাল কলকাতার রাজপথে যারা নাকি একটা পরিবারকে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার অনুষ্ঠান করেছে, তারা রেভারেন্ড কৃষ্ণেন্দুর এই কথা শুনলে নির্ঘাত বলত “চালাকি করে রামশরণকে খ্রীষ্টান বানানোর চেষ্টা করছে।” সুবিধামত পেলে কৃষ্ণেন্দুর অবস্থা গ্রাহাম স্টেইনসের মতও করতে পারত। এরাই আবার এক হিন্দু সন্ন্যাসীকে নিজেদের লোক বলে দাবী করে যিনি লিখেছিলেন “বহুরূপে সম্মুখে তোমার/ ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর/ জীবে প্রেম করে যেইজন/ সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।” শোনা যায় বিবেকানন্দ প্রথমে “জীবে দয়া” লিখেছিলেন। তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ শুনে বলেন “দয়া! দয়া করবার তুই কে রে? জীবে প্রেম বল।” কাকতালীয় নয় যে রিনার চোখ দিয়ে পরিচালক অজয় কর যখন রেভারেন্ডের ঘরটা আমাদের দেখান, সেখানে রিনা, যীশু ছাড়া আর যাঁদের ছবি দেখা যায় তাঁরা হলেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ। এবং রামকৃষ্ণ। এই কৃষ্ণেন্দুর কাছে যে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ভালবাসার মানুষের মূল্য বেশি হবে তা আশ্চর্যের নয়। আশ্চর্যের কথা এই যে কৃষ্ণেন্দুর বাবার গোঁড়ামি থেকে আমরা আজও বেরিয়ে আসতে পারলাম না অথচ তিনি নিজেও ছবির শেষপ্রান্তে সত্যদর্শন করতে পারলেন।
সেদিনের দর্শকের নিশ্চয়ই আপত্তিকর লাগেনি, এমনকি আলাদা করে লক্ষ্য করার মতই মনে হয়নি, যে কৃষ্ণেন্দুকে হারানো এবং নিজের জন্মবৃত্তান্ত জানতে পারা, তারপর মাকে হারানোর মধ্যে দিয়ে রিনার নরকদর্শন আর কৃষ্ণেন্দুর বাবার ভুল স্বীকারের পরে রিনা আর কৃষ্ণেন্দুর মিলন কিন্তু সপ্তপদীতে হয়নি। ধর্মীয় এবং পারিবারিক পরিচয় খোয়ানো, কোমরের নীচে আঘাত পাওয়ায় চলচ্ছক্তি এবং যৌনক্ষমতা পর্যন্ত খোয়ানো রিনাকে কৃষ্ণেন্দু নিয়ে গেছে যীশুর কাছেই। গত ৫৭ বছর ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু দর্শক এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে চলেছেন, কারো মনে হয়নি খ্রীষ্টধর্ম জিতে গেল। আজ এ ছবি তৈরি হলে সুচিত্রা সেনের নাক কাটার দাবী উঠত বোধহয়। পূর্বসুরীদের সাথে আমাদের তুলনা করে দেখুন তো লজ্জায় নিজের নাক কাটতে ইচ্ছে করে কিনা?
তবে পূর্বসুরীরা বোধহয় এই ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। সেইজন্যে নিজেদের সৃষ্টিতে বারংবার সাবধান করেছেন। কেন বারংবার বলছি?
১৯৬১ তে মুক্তি পায় সপ্তপদী। এখানে তবু, অন্তত প্রাণ থাকতে কৃষ্ণেন্দু আর রিনা এক হতে পেরেছে। ধর্মীয় গোঁড়ামি কিভাবে দুটো জীবন নষ্ট করে দিতে পারে তার আরো নির্মম, আরো বিয়োগান্ত একটা ছবি কিন্তু মুক্তি পেয়েছে ঠিক তার আগের বছরই — সত্যজিৎ রায়ের দেবী। সেখানে উমাপ্রসাদ আর দয়াময়ী আর কখনো এক হতে পারেনি। দয়াময়ীকে শেষ দৃশ্যে আমরা হারিয়ে যেতে দেখি কুয়াশায়, উমাপ্রসাদ আর তাকে খুঁজে পায় না। তার মৃত্যু হল কিনা সত্যজিৎ দেখান না কিন্তু সে উন্মাদ হয়ে যায়। রিনা তবু কৃষ্ণেন্দুর কোল পায়, যীশুর শরণাগতি পায়। দয়াময়ী সেসব কিছুই পায় না। কৃষ্ণেন্দুর বাবার মত উমাপ্রসাদের বাবারও (কি আশ্চর্য! সেই ছবি বিশ্বাস!) গোঁড়ামি ভাঙে, তবে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয় তাঁকে।
সত্যজিতের মৃত্যুর পর এক বক্তৃতায় উৎপল দত্ত বলেছিলেন দেবী ছবিটা গ্রামেগঞ্জে সরকারী খরচে দেখানো উচিৎ। তবে সঠিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হবে। শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কথা বাদ দিন। অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আজও দেবী আমাদের হাতিয়ার। আর অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে প্রেমের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে যারা, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সপ্তপদীও আমাদের অস্ত্র হতে পারে। হাদিয়ার জন্য লড়াইয়ে অস্ত্র, আর কেউ যেন অঙ্কিত না হয়, আর কোন তথাকথিত অনার কিলিং না হয় তার জন্য লড়াইয়েও অস্ত্র।
শোকের ঊর্ধ্বে উঠে বা শোকের মধ্যে দিয়েও যে সত্যদর্শন হয় তা যদি উমাপ্রসাদের বাবা কালীকিঙ্করকে দেখে বিশ্বাস না হয় তাহলে অঙ্কিতের বাবা যশপাল সাক্সেনাকে দেখুন, যিনি বললেন “যা হয়েছে তাতে আমি অত্যন্ত শোকগ্রস্ত। কিন্তু মুসলমানদের সাথে শত্রুতার পরিবেশ তৈরি করতে চাই না। আমার কোন ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ নেই।”

Advertisements

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply