অহৈতুকী পার্টিজানপ্রীতি

লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না

মৃণাল সেন প্রতিভাবান, মৃণাল সেন এ দেশে নতুন ধারার চলচ্চিত্রের দিকপালদের একজন, মৃণাল সেনের লেখার হাত চমৎকার — এসব গুণ সত্ত্বেও তাঁর একটা বড় দোষ তিনি রাজনৈতিক। ছবিতে বা ছবির বাইরে তিনি কখনো পাঁচিলের উপর বসে সিগারেট হাতে পা দোলাননি। নিরপেক্ষ হতে তাঁর বয়ে গেছে।
শুধু রাজনৈতিক নয়, তিনি প্রায়শই পার্টিজান। তাঁর ছবির রঞ্জিত মল্লিক যে চাকরি স্যুটেড বুটেড হওয়াটাকেই যোগ্য হওয়ার প্রাথমিক শর্ত বলে মনে করে সেই চাকরি না পেয়ে স্যুট বুটের দোকানে আধলা ইঁট ছুঁড়ে মারে। তাঁর ছবিতে ফিল্ম ইউনিট নিজেদের শৌখিন মানবপ্রেমের অসারতা উপলব্ধি করে শুটিং বন্ধ করে ফিরে যায়। অতএব গত পরশু অব্দিও মৃণাল সেন আজকের ভদ্রলোকদের পাঞ্চিং ব্যাগও ছিলেন। প্রমাণ চাই? দিচ্ছি।
হয়ত আমার নিজের মুদ্রাদোষেই অদ্ভুত সব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই রবিবাসরীয় কাগজে দেখলাম এক স্বনামধন্য প্রাক্তন আমলা নতুন বাঙালিদের নিয়ে লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন আজকের বাঙালি যে বাংলার সংস্কৃতি ভুলে গেছে, হিন্দি, ইংরিজি, বাংলা মিশিয়ে আজব ভাষায় কথা বলছে তার দায় যে নির্দিষ্ট কোন সরকারের ঘাড়ে চাপানো উচিৎ তা নয় তবে এর জন্যে আসলে দায়ী ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। তার ফলেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে পুঁজির পলায়ন, আর তারই দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নাকি বাঙালির ক্রমশ অবাঙালি হয়ে ওঠা। অবশ্য এমন নয় যে এই অভিযোগ ইনিই প্রথম করলেন। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর আউটলুক পত্রিকায় তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও একই কথা লিখেছিলেন। কিন্তু যে কারণে সেই আমলার লেখাটার কথা এখানে উল্লেখ করছি সেটা হল তিনি এক জায়গায় লিখেছেন
“এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আগের প্রজন্মের মতো কেবল পাড়ার মোড়ে বা রকে বসে আড্ডা না দিয়ে, কিংবা সরকারি চাকরি হল না — এই ক্ষোভে নিজেদের নষ্ট না করে রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করে। স্থানীয় কাউন্সিলরের আশীর্বাদে ধন্য হলে তারা ছোট ছোট হকার স্টল খোলে কিংবা জ়োম্যাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজ়ন-এর মতো সংস্থার হয়ে মোটরবাইক চড়ে ডেলিভারি বয়ের কাজ করে। তারা কল সেন্টার বা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে, আন্দোলনের চাহিদা ছাড়াই। তারা ঘাম ঝরায়, কিন্তু ১২ জুলাই কমিটির নাম শোনেনি কোনও দিন। এরা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ দুনিয়ায় ওতপ্রোত জড়িত, মোবাইল রিচার্জ বা ওটিপি ব্যবহারে চোস্ত, কিন্তু এরা কেউ কোনও দিন সাহিত্যপত্রিকা বা জীবনানন্দের কবিতা পড়েনি।
এরা দিনরাত্রি কাজ করে, মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারাদের মতো মোটেই নয়।”
লেখাটা পড়া শেষ করে কাগজটা ভাঁজ করে রেখেছি সবে, এমন সময় হোয়াটস্যাপে এক সিনেমা অন্তপ্রাণ বন্ধু জানাল মৃণাল সেন প্রয়াত। লেখকের বক্তব্য সঙ্গত না অসঙ্গত তা বিচার করতে বসছি না এখন। শুধু বক্তব্য এই যে লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না, সম্ভবত আরেক ঘোষিত মার্কসবাদী ঋত্বিককুমার ঘটকের ক্ষেত্রেও নয়।
মৃণাল সেনের একাধিক ছবিতে অভিনয় করে নজর কেড়েছিলেন এক অভিনেতা। প্রায় প্রতি সাক্ষাৎকারেই বলেন “মৃণালদার থেকে কত যে শিখেছি” ইত্যাদি। অধুনা নিজে ফিল্ম বানান। আমার মত অবসর যাপনের জন্যে ফিল্ম দেখা অশিক্ষিত লোকের সেসব ফিল্ম মুখে না রুচলেও ভদ্রসমাজে তাঁর ছবি যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনিও কয়েকবছর আগে নবীন পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তের ছবির সমালোচনায় এক জায়গায় লিখেছিলেন “আশির দশকের মৃণাল সেনের ছবির মত।“ কেন? না ছবিতে টানাটানির সংসার চালানো এক শ্রমিক দম্পতিকে দেখানো হয়েছিল যাদের জীবিকা অর্জনের লড়াই এত কঠোর যে ঠিক করে কথাও হয় না সারাদিন, দেখা হয় পলক পড়ার মত। আর ক্ষণিকের জন্যে ক্যামেরায় ধরা হয়েছিল একটি লাউডস্পিকারকে, যা দিয়ে বেরিয়ে আসছিল ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের আন্দোলনের সংবাদ বিসংবাদ। বারবার এসে পড়ছিল অর্থনৈতিক মন্দার নানা লক্ষণও।
অর্থাৎ মৃত্যুর পরে লোকের নিন্দা করতে নেই — এই সূত্র মেনে যত বিখ্যাত, অবিখ্যাত লোকের শ্রদ্ধাঞ্জলি আমরা এখন দেখছি, পড়ছি তার অনেকগুলোর আড়ালেই আছে এই অনুভব, এই মতামত যে মৃণাল সেনের ছবি আসলে বাতিল সময়ের বাতিল দলিল। বাতিল মতাদর্শের বাতিল বুলি ছাড়া ও থেকে আর কিচ্ছু পাওয়ার নেই। কিছু কিছু লোকের কাজ নিজ গুণে এমন উচ্চতায় পৌঁছে যায় যে সে কাজকে ভাল না বললে আবার রুচিশীল তকমা পাওয়া যায় না, উচ্চকোটির সদস্য হিসাবে পরিচয়টা নড়বড়ে হয়ে যায়। অগত্যা মৃণাল সেন সম্পর্কে গদগদ না হয়ে আজ অনেকেরই উপায় নেই। কিন্তু বাংলার ফিল্ম জগতের একজনেরও কাজ দেখলে কি মনে হয় যে কেউ “মৃণালদার” থেকে কিছু শিখেছেন?
সত্যি কথাটা স্বীকার করে ফেলা যাক। যাঁরা ছবি বানান আর আমরা যারা দেখি, কেউই বিশ্বাস করি না যে মৃণাল সেনের ছবিতে আর দেখার কিছু আছে। কেন করি না? কারণ স্রোতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা, প্রতিবাদ করা — এসবের অভ্যেস আমরা ‘মহাপৃথিবী’ ছবির ভিক্টর ব্যানার্জির মায়ের ডায়রির পাতার মতই পুড়িয়ে দিয়েছি। ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা বাধ্য হতে শিখেছি। বাধ্য হলেই যাবতীয় আরাম, যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্য, যাবতীয় ভোগ্যপণ্য আমাদের হাতের মুঠোয় তা আমরা বুঝে গেছি। পোষ্যকে দুভাবে বাধ্য করা যায়। এক, কলার পরিয়ে। দুই, লোভ দেখিয়ে। বস্তুত লোভ দেখিয়ে বাধ্য করে নিয়ে কলার পরানোই সবচেয়ে উত্তম উপায়। আমরা বাঙালি ভদ্দরলোকেরা সেভাবেই বাধ্য হয়েছি। আমরাই তো বাংলা ছবির দর্শক, আমাদেরই কেউ কেউ বাংলা ছবির নির্মাতা।
আমরা এতটাই বাধ্য যে শুধু যে নিজেরা প্রতিবাদ করি না তা নয়, অন্যকে প্রতিবাদ করতে দেখলেও যারপরনাই রুষ্ট হই। তাই কলকাতায় মিটিং, মিছিল হলে বাসে আলোচনা করি গাঁয়ের লোকেদের কাজকম্ম নেই তাই এই সুযোগে কলকাতায় বেড়াতে চলে আসে, ফ্রিতে বিরিয়ানি খেয়ে যায়। মাননীয় আমলা যাদের কথা লিখেছেন আর কি। “মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারা।”
এই যে সাদা কলারের আমরা, আমাদের কী করেই বা মৃণাল সেনের ছবি ভাল লাগবে? কলকাতায় মিছিল বেরোয়, ট্যাক্সিচালকরা ইউনিয়ন করে তা নিয়ে বাংলার বাইরের লোকেদের কাছে আমাদের যে লজ্জার শেষ নেই। অথচ কী আশ্চর্য দেখুন। বছরখানেক আগে দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইতে কৃষকদের বিশাল মিছিল হল। সেখানকার ভদ্রলোকেরা অনেকেই সেই মিছিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কদিন আগে সারা দেশের কৃষকরা দিল্লীতে মিছিল করলেন। সেখানেও আমাদের মত ভদ্রলোকেরা খাবার নিয়ে, জল নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। এখানকার মত খবরও হল না কোন রাস্তায় কার গাড়ি আটকে পড়ে কার ফ্লাইট মিস হয়েছে। বাংলায় যখন কোন মিছিল, মিটিং হয় তখন আপনি তন্নতন্ন করে সংবাদের হাজারটা উৎস খুঁজেও একটা প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাবেন না। সেটা হল “কেন?” মানে মিছিলটা হল কেন? কোন দাবীতে? খবরটা আমাদের কেউ দেয় না কারণ আমরা জানতে চাই না। কোন রাস্তা দিয়ে গেলে মিছিলটা এড়াতে পারব সেটুকু জানতে পারলেই আমরা খুশি। অতএব কী দরকার বাপু সিনেমার মধ্যে ওসব জিনিসের? রাজ্যটা অনেক দেরীতে উন্নয়নের রাস্তা ধরেছে, ওসব দেখলে বা দেখালে লোকে আবার যদি বিগড়ে যায়?
এভাবেই সত্যি সত্যি ভাল থাকা গেলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাদা কলারের লোকেরা লক্ষ্মী হয়ে থেকেও মৃণাল সেনের সর্বহারাদের মত দুর্গতিগুলো এড়াতে পারছে না। কারখানার অস্থায়ী কর্মীদের মতই বহুজাতিকের এক্সিকিউটিভের হুটপাট চাকরি চলে যাচ্ছে, কর্মী হিসাবে যেসব অধিকার জন্মগত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সে অধিকারগুলো কোম্পানি বলে কয়েই কেড়ে নিচ্ছে অথচ মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলা যাচ্ছে না। ছ ঘন্টার বদলে আট ঘন্টা, আট ঘন্টার বদলে দশ ঘন্টা কাজ করেই চলেছেন। বাড়িতে এসেও ল্যাপটপ খুলে মালিকের লাভের কড়ি বাড়িয়েই চলেছেন। বেসরকারী ক্ষেত্রের বসেদের কথা বাদ দিন, সরকারপোষিত স্কুল কলেজের সামান্য টিচার ইন চার্জরাও সাক্ষাৎ হিটলার হয়ে উঠেছেন। সেই যে সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা, যারা ১২ই জুলাই কমিটির নাম শোনেনি, আন্দোলনের নাম না করেই সোনা মুখ করে কাজ করে, তারা এত ভাল আছে যে বারো-পনেরো হাজার টাকার জন্যে বাইক নিয়ে দিন নেই রাত নেই ঝড় নেই জল নেই সুইগি, জোমাটোর হয়ে ডেলিভারি করছে। পিঠে খাবারের বোঝা তবু এ খাবার যাবে না ছোঁয়া। ছুঁয়ে ফেললেই ভিডিও ভাইরাল হবে, সামান্য মাইনের, বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা ও অধিকারবিহীন চাকরিটিও যাবে।
একজন লিখেছিলেন “খাওয়া না খাওয়ার খেলা যদি চলে সারা বেলা হঠাৎ কী ঘটে যায় কিচ্ছু বলা যায় না।” একেবারে যে কিছু ঘটছে না তাও নয়। কয়েক বছর আগেই উবের, ওলার আগমনে যারা সচ্ছলতার মুখ দেখেছিল ঐ দালালদ্বয় এখন তাদের টাকা পয়সা কমিয়ে শুধু নিজেদের পকেট ভর্তি করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বাইপাসের উপর গাড়ি পেটাচ্ছে। আমি, আপনি তখনো জানতে চাইছি না দাবীগুলো কী কী?
আর কটা দিন সবুর করুন। এ আই আসিছে চড়ে জুড়ি গাড়ি। তখন আমার আপনার অবস্থাও অ্যামাজনের ডেলিভারি বয় বা উবেরের ড্রাইভারের মত হতে পারে। সেদিন মৃণাল সেনের কোরাস হয়ত খুব অলীক মনে হবে না। যে নায়ক আধলা ইঁট ছোঁড়ে তাকে যে স্রেফ নকশালই মনে হবে তাও ঠিক করে বলা যায় না। আজকের অর্থহীন তর্পণ বাদ দিন। মৃণাল সেনকে আসলে সেদিন আপনার দরকার হবে।
আজ যতই ফেসবুকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বান ডাকুক না কেন, তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে না দেখেই মৃণাল সেনের ছবিকে আঁতেল আখ্যা দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল এবং আছে। কারণ ছবিগুলো পপকর্ন খেতে খেতে দেখা যায় না। অপমানে যেদিন সবার সমান হতে হবে, সেদিন বোঝা যাবে আসলে কোন ছবিগুলো আঁতেল, অর্থাৎ আমার আপনার কথা কোনদিন বলেনি, আমাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে চলা, আমাদের টেনে নিয়ে চলা জীবনের কথা বলেনি, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর গোয়েন্দা গল্পের গাড্ডায় ফেলে রেখেছিল।
মৃণাল সেন মার্কসবাদী ছিলেন আমৃত্যু। পরিবর্তনের হাওয়া গায়ে লেগে যখন এই বাংলায় অনেক আগমার্কা বামপন্থী কবি, অভিনেতা, গাইয়ে রাতারাতি আবিষ্কার করলেন তাঁরা এত বছর ভুল পথে ছিলেন, তখনো মৃণাল সেন অবস্থান বদলাননি। তা মার্কসবাদ ব্যাপারটাকেই যখন বাতিল করে দিয়েছিল সকলে তখন একজন মার্কসবাদীর চলচ্চিত্র ভাবনাকে বাতিল করে দেওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়। কিন্তু যাঁরা খবর রাখেন তাঁরা জানেন হাওয়া বদলাচ্ছে। এতটাই বদলেছে যে ‘দি ইকনমিস্ট’ এর মত চরম দক্ষিণপন্থী পত্রিকা মার্কসের দ্বিশতবার্ষিকীতে লিখেছে পুঁজিবাদকে বর্তমান সঙ্কট থেকে বাঁচাতে হলেও মার্কস পড়তে হবে। অতএব কেউ যদি সচেতন হন, তাহলে এই নাম কা ওয়াস্তে তর্পণ শেষ হওয়ার পরেই মৃণাল সেনকে শিকেয় তুলে রাখার ভুল তিনি করবেন না। তবু এরকম বলার মানে হয় না যে বাংলা ছবির নির্মাতারা তাঁর মত সোচ্চার বামপন্থী ভাবধারার ছবি না বানালেই সেগুলো ফালতু। বলার কথাটা হল ছবিতে আটপৌরে জীবন, তার লড়াই, তার সঙ্কট না থাকাই ফাঁকিবাজি। সেই ফাঁকিবাজি করে, তাকে প্রশ্রয় দিয়ে মৃণাল সেনের প্রয়াণে গদগদ হওয়ার মানে হয় না।
সেই ফাঁকিবাজি না করার জন্যে মার্কসবাদী বা বামপন্থী ছবি বানাতে হয় না। অনেকেই তো বলেন পশ্চিমবাংলায় বাম শাসন ছিল অপশাসন। সেই অপশাসনের স্বরূপ নিয়ে কটা বাংলা ছবি হয়েছে? অথচ সারা পৃথিবীতেই তো অপশাসনের মধ্যে থেকেই দারুণ দারুণ ছবি হয়। ইরানের পরিচালকরা যেমন করেন। বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের রক্তাক্ত, অস্থির সময়গুলো নিয়েই তো অসামান্য সব ছবি হয়। সেগুলো সবই যে বামপন্থী ছবি তা তো নয়। আবার একটা কাকতালীয় ঘটনার কথা বলি।
মৃণাল সেন মারা যাওয়ার আগের রাতে নেটফ্লিক্সে আলফোনসো কুয়ারনের ‘রোমা’ দেখছিলাম। মেক্সিকোর ছাত্র আন্দোলন, গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় বানানো সাদাকালো, আবহসঙ্গীতবিহীন ছবিটা দেখতে দেখতে আমার মত ভেতো বাঙালি, ওয়ার্ল্ড সিনেমার সাথে ক্ষীণ সম্পর্কযুক্ত দর্শকের বারবারই ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনের ছবিগুলোর কথা মনে পড়ছিল। এই ২০১৮তে তৈরি ছবিতে ১৯৭০-৭১ এর গল্প বলা হচ্ছে। এমনকি ১০ই জুন ১৯৭১ এ সংঘটিত কুখ্যাত কর্পাস ক্রিস্টি গণহত্যাও দেখানো হচ্ছে। মৃণাল সেন তো রাজনৈতিক হত্যাগুলোকে পর্দায় এনেছিলেন কেবল কাগজের শিরোনামগুলোর মাধ্যমে। এই বাংলার কেউ ‘রোমা’ বানালে বোদ্ধারা নির্ঘাত বলতেন “এ ছবি দিয়ে কী হবে? এ তো মৃণাল সেনের মত।“
‘রোমা’ ছবির যে সময়কাল তা এই বাংলাতেও অস্থিরতা, ছাত্র আন্দোলন, গণহত্যার সময়। ঠিক ১৯৭১ সালেই ঘটেছিল কাশীপুর গণহত্যা। এখন তো রাজ্যে কংগ্রেস সরকার নেই, সিদ্ধার্থশঙ্কর মৃত, সেই কান্ডের খলনায়করা সকলেই প্রায় ক্ষমতাহীন, নির্বিষ। কই হোক তো দেখি একটা ভাল ছবি সেই নিয়ে। বামফ্রন্ট আমলেও তো দুর্নীতি, রাজনৈতিক হিংসার অনেক ঘটনা। নাহয় তাই নিয়েই হোক। এ আমলে ওসব নিয়ে ছবি করলে তো পুলিশে ধরবে না, উলটে একটা ভূষণ টুষণ জুটে যেতে পারে।
হবে না। কারণ “মৃণালদার” থেকে যদি স্রেফ একটা জিনিস শেখার থাকে, সেটা হল বুকের পাটা। ওটা আবার কারো শেখা হয়নি। আর মেধা? থাক সে কথা। বরং স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গলা ধরে আসা চলুক। পার্টিজানদের ব্যাপারে অস্বস্তি কাটানোর সেরা উপায় তাদের কাল্ট ফিগার বানিয়ে দেওয়া। চিরকালই।

ভুল জায়গায় সিরিয়াস

দুনিয়াশুদ্ধ লোক জেনে গেছে বাঙালির বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই

এ লেখার শিরোনামের জন্য আমি এক অগ্রজ সাংবাদিকের কাছে ঋণী। তাঁর সঙ্গে যে সময় কাজ করতাম তখন নানা কথায় তিনি বলতেন “বাঙালি ভুল জায়গায় সিরিয়াস, তার ভুল জায়গায় আবেগ।” সত্যি বলতে তখন কথাটা শুনে বেশ রাগই হত। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে যা চলছে তাতে তাঁকে সামনে পেলে করজোড়ে নিবেদন করতাম “গুরু, তুমিই ঠিক। তুমিই সত্য।” কথাটা হোয়াটস্যাপেও লেখা যায়, কিন্তু তাতে আবেগটা (ভুল জায়গায় হলেও) ঠিক ফুটিয়ে তোলা যায় না।
বিষয়টা হল এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির টিভি বিজ্ঞাপন। জনগণ দেখছি যারপরনাই রুষ্ট। ডান, বাম, যখন-যেমন-তখন-তেমন নির্বিশেষে সকলেই গেল গেল রব তুলেছেন। বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতির জন্যে কেঁদে কেটে একসা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান তথা কবিতার প্যারডি বানিয়ে ফ্ল্যাট বেচছে প্রোমোটার। তাতে বাঙালি সংস্কৃতি প্রায় ক্যাওড়াতলা পৌঁছে গেছে বলে অভিযোগ। যতদিন লোকে ফেসবুকে বিষোদগার করছিল তদ্দিন ব্যাপারটা নিয়ে আদৌ ভাবনা চিন্তা করিনি। কিন্তু তারপর জানলাম শ্রীরামপুরে (যেখানে প্রাসাদোপম ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর মাথা তুলে দাঁড়ানোর কথা) নাকি এ নিয়ে কারা সব মিটিং মিছিলও করে ফেলেছে। ভুল জায়গায় সিরিয়াস হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
কার সংস্কৃতি কে রাখে? ভদ্দরলোকেরা আজকাল পারতপক্ষে ছেলেমেয়েকে বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেন না, কেউ করলে দিন রাত কানের কাছে বলতে থাকেন “এসব স্কুলের মিডিওকাররাও কিন্তু ওদের স্কুলের ফার্স্ট বয়দের থেকে ভাল।” যেন ইংরিজি মাধ্যম স্কুল থেকে ফি বছর শয়ে শয়ে শেক্সপিয়ার আর ডিকেন্স বেরোচ্ছে, বাংলা মাধ্যম থেকে কেবল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি লিট।
ইংরিজির জন্যে আকুতি না হয় তাও মানা গেল, ইদানীং আবার বাংলা সরিয়ে হিন্দিকে দ্বিতীয় ভাষা করবার হিড়িক পড়েছে বাঙালি বাবা মায়েদের মধ্যে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মাঝে একবার, কে জানে কোন লগ্নে, বললেন বাংলার সব শিশুকে বাংলা পড়াতেই হবে। তাতে প্রগতিশীল বাঙালিরা একেবারে রে রে করে উঠলেন। তখন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য — এসব মনে ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী লগ্ন দোষ কেটে যেতেই আবার ওসব ভুলে গিয়ে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে নেমে পড়েছেন। সেসবের বিরুদ্ধে কে কে কোথায় কোথায় মিছিল করেছেন জানতে ইচ্ছে করে। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো উঠে যাচ্ছে। কদিন আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটাই উঠে যেতে বসেছিল, কিছু ক্ষুদিরামপ্রতিম মানুষ আপাতত আটকেছেন। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী কদিন আগে বলেছেন সরকার ভাবছে স্কুলগুলোকে ইংরিজি মাধ্যম করে দেবে কিনা। এসবের কটা প্রতিবাদ হয়েছে? বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর মানোন্নয়নের দাবীতে সরকারের পেছনে কজন লেগেছে? ওসবে কারোর আগ্রহ নেই। কোথায় কোন বিজ্ঞাপনে দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারডি করা হয়েছে তাই নিয়ে আন্দোলন।
এসব নাটক যতই করুন, দুনিয়াশুদ্ধ লোক জেনে গেছে বাঙালির বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। নাহলে বহুজাতিক টেলিকম কোম্পানির সাহস হয় না কলকাতার দৈনিকগুলোর প্রথম পাতায় ছাপার বিজ্ঞাপনের বয়ানটা স্রেফ গুগল ট্রান্সলেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়ার। নিশ্চিত থাকতে পারেন ওরকম তামিলে চেন্নাইয়ের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোলে বা অমন মালয়ালমে তিরুবনন্তপুরমের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোলে কোম্পানিটির সর্বভারতীয় সি ই ও টিকে করজোড়ে ক্ষমা চাইতে হত।
আর জানবে না-ই বা কেন? পনেরো থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী বাঙালিদের কথা শুনেছেন?
“আরে ইয়ার, তোদের একটা কথা কতবার বলতে হবে?”
“বস, কাজটাতে এত এফর্ট দিলাম, অব এক পার্টি তো বনতা হ্যায়।”
“যা-ই বল, মেয়েটা কিন্তু একটু হটকে।”
“উফ! কাকিমা আলুর দমটা যা হয়েছে না। অসাম।”
কারোর দিকে আঙুল তুলে লাভ নেই। এই ভাষায় কথা বলছে আমার আপনার ভাই, বোন, ছেলেমেয়েরা। বিদ্রোহ, বিপ্লব যা করতে ইচ্ছে করে নিজের ঘর থেকে শুরু করুন না। আর যদি আমার মত অক্ষম হন, তাহলে স্রেফ “চেপে যান”, লোক হাসাবেন না।
আমার মত মফঃস্বলের গাঁইয়ার কথা ছেড়ে দিন, শহুরে বাঙালিদের মুখে, ফি হপ্তায় মলে যাওয়া বাঙালিদের কাছে গত এক দশক ধরে শুনছি বাংলা সিনেমায় নাকি নবজাগরণ এসেছে। তা নবজাগরণের যুগে বাংলা ছবির নাম কী হচ্ছে? ম্যাডলি বাঙালি; মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর; আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস, ঘরে অ্যান্ড বাইরে, অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোজো। যেসব ছবির নাম তবু আগাগোড়া বাংলা সেগুলোরও টাইটেল কার্ডে বাংলা হরফ খুঁজে পাওয়া ভার। এমনকি আমাদের এ যুগের মহানায়ক, যিনি নাকি সংসদে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, তাঁর ছবির পোস্টারেও বাংলা হরফ খুঁজে হতাশ হয়েছি। সে ছবিটার রেডিও বিজ্ঞাপনে শুনলাম তিনি বললেন “Let’s celebrate পয়লা বৈশাখ, let’s celebrate Kabir.” উত্তমকুমার মরে বেঁচেছেন। আমার শুধু ভয় করে এই রিমেকের যুগে আবার সপ্তপদী রিমেক না হয়। শেক্সপিয়ারের সংলাপ বলা তাঁর দ্বারা হবে না, উৎপল দত্তকে লাগবে — এটা বোঝার বিনয় বা কান্ডজ্ঞান তো এখনকার মহানায়ক বা নির্দেশকদের মধ্যে দেখা যায় না। উত্তম, অজয় করের মত ভেতো বাঙালি তো এঁরা নন, সারাসসোয়াতির সাক্ষাৎ বরপুত্র সক্কলে।
তা ভদ্রমণ্ডলী এসবের প্রতিবাদ কবে করবেন? এতে ঐতিহ্যে আঘাত লাগছে না? নাকি আপত্তিটা দ্বিজেন্দ্রলালে হাত দেওয়া হয়েছে বলে? তা যদি হয় তাহলে ব্যাপারটা আরো হাস্যকর। দ্বিজেন্দ্রলাল স্বয়ং প্যারডি লিখতেন। রবীন্দ্রনাথের গান “সে আসে ধীরে, যায় লাজে ফিরে / রিনিকি ঝিনিকি রিনিঝিনি মঞ্জু মঞ্জীরে।” দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারডি “সে আসে ধেয়ে, এন ডি ঘোষের মেয়ে / ধিনিক ধিনিক ধিনিক, চায়ের গন্ধ পেয়ে।” আপনি বলতেই পারেন কাজটা ভাল হয়নি, আমাদের কবিগুরুকে নিয়ে মশকরা অতি গর্হিত ব্যাপার ইত্যাদি। কিন্তু যিনি নিজেই প্যারডিশিল্পী, তাঁর লেখার প্যারডি হলে আন্দোলনে নামা চলে না। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের কোন গানের বাণীর দিকে আদৌ কান না দিয়ে ঝাঁ ঝাঁ করে পাঁচশো বাজনা বাজিয়ে বা মাঝখান থেকে গাইতে শুরু করার চেয়ে একখানা ভাল প্যারডি করা অনেক বেশি উদ্ভাবনী শক্তির পরিচায়ক। আচ্ছা সত্যি বলুন তো, এত যে দ্বিজেন্দ্রপ্রেম দেখা যাচ্ছে, “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি” ছাড়া ওঁর লেখা আর কটা গান কজনের মনে আছে? গোটা পাঁচেকের বেশি কি? তাহলে যে গীতিকারকে পরশু অব্দি ভুলে ছিলেন তাঁকে নিয়ে সংস্কৃতির ঢাক তেরে কেটে তাক তাক করে না বাজালেই নয়?
কারো কারো অবশ্য আপত্তি অন্যত্র। “এরকম একটা গানকে সামান্য ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করল? এর সাথে জাতীয় আবেগ জড়িয়ে…।” আবার ভুল জায়গায় আবেগ। বিজ্ঞাপনের ইতিহাস না ঘেঁটেও বোঝা যায় চিরকাল বহু জনপ্রিয়, আবেগজড়িত আসল গান, আসল সুরকে ব্যবহার করে বহু বিজ্ঞাপন তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তেই যেমন একটা ধূপের বিজ্ঞাপনে ভীষণ বেসুরো গলায় “আমার এ ধূপ না পোড়ালে / গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে” গাওয়া হচ্ছে। বাজি রেখে বলতে পারি এই লেখায় যে মুহূর্তে টাইটান শব্দটা আপনি পড়বেন, অমনি মাথায় একটা সুর বেজে উঠবে। সেটা কী আসলে? মোজার্টের ২৫ নম্বর সিম্ফনির একটা অংশ। ওটা টাইটানের বিজ্ঞাপনে ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি। ওটা বাদ দিয়ে আজ আর টাইটান ঘড়ির কথা ভাবাই যায় না। তাতে কী এসে গেল মোজার্টের? কী-ই বা এসে যায় রবীন্দ্রনাথের? নাকি বক্তব্যটা এই যে আসল গান গাও আপত্তি নেই, প্যারডি গেয়ে জিনিস বেচা চলবে না? এ যুক্তি তো খন্ডনেরও অযোগ্য।
সত্যি সত্যি আন্দোলন করবেন? ইস্যু কম পড়িয়াছে? কেন? কোথাও কোন চাকরিতে কর্মীদের অধিকার বলে কিছু থাকছে না। তাই নিয়ে পথে নামুন না। এ তো আপনারই ইস্যু, চাষাভুষোদের ইস্যু নয়, যারা মিছিলে নামলে আমরা সাদা কলারের চাকুরেরা বলি “কোন কাজ নেই, কলকাতায় ঘুরতে আসে আর ফ্রিতে বিরিয়ানি খেয়ে যায়।”
গত তিরিশ বছরে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ঠ্যালায় কলকাতার জলাভূমি প্রায় নিশ্চিহ্ন, মফঃস্বলে পুকুর চুরি আর বাগধারা হয়ে নেই। তার ফলে ক্রমবর্ধমান জঞ্জালের স্তূপ, সাবমার্সিবল পাম্পের বাড়বাড়ন্তে ভূগর্ভের জলস্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। অথচ এগুলো কোন রাজনৈতিক দল ইস্যু বলে মনে করে না। এসব নিয়ে আন্দোলন করুন না। স্তূপীকৃত জঞ্জাল কোন সংস্কৃতির পরিচায়ক?
রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সুবিধার্থে আইন কানুন বদলে ফেলে হেরিটেজ বিল্ডিং ভেঙে ফেলার সুবব্যবস্থা হয়েছে। তাতে ঐতিহ্য সঙ্কটে পড়েনি? তার প্রতিবাদ করবেন না?
উন্নয়নের নামে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে গেল। আপনারা সৌন্দর্যায়ন হচ্ছে বলে আহ্লাদে আটখানা হলেন। গাছের চেয়ে কংক্রিট ভাল — এই সৌন্দর্যবোধ কোন সংস্কৃতির অভিজ্ঞান? এখন বায়ু দূষণে দিল্লীর সাথে পাল্লা দিচ্ছে কলকাতা। তা নিয়ে আন্দোলন করবেন না? বাঙালির তো প্রাণ রক্ষার সঙ্কট সেটা। প্রাণ বাঁচলে তবে তো সংস্কৃতি বাঁচবে। ঐতিহ্য কার? মানুষেরই তো?
নাঃ! বাদ দিন। এত কে ভাবতে যাবে? আর এসব নিয়ে মিছিল করতে গেলে আবার চড়াম চড়াম ঢাক বাজার সম্ভাবনা আছে। তার চেয়ে “শ্রীকান্তর গান এত ভালবাসতাম, আর ও কিনা এই বিজ্ঞাপনে গাইল!” বলে হা হুতাশ করতে করতে সিরিয়াস আলোচনা করা যাক।

আমার সন্ততি

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

— শঙ্খ ঘোষ (বাবরের প্রার্থনা)

যেদিন বাবা হয়েছি সেদিন থেকে ভেবে চলেছি, মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সন্তানকে যা যা দিয়ে যেতে পারে তার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে মূল্যবান?
অনেকে টাকাপয়সা, ধনসম্পদ দিয়ে যান। টাকার দাম মুদ্রাস্ফীতির কারণে দিন দিন কমে, সম্পত্তির মূল্যও নানা কারণে বাড়ে কমে। কথায় বলে কুবেরের ধনও ফুরিয়ে যায়। ফলে সন্তানকে যত ধনসম্পত্তিই দিয়ে যান না কেন, তার মূল্য অবিকৃত থাকবে না।
সফল, কৃতি মানুষেরা তাঁদের সন্তানদের খ্যাতি দিয়ে যান। কিন্তু সেই খ্যাতি বজায় রাখতে হলে সন্তানকেও বিখ্যাত বাবা কি মায়ের মত প্রতিভাবান এবং সফল হতে হয়, যা প্রায়শই হয় না। উপরন্তু বাবা-মায়ের খ্যাতির অপব্যবহার করে সন্তান তাঁদের দুর্নামের কারণ হচ্ছে — এমন দৃষ্টান্তই চোখে পড়ে বেশি। উপেন্দ্রকিশোরের পরে সুকুমার, সুকুমারের পর সত্যজিৎ নেহাতই ব্যতিক্রম। সে জন্যেই মনে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্রের পরে নারায়ণচন্দ্রই বরং বেশি দেখা যায়।
আমরা সাধারণ মানুষ। এ যুগে সন্তানের ভোগ করার মত যথেষ্ট সম্পত্তি রেখে যাওয়ার সুযোগ আমাদের অনেকেরই হবে না। মৃত্যুর পরেও সন্তান “অমুকের ছেলে” বা “তমুকের মেয়ে” হিসাবে সমাজে অতিরিক্ত সম্মান, সুযোগসুবিধা বা খ্যাতি ভোগ করবে তেমন সম্ভাবনাও নেই। তবে কি এমন কিছুই নেই যা আমাদের মৃত্যুর পরেও সন্তানদের সম্পদ না হোক, অন্তত ছাতা হিসাবে কাজ করতে পারে? আমার সন্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্কের সীমা তবে আমার শরীর? সেই শরীর অবলুপ্ত হওয়ার পর আমার সাথে সম্পর্কের কোন মূল্যবান অর্জন তার কাছে থাকবে না? তাহলে কেন দেশ কাল নির্বিশেষে বাবা-মায়েরা নিজের জীবনের চেয়েও সন্তানের মঙ্গলকে ঊর্ধ্বে স্থান দেন? আমাদের অষ্টাদশ শতকের কবির কেন মনে হল ঈশ্বরীর দেখা পেলে বাংলার নিরক্ষর পাটনী প্রার্থনা করবে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”? প্রায় তিনশো বছর পরের কবির কেন মনে হল ভাগ্যান্বেষী উজবেক যোদ্ধা বাবর, যার সাথে সেই বাঙালি পাটনীর কোন দিক থেকে কোন মিল নেই, তিনিও নিজের ঈশ্বরের কাছে বলতেন, আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার সন্তানের জীবন দাও? কবির কল্পনা তো আকাশ থেকে পড়েনি, এমনই আকুতি বিভিন্ন ভাষায় কত বাবা-মাকে তো আজও উচ্চারণ করতে দেখি আমরা। সেই বাবা মায়েরা তাহলে জীবন ফুরোলেই ফুরিয়ে যাবেন সন্তানের কাছেও?
কেউ কেউ বলবেন বাবা-মা শিক্ষা দেন, জীবনে নিজের পায়ে দাঁড় করান। সেটাই তো সারাজীবন সঙ্গে থাকে। সেকথা ঠিক, কিন্তু সে অবদান বাবা-মায়ের অনন্য অবদান নয়। মানুষ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের থেকেও শিক্ষা পায়, সর্বোপরি শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে পায়। এবং যে শিক্ষা সে পায় তার বেশিরভাগটাই স্বোপার্জিত। বাবা-মা বড় জোর সুযোগ তৈরি করে দেন।
ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ। সুসময়ে, এবং দারুণ দুঃসময়ে, সেই বোধ তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।
সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রত্যেককে আমাদের বাবা-মায়েরাও জেনে বা না জেনে ঐ বোধই দিয়ে গেছেন, দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিহাসের কোন মুহূর্তে ঠিক কোন জায়গাটায় আমি দাঁড়িয়ে আছি এবং তার সাপেক্ষে বর্তমানে আর ভবিষ্যতে আমার কোথায় দাঁড়ানো উচিৎ সেই বোধ সচেতন বাবা-মায়েরা আমাদের দিয়ে যান জেনে বুঝে। আর যে বাবা-মায়েরা তত সচেতন নন আসলে তাঁরাও স্থান নির্দেশ করে দিয়ে যান তাঁদের কথাবার্তায়, জীবনচর্যায়।
কথাটা নতুন করে উপলব্ধি করলাম টিভিতে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে নিহত পুলিশকর্মী সুবোধ কুমার সিং এর ছেলে অভিষেকের কথা শুনতে শুনতে।
সুবোধ কুমার খুন হওয়ার পর যত সময় যাচ্ছে তত পরিষ্কার হচ্ছে যে খুন হওয়ার দিনের ঘটনাবলী সুপরিকল্পিত, হঠাৎ উত্তেজিত জনতা তাঁকে হত্যা করেনি। তিনি সাম্প্রতিক অতীতে গোহত্যার “অপরাধে” প্রথম যে খুনটা হয়েছিল দাদরিতে, সেই খুনের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। সেই খুনের অপরাধীদের হাজতবাস করার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। বদলি হয়ে বুলন্দশহরে এসে পড়ার পরেও আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে আপোষ না করে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের যথেষ্ট বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বলেছেন সুবোধ কুমারকে প্রায়শই খুনের হুমকি দেওয়া হত। খবরে প্রকাশ বিজেপি নেতারা বুলন্দশহর থেকে তাঁর বদলি দাবী করেছিলেন অতি সম্প্রতি। বিপদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন জেনেও সুবোধ কুমার ঘটনার দিন পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসাবে যা কর্তব্য ঠিক তাই করছিলেন। কোন সাহস তাঁকে প্রণোদিত করেছিল তা বলার জন্যে তিনি নেই, তা দেশ হিসাবে আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর সাফল্য এই অন্ধকারে আমাদের ক্ষীণ আলো দেখাচ্ছে।
সকালের কাগজে মুন্ডিতমস্তক যে ছেলেদুটির ছবি কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বসা আমাকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল, সেই বাবা হারা কিশোর যখন টিভির পর্দায় বলে “শুধু মুখ্যমন্ত্রীকে নয়, সারা ভারতের লোকের কাছে আমার আবেদন, হিন্দু মুসলমান নিয়ে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হিংসা দয়া করে বন্ধ করুন,” তখন বোঝা যায় সুবোধকুমার ছেলেটির সঙ্গেই আছেন।
আরো পরিষ্কার হয় যখন অভিষেক বলেন “আমার বাবা একটা কথাই বলতেন ‘আর কিছু হতে পার না পার, সুনাগরিক হও। সব ধর্ম, সব জাতির লোকই এক। তুমি কারো চেয়ে বড় নও, কারো চেয়ে ছোটও নও।”
বাবা খুন হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এই ভাষায় এই কথাগুলো বলতে পারা মুখস্থ বিদ্যায় সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যে বিদ্যার বলে মধ্যে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর বন্দনা করেন সে বিদ্যার কর্ম নয় এসব। অনুভূতিদেশ থেকে আলো না পেলে শুধু ক্রিয়া, বিশেষণের জোরে এসব কথা বেরোয় না। অভিষেক যখন আমাদের সবাইকে সাবধান করেন এই বলে যে আমরা আত্মহননের পথে এগোচ্ছি; পাকিস্তান, চীনের দরকার নেই, আমরাই একে অপরের অনেক বড় শত্রু হয়ে উঠছি; তখন বোঝা যায় অভিষেকের প্রয়াত বাবা, এবং অবশ্যই মা, এই যুগসন্ধিক্ষণে তার যে স্থান নির্দেশ করেছেন সে সেই স্থানের যোগ্য হয়ে উঠছে। এইখানে মৃত সুবোধ কুমারের জিত, হত্যাকারীদের হার। হত্যাকারীদের সরকার তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করুক আর না-ই করুক, সুবোধ কুমার সন্তানের মধ্যে বেঁচে রইলেন। আমাদেরও বাঁচার রাস্তার সন্ধান দিলেন।
এত কথা বলার পরে একটা প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। সন্তান কি সবসময় বাবা-মায়ের দেখানো অবস্থান মেনে নেয়? নেয় না। প্রকৃতপক্ষে সর্বদা মেনে নেওয়া উচিৎও নয়। কারণ অনেক বাবা-মা এমন অবস্থানও ঠিক করেন যা সমাজের পক্ষে, সন্তানের চারপাশের মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর, পশ্চাৎমুখী। সেইসব বাবা-মায়েদের অবাধ্য সন্তানেরাই যুগে যুগে সমাজকে বদলে দেন, এগিয়ে নিয়ে যান। সেই জন্যেই আমাদেরও বারবার ভাবতে হবে সন্তানকে ঠিক কোথায় দাঁড়াতে বলছি। কার পক্ষে, কার বিপক্ষে? তাকে যে অবস্থান নিতে শেখাচ্ছি তা শুধু তার জন্যে ভাল, না আর পাঁচজনের জন্যেও ভাল — সেকথাও ভাবতে হবে। এমনি এমনি তো আর ঠাকুমা, দিদিমারা বলতেন না “প্রসব করলেই হয় না মাতা।”

সৃষ্টির মনের কথা

“ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”

দুঃসময়। বড় দুঃসময়ে বেঁচে আছি। সকালের কাগজ ১৯৯২ এর স্মৃতি উশকে দিয়ে লিখছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ হুমকি দিয়েছে রাত পোহালেই দু লক্ষ লোক ঢুকে পড়বে অযোধ্যায়। এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৮৯ মনে করানো রথযাত্রার প্রস্তুতি। রাজ্য সরকার শীর্ষস্থানীয় আমলাকে পাঠিয়েছে বিজেপির সাথে যাত্রাপথ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে। আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।
ওদিকে আসামে ডিটেনশন ক্যাম্পে ভিড় বাড়ছে, বহু পরিবার ছিন্নভিন্ন, আত্মহত্যার পর আত্মহত্যা। সংসদে পাশ হওয়ার অপেক্ষায় নতুন নাগরিকত্ব আইন। যে আইন পাশ হলে অহিন্দু মানুষের ভারতের নাগরিক হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে” শুধু কবিতার পংক্তি হয়ে যাবে।
এসব ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি। আর বিরোধীদের রাজনীতিটা কিরকম?
দিন দুয়েক আগে কংগ্রেস নেতা সি পি যোশী বললেন একমাত্র একজন কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীই পারেন রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। মনে করিয়ে দিলেন যে রাজীব গান্ধীই বাবরি মসজিদের তালা খুলিয়ে পুজো আচ্চার ব্যবস্থা করিয়েছিলেন। যোশী আরো বলেছেন হিন্দু ধর্মটা একমাত্র ব্রাক্ষ্মণরাই বোঝে। নরেন্দ্র মোদী, উমা ভারতী এরা আর কী জানবে? নীচু জাতের লোকেদের হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলার কোন অধিকারই নেই। যোশীজিকে যিনি ধমকে দিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ, সেই রাহুল গান্ধী কেবল মন্দির থেকে মন্দিরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে তাই হিন্দুত্বের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসাডর বিজেপি প্রশ্ন তুলেছিল তিনি কি হিন্দু? উত্তরে কংগ্রেস মুখপাত্র বলেছিলেন রাহুল যে শুধু হিন্দু তাই নয়, তিনি রীতিমত পৈতেওয়ালা হিন্দু।
বাংলার অগ্নিকন্যা তথা কর্ণধার বিজেপিকে আটকাতে দীর্ঘদিন অব্দি সাধারণ মুসলমানকে ভুলে ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সমর্থনে ভর দিয়ে চলছিলেন। বছরখানেক হল সেসব চাপা দিতে আবার ব্রাক্ষ্মণ সম্মেলন, বজরংবলী পুজো, জনসভায় গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ, দুর্গা বিসর্জনের বিষণ্ণতাকে আমুদে কার্নিভালে পরিণত করায় মেতেছেন। তাতেও যথেষ্ট হচ্ছে না মনে করে শেষমেশ আয়করদাতাদের টাকা পুজো কমিটিগুলোকে বিলিয়েছেন। এন আর সি নিয়ে দিনকতক লোকলস্কর নিয়ে বিস্তর চেঁচামেচি করার পর এখন স্পিকটি নট। অবশ্য ওটা নিয়ে বেশি পরিশ্রম কেনই বা করতে যাবেন? তিনিই তো প্রথম সাংসদ যিনি সীমান্তবর্তী এলাকায় সিপিএম বাংলাদেশ থেকে লোক ঢোকাচ্ছে, এদের বার করে দেওয়া হোক — এই দাবী করে লোকসভার স্পিকারের দিকে কাগজ ছুঁড়েছিলেন।
আর বামপন্থীরা? সর্ববৃহৎ পার্টির নেতাদের একাংশ তো মনে করছেন বিজেপিকে হারাতে উপর্যুক্ত কংগ্রেসেরই হাত ধরা দরকার এক্ষুণি। নিজেদের লড়ার ক্ষমতার উপর এমন আস্থা আর কাদের আছে? এন আর সি, নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বামেদের যে কী মতামত কে জানে! শীর্ষ নেতৃত্ব একবার বলেছিলেন দেখতে হবে নিরপরাধ লোকের যেন হয়রানি না হয়। মানে মানুষের নাগরিকত্ব নির্ধারণে তার বংশপরিচয়কে মানদণ্ড ধরায় বোধহয় তাঁদের আপত্তি নেই। যাহা লিগ্যাসি তাহাই লিগাল।
অর্থাৎ দেশের সর্বত্র তাঁদের ভারতীয়তা, তাঁদের দেশপ্রেমের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে মানুষের কাছে। এই প্রমাণ দীর্ঘকাল ঠারেঠোরে চাওয়া হত এদেশের মুসলমানদের কাছে। এখন ঘাড় ধরে চাওয়া হচ্ছে। আসামের অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও সেই আওতায়। সংখ্যালঘুদের প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁরা অপ্রিয়, অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের খুন করলে শাস্তি হয় না চাকরি হয়, ধর্মস্থান ভেঙে দিলে অপরাধ হয় না মন্ত্রিত্ব হয়, গালাগালি দিলে বাহাদুরি হয়।
এমতাবস্থায় প্রায়শই “সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় — দ্বেষ।” মনটা এমন কোন সৃষ্টি খুঁজতে থাকে যার মনের কথা ভালবাসা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম অনুভব সিনহার ছবি ‘মুল্ক’ (দেশ)। হিন্দু, মুসলমানের ইতিহাসের সঙ্গমস্থল বেনারসের পুরনো বাসিন্দা বৃদ্ধ আইনজীবী মুরাদ আলি মহম্মদকে কাঠগড়ায় উঠতে হল এবং প্রমাণ করতে বলা হল তিনি তাঁর মুল্ক অর্থাৎ দেশকে ভালবাসেন। তিনি নিয়মিত আয়কর দেন, পুলিশের খাতায় কখনো তাঁর নাম ওঠেনি, এমনকি গাড়ি চালানোর সময়ও কখনো ট্র‍্যাফিক আইন ভাঙেননি। কিন্তু ওসব যথেষ্ট নয় একথা প্রমাণের জন্যে যে তিনি দেশপ্রেমিক। সন্ত্রাসবাদী নন।
ধর্মীয় মৌলবাদ আমাদের উঠোন পেরিয়ে চলে আসছে আমাদের সবার শোবার ঘর অব্দি। তফাৎ শুধু এই যে সংখ্যালঘুর মৌলবাদকে ঢুকতে হচ্ছে লুকিয়ে চুরিয়ে, সংখ্যাগুরুর মৌলবাদ আসছে সামনের দরজা দিয়ে। আলি মহম্মদের ভোলেভালা ক্লাস টেন পাশ ভাই বিলালের ছেলে শাহিদ, যাকে ছোটবেলায় ধরে বেঁধে কোরান পড়িয়ে ওঠা যায়নি, সে কাশ্মীরের বন্যাত্রাণে অর্থসাহায্য করছে ভাবতে ভাবতে হয়ে গেল জেহাদি নেটওয়ার্কের সদস্য। আর বাড়ির উল্টোদিকের পান বিক্রেতা চৌবে, যে আলি সাহেবের প্রাণের বন্ধু, তার অকর্মণ্য ছেলে বুক ফুলিয়ে “দেশের কাজে” নেমে পড়ল বাইকের সামনে পতাকা লাগিয়ে। কী সেই কাজ? লোকলস্কর ডেকে এনে আলি সাহেবের গ্যারেজ ভেঙে দেওয়া, হিন্দু উৎসবের আগে লাউডস্পিকারের মুখটা মুসলমানদের বাড়ির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যাতে তারা টের পায় “গোটা দেশ তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ”, রাতে আলি সাহেবের বাড়িতে পাথর ছোঁড়ার আয়োজন, দেয়ালে এবং দরজায় লিখে দেওয়া “TERRORIST”, “GO TO PAK”।
এই ছবিতে অনুভব সিনহার সবচেয়ে বড় কাজ সম্ভবত আমাদের অনেকের মনে তৈরি হওয়া চড়া একরঙা ছবিগুলো মুছে দেওয়া। এ ছবির হিন্দুরা নানারকম, মুসলমানরাও তাই।
ধর্মপ্রাণ অথচ গোঁড়ামিহীন আলি মহম্মদ আছেন, কোরান ঠিকমত না পড়েও জেহাদী হওয়া ভাইপো শাহিদ আছে, অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াডের ভুয়ো এনকাউন্টারবাদী অফিসার দানিশ জাভেদও আছেন। তিনি মনে করেন সন্ত্রাসবাদীদের গ্রেপ্তার না করে শেষ করে দেওয়া উচিৎ কারণ তারা মুসলমানদের বদনামের কারণ।
হিন্দুদের মধ্যে চৌবে আছেন, যিনি স্ত্রীকে লুকিয়ে বন্ধু আলির বাড়িতে কোরমা, কালিয়া খেতেন অথচ শাহিদের অপরাধ প্রকাশ হতেই বিরাট হিন্দু হয়ে উঠলেন এবং নিঃসংশয়ে বুঝে নিলেন “আমার ছেলে ঠিকই বলে। ওরা ঐরকমই।“ কিন্তু আলি সাহেবের আরেক বন্ধু সোনকর আছেন, যিনি ১৯৯২ এর ৬ই ডিসেম্বরের অভিশপ্ত রাতে চৌবেকে সঙ্গে নিয়ে আলি সাহেবের পরিবারকে দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিলেন। যিনি গোটা মহল্লার বিরুদ্ধে গিয়ে আলি সাহেবের পুরো পরিবারকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার চেষ্টা চলার সময়ে পাশে থাকলেন। আলির প্রবাসী ছেলে এসে যখন বলল এ বাড়ি ছেড়ে তার সাথে ইংল্যান্ড চলে যাওয়াই ভাল, তখন সোনকরকে দেখিয়েই আলি সাহেব বললেন “আমরা চলে যাব? আমি নিজেকে কী জবাব দেব? যে আমি দেশদ্রোহী? পাড়ার লোককে সোনকর কী জবাব দেবে? ও বলবে ও দেশদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল?”
সর্বোপরি আছেন আরতি মহম্মদ — আলি সাহেবের হিন্দু পুত্রবধূ। একজন বেপথু হয়েছে বলে পুরো পরিবারটাকে সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করার প্রচেষ্টাকে বিফল করার দায়িত্ব শেষ অবধি যার ঘাড়ে পড়ে। মুসলমানদের ঝামেলা মুসলমানরাই সামলাক, কোর্ট তো বলে দিয়েছে ওরা টেররিস্ট — বাবা-মায়ের এইসব আবোলতাবোল কথাবার্তা উড়িয়ে দিয়ে ঘাড় সোজা করে লড়ে যায় মেয়েটি। অথচ বেনারসে আসার আগে স্বামীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়েছিল সে, কারণ আলি সাহেবের ছেলে আফতাব চাইছিল সন্তানের জন্মের আগেই যেন তার ধর্মটা ঠিক করে রাখা হয়। শুনানিতে যাওয়ার সময় কিন্তু সে মন্দিরের প্রসাদী ফুল মাথায় ছুঁইয়ে যায়।
আরো এক দল মানুষ আছেন আলি সাহেবের মুল্কে, যাদের কথা না বললেই নয়। কিছু লোক যারা মসজিদে নমাজ পড়তে এসে তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় শাহিদ আর বিলালের শাহাদাত উদযাপন করতে আসার জন্যে এবং প্রবল ধমক খায়। আলি সাহেব তাদের জানিয়ে দেন শাহিদ যা করেছে তা শাহাদাত নয়, সন্ত্রাস। যারা তাঁর বাড়িতে পাথর ছুঁড়েছে তারাও যে সন্ত্রাসীই সেকথা তিনি বলে এসেছেন এফ আই আর নিতে অনিচ্ছুক দারোগাকে।
মসজিদে ফিসফিসিয়ে কথা বলা লোকগুলোর দলেই পড়েন সরকারপক্ষের উকিল সন্তোষ আনন্দ। সাক্ষ্যপ্রমাণ না-ই থাক, মুসলমানবিদ্বেষের কোন অভাব নেই তাঁর মধ্যে। তিনি জানেন এখন কেস জিততে হলে বিচারবিভাগকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে হয়; হোয়াটস্যাপ, ফেসবুককে হাতিয়ার করতে হয়।
ছায়াছবি হিসাবে অনায়াসেই আরো ভাল হতে পারত ‘মুল্ক’। তাপসী পান্নু আরো জোরালো আরতি হতে পারতেন, আদালতে তাঁর অতি মূল্যবান closing argument চিত্রনাট্যের সাহায্য পেলে আরো কম বক্তৃতা হতে পারত। বিচারকের শেষ কথাগুলোও, যদিও অত্যন্ত জরুরী, অতটা বক্তৃতার মত না শোনালে নিঃসন্দেহে আরো ভাল হত। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় কথা এই সময়ে এই ছবিটার প্রয়োজন ছিল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আলি সাহেবরূপী ঋষি কাপুর যখন সন্তোষ আনন্দরূপী আশুতোষ রানাকে প্রশ্ন করেন “আমার দেশে আমাকে স্বাগত জানানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?” তখন প্রশ্নটা তাঁর একার থাকে না, কোটি কোটি ভারতবাসীর হয়ে দাঁড়ায়। সেইসব ভারতবাসীর যাঁদের পান থেকে চুন খসলে পাকিস্তানি বলে সম্বোধন করা হয়, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের সময়ে যাদের দিকে আড়চোখে, বাঁকা হেসে তাকানো হয়।
তবে সবচেয়ে মনে রাখার মত মুহূর্ত তৈরি হয় আদালতে নয়, বাড়ির ছাদে। ভাই বিলালের উকিল থেকে কেসে অন্যতম অভিযুক্ত হয়ে যাওয়ার পর শব্দহীন বিনিদ্র রাতে পুত্রবধূকে আলি সাহেব বলেন “তবসসুম যখন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এল, তখন আমার সাথে খুব ঝগড়া করত, বলত ‘তুমি আমায় ভালবাস না।’ আমি বলতাম ‘বাসি তো। খুব ভালবাসি।’ ভালবাসা কী করে প্রমাণ করা যায় বল তো? ভালবেসেই তো? আজ যখন আদালতে আমাকে বলা হল ‘প্রমাণ করুন আপনি দেশকে ভালবাসেন’, আমি ভাবলাম কী করে করি? কেমন করে প্রমাণ করা যায় যে আমি আমার দেশকে ভালবাসি?”
দেশকে ভালবাসার প্রশ্ন উঠতে তাঁর মনে পড়ল প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা, মায়ের কথা নয়। “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগানের পরাভবে পূর্ণিমার তাজমহলের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুরাদ আলি মহম্মদের দেশপ্রেম।

বিরাট রাজার দরবারে

আপনি কে বিরাট? মোদীজির মত আপনিও কি নিজেকে ভারতবর্ষের মূর্ত প্রতীক মনে করেন?

A lovely day for cricket
Blue skies and gentle breeze
The Indians are awaiting now
To play the West Indies
A signal from the umpire
The match is going to start
The cricketers come on the field
They all look very smart …
Erapalli Prasanna
Jeejeebhoy and Wadekar
Krishnamurthy and Vishnoo (sic) Mankad
Them boys could real play cricket
On any kinda wicket
They make the West Indies team look so bad
We was in all kinda trouble
Joey Carew pull a muscle
Clive Lloyd get ’bout three run out
We was in trouble without a doubt
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Ven-kat-a-ra-ghavan
Bedi, in a turban
Vijay Jaisimha, Jayantilal
They help to win the series
Against the West Indies
At Sabina Park and Queen’s Park Oval
A hundred and fifty-eight by Kanhai
Really sent our hopes up high
Noriega nine for ninety-five
The Indian team they still survive
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Govindraj and Durani
Solkar, Abid Ali
Dilip Sardesai and Viswanath
They make West Indies bowlers
Look like second raters
When those fellas came out here to bat
West Indies tried Holder and Keith Boyce
They had no other choice
They even try with Uton Dowe
But ah sure that they sorry they bring him now
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all
Little Desmond Lewis
Also Charlie Davis
Dey take a little shame from out we face
But Sobers as the captain
He want plenty coachin’
Before we cricket end up in a disgrace
Bedi hear that he became a father
So he catch out Holford in the covers
But when Sobers hear he too had a son
He make duck and went back in the pavilion
It was Gavaskar
De real master
Just like a wall
We couldn’t out Gavaskar at all, not at all
You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all

মহামান্য বিরাট রাজা সমীপেষু,
ক্রিকেট আর ভদ্রলোকের খেলা নেই আমরা সকলেই জানি। তাই আজকাল ক্রিকেটারদের থেকে মাঠে বা মাঠের বাইরে ভদ্রলোকসুলভ ব্যবহার কেউ আশাও করে না। আজকাল মাঠে যে ক্রিকেটার যত বেশি গালাগালি দেন তিনি তত বেশি ডাকাবুকো। ক্ষিপ্ত বাঁদরের মত দাঁত না খিঁচোলে যে আগ্রাসন প্রকাশ পায় না তা এখন সদ্য প্লাস্টিকের ব্যাট হাতে নেওয়া শিশুও জানে। অতএব আপনি শতরানের পর শতরান করে ভক্তদের রানের ক্ষিদে বাড়িয়ে দিলেও আপনার থেকে দৃষ্টান্তমূলক ভদ্রজনোচিত ব্যবহার কেউ আশা করে না। বস্তুত তেমন কিছু কখনো করে ফেললে আপনার অনেক ভক্ত হয়ত ঈষৎ রুষ্টই হবেন। আপনার অধীনস্থ সৈনিক যজুবেন্দ্র চহল যেমন কিছুদিন আগে এক পাকিস্তানি ক্রিকেটারের জুতোর ফিতে বেঁধে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় হাততালির সঙ্গে বেশকিছু নিন্দেমন্দও শুনলেন। ভক্তরা যা আশা করেন তা হল খেলোয়াড়োচিত মনোভাব, লোকদেখানো হলেও। সেটুকুরও অভাব ঘটা পীড়াদায়ক।
সোশাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যে সংক্রমিত ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কোন এক ক্রিকেটমোদী লিখেছেন তিনি মনে করেন আপনি “overrated” এবং আপনার ব্যাটিঙে কোন বিশেষত্ব নেই। তিনি আপনার ব্যাটিঙের চেয়ে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং দেখতে বেশি পছন্দ করেন। সন্দেহ নেই লোকটি/মহিলাটি নিতান্ত বেরসিক। কিন্তু আপনি নিদান দিয়েছেন অন্য দেশের খেলোয়াড়দের বেশি পছন্দ হলে সেই দেশেই চলে যাওয়া উচিৎ। অদূর অতীতে আপনার নানা আপত্তিকর ব্যবহারের উত্তরে কিছু লিখব ভেবেও লিখিনি। এবার কিন্তু আত্মসংবরণ অন্যায় বলে মনে হচ্ছে। তাই দু কলম না লিখে পারলাম না।
সবে গতকাল আপনাদের ভারতীয় ক্রিকেট দল নির্বিষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিষ ঝেড়ে উঠল। কুড়ি বিশের সিরিজের ঠিক আগে হওয়া পঞ্চাশ ওভারের সিরিজে আপনি প্রবল ব্যাটিং বিক্রমে আরো একবার ক্রিকেটমোদীদের মুগ্ধ করলেন। ধরে নেওয়া অযৌক্তিক হবে না যে তার ফলে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আপনার ভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যতই সবার পিছে সবার নীচে জায়গা হোক না কেন, আপনি নিশ্চয়ই জানেন ঐ দ্বীপপুঞ্জের ক্রিকেট দল একদা অবধ্য ছিল। তাদের হাড়ে কাঁপন ধরানো জোরে বোলার আর নির্দয় ব্যাটসম্যানরা বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করতেন। এই লেখার শুরুতে রোমান হরফে যে দীর্ঘ অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাটা দেখা যাচ্ছে সেটা আসলে একটা গান, ক্যারিবিয়ানরা যাকে বলেন ক্যালিপসো। এই ক্যালিপসো রচিত হয়েছিল সুনীল গাভাসকরের বন্দনায়। ১৯৭১ এর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে যখন অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল সিরিজ জেতে তখন ওখানকার ক্রিকেটপ্রেমীরা এই গান রচনা করেন। এই গানে প্রায় প্রত্যেকটি ভারতীয় ক্রিকেটারের প্রশংসা করা হয়েছে। কি সৌভাগ্য আমাদের যে সেই সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক গারফিল্ড সোবার্স গানটা শুনে বলেননি, ভারতীয় ক্রিকেটারদের অত পছন্দ হলে ভারতে চলে যাওয়া উচিৎ। যদি বলতেন তাহলে এরকম অমর ক্যালিপসো আর আমরা পেতাম না। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট আজ মরণাপন্ন হলেও ক্যালিপসো বেঁচে আছে। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারদের পাশাপাশি অন্য দেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে একইরকম ভালবাসায় গান লিখেও বেঁচে আছে। খুঁজলে হয়ত আপনাকে নিয়ে লেখা গানও পাওয়া যাবে।
সোবার্সের অবশ্য অমন কথা বলার একটা ব্যবহারিক অসুবিধাও ছিল। তিনি কোন দেশের লোককে ভারতে যেতে বলতেন? ইতিমধ্যে কয়েকবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করে আসার সূত্রে আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বলে একটা ক্রিকেট দল থাকলেও কোন দেশ নেই। ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগো, জামাইকা, গায়ানা, লিওয়ার্ড আইল্যান্ড, উইন্ডওয়ার্ড আইল্যান্ড, অ্যান্টিগা প্রভৃতি দ্বীপগুলো প্রত্যেকটাই একেকটা দেশ। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে যেমন ভারত আর পাকিস্তানের সম্মিলিত ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কায় খেলতে গিয়েছিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল আসলে তেমনই একটা দল। প্রত্যেক ম্যাচের শুরুতে আপনারা আম্পায়ারদের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান, তারপর জনগণমন গান। এতে নাকি দেশের হয়ে খেলার জন্যে আলাদা উৎসাহ পাওয়া যায়, যথোপযুক্ত অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ হয় — এসব আজকাল শুনতে পাই। যখন জেসন হোল্ডার, কার্লোস ব্রাথওয়েটদের পালা আসে তাঁরা কিন্তু কোন জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলান না। কারণ তাঁরা সকলে এক দেশের নাগরিক নন। তাঁরা একটা ক্যালিপসোতে গলা মেলান। চিরকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্ষেত্রে তাই-ই হয়ে আসছে। যে দেশপ্রেমকে আপনি ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তা যে আসলে একটি কাল্পনিক আবেগমাত্র, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ হয় না। ঐ আবেগটির অভাব যে ভাল ক্রিকেট খেলায় বাধা সৃষ্টি করে তাও বলার উপায় নেই। কারণ ক্লাইভ লয়েডের প্রায় অপরাজেয় দলটাও জাতীয় পতাকা বা জাতীয় স্তোত্র ছাড়াই অমন দুর্দমনীয় হয়ে উঠতে পেরেছিল। অর্থাৎ জিততে দেশপ্রেম লাগে না, যোগ্যতা লাগে, প্রতিভা লাগে, ইচ্ছাশক্তি লাগে।
অবশ্য কাল্পনিক হলেও দেশপ্রেম খারাপ কিছু নয় যতক্ষণ তা অকারণে অন্যকে আঘাত করার অস্ত্র হয়ে উঠছে। যখন তা ঘটে তখন আর ওটা দেশপ্রেম থাকে না, হয়ে ওঠে উগ্র জাতীয়তাবাদ। সম্প্রতি জনপ্রিয় যে তুলনাটা সেটা দিয়েই বোঝানো যাক।
“জানি নে তোর ধনরতন আছে কিনা রানীর মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।“ এই হল দেশপ্রেম।
“সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।“ এই হল জাতীয়তাবাদ।
আমার দেশ আমার বড় প্রিয়, অন্য দেশের সাথে তুলনা করি না। অর্থাৎ আমি দেশপ্রেমিক। কিন্তু অন্য দেশের সাথে তুলনা না করে আমার চলে না এবং সে তুলনা কখনোই তথ্যনিষ্ঠ হয় না কারণ আমি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত করেছি আমার দেশ সব দেশের চেয়ে ভাল — এই মূঢ়তারই অপর নাম জাতীয়তাবাদ।
মাননীয় বিরাট রাজা, আপনি বাংলা পড়তে পারুন বা না-ই পারুন, এ লেখা আপনার চোখে পড়ুক বা না-ই পড়ুক, আপনার অগণিত ভারতীয় ভক্তকুল থেকে অবিলম্বে আওয়াজ উঠবে “কেন? জাতীয়তাবাদী হলে অসুবিধাটা কোথায়?” অসুবিধা এই যে সেক্ষেত্রে নিজের দেশের ত্রুটিগুলো কখনোই আপনার নজরে পড়বে না, ফলে সেগুলোর সংশোধনও হবে না। সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে দুর্বল ইংল্যান্ড দলের সাথে ৪-১ এ সিরিজ হেরেও আপনি দাবী করবেন সিরিজটা আরেকটু হলেই জিতে গেছিলেন। আপনার দলের প্রাজ্ঞ কোচ বলবেন আপনারাই এতাবৎকালের সেরা সফরকারী দল। কোন সাংবাদিক যদি বলেন তথ্য অন্যরকম বলছে তাহলে “It’s your opinion” বলে উড়িয়ে দেবেন। এ কথা চিরকাল প্রকাশ্যে গোপন থাকবে যে এ বছর আপনার দল বিদেশে মাত্র দুটি টেস্ট জিতেছে আর আপনাদের ঠিক পরেই রয়েছে যে দল তার নাম জিম্বাবোয়ে। তারা জিতেছে একটি টেস্ট।
এতৎসত্ত্বেও আপনার মন্তব্যে তত আপত্তি করতাম না যদি তার মধ্যে প্রকট রাজনৈতিক ঘৃণার প্রভাব লক্ষ্য না করতাম। আপনি যে ক্রিকেটজগতের বাইরের ঘটনা সম্পর্কে শচীন তেন্ডুলকরের মত উদাসীন নন, বরং যথেষ্ট আগ্রহী তার যথেষ্ট প্রমাণ আপনি নিজেই দিয়েছেন। নোটবন্দীকে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বলে অভিনন্দিত করেছিলেন। নোটবন্দীর সর্বৈব ব্যর্থতা প্রমাণ হওয়ার পরে অবশ্য সুচিন্তিত নীরবতা পালন করেছেন। আপনি টুইটারেও যথেষ্ট সক্রিয়। ফলত এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে “না পোষায় অন্য দেশে চলে যাও” একথা গত কয়েক বছরে কাদের উদ্দেশ্যে কারা প্রয়োগ করেছে তা আপনি জানেন না।
আপনার ও অনুষ্কা শর্মার সুবিজ্ঞাপিত বিবাহবাসরের প্রধান অতিথি নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি, তাঁর সরকার আর দেশ সমার্থক হয়ে গেছে তাঁর সমর্থকদের কাছে। জওহরলাল নেহরু থেকে মনমোহন সিং পর্যন্ত সব প্রধানমন্ত্রীর যথেচ্ছ সমালোচনা হয়েছে, আমার আপনার প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে “গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়” স্লোগান শুনতে শুনতে, অথচ মোদীজির ন্যূনতম সমালোচনা করলেও দেশদ্রোহী হয়ে যেতে হয় এবং শুনতে হয় “Go to Pakistan”। প্রচ্ছন্ন থাকে এই ইঙ্গিত যে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মনে প্রাণে ভারতীয় নন বলেই তাঁরা এদেশের সব খারাপ দ্যাখেন। যারা সমালোচনা করে তারাও ঐ দলে এবং এদেশ তাদের দেশ নয়, তাদের দেশ পাকিস্তান। সেখানেই তাদের যাওয়া উচিৎ।
প্রকাশিত ভিডিওতে আপনি যে সুরে, যে ভাষায় জনৈক ক্রিকেটপ্রেমীকে বলছেন আপনার ব্যাটিং ভাল না লাগলে অন্য দেশে চলে যাওয়া উচিৎ, তাতে “Go to Pakistan” এর গগনবিদারী প্রতিধ্বনি। আপনি কে বিরাট? মোদীজির মত আপনিও কি নিজেকে ভারতবর্ষের মূর্ত প্রতীক মনে করেন? মুখঢাকা বিজ্ঞাপন যা-ই বলুক না কেন, শেষপর্যন্ত আপনি একজন খেলোয়াড়। বড়জোর আপনার ব্যাটিং নৈপুণ্যের সুবাদে আপনাকে একজন উঁচুদরের শিল্পী বলা যেতে পারে। কিন্তু ভারতবর্ষ এত বড় একটা দেশ, এত বড় একটা ধারণা যার সামনে আপনি সর্দার প্যাটেলের মূর্তির পদতলে দাঁড়ানো মোদীর মতই ক্ষুদ্র।
হ্যাঁ, ব্যাট হাতে আজ আপনি রাজা কিন্তু নিশ্চিত জানবেন এ রাজত্বের আয়ু বড় অনিশ্চিত। আজ আছে কাল নেই। ক্রিকেট খেলাটাও আপনার চেয়ে অনেক অনেক বড়। যাঁর সঙ্গে প্রায়ই আপনার তুলনা করা হয়, যাঁকে একবাক্যে সব দেশের (আপনার দেশেরও) ক্রিকেটভক্তরা বলতেন “কিং রিচার্ডস”, সেই ভিভকেও অবসর নিতে হয়েছিল নেহাত পদাতিকের মত। তবু যে তিনি আজও অ্যান্টিগার বাইরেও বহু মানুষের হৃদয়ের রাজা হয়ে আছেন তা কিন্তু শুধু তাঁর রানগুলোর জন্যে নয়। রানগুলো থাকে না, মাঠে এবং মাঠের বাইরে ব্যবহারটা থেকে যায়। মাঠের ভেতর খেলার উত্তেজনায় অনেক বাড়াবাড়ি তবু মানা যায়, মাঠের বাইরের অভব্যতা দুর্নামের কারণ হয়।
অবশ্য আপনার চিন্তা নেই। কাউচে বসা এই অসভ্যতা হয়ত অনেক ভক্তের চোখে আপনাকে আরো বড় করবে। আমার শুধু চিন্তা হচ্ছে শচীন ভোগট বলে অস্ট্রেলিয় ছেলেটির জন্যে। তার তেন্ডুলকরভক্ত বাবা-মা সাধ করে ঐ নামটা রেখেছিলেন। এবার অস্ট্রেলিয়া সফরে যদি কোনভাবে সে আপনার সামনে পড়ে যায় তাকে আবার ঘাড় ধরে ভারতে নিয়ে এসে যোগীজিকে দিয়ে নাম বদলিয়ে দেবেন না তো?

ইতি

এক দুর্বিনীত ক্রিকেটপ্রেমী।

[portfolio]

ভালবাসার শক্তি

তারা খেলতে বেরিয়ে খুন হয়ে যাচ্ছে, পোষা জন্তুকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষিত হয়ে গুমখুন হচ্ছে, অকারণে যখন তখন পিতৃহারা হচ্ছে, এমনকি শিশুদের শব ভেসে উঠছে আমাদের সমুদ্রতীরে

রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ‘গান্ধী’ ছবিটা অসংখ্যবার দেখেছি। ছোটবেলার দোসরা অক্টোবরগুলোয় দেখতাম আর কিছু দেখার ছিল না বলে। পরে স্বেচ্ছায় দেখেছি বেশ কয়েকবার। যে দৃশ্যটা কিছুতেই ভুলতে পারি না সেটা হল বেলেঘাটায় গান্ধীজির অনশনের দৃশ্য।
অসুস্থ তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন, ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না থামলে অনশন ভাঙবেন না। কলকাতার দাঙ্গার হোতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দিকে পাশে নিয়ে জনগণের কাছে নেহরু দাঙ্গা বন্ধ করার আবেদন করলেন, বললেন “আমাদের পাগলামির জন্যে গান্ধীজির জীবন বিপন্ন।“ তার পরের দৃশ্যে দাঙ্গাবাজরা গান্ধীজির পায়ের কাছে অস্ত্র ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় তাদের মধ্যে থেকে এক ক্ষিপ্ত হিন্দু যুবক এসে কোন শিশুর পায়ের একপাটি জুতো ছুঁড়ে মারল তাঁর বুকের উপর।
“খাও এটা। খাও। আমি তো নরকে যাবই। কিন্তু তোমার মৃত্যুর পাপ নিয়ে যাব না।“
“সে তো শুধু ঈশ্বর জানেন কে নরকে যাবে,” গান্ধীজির উত্তর।
“খুন করেছি আমি। একটা ছোট বাচ্চাকে। মাথাটা দেয়ালে ঠুকে মেরে ফেলেছি।“
“কেন?”
“কেটে ফেলেছে… আমার এইটুকু বাচ্চাটাকে… মুসলমানরা মেরে ফেলেছে।“
“এই শোক কাটিয়ে ওঠার একটা রাস্তা আছে। এমন একটা বাচ্চাকে খুঁজে বার কর যার বাবা-মা খুন হয়ে গেছে। তাকে মানুষ কর। বাচ্চাটা যেন মুসলমান হয়। আর সেভাবেই তাকে মানুষ কোর।“
বিস্ফারিত নেত্রে একথা শোনার পর চলে যেতে গিয়েও ফিরে এসে গান্ধীর পায়ের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ে সেই সন্তানহারা, শিশুহন্তা পিতা। ক্ষমা প্রার্থনা করে।
যতবার দেখেছি ছবিটা, এই জায়গাটায় এসে মন বিদ্রোহ করেছে। মনে হয়েছে এমনটাই হওয়া উচিৎ বটে কিন্তু একমাত্র গান্ধীর উচ্চতার মানুষই ওভাবে ভাবতে পারেন। একজন সাধারণ মানুষ কি পারে? অসম্ভব, এ অসম্ভব।
একেবারে অসম্ভব যে নয় তার প্রমাণ পেতে অপেক্ষা করতে হল এই অবিশ্বাসী মধ্যবয়স অবধি। যখন রামনবমীর মিছিল নিয়ে সাম্প্রদায়িক অশান্তিতে আততায়ীরা আসানসোলের এক মসজিদের ইমাম মৌলানা ইমদাদুল রশিদির কিশোর সন্তানকে খুন করল, আর তিনি বললেন যদি কেউ এর প্রতিক্রিয়ায় কোনরকম হিংসার আশ্রয় নেয় তাহলে তিনি মসজিদ ছেড়ে, আসানসোল ছেড়ে চলে যাবেন।
সেটা এবছর মার্চ মাসের ঘটনা। ঠিক তার আগের মাসে অঙ্কিত সাক্সেনা বলে এক হিন্দু যুবককে খুন করা হয় মুসলমান মেয়েকে ভালবাসার অপরাধে। তার বাবা যশপাল সাক্সেনাও একগলা পুত্রশোকের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলেন “হ্যাঁ আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে তারা মুসলমান। কিন্তু তা বলে সব মুসলমানকে খুনী বলে দেগে দেওয়া যায় না। সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর কাজে আমাকে ব্যবহার করবেন না। ব্যাপারটাকে ধর্মের সঙ্গে জড়াবেন না, পরিবেশ বিষিয়ে দেবেন না।“
কিন্তু কে শুনছে তাঁর কথা, তাঁদের কথা? অপরবিদ্বেষ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। যার চামড়ার রং আমার মত নয় তার প্রতি বিদ্বেষ, যে আমার ভাষায় কথা বলে না তার প্রতি বিদ্বেষ, যে মূলত আমার রাজ্যের বা দেশের বাসিন্দা নয় তার প্রতি বিদ্বেষ, যার খাদ্যাভ্যাস আমার মত নয় তার প্রতি বিদ্বেষ, সর্বোপরি যে অন্য ধর্মের লোক তার প্রতি বিদ্বেষ।
এই সর্বব্যাপী বিদ্বেষ দিয়ে আমরা আমাদের শিশুদের জন্যে এক ভয়াবহ পৃথিবী তৈরি করেছি। তারা খেলতে বেরিয়ে খুন হয়ে যাচ্ছে, পোষা জন্তুকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষিত হয়ে গুমখুন হচ্ছে, অকারণে যখন তখন পিতৃহারা হচ্ছে, এমনকি শিশুদের শব ভেসে উঠছে আমাদের সমুদ্রতীরে।
নব্বইয়ের দশক থেকে সৌদি আরবপুষ্ট যে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ পৃথিবীজুড়ে থাবা ছড়িয়েছিল তার কার্যক্রম ছিল জনবহুল জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ বা কয়েকজন সন্ত্রাসবাদীকে দিয়ে কোন জনবহুল জায়গায় মানুষকে বন্দী করে গণহত্যা। দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের মাঝখানে নিতান্ত সাধারণ হয়ে ঘোরাফেরা করত সেই সন্ত্রাসীরা। যাদের পারিভাষিক নাম স্লিপার সেল। একদিন অতর্কিতে হানা দিত তারা, প্রায়শই আত্মহনন যার অঙ্গ। আল কায়দা থেকে আইসিসের হাত ঘুরে অধুনা সেই সন্ত্রাসবাদ অনেকাংশে স্তিমিত। এখন পৃথিবীর সর্বত্র দেখছি স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাস আরো নির্দিষ্ট, আরো ব্যক্তিগত। কোথাও গোপন শিবির করার দরকার হচ্ছে না, মৌলবাদী ধ্বংসাত্মক মতাদর্শ মস্তিষ্কে গুঁজে দেওয়ার জন্যে প্রয়োজন পড়ছে না কোন দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের। হাতের স্মার্টফোনেই চলে আসছে উশকানিমূলক প্রোপাগান্ডা, চতুর ভুয়ো খবর। এখানে আলাদা করে কোন স্লিপার সেল নেই কারণ আমি, আপনি, আমরা সবাই একেকজন স্লিপার সেল। হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক, টুইটার, অর্ণব গোস্বামী ও সম্প্রদায় প্রকাশ্যেই আমাদের মধ্যে অহোরাত্র বুনে যাচ্ছে ঘৃণার বীজ। আমাদের কোষে কোষে ঘুমিয়ে থাকা সেই ঘৃণা মুহূর্তে আমাদের করে তুলছে সন্ত্রাসবাদী। যে মুহূর্তে কেউ ছড়িয়ে দিল অমুকের ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা আছে, এই আমি, এই আপনি দৌড়লাম তাকে পেটাতে। কেউ চিৎকার করে বলল অমুক গরু চুরি করে পালাচ্ছে। সবাই মিলে পেটাতে গেলাম তাকে। মারতে পাশবিক সুখ হচ্ছে। মারতে মারতে মরে গেলে আরো সুখ।
আমি, আপনি মানুষ মারছি আর আমাদের দেখে ছোটরাও শিখছে মানুষ খুন করা নেহাত জলভাত। আফরাজুলকে খুন করে পুড়িয়ে দিয়েছিল যারা তাদের মধ্যে ছিল কয়েকজন চোদ্দ পনেরো বছরের ছেলে। আট বছরের আসিফার ক্রমাগত ধর্ষণ এবং খুনেও যুক্ত ছিল এক অপ্রাপ্তবয়স্ক। মাদ্রাসার ছাত্র আজিমকে খুন করে ফেলল অপ্রাপ্তবয়স্করাই। শুধু গ্রীনহাউস গ্যাস নয়, ঘৃণার বিষবাষ্পে পরিপূর্ণ এক বায়ুমন্ডলে বেড়ে উঠছে আমার, আপনার সন্তান। শুধু বড়দের কাছে নয়, সমবয়স্কদের সাথেও সে নিরাপদ নয়। আজকাল মনে হয় শিশুরা জন্মাচ্ছে হয় খুন হতে নয় খুনী হতে। নিরন্তর শক্তিক্ষয় হচ্ছে — ভালবাসার শক্তি। যে শক্তি একটুও অবশিষ্ট থাকলে শেষ পর্যন্ত খুন করা থামিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া যায়।
হিন্দুরা যাকে নরক বলেন, মুসলমানরা বলেন দোজখ, খ্রীষ্টানরা Hell, তা বোধহয় এমন পৃথিবীর চেয়ে ভয়ঙ্কর নয়।

থামো, ভাবো

আমাকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে কেউ যদি বলে “ঐ একটা লম্পট ধর্ষক যাচ্ছে”, তাহলে আমার বলবার কিছু নেই

ডাক্তারি আর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার হিড়িকের পাশাপাশি আমাদের ছাত্রজীবনের শেষ দিক থেকেই সাংবাদিক হওয়ার হিড়িক দেখেছি। বিখ্যাত হতে কে না চায়? টিভিতে মুখ দেখানোর অভিলাষ বা কাগজে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আশ বহু ছেলেমেয়েকে গত দুই দশকে সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট করেছে। পেশার সুবিধাগুলো এত দৃশ্যমান যে এই একটা অন্যরকম পেশায় যাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করলে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বাবা-মায়েরাও আপত্তি করেননি, উলটে সাধ্যাতীত সাহায্য করেছেন। আত্মীয়স্বজনরাও সপ্রশংস চোখে তাকিয়েছে। কিছু সত্যিকারের ভাল প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা একগাদা জার্নালিজম স্কুল এই হিড়িকটাকে আরো উশকে দিয়েছে।
এই হিড়িক কলকাতাঘেঁষা মফঃস্বলে বসে আমার সাড়ে তেরো বছরের সাংবাদিক জীবনে খুব টের পেয়েছি। বহু অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে তাদের বাবা-মায়ের সাথে, যারা একটু বেশি সপ্রতিভ তারা একাই, আমার কাছে এসেছে কী করে সাংবাদিকতা পড়া যায়, কী করে সাংবাদিক হওয়া যায় সেই প্রশ্ন নিয়ে। আমার চাকরিজীবনের প্রথম তিন চার বছর বাদ দিলে বাকি সময়টা তথ্যগুলো দিয়েও তাদের নাগাড়ে নিরুৎসাহিত করে গেছি। আমি যে কলেজের ছাত্র সেই কলেজের মাস্টারমশাইরা বছরখানেক আগে এই একই ব্যাপারে আমাকে বলতে ডেকেছিলেন। সেখানে গিয়েও খুব উৎসাহব্যঞ্জক কিছু বলতে পারিনি। এই আচরণে অনেকেই বা সকলেই অসন্তুষ্ট হয়েছেন, হয়ত প্রকাশ করেননি। গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী তাঁদের মধ্যে যাঁরা লক্ষ্য করেছেন তাঁরা আশা করি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
কোন পেশায় সবাই ভাল লোক নয়, সব পেশারই ভালমন্দ আছে — এই জাতীয় ধ্রুব সত্য বলে যে সত্যকে আজ আর আড়াল করা যাবে না সেটা এই যে আমাকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে কেউ যদি বলে “ঐ একটা লম্পট ধর্ষক যাচ্ছে”, তাহলে আমার বলবার কিছু নেই। কারণ এদিক থেকে আমার পেশার বিশ্বাসযোগ্যতা বিনষ্ট হয়ে গেছে। আমি নিজে যদি তেমন ইতর না-ও হই, তেমন ইতররা যে আমার পেশায় আছে তার প্রচুর তথ্যপ্রমাণ জনসমক্ষে এসে গেছে। আজ যদি কোন বাবা-মা বলেন “আমার মেয়েকে আর যা-ই হোক সাংবাদিকতা করতে দেব না” তাহলে তাঁদের রক্ষণশীল বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আমিও মেয়ের বাবা। আমিই কি শ্বাপদসঙ্কুল জঙ্গলে জেনেশুনে মেয়েকে ছেড়ে দেব? কোন বাবা-মাই কি তা পারে?
যেদিন গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে এই পেশাটার আমার আর দরকার হবে না সেদিন এ বিষয়ে আরো লিখব। আজ শুধু এটুকু বলি যে আমার মহিলা সহকর্মীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেছে গত কয়েকদিনে। কারণ পুরুষ হয়ে জন্মানোর সৌভাগ্যে আমরা জানতেই পারি না এমন অনেক নিপীড়ন সহ্য করেও তাঁরা আমাদের সমান তালে কাজ করেন।
যে তরুণ তরুণীরা এখনো সাংবাদিক হতে চায় তাদের বলি, থামো, ভাবো, তারপর সিদ্ধান্ত নাও। খ্যাতির শুরু আছে, শেষ আছে। কুখ্যাতির শেষ নেই।

কাঁটাতারের এপার ওপার

বেশ তো চলছিল। গোমাংস খেয়েছে, পিটিয়ে মার। গরু চুরি করছিল, পিটিয়ে মার। কী খাচ্ছিস? টিফিন বক্সে কী আছে? মার শালাকে। হাতে গরম কোন কারণ থাক আর না-ই থাক। পিটিয়ে মার, কারণ এরা বেঁচে থাকলেই সন্ত্রাসবাদী হবে। হয় গণপিটুনিতে মার, নইলে পুলিশ দিয়ে এনকাউন্টারে মার। আইন, আদালত এসবের কোন দরকার নেই। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীরা সব দেবনিযুক্ত

স্ত্রী এলসা, পুত্র ব্রুনো আর কন্যা গ্রেটেলকে নিয়ে র‍্যালফের সুখের সংসার। কর্মক্ষেত্রে সফল লোকেদের যেমন হয় আর কি। সুখ আরো বেড়ে গেল যখন তার পদোন্নতি তথা বদলি হল। কোথায়? পোল্যান্ডে।
কী করে র‍্যালফ? সে একজন কর্তব্যনিষ্ঠ, সৎ নাজি। ফুয়েরারের প্রতি আনুগত্যে তার এক বিন্দু গাফিলতি নেই। সে জন্যে সে নিজের মা-কেও অপছন্দ করে। কারণ তিনি প্রকাশ্যেই বেসুরো গেয়ে ওঠেন অনেক সময়। ছেলের উন্নতিতে আর সকলে খুশি হলেও তিনি খুশি হন না।
সে যা-ই হোক, নতুন জায়গায় গিয়ে ব্রুনো কিন্তু একেবারেই খুশি হয় না কারণ সেখানে তার সাথে খেলার মত কেউ নেই। এটা বারণ, সেটা বারণ। এমনকি বাড়ি সংলগ্ন বাগানের বাইরে যাওয়াও বারণ। গৃহশিক্ষকের কাছে ইহুদীবিদ্বেষ শিক্ষা চলে ব্রুনো আর তার দিদির। সেসব কিছুই ব্রুনোর কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশে না। বাড়িতে চাকর হিসাবে যে ইহুদীকে সে দেখতে পায় তার সাথে গৃহশিক্ষকের বর্ণনার ইহুদীর কোন মিলই নেই যে। ২০০৮ এ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘The Boy in the Striped Pajamas’ এর বাকি গল্পটা সংক্ষেপে বলা যাক।
বাড়ির সকলের নজর এড়িয়ে, আধখোলা গেটের সুযোগ নিয়ে ব্রুনো একদিন চৌহদ্দির বাইরে বেরিয়ে পড়ে। উদ্দেশ্যহীন পদক্ষেপে সে পৌঁছে যায় একটা কাঁটাতারে ঘেরা এলাকার বাইরে। নাজি, ফুয়েরার, ইহুদী — এই শব্দগুলো এক জায়গায় ব্যবহৃত হওয়ার পর কাঁটাতার শব্দটা এসে পড়লে আজ আর কাউকে বলে দেওয়ার দরকার হয় না যে জায়গাটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। কিন্তু ব্রুনো নাজি জার্মানিতে জন্মানো এক নিষ্পাপ শিশু। সে জানত না কনসেনট্রেশন ক্যাম্প কী জিনিস। সে এও জানত না যে ঐ ক্যাম্পের কম্যান্ড্যান্ট স্বয়ং তার বাবা। সে বরং খুশি হয় তারের ওপারে ডোরাকাটা ঢলঢলে শার্ট আর পাজামা পরা এক সমবয়স্ক বন্ধুকে পেয়ে। সকলের অলক্ষ্যে এই বন্ধুত্ব বেড়ে চলে, যতদিন না ব্রুনোর মা এলসা স্বামীর কাজটা আসলে কী সেটা টের পেয়ে ছেলেমেয়েকে এই কুপ্রভাব থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু ততদিনে দেরী হয়ে গেছে। ব্রুনোর বন্ধু শ্মুয়েল কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বাস করেও বোঝেনি ওখানে কী ঘটে আসলে। তাই তার বাবার অন্তর্ধানে সে যারপরনাই বিস্মিত এবং বাবাকে খুঁজে বার করবে ঠিক করেছে। ব্রুনো তাকে সাহায্য করতে চায়। তাই শ্মুয়েল খুঁজে পেতে আরেক জোড়া পোশাক নিয়ে আসে। ব্রুনো সেই পোশাক পরে ঢুকে পড়ে ক্যাম্পে। যতক্ষণে তাকে বাড়িতে খুঁজে না পেয়ে কম্যান্ড্যান্ট র‍্যালফ সদলবলে তার খোঁজ করতে করতে যথাস্থানে এসে পৌঁছেছে, ততক্ষণে গ্যাস চেম্বারে একদল অপরিচিত ইহুদীর সাথে বিশুদ্ধ আর্য রক্তের ব্রুনো প্রাণ ত্যাগ করেছে। চিমনির কালো ধোঁয়া সে কথা জানান দিচ্ছে। বিবেকের মৃত্যু হয়েছে।
বিবেক তিওয়ারির মৃত্যু হয়েছে। বহুজাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী, নিঃসন্দেহে হিন্দু, উচ্চবর্ণ বিবেক তিওয়ারির মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু হয়নি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী শাসকের রাজত্বে পুলিশ বিনা কারণে একজন উচ্চবর্ণের হিন্দুকে গুলি করে মেরেছে। বিবেকের স্বজনরা স্তম্ভিত। টিভি ক্যামেরার সামনে তাঁর সহধর্মিনী বলেছেন তিনি ভাবতেই পারছেন না যে বিজেপিকে তাঁরা ভোট দিয়েছিলেন, যে যোগীজিকে অনেক আশা নিয়ে তাঁরা ভোট দিয়েছিলেন, সেই যোগীজির পুলিশ তাঁর স্বামীকে এভাবে মেরে ফেলল। তিনি তো সন্ত্রাসবাদী ছিলেন না!
তবে কেন? তবে কেন? সারা দেশজুড়ে কোটি কোটি মানুষ প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছেন। বেশ তো চলছিল। গোমাংস খেয়েছে, পিটিয়ে মার। গরু চুরি করছিল, পিটিয়ে মার। কী খাচ্ছিস? টিফিন বক্সে কী আছে? মার শালাকে। হাতে গরম কোন কারণ থাক আর না-ই থাক। পিটিয়ে মার, কারণ এরা বেঁচে থাকলেই সন্ত্রাসবাদী হবে। হয় গণপিটুনিতে মার, নইলে পুলিশ দিয়ে এনকাউন্টারে মার। আইন, আদালত এসবের কোন দরকার নেই। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীরা সব দেবনিযুক্ত। তাঁরা যা বলেন সেটাই তো আইন। অতএব উত্তরপ্রদেশে এনকাউন্টারে আশির উপর মানুষের মৃত্যুতে অনেক মানুষই অবাক হননি, প্রশ্ন তোলেননি। এরকম কড়া হাতেই তো দেশ শাসন করা উচিৎ। আমার রাজ্যে কবে এমন হবে? অধীর আগ্রহে ঘুম হচ্ছে না অনেকের।
কিন্তু সব হিসাব ভেস্তে গেল। বিবেকের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই। তিনি মুসলমান মহিলা সহকর্মীকে সূর্যাস্তের পর বাড়িতে ছাড়তে গেলেন। আর পুলিশের ডাকে থামলেন না পর্যন্ত। কে জানে কেন? তিনি কী ভেবেছিলেন আমরা আর কোনদিন জানতে পারব না। জানব না সঙ্গের ভদ্রমহিলা ইসলাম ধর্মাবলম্বী বলে তাঁরা দুজনে কোন হেনস্থার শিকার হতে পারেন বলে বিবেকের আশঙ্কা ছিল কিনা। হাজার হোক, যোগীজির রামরাজ্যে অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড আছে, লাভ জিহাদ আছে। নাকি তিনি ভেবেছিলেন ট্রিগারমোদী উত্তরপ্রদেশ পুলিশ আর্বান নকশালদের বানানো একটি চরিত্র?
আসলে তিনি বোধহয় জানতেন না, যেমন তাঁর পরিবার জানে না, যে শুরুটা হয়েছিল ইহুদীদের দিয়ে, শেষটা নয়। আখলাক, আফরাজুল, পেহলুর মত অনেকের মৃত্যুতে, কাফিল খানের হয়রানিতে যে ভারতীয়রা প্রকাশ্যে বা জনান্তিকে উল্লাস করেন তাঁরা এই বেলা জেনে রাখুন।

ছবি: The Boy in the Striped Pajamas ছবির একটি দৃশ্য

লেখাপড়া করে যে-ই

ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়

মোদ্দাকথা পড়াশোনা হোক সেটা সরকার চায় না। কেন্দ্রীয় সরকারও চায় না, রাজ্য সরকারও চায় না।
যাঁরা ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকারের বিরুদ্ধে তাঁদের মধ্যে দুরকম মত আছে। এক দল মনে করেন ছাত্রদের শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা উচিৎ, আর কিছু করা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। আরেক দল মানুষের মতে রাজনীতি করতে পারে, কিন্তু সে রাজনীতির দাবীদাওয়া হওয়া উচিৎ একান্ত ছাত্রদের। ক্যাম্পাসের বাইরের কোন ঘটনার অভিঘাত সেখানে থাকা চলবে না। এই মতগুলোর ভাল মন্দের মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু দুরকম মতের লোকেরাই নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে এ রাজ্যের এবং এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কত কয়েক বছর ধরে যা চলছে তা সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় প্রভাব ফ্যালে। সুতরাং সেগুলোকে ভুলে বই মুখে গুঁজে বসে থেকে তাদের বিশেষ লাভ নেই। কারণ পড়ার পরিবেশ এবং উদ্দেশ্যই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
স্কুলে বাংলার শিক্ষক নেই। সে জায়গা পূরণ করা দীর্ঘদিনের দাবী। অথচ এসে হাজির হলেন উর্দু আর সংস্কৃতের শিক্ষকরা। ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ, হতেই পারে কিছু বাইরের লোকও তাদের অসন্তোষে ঘৃতাহুতি করেছে। একটা এলাকার স্কুল কলেজের সাথে সেই এলাকার সমস্ত মানুষেরই স্বার্থ জড়িত আছে, বিশেষত সরকারপোষিত স্কুলগুলোর সাথে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তরা এখন ছেলেমেয়েকে অমুক ইন্টারন্যাশনাল, তমুক পাবলিক স্কুলে পাঠাতে পারেন। গরীব, নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েদের জন্যে এখনো যে সরকারী স্কুলই ভরসা। ফলে বহিরাগত আপনি বলবেন কাকে? তাছাড়া কোন রাজনীতিবিদ এসে দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারলে যখন বহিরাগতর প্রশ্ন ওঠে না, তখন এ বেলাতেই বা সে প্রশ্ন কেন উঠবে?
ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। দীর্ঘ তিন চার দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে যে চাকরিটা যোগ্যতা থাকলেই পাওয়া যায় বলে লোকে জানত সেটা হল স্কুল শিক্ষকের চাকরি। সেখানেও দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ঢুকে পড়ায় বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নেট বা স্লেট পরীক্ষার আদলে স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা চালু হয়। বর্তমান সরকার আসার পরে সেই পরীক্ষা নিয়মিত হয় না, হলেও কে পাশ করল আর কে চাকরি পেল তা ভগবান আর সরকার ছাড়া কাক পক্ষীতেও টের পায় না। বেসরকারী ক্ষেত্রে কাজ করা লোকেরা বিশ্বায়নের যুগে কর্মক্ষেত্রে আন্দোলন করার অধিকার হারিয়েছে, সরকারী কর্মচারীদের সে অধিকার বজায় আছে বলে জানা ছিল। কিন্তু শিক্ষকদের অধিকারের এমনই চেহারা যে এক সহকর্মীর ভোট করাতে গিয়ে রহস্যমৃত্যুর তদন্ত চাইলেও হাজতবাস করতে হয়, মার খেতে হয়। স্কুল চত্বরেও বিভিন্ন শ্রী সামলাতে সামলাতে লেখাপড়ার বিশ্রী অবস্থা মেনে নিতে হচ্ছে মাস্টারমশাই-দিদিমণিদের।
এদিকে কলেজগুলো চলছে একগাদা আংশিক সময়ের অধ্যাপকদের দিয়ে। তরুণ মেধাবীরা প্রায় ঠিকে ঝিতে পর্যবসিত। তারা এবং প্রবীণরা সর্বদাই আতঙ্কে আছেন, কখন ছাত্র সংসদ বা অন্য কারো কোপদৃষ্টি পড়ে। মারধোর না খেয়ে সসম্মানে বাড়ি ফিরতেই পারলেই যথেষ্ট, পড়ানোয় আর মন দেবেন কখন?
উল্টোদিকে কলেজ ভর্তি হতে গেলে কয়েক হাজার বা লক্ষ টাকা তোলা দিতে হবে ছাত্র সংসদকে। অথচ ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু কলেজে। আন্দোলনের দাবী ন্যায্য, অন্যায্য যা-ই হোক, যাদবপুর থেকে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র সরকার এবং প্রধানদের সমাধান হল “পুলিশ ডাকো আর ঠ্যাঙাও।” এও মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ যে ছাত্রদের কোন দাবী থাকতে নেই। অতএব হোস্টেলে থাকার জায়গা আদায় করতে হলেও তাদের হয় মেডিকাল কলেজের মত অনশন করতে হবে, নয় প্রেসিডেন্সির মত কলেজের গেটে তালা ঝুলিয়ে বলতে হবে “হোস্টেল দাও তবে তালা খুলব।” সুবিধামত সরকার কোথাও বলবে “এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” আর কোথাও “সরকারের টাকায় চলবে, সরকারের কথা শুনবে না?” ওদিকে মালদার স্বীকৃতিবিহীন কলেজটার ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন এখনো চলছে, কলকাতার বুকে। ওদের জন্যে কেউ কোন সমাধান খুঁজছেন কিনা কে জানে?
আপনি যদি শিক্ষিত যুবক/যুবতী বা তাদের বাবা-মা হন, আপনি ভাবতেই পারেন “এ রাজ্যটা একেবারে গেছে। ওকে বাইরে পাঠিয়ে দেব।” কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। সমস্ত সরকারী বা বেসরকারী সমীক্ষায় দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় প্রথম সারিতে (যদি প্রথম না হয়) থাকে, সেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী পার্টির ছাত্র সংগঠন মারদাঙ্গা করেও সংসদ দখল করতে পারেনি। সেই রাগে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলে দিয়েছেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে “ভারতবিরোধী শক্তি” কাজ করছে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের ভারত সরকার শত্রু হিসাবে দেগে দিল। তার কয়েকদিন আগেই দিল্লীর জাকির হুসেন কলেজেও সংসদ নির্বাচনের দিন তাণ্ডব চলেছে।
গত পাঁচ বছরে ভারত সরকারের নিশানায় জেএনইউ ছাড়াও এসেছে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় প্রভৃতি। ক্যান্টিনে এটা কেন, ওটা কেন নয়? অমুক জায়গায় তমুকের ছবি ঝুলছে কেন? আবোল তাবোল ছুতোয় পড়াশোনা নষ্ট করে দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা চলছে, চলবে।
কোথায় কেমন লেখাপড়া হচ্ছে তা নিয়ে সরকার বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢাউস জাতীয় পতাকা টাঙাতে ব্যস্ত, সাঁজোয়া গাড়ি রাখতে চায়। অবশ্য শুধু চায় বললে এই সরকারের সক্রিয়তাকে নেহাতই অসম্মান করা হয়। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন ২৯শে সেপ্টেম্বর তারিখটা সার্জিকাল স্ট্রাইক দিবস হিসাবে পালন করতে হবে। সেদিন এন সি সি প্যারেড করতে হবে, ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রশংসাসূচক ডিজিটাল বা সত্যিকারের কার্ড বানাতে হবে, দিল্লীতে এবং সব রাজ্যের রাজধানীতে এই উপলক্ষে যে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের সেখানে যেতে উৎসাহ দিতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ততটা পড়াশোনার জায়গা নয় যতটা দেশপ্রেমের প্রদর্শনীর জায়গা।
অবশ্য এর জন্যে মঞ্জুরি কমিশনের উপর রাগ না করাই ভাল। সে বেচারা নিজেই তো আর দুদিন পর থাকবে না। পরিকল্পনা কমিশন গিয়ে নীতি আয়োগ এসেছে, যার প্রয়োগ সম্বন্ধে রচনা লিখতে দিলে চেয়ারম্যান নিজেও মাথা চুলকোবেন। আগামী দিনে মঞ্জুরি কমিশন গিয়ে কোন এক জো হুজুরি কমিশন আসবে নিশ্চয়ই। অবশ্য ওসবের দরকারই বা কী? এখনো তৈরি না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে যখন সরকার স্বয়ং সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়ে দিচ্ছেন তখন আর ন্যাক, ইউজিসি এসব রেখে আয়করদাতার পয়সা নষ্ট করা কেন?
এসবেও অবশ্য অনেকেরই আপত্তি নেই। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পুষ্পক বিমানের মডেল নিয়ে তো আলোচনা হয়েই গেছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে আধুনিক বিদ্যাগুলো সব ফালতু। ওগুলো শেখার কোন দরকারই নেই। অতএব উঠে যাক না স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে খারাপ লাগে আমার সেইসব বোকা বন্ধুদের জন্যে, যারা গত এক দশক উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন গবেষণাগারে কাজ করে, এ দেশের চেয়ে অনেক উন্নত জীবনযাত্রায় থেকেও ভুলতে পারেনি যে তার লেখাপড়ার খরচ অনেকদিন পর্যন্ত ভাগ করে নিয়েছে এ দেশের রিকশাওয়ালা, পানওয়ালা, লোকের বাড়িতে বাসন মাজে যারা তারা। সেই বোকাগুলো দেশে ফিরে এসে দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাইছে আর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না তাদের যোগ্যতা কেন দেশে ফিরে আসার জন্যে যথেষ্ট হচ্ছে না। ভাবি তাদের মনে করিয়ে দেব “লেখাপড়া করে যে-ই/অনাহারে মরে সে-ই।/জানার কোন শেষ নাই/জানার চেষ্টা বৃথা তাই।/বিদ্যালাভে লোকসান/নাই অর্থ নাই মান”।
সরকার কেন খাল কেটে উদয়ন পণ্ডিত আনতে যাবে?

দিলীপবাবুর দান

তোমরা যে মোটা মোটা মানে বইগুলো পড়, ও দিয়ে যেন খবরদার জীবনানন্দকে পাকড়াও করতে যেয়ো না

jd

মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের কাছ থেকে ঠিক কী পাই আমরা? শিক্ষা বললে বোধহয় উত্তরটা দায়সারা হয়। কারণ শিক্ষা শুধু তাঁরাই দেন না। বাবা-মা দেন, আত্মীয়রা দেন, বন্ধুবান্ধবও নিজের অজান্তেই ভাল মন্দ নানারকম শিক্ষা দেয়। কিন্তু সেই সব শিক্ষাই যে আমাদের মনে থাকে এমন নয়। অথচ কোন মাস্টারমশাইয়ের কাছে শেখা কোন কোন জিনিস আমরা সারা জীবন ভুলতে পারি না। সত্যি কথা বলতে, দীর্ঘ কর্মজীবনের সব ছাত্রছাত্রীকে কোন মাস্টারমশাই বা দিদিমণিরই মনে থাকে না। অথচ এমন মানুষ পাওয়া বিরল যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁদের ক্লাস করতে হয়েছে তাঁদের কাউকে একেবারে ভুলে গেছে। এই বৈপরীত্যের কারণ শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। কারণ শিশু শ্রেণী থেকে শুরু করে লেখাপড়া শেষ করা অব্দি কম শিক্ষক, শিক্ষিকার ক্লাস করে না একজন মানুষ। অথচ অনেক বৃদ্ধকেও দেখেছি স্কুলের মাস্টারমশাইদের দিব্যি মনে রেখেছেন। আসলে সম্ভবত আমরা শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে এমন অনেক জিজ্ঞাসা পাই যা সারা জীবনের পাথেয় হয়ে থাকে। তার কিছু ক্লাসঘরেই, কিছু হয়ত ক্লাসঘরের বাইরে। প্রমথ চৌধুরীর কথা যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে “সুশিক্ষিত লোক মাত্রেই স্বশিক্ষিত।” অতএব শিখতে হয় নিজেকেই, কেউ শেখাতে পারে না। কিন্তু কী শিখব, কেন শিখব, কোনটা শিখলে আমার ভাল লাগবে — প্রিয় মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা বোধহয় সেটাই ধরিয়ে দেন। কেউ খুব ভাল পারেন কাজটা, কেউ আবার তত ভাল পারেন না। যাঁরা ভাল পারেন তাঁরাই বোধহয় বেশি করে মনে থেকে যান। আজ সকালের কাগজে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে পাতা জোড়া লেখা পড়তে পড়তে যেমন আমার মনে পড়ছিল সেই মাস্টারমশাইয়ের কথা, যিনি জীবনানন্দে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
ক্লাস টেনে পড়ার সময়ে আমাদের পাঠ্য ছিল এই কবিতাটা:

তোমার বুকের থেকে একদিন চ’লে যাবে তোমার সন্তান

বাংলার বুক ছেড়ে চ’লে যাবে, যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে,

আকাশের নীলাভ নরম বুক ছেড়ে দিয়ে হিমের ভিতরে

ডুবে যায়, — কুয়াশায় ঝ’রে পড়ে দিকে দিকে রূপশালী ধান

একদিন; — হয়তো বা নিমপেঁচা অন্ধকারে গা’বে তার গান,

আমারে কুড়ায়ে নেবে অন্ধকারে মেঠো ইঁদুরের মতো মরণের ঘরে —

হৃদয়ে ক্ষুদের গন্ধ লেগে আছে আকাঙ্ক্ষার — তবুও তো

চোখের উপরে

নীল মৃত্যু উজাগর — বাঁকা চাঁদ, শূন্য মাঠ, শিশিরের ঘ্রাণ —

কখন মরণ আসে কেবা জানে — কালীদহে কখন যে ঝড়

কমলের নাল ভাঙে — ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিখের প্রাণ

জানি নাকো;— তবু যেন মরি আমি এই মাঠ-ঘাটের ভিতর,

কৃষ্ণা যমুনার নয় — যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ

লেগে থাকে চোখেমুখে — রূপসী বাংলা যেন বুকের উপর

জেগে থাকে; তারি নীচে শুয়ে থাকি যেন আমি অর্ধনারীশ্বর।

আমাদের কবিতাটা পড়িয়েছিলেন দিলীপবাবু। তিনি গম্ভীর মানুষ। তাঁকে কখনো হা হা করে হাসতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাঁর হাসি স্মিত, তিনি রাগে ফেটে পড়তেন না, ফুটতেন। সর্বদা ধুতি পাঞ্জাবী পরতেন। ফুল পাঞ্জাবীর হাতা কনুইয়ের উপর পর্যন্ত গোটানো থাকত। চোখে থাকত সেলুলয়েডের ফ্রেমের চশমা, চুল উলটে আঁচড়ানো। দূরদর্শনের সাদাকালো আমলে তোলা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের যে ভিডিও এখনো মাঝেসাঝে দেখানো হয়, অনেকটা সেইরকম চেহারা। স্যার অবশ্য অতটা ছিপছিপে ছিলেন না। একটা হাত মুড়ে বুকের কাছে ধরা পাঠ্য বই আর ডাস্টার, অন্য হাতে চক নিয়ে দিলীপবাবু ক্লাসে আসতেন।
জীবনানন্দের কবিতাটা যত দিন ধরে আমাদের পড়িয়েছিলেন, তত দিন ধরে সম্ভবত অন্য কোন লেখা পড়াননি। প্রথম দিনই বললেন “এবার তোমরা যে কবিতাটা পড়তে যাচ্ছ, এর তুল্য কিছু আগে কখনো পড়নি।”
বেয়াড়া প্রশ্ন করার মত ছাত্র কোনকালে কম ছিল না। একজন জিজ্ঞেস করল “স্যার, ট্রামের তলায় কোন মানুষ কী করে চাপা পড়ে?”
আমরা তটস্থ। ভেবেছি রাশভারী দিলীপবাবু ভয়ানক রেগে যাবেন। কিন্তু তিনি স্মিত হেসে বললেন “কোন মানুষ কী করে চাপা পড়ে জানি না বাবা। তবে ইনি জীবনানন্দ দাশ, যে কোন মানুষ নন। এঁকে কোন ছকে ধরা যায় না। তোমরা যে মোটা মোটা মানে বইগুলো পড়, ও দিয়ে যেন খবরদার জীবনানন্দকে পাকড়াও করতে যেয়ো না। কবিতাটা বারবার পড়। এমনিতে আমাদের যা অভ্যেস আর কি। মানে বই পড়ব, বইটা পড়ব না। সেটা এঁর ক্ষেত্রে করেছ কি মরেছ।”
কবিতাটা পড়াতে পড়াতে মাঝে মাঝে আমাদের মুখগুলো দেখতেন। কোন মুখে একটু আগ্রহের উদ্ভাস, কোন মুখ একেবারে অনাগ্রহী, কোন মুখ দুর্বোধ্যতায় হাবুডুবু — এসবই খেয়াল করতেন বোধ করি। পড়াতে পড়াতে একদিন “কৃষ্ণা যমুনার নয় — যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ” পংক্তিতে পৌঁছেছেন। একজন প্রশ্ন করল “স্যার, ঢেউয়ের আবার গন্ধ হয় নাকি?”
“পুকুর বা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে কোন গন্ধ পাওনি কখনো?”
ছেলেটি মাথা নেড়ে না বলায় দিলীপবাবু বড় অসহায়ের মত হাসলেন। তারপর বললেন “সত্যি। এ বড় অন্যায়। যাঁরা পাঠ্য ঠিক করেছেন তাঁদের বোধহয় এতখানি দাবী করা উচিৎ হয়নি তোমাদের কাছে। ক্লাসরুমে বসে কী করেই বা ঢেউয়ের গন্ধ বুঝবে তোমরা? তাছাড়া এত কিছু অনুভব করতে বলাও কি উচিৎ? অনুভব না করেই যখন পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যায়। তবে বাবা কবিতা তো পাঠকের একটু বেশি মনোযোগ দাবী করে। কবি তো আমার মত স্কুল মাস্টার নন যে তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। পাঠ্য হওয়ার জন্যে তো কবিতাটা লেখেননি কবি। দ্যাখো না একটু চেষ্টা করে, যদি ঢেউয়ের গন্ধটন্ধ পাও?”
আমাদের তখন দুর্বিনীত হওয়ার বয়স। আমি আর আমার এক বন্ধু তখন মনে করি আমাদের আশ্চর্য কাব্যপ্রতিভা আছে। আমরা দুজনেই তখন পাঠ্য কবিতার অক্ষম অনুকরণ দিয়ে কবিতার খাতা ভরিয়ে ফেলছি। অতএব যেদিন কবিতাটা পড়ানো শেষ হল এবং দিলীপবাবু বললেন কারো কোন প্রশ্ন থাকলে করতে, সেদিন আমার বন্ধুটি জিজ্ঞেস করল “স্যার, ভবিষ্যতে কোন কবি যদি জীবনানন্দের মত লিখতে পারে?”
দিলীপবাবু মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন “সে হবার নয়। ইনি যে পথে হেঁটেছেন সে পথে বাংলা কবিতার ইতিহাসে আগেও কেউ হাঁটেননি, পরেও কেউ হাঁটেননি। যে হাঁটবে তার পরিণতি হবে জীবনানন্দের মতই। কত লোকে কত কথা বলেছে। কেউ বলেছে নৈরাশ্যবাদী কবি, কেউ বলেছে নির্জনতার কবি। এঁর মত হওয়া যায় না। আর হতে যাবেই বা কেন? নিজের মত হও।”
ক্লাসের শেষদিকে এসে বললেন “কবিতাটা তো পড়ালাম। কিন্তু বলে দিই, দেখা গেছে বোর্ডের পরীক্ষকরা জীবনানন্দের কবিতার প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেয়ার ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে। অতএব যারা বেশি নম্বর পেতে চায় তারা জীবনানন্দকে ছোঁয় না। তোমরাও নির্ঘাত তাই করবে। তবে কেবল নম্বর পাওয়ার জন্যে কবিতা পড়া খুবই দুর্ভাগ্যের। জীবনানন্দ তোমাদের নম্বর পাইয়ে দিতে পারবেন না। তবে যদি একটু ভাল লাগিয়ে নিতে পার, তাহলে এমন অনেক কিছু পেতে পার যা আমারও জানা নেই।”
যেন রহস্যোপন্যাস। শেষে সাংঘাতিক কিছু আছে সেই আভাসটুকু দিলেন কিন্তু কী আছে বললেন না। ঐ খোঁচাটুকুই আমায় বাধ্য করল রূপসী বাংলা বইটার খোঁজ করতে। পরে আরো অন্যান্য। আজও যখন জীবনানন্দ পড়তে গিয়ে কোন পংক্তিতে আটকে যাই, দুর্বোধ্য মনে হয়, স্যারের কথাগুলো মনে করি। “কবি তো আমার মত স্কুল মাস্টার নন যে তোমাকে বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। পাঠ্য হওয়ার জন্যে তো কবিতাটা লেখেননি কবি। দ্যাখো না একটু চেষ্টা করে, যদি ঢেউয়ের গন্ধটন্ধ পাও।”
দিলীপবাবু আমায় জীবনানন্দ দিয়েছেন। তাঁর ক্লাসে আজও বসে আছি।

%d bloggers like this: