রূপবতী

ঐ যে এক গাঁ লোক মিলে একটা মেয়েকে মৃত স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত পোড়ানো (বা পুড়তে দেওয়া), তার মৃত্যুর পর তাকে ভগবান বানিয়ে ফেলা, যেখানে পোড়ানো হয়েছে সেই জায়গাটাকে তীর্থক্ষেত্র করে তোলা — ওটাই রাজপুতদের গর্বের জিনিস

শাহ বানোর নাম জানে না এমন কোন লিখতে পড়তে জানা ভারতীয় বোধহয় আর অবশিষ্ট নেই। যারা জানত না তারাও কয়েকমাস আগে তিন তালাক এবং অভিন্ন দেওয়ানী বিধি নিয়ে বিজেপির কিং কং সুলভ বুক চাপড়ানোর সূত্রে জেনে গেছে শাহ বানো কে। ঐ ভদ্রমহিলার নামটা ভারতীয় দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মুসলমানবিদ্বেষীরা চট করে ভুলবে না কারণ মুসলমানরা যে এখনো “আধুনিক হয়নি”, তারা যে “এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে” সেটার এমন হাতেগরম প্রমাণ পাওয়া যায় না তো চট করে। কিন্তু বলুন “রূপ কানোয়ার”, অনেকেই বলবে “সেটা আবার কে?” যারা ফেসবুকে জহরলাল নেহরু আর বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিতের ছবি শেয়ার করে জহরলালকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করে তারা তো বটেই। রূপ কানোয়ার একটা বছর আঠেরোর মেয়ে। ১৯৮৭ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর তার চব্বিশ বছর বয়সী স্বামীর চিতায় সে সতী হয়।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। সতী হয়, অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যায়। এই সেই প্রথা যা রদ করার জন্যে রামমোহন রায় (“এমনকিছু ভাল লোক ছিলেন না। হিন্দুধর্মের অনেক ক্ষতি করেছেন” — আনুমানিক ১৯৯৯ সালে জনপ্রিয় এবং তথাকথিত আধুনিক এক হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের সন্ন্যাসীর মন্তব্য) আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে এখান থেকে লন্ডন পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন এবং তার ফলে ১৮২৯ এ লর্ড বেন্টিঙ্কের আমলে আমাদের ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই জঘন্য প্রথাকে বেআইনি ঘোষণা করে। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, ১৯৮৭ তেও কেউ সতী হচ্ছে মানে ১৫৮ বছরেও হিন্দুরা সকলে আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের আইন যা বলে বলুক, ধর্মীয় ভাবাবেগের উপরে কোনকিছুর স্থান তাদের কাছে নেই। ঐ সময়কার প্রতিবেদন বলছে, কয়েকশো লোকের সামনে রূপ কানোয়ার সতী হয়। সে স্বেচ্ছায় সতী হয়নি (হলে সেটাও আত্মহত্যা বলে আইনত অপরাধ), তাকে জোর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ থাকায় পুলিশি তদন্ত ইত্যাদি হয়। যথারীতি কিছু প্রমাণ করা যায়নি। কয়েকশো লোককে কে চটাতে যাবে? শেষমেশ সতী হতে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনি কার্যকলাপ চালু হয়। কিন্তু তারাও ২০০৪ সালে প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পায়। পদ্মাবতী ছবিটা কেন মুক্তি পাওয়া উচিৎ নয়, তার পক্ষে একটাই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে — “Rajput pride”। সেটা কী জিনিস বুঝতে হলে রূপ কানোয়ারের ঘটনাটা খুব প্রাসঙ্গিক। ঐ যে এক গাঁ লোক মিলে একটা মেয়েকে মৃত স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত পোড়ানো (বা পুড়তে দেওয়া), তার মৃত্যুর পর তাকে ভগবান বানিয়ে ফেলা, যেখানে পোড়ানো হয়েছে সেই জায়গাটাকে তীর্থক্ষেত্র করে তোলা — ওটাই রাজপুতদের গর্বের জিনিস।
গা ঘিনঘিন করছে? কেন ভাই? এরা তো মুসলমান নয়, হোক না মধ্যযুগীয়। রাজপুতরা নাকি বরাবর বীরের জাত। এমন বীর যে তাদের মেয়েদের শেখানো হত শত্রু আক্রমণ করলে নিজের যৌন শুদ্ধতা বাঁচাতে আগুনে ঝাঁপ দেবে, তবু যেন শত্রুর হাতে পড়ো না। এর আবার গালভরা নাম আছে — জহরব্রত। আলাউদ্দিন খিলজি যখন রাজপুতানা আক্রমণ করেন তখন নাকি রানী পদ্মাবতী (আমাদের অবনীন্দ্রনাথের রাজকাহিনীর পদ্মিনী) এই জহরব্রতই পালন করেন।
এটা ইতিহাস না নেহাত গপ্প সে বিতর্কে যাবই না। নাহয় ইতিহাসই হল। কিন্তু এই ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে একজন মহিলার যৌন শুদ্ধতা তার জীবনের চেয়েও মূল্যবান, অতএব যিনি নিজের মানরক্ষায় প্রাণত্যাগ করেছেন তিনি দেবী — এই চিন্তাভাবনা যাদের, তাদের তো আধুনিক মানুষ বলা চলতে পারে না। তাহলে স্বীকার করতে হয় যে হিন্দুদেরও অনেকেই এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে।
একদল বিজ্ঞ লোক বলবে “১৯৮৭র একটা ঘটনা দিয়ে ২০১৭র রাজপুতদের বদনাম করছে। যত্তসব।” সেইসব বিজ্ঞদের জ্ঞাতার্থে বলি ২০১১র জনগণনা অনুযায়ী রাজস্থানে প্রতি হাজার জন পুরুষপিছু মাত্র ৯২৮ জন মেয়ে। জাতীয় অনুপাতের চেয়েও রাজপুত বীরপুঙ্গবদের রাজস্থান অনেক পিছিয়ে। শূন্য থেকে ছয় বছরের শিশুদের মধ্যে হিসাব করলে সংখ্যাটা আরো ভয়াবহ — ৮৮৮। বোঝাই যাচ্ছে রাজপুতরা তাদের মেয়েদের নিয়ে কি দারুণ গর্বিত। আমাদের মেয়েরা শত্রুর এঁটো হয় না — এইটাই ওঁদের একমাত্র গর্বের জায়গা আর কি। স্বভাবতই পদ্মাবতী সিনেমার পর্দায় নাচলে গাইলে ওঁদের গর্বে আঘাত লাগবে বইকি। সিনেমা যে বাস্তব নয় সেসব বুঝিয়ে লাভ কী? যেদেশে গুরমীত রাম রহিম সিং এর সুপারহিরো ফিল্ম হিট হয় সেদেশে ও যুক্তি শুনবে কে?
এসব বলার মানে এই নয় যে রাজপুত মানেই নরাধম। সত্যি বলতে কি, শুধু রাজপুত নয়, এদেশের সর্বত্রই উচ্চবর্ণের লোকেরা নানারকম অমানুষিক আচার হাজার বছর ধরে চালিয়ে এসেছে। এই বাংলায় যেমন কুলীন ব্রাক্ষ্মণরা বিয়ে করাটাকেই একটা পেশায় পরিণত করে ফেলেছিল। বাঁড়ুজ্জে বংশে যখন জন্মেছি তখন খুঁজলে নিশ্চয় আমার কোন পূর্বপুরুষকেও পাওয়া যাবে যে এরকম বিকৃত ব্যবসায় লিপ্ত ছিল। তা বলে আমি, একবিংশ শতকের মানুষ, আমি কি সেসবকে সমর্থন করব? কুলীন বামুনদের নিয়ে কেউ ছবি করলে কি বাংলার চাটুজ্জে, বাঁড়ুজ্জে, মুখুজ্জে মিলে সিনেমা হল ভাঙচুর করতে নামবে না পরিচালকের মাথা কাটতে চাইবে?
কল্পনা করতেও কষ্ট হচ্ছে, তাই না? এর কারণ কিন্তু এই নয় যে বাঙালি ব্রাক্ষ্মণরা সব দেবতুল্য, রাজস্থানের কর্ণি সেনার রাজপুতদের মত নয়। কারণটা ইতিহাস। বিশদে বলার জায়গা এবং সময় যেহেতু নেই তাই সংক্ষেপে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে কারণটা রামমোহন আর বিদ্যাসাগর। শশী থারুর বলে এক নিপুণ বক্তা এবং ধুরন্ধর ভদ্রলোক বলেছেন রাজপুত ঐতিহ্য ভারতীয় ঐতিহ্যের অপরিহার্য অঙ্গ। অতএব তাদের ঐতিহ্যের অপমান না হয় সেদিকে সকলের নজর দেওয়া উচিৎ। রামমোহন আর বিদ্যাসাগর এইসব ঐতিহ্যের স্বরূপ থারুরের চেয়ে অনেক ভাল জানতেন। তাই ওসবের তোয়াক্কা না করে বিধর্মী, বিজাতীয় শাসকের কাছে সতীদাহ, বহুবিবাহের ঐতিহ্যের বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দেওয়ার জন্যে তদবির করতে একদম দ্বিধা করেননি। সেসময়কার বামুন, কায়েতরা আজকের কর্ণি সেনার মতই আচরণ করেছিল। পার্থক্যের মধ্যে ইংরেজ সরকার বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার মত “ইশ! ওরা কি দুষ্টু!” বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। অসভ্য ঐতিহ্যগুলোকে বেআইনি করে ছেড়েছিল।
আরেকটা সুবিধা তখন ছিল। সেসময় অতিচালাক, স্বার্থান্বেষী, ঘুষখোর বুদ্ধিজীবী আর সাংবাদিক ছিল না যারা সরকারের মদতপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীগুলোকে ন্যাকামি করে “fringe element” বলবে। এরা আছে বলেই আইনের শাসনের উপরে কোন গোষ্ঠীর ভাবাবেগের এই অবাধ দৌরাত্ম্য নির্ঝঞ্ঝাটে সম্ভব হচ্ছে। শাসক দলের নেতা লাইভ টিভিতে বসে আইএসের ঢঙে খুনের হুমকি দিচ্ছে, নায়িকার অঙ্গহানির হুমকি দিয়ে ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে লোকে, সরকার কিছুই করতে পারছে না। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের এই এক মজা। তাঁরা সবাই ভীষণ পরিশ্রমী, উপযুক্ত এবং জনপ্রিয় কিন্তু সঙ্কটের সময়ে তাঁরা কেউই কিছু করে উঠতে পারেন না। যেমন ২০০২ এ মোদী পারেননি আরকি। সব মিলিয়ে দীপিকা পাড়ুকোনের নাক আস্ত থাকলেও দেশ হিসাবে ভারতের নাক কাটা গেছে। নিজেদের সভ্য বলে দাবী করার অধিকার আমরা ক্রমশ হারাচ্ছি।
দুঃখের বিষয় এই যে এমন একটা ছবি নিয়ে এই কান্ড হচ্ছে যেখানে আধুনিক ভারতে একেবারেই অনুকরণীয় নয় এমন এক চরিত্রকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে। সঞ্জয় লীলা বনশালী তো সমাজসচেতন বাস্তবধর্মী ছবি বানানোর বান্দা নন। তিনি কেবল মনোরম দৃশ্যপট তৈরি করেন। দেবদাসের নিদারুণ ট্রাজেডিও তাঁর হাতে পড়ে রাঙা টুকটুক করে। এমন পরিচালকের এই দুর্গতির কোন মানে হয়! তাছাড়া এরপরেও তো তিনি একবারও বলছেন না এস দুর্গা আর ন্যুড ছবির সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে তাও কম আঘাত নয়। এতদিন কল্পজগতে বাস করেছেন বেশ করেছেন। এখন যখন নাচগানওলা ফর্মুলা ছবি বানাতে গিয়েও গোষ্ঠীর এবং রাষ্ট্রের গুন্ডামি সহ্য করতে হচ্ছে তখন অন্তত বেপরোয়া হয়ে উঠুন না। দেখান না একটা অন্য কল্পজগত। বানান না রূপ কানোয়ারকে নিয়ে একটা ছবি, যেখানে স্বামীর চিতা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে অমিতাভ বচ্চনের মত একাই শ্বশুর, দেওর আর তাদের গুন্ডাবাহিনীকে নিকেশ করবেন দীপিকা। তারপর নীচু জাত বা মুসলমান বলে যে প্রেমিকের সাথে বিয়ে দেননি বাবা-মা, সেই রণবীরকে বাইকের পেছনে চাপিয়ে চলে যাবেন অনেক দূরে, “Rajput pride” কে কাঁচকলা দেখিয়ে।
পুনশ্চ: আমার ধারণা এই লেখাটায় বেশকিছু লোক মন্তব্য করবে যে এর মধ্যে হিন্দু, মুসলমানকে টেনে আনা নোংরা রাজনীতি বা মূর্খামি। রাজপুত ভাবাবেগে আঘাত লাগায় রাজস্থানের মুসলমানরাও আহত। এর প্রমাণ হিসাবে বলা হবে যে আজমের শরীফও পদ্মাবতীর মুক্তির বিরোধিতা করেছে। উত্তরে বলি, আজমের শরীফের ঘাড়ে কটা মাথা যে বিরোধিতা না করে? যে রাজপুতদের মুখ্যমন্ত্রীই ছুঁতে পারেন না তাদের বিরোধিতা করবে সংখ্যালঘুরা?

বড়দের ছেলেমানুষি

শিশুরা আর শিশু থাকছে না আজকাল। কারণ বড়রা থাকতে দিচ্ছে না

শিশুসুলভ আচরণ শিশুরা করলেই ভাল লাগে, তাই না? বড়রা তেমন করলে সবসময় যে হেসে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব তা নয়। অনেকসময় অসহ্য লাগতেই পারে। আর সত্যি কথা বলতে কি, বড়রা শিশুদের ভাল আচরণগুলো অনুসরণ করছে এমনটা কমই দেখা যায়, বেছে বেছে খারাপগুলোই করে। এব্যাপারে বড়দের ধারাবাহিকতা এমনই যে আমার তো সন্দেহ হয় আদৌ খারাপ আচরণগুলো শিশুদের নিজেদের মাথা থেকে বেরোয় কিনা। হয়ত সেগুলো তারা বড়দের থেকেই শিখেছে! অনেকক্ষেত্রে তো আমি নিশ্চিত যে ওগুলো তাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটু উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে।
নার্সারিতে পড়ে তিনটে বাচ্চা মেয়ে। দুজন টকটকে ফরসা, একজন শ্যামবর্ণ। ফরসা দুজনের একজন আর শ্যামবর্ণ মেয়েটা রোগা প্যাটকা, অন্যজন গোলগাল। একজনের বাবা-মা চাকরিজীবী, দুজনের মা গৃহবধূ। একজনের বাবার ব্যবসা। মেয়ে তিনটে কিন্তু এসব কিছুই জানে না এবং জানার প্রয়োজনও বোধ করে না। প্রত্যেকের কাছে অন্য দুজনের একটাই পরিচয় “বন্ধু”। এরকমটা বড়দের মধ্যে বড় একটা দেখা যায় কি? বড়রা তো বন্ধুত্বও পাতায় অনেককিছু বিচার করে। কেউ কেউ তো বামুন না কায়েত না শিডিউলড কাস্ট সেটাও বিচার করে।
এবার এই তিনজনের মধ্যে ঢুকে পড়লেন একজনের বাবা-মা। কোন একদিন শ্যামবর্ণ মেয়েটার বাবার চোখে পড়ল গোলগাল মেয়েটা স্কুলে এসেছে বাবার গাড়ি চেপে। পত্রপাঠ মেয়েকে বোঝানো হয়ে গেল “ওর সাথে মিশবি না। ওরা অনেক বড়লোক, ওদের সাথে আমাদের মেলে না।” এরকম অযৌক্তিক যুক্তিকে ছেলেমানুষি ছাড়া কিছু বলা যায় কি? কিন্তু এটাকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই কারণ মেয়ে পরেরদিন স্কুলে গিয়ে তিন নম্বর বন্ধুকেও বুঝিয়ে দিল, গোলগাল মেয়েটার সাথে বন্ধুত্ব করা উচিৎ নয়। অর্থাৎ বড়দের অন্যরকম মানুষকে এড়িয়ে চলা বা অকারণে শত্রু মনে করার যে অভ্যাস তা ঢুকিয়ে দেওয়া হল ছোটদের মধ্যে। গাড়ির মালিক হওয়ার কারণে অন্যদের ছোট করে দেখার কোন প্রবণতা যদি মেয়েটার বা তার বাবা-মায়ের মধ্যে দেখা যেত, তাহলে নাহয় ভাবা যেত মেয়ের বাবা তাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন মাত্র। কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন কোন প্রমাণ নেই।
আরেকটা উদাহরণ দিই।
ক্লাস ফাইভের দুটো মেয়ে। তারা একসাথে এক স্কুলে পড়ছে সেই নার্সারি থেকে। ভারী ভাব। একজন টুকটুকে, অন্যজন কুচকুচে। বড়রা কাউকে ফেয়ার এন্ড লাভলি মাখতে বলতেই পারে কিন্তু শিশুরা ওসব নোংরা ছেলেমানুষি করে না ফলে দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতেই পারে না এতগুলো বছর ধরে। অথচ সেই টুকটুকে মেয়েটা একদিন কুচকুচে মেয়েটাকে বলল “শোন, তুই না আমার পাশে বসবি না। তুই তো খুব কালো, আমার পাশে বসলে আমার রঙ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”
এই ছেলেমানুষি এতবছর পরে মেয়েটার মাথায় এল কোথা থেকে বলুন দেখি, যদি বড়রা না শিখিয়ে থাকে?
শিশুরা আর শিশু থাকছে না আজকাল। কারণ বড়রা থাকতে দিচ্ছে না। আমাদের বড়রা এর চেয়ে অনেক ভাল ছিলেন। মানতেই হবে নিজেদের কুবুদ্ধিগুলো বড় হওয়ার আগেই আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন না। “অমুক মেয়ের সাথে মিশবি না কারণ তুই ফরসা আর ও কালো” বা “অমুকের বাবার গাড়ি আছে, তোর বাবার নেই। অতএব ও তোর বন্ধু হতে পারে না” এরকম বলতে আমার বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের বাবা-মা — কাউকে শুনিনি। তাঁরা অবশ্য যারা ফেল টেল করে তাদের সাথে মেশা বড় একটা পছন্দ করতেন না, যারা ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হত তাদের মায়েরা কেউ কেউ কড়া নজর রাখতেন যাতে তারা আমাদের মত সাধারণ ছেলেপুলের সাথে না মেশে। কিন্তু তা বলে ছেলেমেয়েদেরই এসব বলতে শিখিয়ে দিতেন না। আর তাঁদের বাবা-মায়েরা সম্ভবত আরো উন্নত জীব ছিলেন কারণ আমার স্কুলমাস্টার বাবার কোন ক্লাসে একবারে না ওঠা অনেক বন্ধু আমৃত্যু ছিল।
আসলে বোধহয় তখনকার বাবা-মায়েরা পরীক্ষার নম্বর পাওয়ার সাথে মানুষ হওয়ার যে কোন যোগাযোগ নেই সেটা বুঝতেন, আমরা বুঝি না। আমাদের সময়ে এমন বেশকিছু ছেলেমেয়ের দেখা পাওয়া যেত যাদের সম্পর্কে ঠাট্টা করে বলা হত “যে ক্লাসে ওঠে সেখানেই শিকড় গেড়ে ফ্যালে।” আজকাল বোধহয় পাশ করা আরো সহজ হয়ে গেছে বলে খুব একটা কেউ ফেল করে না। কিন্তু তাতে কী? মনুষ্যত্বের পরীক্ষায় যে আমাদের ছেলেমেয়েরা অনবরত ফেল করে চলেছে। আমাদের সময়কার সবচেয়ে খারাপ ছাত্ররাও কিন্তু শিশু থেকে কিশোর হতে না হতেই পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে একটা দুধের শিশুকে খুন করে ফেলার কথা কল্পনাও করতে পারত না।
আবার বড়দের ছেলেমানুষি দেখুন — এই যেখানে অবস্থা সেখানে স্কুলে, বাড়িতে, টিভিতে ঘটা করে শিশু দিবস পালন করছে। নাকি এটার মানে হল “এই একটা দিন তোমাদের শিশু থাকার অনুমতি দিলাম। বাকি ৩৬৪ দিন বড়দের মত নোংরামো করতে হবে”?

ফ্যাসিবাদের মানবজমিন

শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন

ভারতে ফ্যাসিবাদের জন্য জমি কেমন উর্বর এবং নরেন্দ্র মোদীর মত লোককে উপড়ে ফেলা কেন শক্ত সেটা বোঝা খুব সোজা। এর কারণটা হল এখানে ফ্যাসিবাদের অনেকগুলো মাথা। মোদী বা অমিত শাহ বা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে খবর করার জন্য সম্পাদকের চাকরি যাওয়া, সাংবাদিকদের খুন বা ধর্ষণের হুমকি পাওয়া, সাধারণ মানুষ বা বিখ্যাত কেউ সরকারের কোনরকম সমালোচনা করলেই অনলাইন বা অফলাইনে গালাগাল, তাকে ভাতে মারার চেষ্টা — এসব গত কয়েকবছরে জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে এটা যে ঘটছে তাও আপনি বলতে পারবেন না। বললেই “পাকিস্তান চলে যাও” ইত্যাদি। আজও কানহাইয়া কুমারকে এক জায়গায় মেরেধরে নীরব করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটা যত ব্যাপক ভাবছেন তার চেয়েও অনেক বড় কারণ প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানিতে একটাই দল এভাবে বিরোধীদের গলা টিপে ধরত কিন্তু ভারতে শুধু সঙ্ঘ পরিবার এমন করছে তা নয়, ফলে এসব যে অন্যায় এটুকুই অনেক মানুষকে বোঝানো শক্ত। এমনিতেই শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন। সুতরাং যার ক্ষমতা কম বা নেই তাকে কথা বলতে না দেওয়া আমাদের সংস্কৃতি আর সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে নির্লজ্জ ব্যবহার করেন আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। না, শুধু বিজেপি নয়।
কয়েকদিন আগেই তামিলনাডুর কার্টুনিস্ট জি বালাকে হাজতবাস করতে হল। তাঁর অপরাধ তিনি মুখ্যমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার আর ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরকে নগ্ন দেখিয়েছেন তাঁর এক কার্টুনে। অতএব প্রশাসন ভীষণ সক্রিয় হয়ে ব্যবস্থা নিয়ে নিল ঝটপট।
মনে রাখবেন তামিলনাড়ু এমন রাজ্য যেখানে কিছুদিন আগে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায়নি দীর্ঘদিন। জয়ললিতা মারা যাওয়ার পর থেকে কে কার পক্ষে, কে জয়ললিতার বড় ভক্ত তা নিয়ে ডামাডোলে বেশ কিছুদিন কোন মুখ্যমন্ত্রীই ছিল না। অথচ যেই কার্টুনিস্টকে গ্রেপ্তার করার কথা এল, প্রশাসন যন্ত্রের মত দ্রুত কাজ করল। দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাশালীদের ল্যাংটো করে দেওয়াই যে কার্টুনিস্টের কাজ সেকথা আর শুনছে কে?
আরো ঘরের কাছে আসুন। ডেঙ্গু হয়েছে কি হয়নি তাই নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ আর সরকারের মধ্যে তর্কাতর্কি চলতে চলতে কতগুলো প্রাণ চলে গেল, প্রশাসন চলছিল গদাই লস্করী চালে এবং ডেঙ্গুর চেয়ে বড় শত্রু ঠাউরেছিল ডেঙ্গুর খবরকে। যেই না এক ডাক্তারবাবু ফেসবুকে পোস্ট করলেন ডেঙ্গু নিয়ে, অমনি দারুণ দ্রুততায় তিনি সাসপেন্ড হয়ে গেলেন। অম্বিকেশ, শিলাদিত্য ইত্যাদি পুরনো নামগুলো আর নাহয় না-ই বললাম।
আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে ডেঙ্গু নিয়ে একটা পোস্ট দেওয়ার পরে এক শুভাকাঙ্ক্ষী অগ্রজ সাংবাদিক ফোন করে সতর্ক করেছিলেন “খুব সাবধান। তুমি যা লিখেছ তার চেয়েও নিরীহ কথা লিখে কিন্তু এরাজ্যে লোকে গ্রেপ্তার হয়েছে।” ডাক্তার দত্তচৌধুরীর হাল থেকে স্পষ্ট যে সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত সঙ্গত।
তা এই দেশে আর আপনি লোককে বোঝাবেন কী করে যে বিজেপি সরকার যা করছে তা এমার্জেন্সিরই নামান্তর! পঁচাত্তর থেকে সাতাত্তর পর্যন্ত গণতন্ত্রকে গণধর্ষণ করার পরেও তো আজও অনেক শিক্ষিত লোক ইন্দিরাকে ভারতের সেরা প্রধানমন্ত্রী বলেন। স্বাভাবিকভাবেই মোদীবাবু তাঁকেও ছাড়িয়ে যাবেন। ওনার আমল নিয়ে হয়ত বইটই লেখা হবে। তবে মমতার সাথে যতই শত্রুতা করুন, একনায়কত্বের ইতিহাসে অন্তত কয়েকটা পাতা পাওয়ার থেকে আমাদের দিদিকে উনি বঞ্চিত করতে পারবেন না।

স্বর্গসুখ

lenin

১৯৮৯-৯১ এ যখন সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় হয় তখন সারা পৃথিবীজুড়ে শোনা গিয়েছিল এই প্রতিশ্রুতি যে পুঁজিবাদের শুধু চূড়ান্ত বিজয়ই হয়নি, সারা পৃথিবীর মানুষকে এবার থেকে পুঁজিবাদ দারিদ্র্য, অশিক্ষা, স্বাস্থ্যের অভাব — এসব থেকে মুক্তির পথ দেখাবে, পৃথিবীতে স্বর্গ নামিয়ে আনতে পারে পুঁজিবাদই।
রাত পোহালেই ৭ই নভেম্বর। বিপ্লবের বাতিল ঘোড়ার বয়স ১০০ পূর্ণ হবে। আজ প্রকাশ পেল প্যারাডাইস পেপার্স। বছর দেড়েক আগের পানামা পেপার্সের পর আবার আমরা জানতে পারছি দুনিয়ার বড় বড় ধনীরা কিভাবে গণতান্ত্রিক দেশের কর ফাঁকি দিয়ে নিজেদের গুপ্তধন কোথায় লুকিয়ে রাখে। গত কুড়ি বছরে উদারনৈতিক গণতন্ত্র কি দারুণ সফল হয়েছে সম্পদের সুষম বন্টনে, সেটাও বুঝতে পারছি। কেমন স্বর্গ নেমে এসেছে পৃথিবীতে তাও দেখতে পাচ্ছি। স্পষ্টতই পুঁজিবাদের কোন বিকল্প নেই। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চেসেস্কুর মত বাথরুমে সোনার কল লাগানোর সাহস কারো হয় না, তাই বারমুডা দ্বীপে যক্ষের কাছে গুপ্তধন রাখা হয়। গুপ্তধন, যক্ষ, রানী, মহানায়ক, খলনায়কের বউ — সব মিলিয়ে জমজমাট রূপকথা একেবারে। আহা! একেই তো বলে স্বর্গসুখ। সত্যিই পুঁজিবাদ পথ দেখাচ্ছে। প্যারাডাইস মানেটা যেন কী?

%d bloggers like this: