গুরুর ধর্ষণ মাপ

ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখছি খোদ বাংলায় হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হলে পরিবারের গুরু ফুলশয্যায় বসে থাকতেন। তিনি “প্রসাদ করে দিলে” তবে স্বামী-স্ত্রী মিলিত হতে পারত। হুতোম সকৌতুকে লিখেছেন কিভাবে এক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামী খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে যথাসময় বেরিয়ে এসে এক গুরুর মাথা ফাটিয়ে দেন, অতঃপর প্রাণভয়ে গুরুরা এই প্রসাদ করার অভ্যেস ত্যাগ করেন

মনে রাখবেন, ২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন এক ধর্ষিতা আর তার সঙ্গী দিল্লীর ঠান্ডায় উলঙ্গ, রক্তাক্ত, মৃতপ্রায় অবস্থায় রাস্তায় পড়েছিল তখন তাদের সাহায্য করতে একটি মানুষও এগিয়ে আসেনি অথচ তা নিয়ে মোমবাতি মিছিল করতে লোকের অভাব হয়নি। আর ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট একজন ধর্ষকের শাস্তির প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায়। নিরস্ত্র, নিরীহ অবস্থায় নয়, রীতিমত খুনে মেজাজে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেছে বহু মহিলা এই ধর্ষকটির জন্যে কান্নাকাটি করছেন। মগজধোলাই কোন পর্যায়ে গেলে এটা সম্ভব একবার ভেবে দেখুন। মানলাম যে এই ভিড় সংগঠিত করা হয়েছে গোলমাল পাকানোর জন্য। কিন্তু একজন ধর্ষককে সমর্থন করার জন্যে এত লোককে সংগঠিত করা যে সম্ভব হচ্ছে (যে মূল্যেই হোক) তা মগজধোলাই ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। সেই মগজধোলাইটা কী এবং কত প্রাচীন সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিৎ।
ঘটনা হল যে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার গর্ব আমরা করে থাকি, এটা তার এক বিরাট উত্তরাধিকার। দেবদাসী এদেশের অতি প্রাচীন প্রথা তবে সেটা মন্দিরে সীমাবদ্ধ। কিন্তু শিষ্যদের বাড়ির মেয়েরা গুরুর ভোগ্য — এ বিশ্বাসটার ইতিহাসও কিন্তু আমাদের দেশে বেশ লম্বা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লেখা হুতোম প্যাঁচার নকশায় দেখছি খোদ বাংলায় হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হলে পরিবারের গুরু ফুলশয্যায় বসে থাকতেন। তিনি “প্রসাদ করে দিলে” তবে স্বামী-স্ত্রী মিলিত হতে পারত। হুতোম সকৌতুকে লিখেছেন কিভাবে এক পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত স্বামী খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে যথাসময় বেরিয়ে এসে এক গুরুর মাথা ফাটিয়ে দেন, অতঃপর প্রাণভয়ে গুরুরা এই প্রসাদ করার অভ্যেস ত্যাগ করেন। অতএব ঐ যে দেড় লক্ষ লোক মনে করেছে তাদের গুরু নির্দোষ, ঐ যে সাক্ষী মহারাজ বলে শাসকদলের এক গেরুয়া মাফিয়া ধর্ষণ প্রমাণিত হওয়ার পরেও গুরমিত নামক বরাহনন্দনটিকে পুণ্যাত্মা বলেছে, এরা কিন্তু সত্যিই মনে করে গুরুর অধিকার আছে শিষ্যাদের একটুআধটু ভোগটোগ করার। আমাদের এই ধর্মশাসিত দেশে ব্যাপারটা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুবাদী দেশ তো। “মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা।” ফলে এদেশের অধিকাংশ পুরুষই মনে করে ধর্ষণ তার জন্মগত অধিকার। যাদের পেটে বিদ্যে আছে, ঘটে বুদ্ধি আছে — তারা এই মনোভাব গোপন করতে জানে, বাকিরা জানে না। ঠিক এই কারণেই আইন marital rape বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে না, ধর্ষণের আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর সাথে যৌন সংসর্গ ধর্ষণ বলে গণ্য হলেও অপকম্মটি মেয়েটির স্বামী করলে ধর্ষণ বলে ধরে না। এই আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য, যা সমস্ত নারীকেই মা বলে ভাবতে শেখায় আর পুরুষকে শেখায় যে কোন নারীকেই সে ইচ্ছে হলেই মা বানিয়ে দিতে পারে, দোষ নেই। ভাগ্যিস সায়েবরা এসে আমাদের পাশ্চাত্যের আদবকায়দা শিখিয়ে নষ্ট করে দিয়েছিল, নইলে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের লাশ পড়ে যেত তবু এদেশের মেয়েরা সতী হয়েই চলত, বালবিধবারা পাড়া প্রতিবেশীর সন্তানের মা হয়েই চলত। দেশের শিল্পোন্নত রাজ্যগুলো আবার এই পিছিয়ে পড়া বাংলার মত রামমোহন, বিদ্যাসাগর পায়নি কিনা তাই উনিশশো আশির দশকেও রূপ কানোয়ারকে সতী বানিয়েছে। শাহ বানোর নামটা মনে রাখা সোজা, এই মহিলার নামটা মনে পড়ে না সহজে।
নেহরু, আম্বেদকরদেরও বলিহারি। যে দেশ যা নয় তাকে তাই করে তোলার চেষ্টা! কতবড় সাহস! দেশের লোক গুরু ছাড়া বাঁচতে পারে না আর ওনারা বানাতে গেলেন সেকুলার দেশ। যত্তসব বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত মোগল আর সোনার চাঁদের দল। এতদিনে দেশটা ধর্মের পথে ফিরছে, গুরুদের হাতে ফিরছে

ধোঁকা ধোঁকা ধোঁকা

এখন অব্দি যা খবর তাতে সুপ্রিম কোর্ট একটি ছ মাসের জন্য ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। ছ মাসের জন্য কারণ মুসলমান মহিলাদের অধিকার রক্ষায় বিদ্যাসাগরের মত লড়ছেন যে ভদ্রলোক, তাঁর সরকার নাকি মুসলমানদের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে কোন নতুন আইন টাইন করতে চান না। সেটা না করলে পরিস্থিতি ছ মাস পরে আবার পুনঃ তাৎক্ষণিক তালাক ভব হয়ে যাবে।
“আমরা” অবশ্য ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন ইত্যাদি জানিয়ে দিয়েছি এই রায়টার জন্যে। কারণ তাতে “আমাদের” এইটা ভাবতে সুবিধা হয় যে “আমাদের” নেতা “ওদের” মহিলাদের উদ্ধার করলেন। মামলাটা যে করেছিলেন মুসলমান মহিলারাই, এতদিন নিজেদের অধিকারের জন্য লড়লেন তাঁরাই সেটা ভুলে যেতে সুবিধা হয়। রায়টাও যে দিলেন বিচারপতিরা, মোদীবাবু নয় — সেটাও চেপে যাওয়াই ভাল কারণ আদালতের রায় বললে নেশাটা ঠিক জমে না। বিচারকদের তো আর দেখেশুনে, পছন্দ করে কপালে ভোটটি দিইনি। ফলে ওনাদের “আমাদের” লোক বলে ভাবতে এখনো একটু অসুবিধা হয়। তাছাড়া জহরকোট আর শ্বেতশুভ্র দাড়িতে যে মহারাণা প্রতাপসুলভ আবেদনটা আছে সেটা ঢলঢলে কালো কোটে কোথায়? অতএব যাঁর অবদান এই রায়ে গোটাকতক বক্তৃতা আর টুইট বৈ কিছু নয়, তাঁকেই কৃতিত্ব দিতে হবে।
দাঁড়ান, দাঁড়ান। অত অজ্ঞ ভাববেন না। এখুনি বলবেন তো “রাজীব গান্ধী যখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে মুসলমান মহিলাদের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিলেন না তখন কোথায় ছিলেন?” তখন আমি অ আ ক খ শিখছিলাম। তবে রাজীব গান্ধী যে অন্যায় করেছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু নিজেকে রাজীব গান্ধীর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ করতে শুধু আদালতে তাৎক্ষণিক তিনতালাকের (হ্যাঁ, তাৎক্ষণিক, মানে instant triple talaq কেই অসাংবিধানিক বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। তিনতালাককে নয়) বিরুদ্ধে সরকারী উকিলকে দিয়ে সওয়াল করালে তো যথেষ্ট হবে না, দাদা। একটা নতুন আইন করে দেখান।
এইবার অভিন্ন দেওয়ানি আইনের কথা বলবেন তো? সেটা হলেই এটা হয়ে যায়, তাই না? আচ্ছা তাই হোক। মোদীজি আমাদের বলুন শুনি কী কী থাকবে সেই আইনে? নাহয় টুইট করেই বলুন। কী বললেন? ওটা এখনো তৈরি হয়নি? বুঝুন। দেশসুদ্ধ লোকের গোঁফে তেল মাখিয়ে দিলেন এদিকে কাঁঠাল গাছটা কোথায় সেটাই বলতে পারছেন না? তার মানে যদ্দিন অভিন্ন দেওয়ানী আইন না করতে পারছেন তদ্দিন তাৎক্ষণিক তিনতালাকের কোন প্রতিকার করতে পারবেন না? ও হরি! তাহলে আর কী উদ্ধার করলেন মুসলমান মহিলাদের? না মানে এটা ঠিকই যে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক, মহিলাদের উদ্ধার করতে না পারলে ঠিক নায়ক হওয়া যায় না। আর এদেশের বাস্তবটা হল সত্যিকারের ক্ষমতার জায়গায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরাই বসে আছে, অতএব তারা অধিকার না দিলে মেয়েরা অধিকার পাবেও না। সুতরাং মোদীবাবুর দিকেই তো তাকিয়ে থাকতে হবে মুসলমান মহিলাদের অধিকার আদায়ের জন্যে। তিনিও যদি মুসলমান বোনেদের দুঃখে এরকম উদাসীন হন তাহলে চলে?

পুনশ্চ: এই স্ট্যাটাস যাঁরা পড়লেন তাঁদের মধ্যে যদি মোদীজির ঘনিষ্ঠ কেউ থাকেন, দয়া করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলবেন মুসলমান বোনেদের উদ্ধারকার্য শেষ করতে বেশি দেরী না করতে কারণ হিন্দু বোনেরা অনেকে বড় কষ্টে আছেন। বিবাহবিচ্ছেদ তো ছেড়ে দিন, কাকে বিবাহ করবেন সেটা ঠিক করার অধিকারটুকু পাচ্ছেন না, বাপদাদার হাতে বেঘোরে খুন হচ্ছেন। অনেকে আবার সাহস করে বিয়েটা করে ফেলেও স্বামীর সাথে শান্তিতে থাকতে পারছেন না, স্বামীর নামে লাভ জিহাদ না কিসব অভিযোগ শুনছেন বাপের বাড়িতে ঘরবন্দী হয়ে। এঁরাই বা মোদীজি ছাড়া কার ভরসায় থাকবেন?

শুনুন ধর্মাবতার

কোটাল বলিলেন “ধর্মাবতার, আমরা গোমাতার সুরক্ষার চিন্তা ত্যাগ করিয়া পাদুকার শুকতলা ক্ষয় করিয়া অনুসন্ধান করিয়া দেখিয়াছি যে ইহাই ঐ রাজ্যে এহেন একমাত্র ঘটনা নহে।”
বিচারকের রক্ত সাইক্লোনকালে ভারত মহাসাগরের ন্যায় উত্তাল হইয়া উঠিল। তিনি উত্তেজনার বশে দাঁড়াইয়া পড়িয়া বলিলেন “বল কি! আরো আছে!”
কোটাল উত্তর করিলেন “তবে আর বলিতেছি কি। আরো দুটি ঘটনার সন্ধান পাইয়াছি যেখানে পিতামাতার প্রতি রুষ্ট হইয়া অবোধ মেয়েটি ভিন্ন ধর্মের এক নরাধমকে বিবাহ করিয়াছে এবং ধর্মান্তরিত হইয়াছে।”
“দু-দুটি ঘটনা! তবে তো এ বড় ভয়ঙ্কর চক্রান্ত, কোটাল মহাশয়! আপনার বাহিনীকে বলুন মাতারক্ষা আপাতত স্থগিত রাখিয়া কন্যারক্ষায় মনোযোগ দিতে।”
এক্ষণে আলোচ্য কন্যার কৌঁসুলি আর্তনাদ করিলেন “ধর্মাবতার, আমার মক্কেল একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা। এ সম্বন্ধে তাঁহার মতামতটা একবার শুনিয়া দেখুন। তিনি বলিয়াছেন তিনি স্বেচ্ছায় এই বিবাহ করিয়াছেন এবং ধর্মান্তরিত হইয়াছেন।”
বিচারকের সহকারী তাঁর কানে কানে বলিলেন “বাইজোভ, ছোকরা বলে কি! মহিলার আবার স্বেচ্ছা! কোনদিন শুনিব দুগ্ধ দোহনের জন্য গোমাতার অনুমতি প্রয়োজন। তিনি স্বেচ্ছায় দিলে তবেই নেওয়া চলিবে।”
একথায় দুজনে খুব হাসিলেন। হাসির কারণ বুঝিতে না পারিয়া কন্যার কৌঁসুলিদ্বয় একে অপরের পানে ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিলেন। অতঃপর বিচারপতি তাঁহাদের বলিলেন “প্রাপ্তবয়স্ক তো কী হইল? আপনারা দ্যাখেন নাই ইদানীং প্রাপ্তবয়স্করা কেমন শিশুদের মতন আহাম্মকি করিতেছেন? প্রবীণ প্রাক্তন ক্রিকেটার উদ্ভিন্নযৌবনা অনুষ্ঠান সঞ্চালিকাকে দেখিয়া নিজেকে ডিস্কো ড্যান্সার মনে করিতেছেন, সাংবাদিক নিজেকে বিচারক ভাবিতেছেন, অসংখ্য নরনারী মোবাইলকে জীবন আর জীবনকে মোবাইল ভাবিতেছেন, খেলা নিয়ে মেলা অনর্থ ঘটিতেছে এমনকি প্রাণ যাইতেছে। এসব কী করিয়া সম্ভব হইতেছে? না মগজধোলাই করিয়া। অতএব মগজধোলাই করিলেই যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে দিয়া যা খুশি করাইয়া নেওয়া যায় ইহা বুঝিতে আপনাদের অসুবিধা হওয়া উচিৎ নহে।”
কন্যার কৌঁসুলি মাথা নাড়িয়া বলিলেন “যথার্থ, ধর্মাবতার। আপনি নির্ভুল। সত্যই আজকাল ভূমিকাগুলি বড্ড গুলাইয়া যাইতেছে। মন্ত্রীদের বিচারক মনে হইতেছে, বিচারককে প্রচারক মনে হইতেছে। তেনাদেরও মগজধোলাই হইয়াছে কিনা তাহাও তদন্ত করিয়া দেখা দরকার।”

*উপরের কথোপকথনটি কাল্পনিক। কোন বাস্তব ঘটনা বা চরিত্রের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়

ছবিটা

বাড়ির রেকর্ড প্লেয়ারে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং তাঁর দলবলের একটা রেকর্ড খুব বাজত। তাতে শঙ্খচিল বলে একটা গান ছিল। প্রশান্তের বুকে হিরোশিমা দ্বীপে বাস করা এক শঙ্খচিলের গল্প ছিল সেই গানে, যে ভালবাসত সাগরিকাকে। তার চোখে হিরোশিমার ধ্বংস কেমন লেগেছিল সেই গল্প। তখন থেকেই হিরোশিমাকে চিনি, নাগাসাকিকেও

আমাদের স্কুলজীবনের গোড়ার দিকে অফসেট প্রিন্টিং সুলভ ছিল না। সরকারের দেওয়া পাঠ্যবইগুলো ছিল ব্লক প্রিন্টিং, সে বইতে ফটোগ্রাফ থাকত না, থাকত স্কেচ। সম্ভবত ক্লাস ফাইভের ইতিহাস বইতে একটা ছবি ছিল — একটা গর্ত থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। ক্যাপশন ছিল এরকম কিছু: “পরমাণু বিস্ফোরণের পরে হিরোশিমা”। স্কেচ হওয়াতে বীভৎসতা ভাল করে বোঝা যেত না। আমাদের অনেকেরই পরমাণু আর হিরোশিমা শব্দদুটোর সাথে সেই প্রথম পরিচয়। অবশ্য রাজনীতিবিদ বাবার সন্তান আর রাজনীতিবিদ মামাদের ভাগ্নে হওয়ার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হিটলার, মুসোলিনি, স্তালিন, রুজভেল্ট, ঠান্ডাযুদ্ধ আমার তখনই পরিচিত। হিরোশিমার সঙ্গে আমার পরিচয় এসব চেনারও আগে। বাড়ির রেকর্ড প্লেয়ারে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং তাঁর দলবলের একটা রেকর্ড খুব বাজত। তাতে শঙ্খচিল বলে একটা গান ছিল। প্রশান্তের বুকে হিরোশিমা দ্বীপে বাস করা এক শঙ্খচিলের গল্প ছিল সেই গানে, যে ভালবাসত সাগরিকাকে। তার চোখে হিরোশিমার ধ্বংস কেমন লেগেছিল সেই গল্প। তখন থেকেই হিরোশিমাকে চিনি, নাগাসাকিকেও।
যে ফটোগ্রাফটার অনুকরণে পাঠ্যবইয়ের স্কেচটা আঁকা হয়েছিল সেটা দেখি অনেক বড় হয়ে। কিন্তু প্রতিবছর আজকের দিনে আমার স্কুলের প্রার্থনাসভায় (ভগবানের নাম করার অনুষ্ঠান নয়। আমার স্কুলে ঐ জিনিসটা কী অপূর্ব ছিল তা নিয়ে পরে কখনো পোস্ট করব) মাস্টারমশাইরা, বিশেষত ইতিহাসের স্যার শঙ্খবাবু, হিরোশিমা আর নাগাসাকির বীভৎসতা বোঝাতে আর সেইসঙ্গে যুদ্ধ আর ভবিষ্যতে পারমাণবিক যুদ্ধ হলে তা কত ভয়ঙ্কর হবে তা বোঝাতে অনেকখানি সময় ব্যয় করতেন।
বড় হওয়ার পথে যখন ক্রমশ রাজনৈতিক হচ্ছি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রও হয়েছি সেইসময় এই উপমহাদেশে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হল। কোন একটা কাগজ তো মহা উৎসাহে হেডিং দিয়েছিল “ভারত ৫ : পাকিস্তান ৫”। তখনই প্রথম আঁচ পেলাম যে আমাদের চারপাশে অনেকেরই ধারণা পরমাণু বোমা বড়সড় পেটো ছাড়া কিছুই নয়। শত্রুপক্ষের দশটা আছে, মারতে পারে। কুছ পরোয়া নেহি। আমাদের বারোটা আছে। আমরাও মারব। এইরকম আর কি। অতঃপর কারগিল, পাকিস্তান, রক্তলোলুপতা, মারো শালাদের। তখন আবাসিক কলেজে পড়ি। বিজ্ঞানের ছাত্রদের অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা অত কাছ থেকে দেখার সুযোগ কমই পেয়েছি। কলেজ পত্রিকায় পদার্থবিদ্যার বিভাগীয় প্রধান দীপক ঘোষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরমাণু বোমার ধ্বংসক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে লিখেছিলেন। কে শোনে কার কথা! আজ যাদের ভক্ত বলি, তাদের ভক্তির ট্রেলার সেইসময় দেখেছি।
মোটামুটি ঐ সময়েই ‘নির্বাপিত সূর্যের সাধনা’ গ্রন্থের লেখক জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়, আমার ছোটমামা, বইটার একটা পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। পুরনোটা বাড়ির বইয়ের তাকে অনেকদিন পড়েছিল, আমার পড়া হয়নি। চারিদিকের যুদ্ধবাদী কোলাহল শেষ অব্দি আমাকে দিয়ে নতুন সংস্করণটা পড়িয়ে নেয়। ১৯৪০ এর দশকে যে বোমার ভূগর্ভে বিস্ফোরণ দেখে সংস্কৃতে পণ্ডিত রবার্ট ওপেনহাইমারের মনে পড়েছিল গীতায় বর্ণিত সহস্র সূর্যের বিস্ফোরণের কথা, তার শক্তি ১৯৯৯-২০০০ এ কোথায় এসে ঠেকে থাকতে পারে ভেবে স্তম্ভিত হয়ে যাই।
এরপর ২০০৪। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে এম এ পড়তে ঢুকেছি এবং বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা চলছে দারুণভাবে। সহপাঠী সুদীপ্ত, যাকে তখন কমরেড বলে সম্বোধন করি, হঠাৎ টানতে টানতে নিয়ে গেল ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য কমিটির দপ্তরে। আলাপ করাল এক পাঞ্জাবি পাজামা পরা জাপানি ভদ্রলোকের সঙ্গে। নাম তার জুনিচি কোদামা। জাপান থেকে এসেছে সেদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘আকাহাতা’ র হয়ে আমাদের লোকসভা নির্বাচন রিপোর্ট করতে। জুনিচি ভাঙা ভাঙা ইংরিজি বলতে পারে, হিন্দী বা বাংলা একদমই না। সুদীপ্ত ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দের অনুমতিক্রমে আমাকে জুতে দিল তার সাথে, সহকারী হিসাবে। পথ চিনিয়ে নিয়ে যাব আর স্থানীয় লোকেদের সাথে কথোপকথনে সাহায্য করব।
পরের বছর জুনিচি আবার কলকাতায় এল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ষাট বছর পূর্তিতে কলকাতায় কী হচ্ছে তার প্রতিবেদন লিখবে বলে। এবারে সঙ্গে এল ওর স্ত্রী রিয়েকো আসাতো। রিয়েকো পেশায় দোভাষী। দিব্যি হিন্দি বলতে পারে, চেষ্টা করলে বাংলাও শিখে নিতে পারে ঝটপট। তবু নাকি জুনিচির আমাকেই দরকার। অতএব ওদের সাথে পয়লা সেপ্টেম্বর টো টো করে কলকাতা ঘুরলাম। ওরা অবাক — বিশ্বযুদ্ধ থেকে এতদূরে থাকা একটা দেশে মানুষ সেই যুদ্ধ সম্পর্কে এত জানে! এত লোক সেজন্য মিছিলে হাঁটে! স্কটিশচার্চ স্কুলের মাস্টারমশাইরা ছেলেদের লাইন দিয়ে দাঁড় করাচ্ছেন, তাদের হাতে যুদ্ধবিরোধী প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন। জুনিচির ধারণা হল ছাত্ররা কী নিয়ে এই কান্ড সেসব জানে না, শুধু আদেশ পালন করছে। আমি, শঙখবাবুর ছাত্র আমি, এই অভিযোগ মানব কেন? জনে জনে ছাত্রকে ধরে ধরে প্রশ্ন করতে লাগলাম। তাদের উত্তরগুলো আমার, আমার দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে লাগল। জুনিচিও আপ্লুত। রিয়েকো হঠাৎ আমায় জিজ্ঞেস করল “আচ্ছা, এরা হিরোশিমা, নাগাসাকির কথা জানে?”
“আলবাৎ জানে।”
“দেখি, জিজ্ঞেস কর।”
ছাত্ররা ‘লিটল বয়’, ‘ফ্যাটম্যান’ পর্যন্ত যথাযথ বলে দিল।
সেবার ফেরত যাওয়ার আগে ওরা দুজনে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। সেদিন জানতে পারলাম রিয়েকোর বাবা-মা হিবাকুশা। ১৯৪৫ এর ৬ই আগস্ট হিরোশিমায় ছিলেন। রিয়েকো জাপানে যুদ্ধবিরোধী, পরমাণু অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। যাওয়ার আগে আমাকে ওদের আন্দোলনের স্মারক একখানা লকেট উপহার দিয়ে গিয়েছিল।
নব্বইয়ের দশকে তবু আমরা পরমাণু বোমাকে বড়সড় পেটো ভাবতাম। আজকাল যখন দেখি চকলেট বোমা ভাবা হচ্ছে, “লাহোরে একটা ফেলে দিলেই হয়” বলা হচ্ছে মুহুর্মুহু, যে বলছে সে বোঝেই না যে লাহোরে বোমা পড়লে তেজষ্ক্রিয়তায় আমাদের পাঞ্জাবের দেশপ্রেমিক মানুষও বাঁচবে না, তখন বেশ কষ্ট হয়। নিজের জন্যে নয়, শঙ্খবাবু, ডিজির মত মাস্টারমশাইদের জন্যে; রিয়েকোর জন্যে, তার বাবা-মায়ের জন্যে।
এসব বললে আমার অনেক বন্ধুবান্ধব, অনেক নিকটাত্মীয় সামনে বা পেছনে বলে “নিজেকে কী মনে করে ও? সব ব্যাপারে অন্যরকম কথা বলে নিজেকে এক্সেপশনাল প্রমাণ করতে চায়?”
কী করে বোঝাই বলুন? যারা এসব বলে তারাও কেউ কেউ স্যারেদের ক্লাসগুলো করেছে বটে, রিয়েকোর ছলছলে চোখদুটো তো দ্যাখেনি। ভাল করে তাকালে যেখান দিয়ে আজও সেই দৃশ্যটা দেখা যায় — বিরাট গর্ত, ধোঁয়ার কুণ্ডলী। অফসেট প্রিন্টের চেয়েও পরিষ্কার ছবিটা।

%d bloggers like this: