পূজার ছলে তোমায় ভুলে

rabindranath

একদা এক সহপাঠিনীকে আমার বেশ পছন্দ ছিল, প্রায় প্রেমে পড়ে যাই যাই অবস্থা। অন্য একজনের প্রতি আকর্ষণ প্রবলতর না হলে হয়ত প্রেমে পড়েই যেতাম সেইসময়। সে যা-ই হোক, সহপাঠিনীটির প্রতি আমার দুর্বলতার একটা বড় কারণ ছিল তার রবীন্দ্রপ্রীতি। মেয়েটিকে দেখতে বিলক্ষণ ভাল, আমার সাথে চিন্তাভাবনায় দিব্য মিল বলে মনে হত। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা মেয়েটির গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত চমৎকার লাগত। সে রবিবাবুর গল্প, কবিতা, উপন্যাসও গুলে খেয়েছিল। অতএব আমি ভীষণই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম একসময়। এখন ভেবে শিউরে উঠি, সত্যিই তার প্রেমে পড়ে গেলে কি দুর্দশাই না হত দুজনেরই।
অন্য অনেক হাফসোলপর্ব পেরিয়ে আমার গিন্নীর সাথে প্রেম, অতঃপর বিবাহের পরে ক্রমশ আবিষ্কার করলাম যে আমার সেই সহপাঠিনী আদ্যন্ত মুসলমানবিদ্বেষী। ভারতবর্ষ দেশটা যে হিন্দুদের এবং আর সকলেরই এখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকা উচিৎ — এ নিয়ে তার বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। জানতে পেরে শুধু অবাক নয়, রীতিমত আহত হয়েছিলাম। প্রেমিকা না-ই হল, বন্ধু তো বটে। এমন একজন মতের মানুষকে পরম বন্ধু ভেবে বসেছিলাম বুঝতে পারলে নিজের বোধবুদ্ধি সম্পর্কেই প্রশ্ন জাগে মনে। অবশ্য সেটা ২০১৪ গোড়ার দিক। অনেক কাছের লোককেই অচেনা লাগতে শুরু করার সময়। এখনকার মত অতটা গা সওয়া হয়নি তখনো ব্যাপারটা। কিন্তু অভ্যেস হয়ে যাওয়ার পরেও অনেকদিন পর্যন্ত আমার যেটা অবিশ্বাস্য লাগত সেটা হল রবীন্দ্রনাথে ডুবে থাকা একজন মানুষের মধ্যে মানবতাবোধের এরকম অভাব, ভারতীয়ত্ব সম্পর্কে এরকম একপেশে ধারণা কী করে জয়ী হয়?
পরবর্তীকালে আরো অনেকের সাথে মিলিয়ে দেখে যা বুঝলাম সেটা হল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের বাঙালিদের এত যে গর্ব, এত গদগদ ভাব — সব ভাঁওতা। রবীন্দ্রনাথকে আমরা বহুকাল হল বাদ দিয়েছি, পড়ে আছে এক ঠাকুর। লক্ষ্মীর পাঁচালি যেমন লোকে বুঝে বা না বুঝে গড়গড় করে পড়ে আমরা তেমন ওঁর গোটা কুড়ি গান আর ডজনদুয়েক কবিতা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শিখি এবং পারফর্ম করি। কথাগুলো কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশে না। ফলে যে প্রতিযোগিতায় ‘ভারততীর্থ’ আবৃত্তি করে প্রথম হয় সে রামমন্দির নির্মাণে করসেবা করতে অযোধ্যা চলে যায়। যে দিদিমণি রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় “বাংলার মাটি বাংলার জল” গায় সে মুসলমান ছাত্রীর এনে দেওয়া জল খায় না। আরো দেখলাম রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলো বড় একটা কেউ পড়ে না। ফলে রবীন্দ্রনাথকে একজন অরাজনৈতিক, সাঁইবাবাসুলভ লোক বলেই বেশিরভাগ বাঙালি মনে করে।
কি আশ্চর্য! যে লোক বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রাস্তায় নেমে এসে নেতৃত্ব দিয়েছে, রক্তকরবীর ভূমিকায় লিখেছে এই নাটক রূপক নয়, সরকারী গণহত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করেছে, কংগ্রেসের অধিবেশনের জন্য গান লিখেছে, নেতাজী কংগ্রেস ত্যাগে বাধ্য হওয়ায় রুষ্ট হয়ে গান্ধীজিকে চিঠি লিখেছে — সেই লোকের ছবি দেখিয়ে বাঙালি ছেলেমেয়েকে শেখায় “নম কর। ঠাকুর।” কোন বাঙালি? যে বাঙালি স্কুলের শেষ ধাপে থাকা ছেলেমেয়েকে পইপই করে শেখায় “কলেজে যাবে পড়াশোনা করতে, রাজনীতি করতে নয়।”
এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের শক্তি নন, আমাদের দুর্বলতা। যে কোন মধ্যমেধার চলচ্চিত্র পরিচালক বা নিম্নরুচির মেগা সিরিয়াল নির্মাতা একখানা লাগসই রবীন্দ্রসঙ্গীত গুঁজে দিয়েই নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে অন্তত পয়সা উঠে যাবে। লেখাপড়া জানা বাঙালিও এমন বিহ্বল হয়ে দেখবে যে মনে হবে ঋত্বিক বা সত্যজিতের ছবি দেখছে।
আসলে ভদ্রলোকের থেকে আমরা নিয়েছি লবডঙ্কা কিন্তু দিয়েই চলেছি — অবজ্ঞা। জেনে এবং না জেনে। “তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি”।

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply