স্বপ্নসুন্দর

শেলী পড়েছি অনেক অনেক পরে। কিন্তু মহম্মদ রফির গান শুনতে শুনতেই বুঝেছি, যে গানগুলো সবচেয়ে বেশিদিন মনে থাকে, হৃদপিন্ডে জড়িয়ে থাকে শিরা, ধমনীর মত — সেগুলো বিষাদের গান, বিরহের গান

23sld12112934720.jpg

আমাদের বাড়িতে মামার দেওয়া একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। আমার স্কুলমাস্টার বাবার রোজগারে রেকর্ড কেনা বড় সহজ ছিল না। একমাত্র পুজোর মাসে নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে একটা দুটো লং প্লেয়িং রেকর্ড কেনা যেত। কিন্তু গান শোনা থেমে থাকত না তা বলে। পরিচিত বা প্রতিবেশীদের থেকে রেকর্ড চেয়ে এনেও গান শুনতাম সেইসময়।
একদিন একটা রেকর্ড চেয়ে আনল বাবা, খাপটার উপরে দেখি একটা হাসিমুখ, টাকমাথা লোকের ছবি। সেই রেকর্ডটা চালিয়ে একটা গানের আগে বাবা বলল “এই ছবিটা জানিস, আমি বাবার সাথে হলে গিয়ে দেখেছিলাম। একটা বিরাট পাথরের মূর্তি। তার সামনে বসে একটা লোক আকুল হয়ে গানটা গাইছে। গান শুনে পাথরের মূর্তিটার চোখ দিয়ে জল পড়ে। ওদিকে পাথরের মূর্তি কাঁদছে, এদিকে আমরা কাঁদছি।”
জানি না গল্পটার প্রভাবে নাকি গায়কের গুণে, গানটা শুনতে শুনতে আমারও চোখে জল এসে গেল। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি বাবারও চোখে জল। সেটা গান শুনে নাকি নিজের শৈশবস্মৃতি মনে করে, নাকি ঐ গানটা আর বাবার স্মৃতি অবিচ্ছেদ্য হয়ে গিয়েছিল — সে বিচার করার মত বড় তখন আমি ছিলাম না। কিন্তু বেশ কয়েকবার শুনে আমার এত ভাল লেগে গেল গানটা যে প্রচন্ড বেসুরো গলায় গাইতে চেষ্টা করতে লাগলাম “ও দুনিয়া কে রখওয়ালে, সুন দর্দ ভরে মেরে নালে।”
তখন আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসতেন হিন্দমোটর কারখানার হিন্দিভাষী শ্রমিকরা। আমার বাংলা শিক্ষা তখনো হাসিখুশি দ্বিতীয় ভাগে না পৌঁছলেও তাঁদের সাথে বাবার কথোপকথন শুনে শুনে হিন্দি আমি বেশ বুঝতে পারি। ঐ রেকর্ডটাতেই আরেকটা গান ছিল যেটা আমার খুব পছন্দ হল। “কেয়া হুয়া তেরা ওয়াদা? ওয়ো কসম ওয়ো ইরাদা?” যতই হিন্দি বুঝি না কেন, প্রেম এবং তার প্রত্যাখ্যান বোঝার শক্তি তখন আমার মোটেও ছিল না। আসলে গায়কের গলার আওয়াজটাই বড্ড ভাল লেগে গেল। সেই ভাল লাগা নিয়ে মহম্মদ রফির সঙ্গে এতটা পথ।
শেলী পড়েছি অনেক অনেক পরে। কিন্তু মহম্মদ রফির গান শুনতে শুনতেই বুঝেছি, যে গানগুলো সবচেয়ে বেশিদিন মনে থাকে, হৃদপিন্ডে জড়িয়ে থাকে শিরা, ধমনীর মত — সেগুলো বিষাদের গান, বিরহের গান। চাপা কান্নায় বা উদগত অশ্রুতে রফির জুড়ি পাইনি।
স্মরণীয় গানে নিশ্চয়ই অনেকটা অবদান থাকে গীতিকার আর সুরকারের। কিন্তু আমার মত সঙ্গীতবোধহীন শ্রোতার মন জুড়ে থাকে শুধু মুখচোরা শিল্পীর মনোহরণ গলাটা। অল্প বয়সে প্রেমে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে তাই বারবার শুনতাম “এহসান তেরা হোগা মুঝ পর / দিল চাহতা হ্যায় ওয়ো কহনে দো”। সায়রা বানুর মুখে তখন দিব্য বসে যেত সেই মেয়েটির মুখ, কিন্তু স্বপ্নেও কন্ঠস্বরটা আমার হত না, মহম্মদ রফিরই থাকত।
ইদানীং বয়স দ্রুত বাড়ছে বুঝতে পারি। যদিও সন্ধের দিকে মেঘ করে এলে এখনো “দিওয়ানা হুয়া বাদল” মনে পড়ে অনিবার্যভাবে, আগেকার মত বাসে বোরখা পরা কোন সুন্দরীকে দেখলে চট করে “মেরে মেহবুব তুঝে মেরি মহব্বত কি কসম” মনে পড়ে না। তবে অবাক লাগে এই ভেবে যে দিনে পাঁচবার নমাজ পড়া এক মুসলমান কী করে পাথরের বিগ্রহ আর সেইসঙ্গে লক্ষ লক্ষ মূর্তিপুজোয় বিশ্বাসী শ্রোতাকে কাঁদাতে পারেন শুধু তাঁর কণ্ঠস্বর দিয়ে! এসব কি সত্যি ঘটেছিল, নাকি কোন চৈতালী রাতের স্বপ্নে আমাদের বাপ-ঠাকুর্দারা এসব দেখেছিলেন?

বড় দেশের দিন

আপনার যদি মনে হয় আমার ছেলে/মেয়ে ক্রিসমাস ক্যারল শিখে কেরেস্তান হয়ে যাবে, হলে সমূহ সর্বনাশ, তাহলে ঐসব স্কুলে পড়াবেন না। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে পড়াতে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুবছর আর প্রাথমিক শিক্ষার বছরচারেক বাদ দিলে আমার গোটা ছাত্রজীবন কেটেছে গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

আমাদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একজন সন্ন্যাসী। সেই স্কুলে আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন ছাত্রদের জন্য একটা আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল যার বিষয় ছিল ‘ধর্ম কি কুসংস্কার?’ বিতর্ক প্রতিযোগিতার মত এতেও পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল এবং প্রথম হয়েছিল ক্লাস সিক্সের একটি ছেলে, যার মূল বক্তব্য ছিল “হ্যাঁ, আচারসর্বস্ব ধর্ম অবশ্যই কুসংস্কার।”

আমাদের স্কুলে দুর্গাপুজো হত, একেবারে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে।

এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পরে ভর্তি হলাম রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সদর দপ্তরের নাকের ডগায় থাকা কলেজে। সম্পূর্ণ আবাসিক কলেজ, যেখানে সকাল সন্ধ্যে হোস্টেলের ঠাকুরঘরে প্রার্থনায় বসতে হয়। যদিও ঠাকুরের আসনে তিনজন মানুষের ছবি আছে, তবু ব্যাপারটাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে কোনভাবেই চালানো যায় না। কারণ প্রার্থনায় রামকৃষ্ণ, সারদা, বিবেকানন্দ ছাড়াও হিন্দু দেবদেবীর বন্দনা করা হয়। কিন্তু সেই প্রার্থনায় যাওয়া নিয়ে কোনদিন আমার সহপাঠী জাহির আর আমিনুলের মুখ ভার দেখিনি। স্পষ্টতই ওদের বাবা-মায়েদেরও এ নিয়ে কোন আপত্তি ছিল না। জাহির আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন হওয়ায় এ নিয়ে জিজ্ঞেসও করেছিলাম। ও বলেছিল “আমার বাবা তো ঠাকুর দেবতা মানে না। তাছাড়া এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিসিপ্লিন, জেনেশুনেই তো এসেছি। আর আমি প্রার্থনায় বসে আমার ভগবানের কাছেও প্রার্থনা করতে পারি। কেউ তো আটকাচ্ছে না।” পরেও আমার সহপাঠী ইফতে খারুল, আসিফ, ইমরান, ইকবাল — এদের কাউকেই এ নিয়ে একটা শব্দও খরচ করতে দেখিনি, প্রার্থনায় যেতে ওদের কোনরকম আপত্তি আছে এমন মনে করবারও কোন কারণ ঘটেনি।

এত কথা বলবার কারণ বড়দিন পালন নিয়ে যে বদমাইশিটা শুরু হয়েছে সেইটা। বহু লেখাপড়া জানা হিন্দু, যাদের ধর্মপালন বছরে একবার বাড়িতে লক্ষ্মী, সরস্বতী বা কালীপুজো করায় সীমাবদ্ধ, পেটে বোম মারলেও এক লাইন শুদ্ধ সংস্কৃত বেরোবে না, তারাও গত কয়েকবছর ধরেই নিজেদের হিন্দু পরিচিতি সম্পর্কে দেখছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সচেতন হয়ে উঠেছে। “আমি গর্বিত যে আমি হিন্দু” বলাটা বেশ একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে বছরসাতেক হল। ভাবখানা এমন যেন ওকে কেউ বলেছে “এ মা, তুই হিন্দু? ছ্যা ছ্যা ছ্যা! দূর হ! এবার থেকে তুই আমার বাড়ি এলে আলাদা থালা বাসনে খেতে দেব।” অথবা হিন্দু বলে ওকে ট্রেন থেকে মেরে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে অথবা নতুন জায়গায় গিয়ে বাড়িভাড়া পাচ্ছে না। মজার কথা, এরকম গর্বিত হিন্দুরা আবার লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েকে খ্রীষ্টান মিশনারিদের স্কুলে ভর্তি করে। তাতে ক্ষতি নেই। বহুবছর ধরে ঐ স্কুল, কলেজগুলো এদেশে উচ্চমানের শিক্ষা দিয়ে আসছে, রামকৃষ্ণ মিশনের মতই। কিন্তু সমস্যা এই যে হিন্দু বাবা-মায়েদের এখন এক অদ্ভুত ধারণা হয়েছে “ওরা কায়দা করে নিজেদের ধর্ম প্রচার করছে।”

কি আশ্চর্য! এরা নাকি লেখাপড়া শিখেছে! আমার সন্তানকে আমি জেনেশুনে খ্রীষ্টান সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীদের পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করলাম, তা তাঁরা তো সেভাবেই শিক্ষা দেবেন যেভাবে দেওয়া ভাল বলে তাঁরা মনে করেন। ওঁরা তো ওঁদের স্কুল কলেজের নিয়মকানুন গোপনও করেন না কখনো। ডন বসকো, অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ, লোরেটো বা সেন্ট জেভিয়ার্স তো আর হগওয়ার্টস নয় যে ভেতরে কী হচ্ছে বাইরের মাগল বাবা-মায়েরা জানতে পারে না। আপনার যদি মনে হয় আপনার ছেলে/মেয়ে ক্রিসমাস ক্যারল শিখে কেরেস্তান হয়ে যাবে, হলে সমূহ সর্বনাশ, তাহলে ঐসব স্কুলে পড়াবেন না। কে মাথার দিব্যি দিয়েছে পড়াতে? আজ অব্দি তো শুনলাম না লিলুয়ার কোন বাবা-মা পুলিশে ডায়রি করেছেন যে তাঁদের বাড়ির ছেলেকে ফাদাররা জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ডন বসকোয় ভর্তি করেছে। বরং অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও সেখানে ভর্তি করতে পারলেন না বলে বিলাপ করতে শুনি বহু বাবা-মাকে।

তাহলে আর এস এস প্রোপাগান্ডায় এই নির্বোধের মত আত্মসমর্পণ করে কী প্রমাণ করছেন আপনি? নিজের হিন্দু পরিচিতি না উজবুক পরিচিতি?

স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের ধরে ধরে খ্রীষ্টান বানানোর প্রকল্প যদি মিশনারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর থাকত তাহলে কলকাতার সচ্ছল বাঙালিদের মধ্যে অ্যাদ্দিনে খ্রীষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেত বোধহয়। নিজের ধর্ম নিজের বুকের মধ্যে রাখুন, মাথায় উঠতে দেবেন না। সবাই জমিয়ে কেক খান, বড়দিনে আনন্দ করুন। না করলে ক্ষতি আপনার। আমি নাস্তিক কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর খিচুড়ি, ঈদের সেমাই, ছটের ঠেগুয়া বা ক্রিসমাসের কেক — কোনটাই ছাড়ি না। কেন ছাড়ব? এই যে নানা স্বাদ এটাই তো আমার দেশের মজা, এই মজা উপভোগ করার জন্যে মানুষ হওয়াই যথেষ্ট, বিশ্বাসী হওয়ার দরকার পড়ে না। আপনি যদি এর একটা খান, অন্যগুলো না খান সেটা আপনার ক্ষতি। সে তো লোকে প্যালারাম বাঁড়ুজ্জের মত আলু পটল আর সিঙিমাছের ঝোল খেয়েও বেঁচে থাকে। অমন বাঁচায় আনন্দ কই?

রক্তপিপাসু বাঙালি

আফরাজুল মুসলমান অর্থাৎ বাঙালি নয় — এই কথাও দেখলাম লোকে বেশ রেলা নিয়ে বলে বেড়াচ্ছে। অবশ্য মাইকেল মধুসূদন আর কাজী নজরুল বাঙালি নন যারা বলতে পারে তাদের কাছে আফরাজুলের আর কী দাম?

afrazul

আখলাক আহমেদ খুন হওয়ার কয়েকদিন পরে আমি একটা খেলার প্রতিবেদন লিখতে একটা বিজেপিশাসিত রাজ্যে গেছি। সেই রাজ্যের সবচেয়ে শিল্পোন্নত শহরের অভিজাত এলাকায় তৈরি স্টেডিয়ামের অস্থায়ী প্রেস বক্সে গিয়ে রোজ বসি। ওখানকার পয়সাওয়ালা, ক্ষমতাবান লোকেরা আশেপাশেই এসে বসেন, খানিকক্ষণ ক্রিকেটমাঠের উত্তাপ নিয়ে যান, নিজেদের মধ্যে আবহাওয়া, হজমের গণ্ডগোল, ক্রিকেটটা আশির দশকে কেমন ছিল আর এখন কেমন হয়েছে, শহরের কোথায় এখন জমির দাম সবচেয়ে বেশি আর কোথায় সবচেয়ে কম — এইসব নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। সেই আলোচনায় একদিন দেখলাম সকলেই একমত হয়ে বলছেন যে একটা মুসলমান মরেছে তাতে দেশসুদ্ধু লোক মিলে যে লাফালাফিটা করছে সেটা অত্যন্ত অন্যায়। উত্তরপ্রদেশ সরকার আবার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে! হিন্দু মরলে দিত?
কিছুটা তফাতে বসে আমার গা চিড়বিড় করছে, নিজেকে শান্ত রাখছি এই বুঝিয়ে যে এই ধর্মান্ধগুলোর সাথে তখন তর্কে জড়ালে আমার কাজের বারোটা বাজবে। আরো যে ভাবনাটা শান্ত থাকতে সাহায্য করেছিল সেটা এই যে ওটা একে গোবলয়ের রাজ্য তায় বিজেপিশাসিত। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত লোকেরা এইভাবে ভাবে না। অন্য ব্যাপারে যতই মতের অমিল থাক, এই ধরণের হত্যার পক্ষ নিয়ে কেউ গলা ফাটায় না, যে খুন হল সরকার তার পরিবারের পাশে দাঁড়ালেও কেউ নোংরা মন্তব্য করে না। আফরাজুলের হত্যার পরের দিনগুলো আমার এই আত্মশ্লাঘাকে ইডেন থেকে ছয় মেরে বাংলার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে।
রামনবমীতে সশস্ত্র মিছিল দেখে আন্দাজ করেছিলাম, এবারে নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে বাঙালিদের মধ্যে গোমাতার সন্তানের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আফরাজুল সম্পর্কে লাভ জিহাদের গপ্পটা বাজারে পড়তে না পড়তে বাঙালি চৈত্র সেলের শাড়ির মত ঝাঁপিয়ে তুলে নিল এবং সেটাকে মানুষ খুনের যুক্তি হিসাবে রোজকার কথাবার্তায় এবং অবশ্যই সোশাল মিডিয়ায় চালিয়ে দিল। আফরাজুলের বিরুদ্ধে লাভ জিহাদের অভিযোগ যে আদৌ প্রমাণ হল না সেকথা ছেড়েই দিলাম। কিন্তু যে দেশে ধর্ষণ করে ড্যাংড্যাং করে মন্ত্রী হওয়া যায় সে দেশে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড, তাও আবার দন্ড দিতে আইন আদালত লাগবে না; রাম, শ্যাম, যদু, শম্ভু যে কেউ দন্ড দিতে পারে — একে যুক্তি বলে স্বীকার করে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করল কারা? রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, বেগম রোকেয়ার দেশের লোকেরা। আবার আফরাজুল মুসলমান অর্থাৎ বাঙালি নয় — এই কথাও দেখলাম লোকে বেশ রেলা নিয়ে বলে বেড়াচ্ছে। অবশ্য মাইকেল মধুসূদন আর কাজী নজরুল বাঙালি নন যারা বলতে পারে তাদের কাছে আফরাজুলের আর কী দাম? অপেক্ষায় ছিলাম কবে কোন ঘটনা নিয়ে বনলতা সেনগিরি শুরু হবে। বিরাট হিন্দু বাঙালি সেই সুযোগটা পেল হেমন্ত রায়ের মৃত্যুতে। কে হত্যা করেছে, কেন হত্যা করেছে কিছু জানতে পারার আগেই তারা যত ধর্মনিরপেক্ষ লোক সবার মা-মাসি উদ্ধার করে বলতে শুরু করল “এই হত্যার প্রতিবাদ হবে না কেন? একে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না কেন?”
আচ্ছা প্রতিবাদটা কার বিরুদ্ধে হবে? দুনিয়ার যেখানে যত খুন হচ্ছে নানা কারণে, সবকটারই প্রতিবাদ করতে হবে? সবকটাই নিন্দনীয় বললে মোটের উপর আপত্তি করার কিছু থাকে না কিন্তু সবকটারই নিন্দা করতেই হবে, নয়ত কোনটারই নিন্দা করা চলবে না, একথা যারা বলে তারা যে আসলে এক বিশেষ ধরণের খুনীর সমর্থক — একথা পরিষ্কার করে বলার সময় এসেছে। কী ধরণের খুনী তা নিয়ে যদি আপনার সন্দেহ থেকে থাকে তাহলে একবার কালকের খবরে চোখ রাখুন। রাজস্থানে শম্ভুলালের সমর্থনে আদালত আক্রমণ করে যেটা করা হয়েছে সেটাকে সন্ত্রাসবাদ ছাড়া অন্য কোন নাম দেওয়া যায় না। মাথার তেরঙ্গাটাকে টেনে নামিয়ে তার জায়গায় গেরুয়া পতাকা তোলা হয়েছে। আইসিসের আছে কালো পতাকা, এদের আছে গেরুয়া পতাকা। যে ভারত সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ ফুট উঁচু জাতীয় পতাকা লাগাতে চায়, পর্নো ছায়াছবির আগেও জাতীয় সঙ্গীত চালাতে চায় সেই সরকার কিন্তু এ নিয়ে চুপচাপ। অর্ণব গোস্বামী কী বললেন এ নিয়ে? কেউ শুনেছেন?
ও হ্যাঁ, ক্ষতিপূরণের কথা হচ্ছিল। ওটা তো রাজস্থান সরকারেরই দেওয়া উচিৎ ছিল। তাদের রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার এমন অবস্থা যে লোকে জানে একটা মুসলমানকে খুন করলে কিচ্ছু এসে যাবে না — এর জন্যেই তো প্রাণ গেল একটা নিরস্ত্র লোকের। এর দায় কোন না কোন সরকারকে তো নিতেই হবে। অতঃপর খুনী গ্রেপ্তার হল কিনা সেটা বড় কথা নয় কারণ অপরাধটা যেভাবে করা হয়েছে তাতে গ্রেপ্তার করার কাজটুকুই তো সরকারের ভাগে পড়ে ছিল। সেটুকু করার জন্যে তো আর বিরাট হিন্দুরা দাবী করতে পারেন না যে সকলে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেবে।
রাজস্থান সরকার অবশ্য আফরাজুলের খুনী, তার প্রতি সহানুভূতিশীল লোকেদের দায় নেবেন না সেটাই স্বাভাবিক কারণ মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে জননেত্রী নন, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আগ্রহী প্রশাসক নন। উনি উন্মত্ত জনতার নেত্রী। প্রমাণ চাই? গত ১৩ই ডিসেম্বর দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাৎকারটা পড়ে নিন। নেত্রীর সোজাসাপ্টা কথা “একটা কাস্টের লোকের ভাবাবেগে যখন আঘাত লেগেছে তখন পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়ার দরকারটা কী?” আরো অনেক মণিমুক্তো পাবেন ঐ সাক্ষাৎকারে যা বুঝিয়ে দেয় ক্ষ্যাপা জনতা যা চায় তাই-ই হবে রাজস্থানে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও সেই জনতারই একজন।
যাক সে কথা। এই বীভৎসতা দেখে কিন্তু এক শ্রেণীর বাঙালি যারপরনাই উল্লসিত। বসিরহাটের গন্ডগোলেই যারা ৩৫৬ ইত্যাদির দাবী করে ফেলেছিল তাদের রাজস্থানে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে এমনটা বলতে কিন্তু শোনা যাবে না। বাঙালির মোদীপ্রীতি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। নিত্যযাত্রী হওয়ার সুবাদে আজকাল প্রায়ই দেখি বাংলার বাসিন্দা বিহারী, মারোয়াড়িরা মোদীকে গাল পাড়ছেন। অথচ বাঙালিদের কি অচলা ভক্তি!
সক্রেটিসের ছাত্র আর এরিস্টটলের মাস্টারমশাই প্লেটো মনে করতেন গণতন্ত্র একটা ফালতু ব্যাপার কারণ এটা খুব ভাল চললে হয়ে দাঁড়ায় অভিজাততন্ত্র (plutocracy) আর খুব খারাপ চললে ক্ষ্যাপা জনতাতন্ত্র (mobocracy)। তা ভারতীয় গণতন্ত্র এখন একাধারে plutocracy এবং mobocracy। একদিকে দেশের সরকার থেকে ফুটবল পর্যন্ত সবকিছু চালাচ্ছে হাতেগোনা কয়েকজন পয়সাওয়ালা লোক, যাদের আরো বড়লোক করার জন্যে আগামীদিনে আমার, আপনার সাদা পথে অর্জিত টাকাও কেড়ে নেওয়ার আইন তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে আপনি কার পুজো করবেন, কী খাবেন, কী পরবেন, কী দেখবেন, কাকে বিয়ে করবেন, কার সাথে শোবেন সেটা ঠিক করে দেবে পাগলা কুকুরের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক জনতা আর সরকার সেই জনতারই পক্ষ নিয়ে কখনো আপনার লাঞ্ছনা দেখে চুপটি করে থাকবে, আর কখনো আইনের অপব্যবহার করে বা নতুন আইন বানিয়ে আপনার অত্যাচার বাড়িয়ে তুলবে। যদি সংখ্যালঘু হন তো আপনি বাঁচবেন না মরবেন সেটাও ঠিক করবে ঐ জনতাই। সরকার বলবে “জনতাকে ক্ষেপানো কেন বাপু? জনতা যেমনটি চায় তেমনটি করে থাকতে পারলে থাক, নইলে পাকিস্তান চলে যাও।”
তা বাঙালি ঐ plutocracy র দিকটায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না কারণ বাঙালির অভিজাত নেই গুজরাতি আর মারোয়াড়িদের মত, তাই mobocracy র দিকটায় সমানে সমানে লড়ে যাচ্ছে। ফাইট, মণি ফাইট।

যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

“বাবরি ভাঙার উদ্দেশ্য যদি না-ই থেকে থাকে তাহলে ‘মন্দির ওয়াহি বনায়েঙ্গে’ স্লোগানে ‘ওয়াহি’ বলতে আপনি কোন জায়গাটা বুঝিয়েছিলেন? কল্যাণ সিং এর বাড়ির বৈঠকখানাটা? প্রতীকী করসেবায় শাবল, গাঁইতি, তরোয়াল এসবই বা আসে কোথা থেকে?”

সকালের কাগজে দেখলাম এক বৃদ্ধকে নিয়ে একটা আবেগঘন লেখা বেরিয়েছে। হেডিংটা পড়েই মনে মনে একটা কাঁচা খিস্তি দিলাম। তারপরেই মনে পড়ল ছোটবেলায় একবার বাবার সাথে বাজারে গেছি, বাবা চায়ের দোকানে ঢুকেছে। এক অচেনা বুড়ো, দেখলেই তার জন্যে কষ্ট হবে আপনার, এক কোণে বসে চা খাচ্ছিল। চায়ের গেলাসটা মুখ অব্দি নিয়ে যাওয়াও তার পক্ষে কষ্টকর। বহুকষ্টে মুখের পেশি সঞ্চালন করে একবার বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল। বাবাও হাসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম “কে গো? চেনো?”
বাবা বলল “চিনব না? একসময় এ আমাদের কম ঠেঙিয়েছে? নামকরা গুন্ডা ছিল।”
“খুনটুন করেছে নাকি?”
“ঠিক জানি না। করেও থাকতে পারে এক আধটা।”
“এখনো গুন্ডামি করে?”
“না না। এখন তো বয়স হয়ে গেছে, ভদ্রলোক হয়ে গেছে।”
গুন্ডারা বয়স হলে ভদ্রলোকই হয়ে যায় বটে। কারণ উপায় থাকে না, জোয়ান গুন্ডাদের জায়গা ছেড়ে দিতে হয়।
নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কোন বৃদ্ধের কথা বলছি? হ্যাঁ, লালকৃষ্ণ আদবানির কথাই বলছি। তিনি নাকি বাবরি ধ্বংসে আজও ব্যথিত। লেখাটা পড়লে দেখবেন সেই চিরাচরিত হিন্দুত্ববাদের যুক্তিগুলো আবার আওড়ানো হয়েছে, নতুন কিছু নেই। আর বাবরি ধ্বংস সম্পর্কে আন্দোলনের এক নম্বর নেতা বলছেন তাঁর নাকি উদ্দেশ্য ছিল শুধু প্রতীকী করসেবা করা, মসজিদ ভাঙা নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে গেছিল।
আদবানির সঙ্গে কথা বলেছেন এক প্রবীণ সাংবাদিক। অদ্ভুত ব্যাপার হল ঝানু সাংবাদিকরাও ২৫ বছর পরেও এইসব ঢপ হজম করছেন। একবারও প্রশ্ন করেননি “বাবরি ভাঙার উদ্দেশ্য যদি না-ই থেকে থাকে তাহলে ‘মন্দির ওয়াহি বনায়েঙ্গে’ স্লোগানে ‘ওয়াহি’ বলতে আপনি কোন জায়গাটা বুঝিয়েছিলেন? কল্যাণ সিং এর বাড়ির বৈঠকখানাটা? প্রতীকী করসেবায় শাবল, গাঁইতি, তরোয়াল এসবই বা আসে কোথা থেকে?”
যাই হোক, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তার অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে তরতরিয়ে এগিয়েছে গত ২৫ বছরে। লালু গুন্ডা কালের নিয়মে নরেন গুন্ডাকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ভদ্দরলোক হয়ে গেছে। হিন্দুত্ববাদের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার এই যাত্রায় সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হল আমাদের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা। ভুলে যাবেন না। ভুলে যাবেন না নরেন্দ্র মোদী যদি হিন্দুত্ববাদের বিশ্বকাপজয়ী মহেন্দ্র সিং ধোনি হন, আদবানি তাহলে কঠিন পরিস্থিতিতে বিদেশের মাটিতে ম্যাচ জেতানো সৌরভ গাঙ্গুলি। এখন তিনি নিজেকে অময় খুরাসিয়া হিসাবে প্রমাণ করে হাত ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করলেই তাঁকে সেটা করতে দেওয়া চলবে না কারণ জার্মান ভাষায় একটা প্রবাদ আছে “যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয় তারা অভিশপ্ত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তারা করবেই।” জার্মানরা আবার এই ব্যাপারটা অন্য অনেকের চেয়ে ভাল জানে। ভুক্তভোগী তো।
যাতে ভুলে না যাই, তাই রইল আনন্দ পট্টবর্ধনের তথ্যচিত্র ‘রাম কে নাম’

স্খলনের শাস্তি

যৌনতা হল ছেনি, হাতুড়ির মত। ভাস্করের হাতে পড়লে মিকেলাঞ্জেলোর ডেভিড আর মন্দ লোকের হাতে পড়লে ধর্ষক, এমনকি শিশুধর্ষক গোলিয়াথ

broken-toy

বয়ঃসন্ধিতে বা প্রথম যৌবনে খবরের কাগজের যেসব ছবি আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম তার চেয়েও রগরগে ছবি এবং লেখা এখনকার যে কোন জিনিসের বিজ্ঞাপনে।
যেসব ছবি স্কুল, কলেজ পালিয়ে কোন এলাকার এককোণে পড়ে থাকা ছারপোকাময়, দুর্গন্ধ সিনেমা হলে চলত সেসব এখন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হলে পপকর্ন খেতে খেতে সামাজিক সম্মান না খুইয়েই দেখা যায়। সাধারণ বলিউডি ছবির আইটেম সং, যা বাবা, মা, কাকা, পিসী, মাসি, মামা সবার সঙ্গে বসেই দেখা যায় আজকাল সেগুলোতে কিভাবে নারীকে শুধু ভোগ্যবস্তু হিসাবে দেখানো হয় তা নিয়েও অনেক লেখালিখি হয়েছে।
বেশ মনে আছে, আমরা যখন স্কুলের শেষ ধাপে তখন কোন সহপাঠী ব্লু ফিল্ম দেখেছে বললে বাকিরা এমন করে তার দিকে তাকাত যেন সে মঙ্গলগ্রহ থেকে এইমাত্র পৃথিবীতে ল্যান্ড করল। এই রেলাটা নেওয়ার অভিলাষে কেউ কেউ না দেখে থাকলেও বলত দেখেছে। অথচ শূন্য দশকের শুরু থেকেই দেখছি ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকেই ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল, অতএব ইন্টারনেট, অতএব দেদার পর্ন।
বিদেশী পর্নোছবির এক নায়িকা আমাদের দেশে এসে রিয়েলিটি শো আর সফট পর্নে অভিনয় করে প্রায় ফেমিনিস্ট আইকন হয়ে গেলেন। অথচ নিজের দেশে, যেখানে পর্ন নিয়ে ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই, পর্নোছবির অভিনেত্রীকে কেউ খারাপ মেয়ে বলেও ভাবে না, সেখানেও ওঁকে কেউ বিদ্রোহী, বিপ্লবী ভাবত এরকমটা শুনিনি।
সেদিন দেখলাম ‘দুপুর ঠাকুরপো’ বলে একটা বাংলা ওয়েব সিরিজ হয়েছে যার ট্রেলার অনেকেই ফেসবুকে শেয়ার করছে। বিষয়বস্তু কী? না নির্জন বউদির সাথে পাড়াতুতো ঠাকুরপোদের পরকীয়া। ট্রেলারটা দেখলেই বোঝা যায় পরকীয়া মানে এখানে কোন সূক্ষ্ম সম্পর্ক, নষ্টনীড়সুলভ প্রেম, অভিমান ইত্যাদি বোঝানো হচ্ছে না। যা বোঝানো হচ্ছে তা হল হ্যাংলা যৌনতা।
যৌন ক্ষিদে বাড়িয়ে তোলার এতরকম উপায় এবং যৌনবিকৃতির এহেন মূলধারায় অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি আমাদের দেশে কামনা সুস্থভাবে চরিতার্থ করার সোজা পথ এখনো সোজা নয়। আর সবাইকে নাহয় বাদই দিলাম, এখনো যে কত বিবাহিত দম্পতিকে বাড়িতে লোক এলে আলাদা শুতে হয় (নাহলে “সবাই কী ভাববে”), সপরিবারে সিনেমা দেখতে গেলে পাশাপাশি বসা চলে না (পাশাপাশি বসায় যে যৌনতার য ও নেই সেটা অনেককেই বোঝানো বেশ শক্ত) তার তালিকা তৈরি করলে ভোটার তালিকার চেয়ে ছোট হবে না।
যৌনতা হল ছেনি, হাতুড়ির মত। ভাস্করের হাতে পড়লে মিকেলাঞ্জেলোর ডেভিড আর মন্দ লোকের হাতে পড়লে ধর্ষক, এমনকি শিশুধর্ষক গোলিয়াথ। এই মহামূল্যবান জিনিসটাকে বিক্রয়যোগ্য, শস্তা পণ্য করে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে প্রায়শই পিতৃতান্ত্রিকতা, সাংস্কৃতিক মৌলবাদ — এসব বলে ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে এদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিকৃত পুরুষদেরই হয়েছে সুবিধা। রাস্তাঘাটে কোন মহিলাকে দেখে কামনায় হিলহিল করা দিব্য ফ্যাশনেবল হয়ে গেছে। আগে বদ লোকেরা কোন মহিলার দিকে তাকাতে গেলেও ভাবত কেউ দেখতে পেলে কী ভাববে। এখন আর ও নিয়ে লজ্জা পাওয়ার বিশেষ কিছু থাকছে না।
অর্থাৎ বিকৃতিকে উস্কে দেওয়ার মত উপাদান চতুর্দিকে ঢালাও বিক্রি হচ্ছে। বিক্রির পক্ষে নানান যুক্তিও তৈরি হয়ে গেছে। মুশকিল হল সেসব কিনে নেওয়ার পরে কার বিকৃতি কতদূর যাবে তার সীমা বেঁধে দেওয়ার কোন উপায় নেই। মেয়েদের তো ছাড়ছেই না, যে শিশু মেয়ে হয়ে ওঠেনি আদৌ, তাকেও ছাড়ছে না।
এই ঘটনাক্রম আমরা নিজেদের চারপাশে দেখি, এবং অস্বীকার করি। এই যে কারণ নির্দেশ করার চেষ্টা করছি, এর জন্যে নির্ঘাৎ কয়েকজন তেড়ে এসে বলবেন অজুহাত দিচ্ছি। ধর্ষকদের ওকালতি করছি বললেও অবাক হব না। তাঁদেরকে আমার একটা কথাই বলার আছে। জঞ্জাল, আবর্জনা, জমা জল — এগুলো কি ডেঙ্গুর কারণ না অজুহাত? যদি আপনি মশার জন্মের রাস্তা বন্ধ করতে আগ্রহী না হন তাহলে মশাঘটিত রোগগুলো বারবার হবেই। যে বলবে ওগুলোর জন্যই ডেঙ্গু হচ্ছে তাকে যদি মশার হয়ে ওকালতি করছে বলেন তাহলে ক্ষতি আপনারই। মশা কেন কামড়াল তা নিয়ে রাগারাগি করে লাভ হবে কী?
হ্যাঁ, শিক্ষকের হাতে ছাত্রী ধর্ষিতা হলে আমাদের বেশি অসহায় লাগবে নিশ্চয়ই কিন্তু শিক্ষকরা তো আকাশ থেকে পড়েন না। আমাদের বাবা-মায়েরা যে শিক্ষকদের চোখ বুজে ভরসা করতেন তাঁরা তাঁদের সময়ের উৎপাদন, এখনকার শিক্ষকরা বর্তমান সময়ের। তাছাড়া আর সবকিছুর মত শিক্ষাও যে একটা পণ্য, শিক্ষকরা বিক্রেতা আর আমরা ক্রেতা — সে তো কবেই মেনে নিয়েছেন। তা দোকানে গিয়ে কি আপনি আশা করেন দোকানদার ভালবেসে ভাল জিনিস দেবে আপনাকে? করেন না। তাহলে শিক্ষককে বা স্কুলকেই বা একজন দোকানদারের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে যাবেন কেন? পাকা ক্রেতার মত ছেলেমেয়েকে ভর্তি করার আগেই দেখে নিন যে স্কুলে ভর্তি করছেন সেখানে ছেলেমেয়ে কতটা নিরাপদ, কী কী ব্যবস্থা আছে।
আরেকটা কথাও না বলে পারছি না। জি ডি বিড়লা স্কুলের মেয়েটার ধর্ষকদের দেখে রাগে আমার গা যতটা ঘিনঘিন করছে ততটাই ঘেন্না করে যখন দেখি পাড়ার পুজোয় ধুনুচি নৃত্য প্রতিযোগিতার জায়গা নিয়েছে বুগিউগি আর সেখানে চার, পাঁচ, ছয় বছরের মেয়েরা হিন্দি আইটেম সং এ ছবির আইটেম গার্লের মতই সাজপোশাক পরে, তেমনই ভুরু নাচিয়ে, কোমর দুলিয়ে নাচছে, পুরস্কার পাচ্ছে। হাততালি দিচ্ছে তার বাবা, পাড়াতুতো কাকু, জেঠুরা। টিভির লিটল চ্যাম্পমার্কা অনুষ্ঠানে নিজের মেয়েকে প্রতিযোগী করে পাঠিয়ে এইসব নাচ নাচিয়ে গর্বিত হন যে বাবা-মায়েরা তাঁদের দেখেও আমার বমি করতে ইচ্ছা করে। জি ডি বিড়লার ঐ দুই শিক্ষককে খুব বর্বর কোন শাস্তি দেওয়া হোক, সঙ্গে এইসব বাবা-মায়েদেরও।

রূপবতী

ঐ যে এক গাঁ লোক মিলে একটা মেয়েকে মৃত স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত পোড়ানো (বা পুড়তে দেওয়া), তার মৃত্যুর পর তাকে ভগবান বানিয়ে ফেলা, যেখানে পোড়ানো হয়েছে সেই জায়গাটাকে তীর্থক্ষেত্র করে তোলা — ওটাই রাজপুতদের গর্বের জিনিস

শাহ বানোর নাম জানে না এমন কোন লিখতে পড়তে জানা ভারতীয় বোধহয় আর অবশিষ্ট নেই। যারা জানত না তারাও কয়েকমাস আগে তিন তালাক এবং অভিন্ন দেওয়ানী বিধি নিয়ে বিজেপির কিং কং সুলভ বুক চাপড়ানোর সূত্রে জেনে গেছে শাহ বানো কে। ঐ ভদ্রমহিলার নামটা ভারতীয় দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মুসলমানবিদ্বেষীরা চট করে ভুলবে না কারণ মুসলমানরা যে এখনো “আধুনিক হয়নি”, তারা যে “এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে” সেটার এমন হাতেগরম প্রমাণ পাওয়া যায় না তো চট করে। কিন্তু বলুন “রূপ কানোয়ার”, অনেকেই বলবে “সেটা আবার কে?” যারা ফেসবুকে জহরলাল নেহরু আর বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিতের ছবি শেয়ার করে জহরলালকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করে তারা তো বটেই। রূপ কানোয়ার একটা বছর আঠেরোর মেয়ে। ১৯৮৭ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর তার চব্বিশ বছর বয়সী স্বামীর চিতায় সে সতী হয়।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। সতী হয়, অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যায়। এই সেই প্রথা যা রদ করার জন্যে রামমোহন রায় (“এমনকিছু ভাল লোক ছিলেন না। হিন্দুধর্মের অনেক ক্ষতি করেছেন” — আনুমানিক ১৯৯৯ সালে জনপ্রিয় এবং তথাকথিত আধুনিক এক হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের সন্ন্যাসীর মন্তব্য) আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে এখান থেকে লন্ডন পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন এবং তার ফলে ১৮২৯ এ লর্ড বেন্টিঙ্কের আমলে আমাদের ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই জঘন্য প্রথাকে বেআইনি ঘোষণা করে। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, ১৯৮৭ তেও কেউ সতী হচ্ছে মানে ১৫৮ বছরেও হিন্দুরা সকলে আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের আইন যা বলে বলুক, ধর্মীয় ভাবাবেগের উপরে কোনকিছুর স্থান তাদের কাছে নেই। ঐ সময়কার প্রতিবেদন বলছে, কয়েকশো লোকের সামনে রূপ কানোয়ার সতী হয়। সে স্বেচ্ছায় সতী হয়নি (হলে সেটাও আত্মহত্যা বলে আইনত অপরাধ), তাকে জোর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ থাকায় পুলিশি তদন্ত ইত্যাদি হয়। যথারীতি কিছু প্রমাণ করা যায়নি। কয়েকশো লোককে কে চটাতে যাবে? শেষমেশ সতী হতে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনি কার্যকলাপ চালু হয়। কিন্তু তারাও ২০০৪ সালে প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পায়। পদ্মাবতী ছবিটা কেন মুক্তি পাওয়া উচিৎ নয়, তার পক্ষে একটাই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে — “Rajput pride”। সেটা কী জিনিস বুঝতে হলে রূপ কানোয়ারের ঘটনাটা খুব প্রাসঙ্গিক। ঐ যে এক গাঁ লোক মিলে একটা মেয়েকে মৃত স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত পোড়ানো (বা পুড়তে দেওয়া), তার মৃত্যুর পর তাকে ভগবান বানিয়ে ফেলা, যেখানে পোড়ানো হয়েছে সেই জায়গাটাকে তীর্থক্ষেত্র করে তোলা — ওটাই রাজপুতদের গর্বের জিনিস।
গা ঘিনঘিন করছে? কেন ভাই? এরা তো মুসলমান নয়, হোক না মধ্যযুগীয়। রাজপুতরা নাকি বরাবর বীরের জাত। এমন বীর যে তাদের মেয়েদের শেখানো হত শত্রু আক্রমণ করলে নিজের যৌন শুদ্ধতা বাঁচাতে আগুনে ঝাঁপ দেবে, তবু যেন শত্রুর হাতে পড়ো না। এর আবার গালভরা নাম আছে — জহরব্রত। আলাউদ্দিন খিলজি যখন রাজপুতানা আক্রমণ করেন তখন নাকি রানী পদ্মাবতী (আমাদের অবনীন্দ্রনাথের রাজকাহিনীর পদ্মিনী) এই জহরব্রতই পালন করেন।
এটা ইতিহাস না নেহাত গপ্প সে বিতর্কে যাবই না। নাহয় ইতিহাসই হল। কিন্তু এই ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে একজন মহিলার যৌন শুদ্ধতা তার জীবনের চেয়েও মূল্যবান, অতএব যিনি নিজের মানরক্ষায় প্রাণত্যাগ করেছেন তিনি দেবী — এই চিন্তাভাবনা যাদের, তাদের তো আধুনিক মানুষ বলা চলতে পারে না। তাহলে স্বীকার করতে হয় যে হিন্দুদেরও অনেকেই এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে।
একদল বিজ্ঞ লোক বলবে “১৯৮৭র একটা ঘটনা দিয়ে ২০১৭র রাজপুতদের বদনাম করছে। যত্তসব।” সেইসব বিজ্ঞদের জ্ঞাতার্থে বলি ২০১১র জনগণনা অনুযায়ী রাজস্থানে প্রতি হাজার জন পুরুষপিছু মাত্র ৯২৮ জন মেয়ে। জাতীয় অনুপাতের চেয়েও রাজপুত বীরপুঙ্গবদের রাজস্থান অনেক পিছিয়ে। শূন্য থেকে ছয় বছরের শিশুদের মধ্যে হিসাব করলে সংখ্যাটা আরো ভয়াবহ — ৮৮৮। বোঝাই যাচ্ছে রাজপুতরা তাদের মেয়েদের নিয়ে কি দারুণ গর্বিত। আমাদের মেয়েরা শত্রুর এঁটো হয় না — এইটাই ওঁদের একমাত্র গর্বের জায়গা আর কি। স্বভাবতই পদ্মাবতী সিনেমার পর্দায় নাচলে গাইলে ওঁদের গর্বে আঘাত লাগবে বইকি। সিনেমা যে বাস্তব নয় সেসব বুঝিয়ে লাভ কী? যেদেশে গুরমীত রাম রহিম সিং এর সুপারহিরো ফিল্ম হিট হয় সেদেশে ও যুক্তি শুনবে কে?
এসব বলার মানে এই নয় যে রাজপুত মানেই নরাধম। সত্যি বলতে কি, শুধু রাজপুত নয়, এদেশের সর্বত্রই উচ্চবর্ণের লোকেরা নানারকম অমানুষিক আচার হাজার বছর ধরে চালিয়ে এসেছে। এই বাংলায় যেমন কুলীন ব্রাক্ষ্মণরা বিয়ে করাটাকেই একটা পেশায় পরিণত করে ফেলেছিল। বাঁড়ুজ্জে বংশে যখন জন্মেছি তখন খুঁজলে নিশ্চয় আমার কোন পূর্বপুরুষকেও পাওয়া যাবে যে এরকম বিকৃত ব্যবসায় লিপ্ত ছিল। তা বলে আমি, একবিংশ শতকের মানুষ, আমি কি সেসবকে সমর্থন করব? কুলীন বামুনদের নিয়ে কেউ ছবি করলে কি বাংলার চাটুজ্জে, বাঁড়ুজ্জে, মুখুজ্জে মিলে সিনেমা হল ভাঙচুর করতে নামবে না পরিচালকের মাথা কাটতে চাইবে?
কল্পনা করতেও কষ্ট হচ্ছে, তাই না? এর কারণ কিন্তু এই নয় যে বাঙালি ব্রাক্ষ্মণরা সব দেবতুল্য, রাজস্থানের কর্ণি সেনার রাজপুতদের মত নয়। কারণটা ইতিহাস। বিশদে বলার জায়গা এবং সময় যেহেতু নেই তাই সংক্ষেপে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে কারণটা রামমোহন আর বিদ্যাসাগর। শশী থারুর বলে এক নিপুণ বক্তা এবং ধুরন্ধর ভদ্রলোক বলেছেন রাজপুত ঐতিহ্য ভারতীয় ঐতিহ্যের অপরিহার্য অঙ্গ। অতএব তাদের ঐতিহ্যের অপমান না হয় সেদিকে সকলের নজর দেওয়া উচিৎ। রামমোহন আর বিদ্যাসাগর এইসব ঐতিহ্যের স্বরূপ থারুরের চেয়ে অনেক ভাল জানতেন। তাই ওসবের তোয়াক্কা না করে বিধর্মী, বিজাতীয় শাসকের কাছে সতীদাহ, বহুবিবাহের ঐতিহ্যের বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দেওয়ার জন্যে তদবির করতে একদম দ্বিধা করেননি। সেসময়কার বামুন, কায়েতরা আজকের কর্ণি সেনার মতই আচরণ করেছিল। পার্থক্যের মধ্যে ইংরেজ সরকার বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার মত “ইশ! ওরা কি দুষ্টু!” বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। অসভ্য ঐতিহ্যগুলোকে বেআইনি করে ছেড়েছিল।
আরেকটা সুবিধা তখন ছিল। সেসময় অতিচালাক, স্বার্থান্বেষী, ঘুষখোর বুদ্ধিজীবী আর সাংবাদিক ছিল না যারা সরকারের মদতপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীগুলোকে ন্যাকামি করে “fringe element” বলবে। এরা আছে বলেই আইনের শাসনের উপরে কোন গোষ্ঠীর ভাবাবেগের এই অবাধ দৌরাত্ম্য নির্ঝঞ্ঝাটে সম্ভব হচ্ছে। শাসক দলের নেতা লাইভ টিভিতে বসে আইএসের ঢঙে খুনের হুমকি দিচ্ছে, নায়িকার অঙ্গহানির হুমকি দিয়ে ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে লোকে, সরকার কিছুই করতে পারছে না। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের এই এক মজা। তাঁরা সবাই ভীষণ পরিশ্রমী, উপযুক্ত এবং জনপ্রিয় কিন্তু সঙ্কটের সময়ে তাঁরা কেউই কিছু করে উঠতে পারেন না। যেমন ২০০২ এ মোদী পারেননি আরকি। সব মিলিয়ে দীপিকা পাড়ুকোনের নাক আস্ত থাকলেও দেশ হিসাবে ভারতের নাক কাটা গেছে। নিজেদের সভ্য বলে দাবী করার অধিকার আমরা ক্রমশ হারাচ্ছি।
দুঃখের বিষয় এই যে এমন একটা ছবি নিয়ে এই কান্ড হচ্ছে যেখানে আধুনিক ভারতে একেবারেই অনুকরণীয় নয় এমন এক চরিত্রকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে। সঞ্জয় লীলা বনশালী তো সমাজসচেতন বাস্তবধর্মী ছবি বানানোর বান্দা নন। তিনি কেবল মনোরম দৃশ্যপট তৈরি করেন। দেবদাসের নিদারুণ ট্রাজেডিও তাঁর হাতে পড়ে রাঙা টুকটুক করে। এমন পরিচালকের এই দুর্গতির কোন মানে হয়! তাছাড়া এরপরেও তো তিনি একবারও বলছেন না এস দুর্গা আর ন্যুড ছবির সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে তাও কম আঘাত নয়। এতদিন কল্পজগতে বাস করেছেন বেশ করেছেন। এখন যখন নাচগানওলা ফর্মুলা ছবি বানাতে গিয়েও গোষ্ঠীর এবং রাষ্ট্রের গুন্ডামি সহ্য করতে হচ্ছে তখন অন্তত বেপরোয়া হয়ে উঠুন না। দেখান না একটা অন্য কল্পজগত। বানান না রূপ কানোয়ারকে নিয়ে একটা ছবি, যেখানে স্বামীর চিতা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে অমিতাভ বচ্চনের মত একাই শ্বশুর, দেওর আর তাদের গুন্ডাবাহিনীকে নিকেশ করবেন দীপিকা। তারপর নীচু জাত বা মুসলমান বলে যে প্রেমিকের সাথে বিয়ে দেননি বাবা-মা, সেই রণবীরকে বাইকের পেছনে চাপিয়ে চলে যাবেন অনেক দূরে, “Rajput pride” কে কাঁচকলা দেখিয়ে।
পুনশ্চ: আমার ধারণা এই লেখাটায় বেশকিছু লোক মন্তব্য করবে যে এর মধ্যে হিন্দু, মুসলমানকে টেনে আনা নোংরা রাজনীতি বা মূর্খামি। রাজপুত ভাবাবেগে আঘাত লাগায় রাজস্থানের মুসলমানরাও আহত। এর প্রমাণ হিসাবে বলা হবে যে আজমের শরীফও পদ্মাবতীর মুক্তির বিরোধিতা করেছে। উত্তরে বলি, আজমের শরীফের ঘাড়ে কটা মাথা যে বিরোধিতা না করে? যে রাজপুতদের মুখ্যমন্ত্রীই ছুঁতে পারেন না তাদের বিরোধিতা করবে সংখ্যালঘুরা?

বড়দের ছেলেমানুষি

শিশুরা আর শিশু থাকছে না আজকাল। কারণ বড়রা থাকতে দিচ্ছে না

শিশুসুলভ আচরণ শিশুরা করলেই ভাল লাগে, তাই না? বড়রা তেমন করলে সবসময় যে হেসে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব তা নয়। অনেকসময় অসহ্য লাগতেই পারে। আর সত্যি কথা বলতে কি, বড়রা শিশুদের ভাল আচরণগুলো অনুসরণ করছে এমনটা কমই দেখা যায়, বেছে বেছে খারাপগুলোই করে। এব্যাপারে বড়দের ধারাবাহিকতা এমনই যে আমার তো সন্দেহ হয় আদৌ খারাপ আচরণগুলো শিশুদের নিজেদের মাথা থেকে বেরোয় কিনা। হয়ত সেগুলো তারা বড়দের থেকেই শিখেছে! অনেকক্ষেত্রে তো আমি নিশ্চিত যে ওগুলো তাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটু উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে।
নার্সারিতে পড়ে তিনটে বাচ্চা মেয়ে। দুজন টকটকে ফরসা, একজন শ্যামবর্ণ। ফরসা দুজনের একজন আর শ্যামবর্ণ মেয়েটা রোগা প্যাটকা, অন্যজন গোলগাল। একজনের বাবা-মা চাকরিজীবী, দুজনের মা গৃহবধূ। একজনের বাবার ব্যবসা। মেয়ে তিনটে কিন্তু এসব কিছুই জানে না এবং জানার প্রয়োজনও বোধ করে না। প্রত্যেকের কাছে অন্য দুজনের একটাই পরিচয় “বন্ধু”। এরকমটা বড়দের মধ্যে বড় একটা দেখা যায় কি? বড়রা তো বন্ধুত্বও পাতায় অনেককিছু বিচার করে। কেউ কেউ তো বামুন না কায়েত না শিডিউলড কাস্ট সেটাও বিচার করে।
এবার এই তিনজনের মধ্যে ঢুকে পড়লেন একজনের বাবা-মা। কোন একদিন শ্যামবর্ণ মেয়েটার বাবার চোখে পড়ল গোলগাল মেয়েটা স্কুলে এসেছে বাবার গাড়ি চেপে। পত্রপাঠ মেয়েকে বোঝানো হয়ে গেল “ওর সাথে মিশবি না। ওরা অনেক বড়লোক, ওদের সাথে আমাদের মেলে না।” এরকম অযৌক্তিক যুক্তিকে ছেলেমানুষি ছাড়া কিছু বলা যায় কি? কিন্তু এটাকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই কারণ মেয়ে পরেরদিন স্কুলে গিয়ে তিন নম্বর বন্ধুকেও বুঝিয়ে দিল, গোলগাল মেয়েটার সাথে বন্ধুত্ব করা উচিৎ নয়। অর্থাৎ বড়দের অন্যরকম মানুষকে এড়িয়ে চলা বা অকারণে শত্রু মনে করার যে অভ্যাস তা ঢুকিয়ে দেওয়া হল ছোটদের মধ্যে। গাড়ির মালিক হওয়ার কারণে অন্যদের ছোট করে দেখার কোন প্রবণতা যদি মেয়েটার বা তার বাবা-মায়ের মধ্যে দেখা যেত, তাহলে নাহয় ভাবা যেত মেয়ের বাবা তাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন মাত্র। কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন কোন প্রমাণ নেই।
আরেকটা উদাহরণ দিই।
ক্লাস ফাইভের দুটো মেয়ে। তারা একসাথে এক স্কুলে পড়ছে সেই নার্সারি থেকে। ভারী ভাব। একজন টুকটুকে, অন্যজন কুচকুচে। বড়রা কাউকে ফেয়ার এন্ড লাভলি মাখতে বলতেই পারে কিন্তু শিশুরা ওসব নোংরা ছেলেমানুষি করে না ফলে দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতেই পারে না এতগুলো বছর ধরে। অথচ সেই টুকটুকে মেয়েটা একদিন কুচকুচে মেয়েটাকে বলল “শোন, তুই না আমার পাশে বসবি না। তুই তো খুব কালো, আমার পাশে বসলে আমার রঙ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”
এই ছেলেমানুষি এতবছর পরে মেয়েটার মাথায় এল কোথা থেকে বলুন দেখি, যদি বড়রা না শিখিয়ে থাকে?
শিশুরা আর শিশু থাকছে না আজকাল। কারণ বড়রা থাকতে দিচ্ছে না। আমাদের বড়রা এর চেয়ে অনেক ভাল ছিলেন। মানতেই হবে নিজেদের কুবুদ্ধিগুলো বড় হওয়ার আগেই আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন না। “অমুক মেয়ের সাথে মিশবি না কারণ তুই ফরসা আর ও কালো” বা “অমুকের বাবার গাড়ি আছে, তোর বাবার নেই। অতএব ও তোর বন্ধু হতে পারে না” এরকম বলতে আমার বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের বাবা-মা — কাউকে শুনিনি। তাঁরা অবশ্য যারা ফেল টেল করে তাদের সাথে মেশা বড় একটা পছন্দ করতেন না, যারা ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হত তাদের মায়েরা কেউ কেউ কড়া নজর রাখতেন যাতে তারা আমাদের মত সাধারণ ছেলেপুলের সাথে না মেশে। কিন্তু তা বলে ছেলেমেয়েদেরই এসব বলতে শিখিয়ে দিতেন না। আর তাঁদের বাবা-মায়েরা সম্ভবত আরো উন্নত জীব ছিলেন কারণ আমার স্কুলমাস্টার বাবার কোন ক্লাসে একবারে না ওঠা অনেক বন্ধু আমৃত্যু ছিল।
আসলে বোধহয় তখনকার বাবা-মায়েরা পরীক্ষার নম্বর পাওয়ার সাথে মানুষ হওয়ার যে কোন যোগাযোগ নেই সেটা বুঝতেন, আমরা বুঝি না। আমাদের সময়ে এমন বেশকিছু ছেলেমেয়ের দেখা পাওয়া যেত যাদের সম্পর্কে ঠাট্টা করে বলা হত “যে ক্লাসে ওঠে সেখানেই শিকড় গেড়ে ফ্যালে।” আজকাল বোধহয় পাশ করা আরো সহজ হয়ে গেছে বলে খুব একটা কেউ ফেল করে না। কিন্তু তাতে কী? মনুষ্যত্বের পরীক্ষায় যে আমাদের ছেলেমেয়েরা অনবরত ফেল করে চলেছে। আমাদের সময়কার সবচেয়ে খারাপ ছাত্ররাও কিন্তু শিশু থেকে কিশোর হতে না হতেই পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে একটা দুধের শিশুকে খুন করে ফেলার কথা কল্পনাও করতে পারত না।
আবার বড়দের ছেলেমানুষি দেখুন — এই যেখানে অবস্থা সেখানে স্কুলে, বাড়িতে, টিভিতে ঘটা করে শিশু দিবস পালন করছে। নাকি এটার মানে হল “এই একটা দিন তোমাদের শিশু থাকার অনুমতি দিলাম। বাকি ৩৬৪ দিন বড়দের মত নোংরামো করতে হবে”?

ফ্যাসিবাদের মানবজমিন

শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন

ভারতে ফ্যাসিবাদের জন্য জমি কেমন উর্বর এবং নরেন্দ্র মোদীর মত লোককে উপড়ে ফেলা কেন শক্ত সেটা বোঝা খুব সোজা। এর কারণটা হল এখানে ফ্যাসিবাদের অনেকগুলো মাথা। মোদী বা অমিত শাহ বা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে খবর করার জন্য সম্পাদকের চাকরি যাওয়া, সাংবাদিকদের খুন বা ধর্ষণের হুমকি পাওয়া, সাধারণ মানুষ বা বিখ্যাত কেউ সরকারের কোনরকম সমালোচনা করলেই অনলাইন বা অফলাইনে গালাগাল, তাকে ভাতে মারার চেষ্টা — এসব গত কয়েকবছরে জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে এটা যে ঘটছে তাও আপনি বলতে পারবেন না। বললেই “পাকিস্তান চলে যাও” ইত্যাদি। আজও কানহাইয়া কুমারকে এক জায়গায় মেরেধরে নীরব করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটা যত ব্যাপক ভাবছেন তার চেয়েও অনেক বড় কারণ প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানিতে একটাই দল এভাবে বিরোধীদের গলা টিপে ধরত কিন্তু ভারতে শুধু সঙ্ঘ পরিবার এমন করছে তা নয়, ফলে এসব যে অন্যায় এটুকুই অনেক মানুষকে বোঝানো শক্ত। এমনিতেই শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন। সুতরাং যার ক্ষমতা কম বা নেই তাকে কথা বলতে না দেওয়া আমাদের সংস্কৃতি আর সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে নির্লজ্জ ব্যবহার করেন আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। না, শুধু বিজেপি নয়।
কয়েকদিন আগেই তামিলনাডুর কার্টুনিস্ট জি বালাকে হাজতবাস করতে হল। তাঁর অপরাধ তিনি মুখ্যমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার আর ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরকে নগ্ন দেখিয়েছেন তাঁর এক কার্টুনে। অতএব প্রশাসন ভীষণ সক্রিয় হয়ে ব্যবস্থা নিয়ে নিল ঝটপট।
মনে রাখবেন তামিলনাড়ু এমন রাজ্য যেখানে কিছুদিন আগে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায়নি দীর্ঘদিন। জয়ললিতা মারা যাওয়ার পর থেকে কে কার পক্ষে, কে জয়ললিতার বড় ভক্ত তা নিয়ে ডামাডোলে বেশ কিছুদিন কোন মুখ্যমন্ত্রীই ছিল না। অথচ যেই কার্টুনিস্টকে গ্রেপ্তার করার কথা এল, প্রশাসন যন্ত্রের মত দ্রুত কাজ করল। দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাশালীদের ল্যাংটো করে দেওয়াই যে কার্টুনিস্টের কাজ সেকথা আর শুনছে কে?
আরো ঘরের কাছে আসুন। ডেঙ্গু হয়েছে কি হয়নি তাই নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ আর সরকারের মধ্যে তর্কাতর্কি চলতে চলতে কতগুলো প্রাণ চলে গেল, প্রশাসন চলছিল গদাই লস্করী চালে এবং ডেঙ্গুর চেয়ে বড় শত্রু ঠাউরেছিল ডেঙ্গুর খবরকে। যেই না এক ডাক্তারবাবু ফেসবুকে পোস্ট করলেন ডেঙ্গু নিয়ে, অমনি দারুণ দ্রুততায় তিনি সাসপেন্ড হয়ে গেলেন। অম্বিকেশ, শিলাদিত্য ইত্যাদি পুরনো নামগুলো আর নাহয় না-ই বললাম।
আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে ডেঙ্গু নিয়ে একটা পোস্ট দেওয়ার পরে এক শুভাকাঙ্ক্ষী অগ্রজ সাংবাদিক ফোন করে সতর্ক করেছিলেন “খুব সাবধান। তুমি যা লিখেছ তার চেয়েও নিরীহ কথা লিখে কিন্তু এরাজ্যে লোকে গ্রেপ্তার হয়েছে।” ডাক্তার দত্তচৌধুরীর হাল থেকে স্পষ্ট যে সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত সঙ্গত।
তা এই দেশে আর আপনি লোককে বোঝাবেন কী করে যে বিজেপি সরকার যা করছে তা এমার্জেন্সিরই নামান্তর! পঁচাত্তর থেকে সাতাত্তর পর্যন্ত গণতন্ত্রকে গণধর্ষণ করার পরেও তো আজও অনেক শিক্ষিত লোক ইন্দিরাকে ভারতের সেরা প্রধানমন্ত্রী বলেন। স্বাভাবিকভাবেই মোদীবাবু তাঁকেও ছাড়িয়ে যাবেন। ওনার আমল নিয়ে হয়ত বইটই লেখা হবে। তবে মমতার সাথে যতই শত্রুতা করুন, একনায়কত্বের ইতিহাসে অন্তত কয়েকটা পাতা পাওয়ার থেকে আমাদের দিদিকে উনি বঞ্চিত করতে পারবেন না।

স্বর্গসুখ

lenin

১৯৮৯-৯১ এ যখন সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় হয় তখন সারা পৃথিবীজুড়ে শোনা গিয়েছিল এই প্রতিশ্রুতি যে পুঁজিবাদের শুধু চূড়ান্ত বিজয়ই হয়নি, সারা পৃথিবীর মানুষকে এবার থেকে পুঁজিবাদ দারিদ্র্য, অশিক্ষা, স্বাস্থ্যের অভাব — এসব থেকে মুক্তির পথ দেখাবে, পৃথিবীতে স্বর্গ নামিয়ে আনতে পারে পুঁজিবাদই।
রাত পোহালেই ৭ই নভেম্বর। বিপ্লবের বাতিল ঘোড়ার বয়স ১০০ পূর্ণ হবে। আজ প্রকাশ পেল প্যারাডাইস পেপার্স। বছর দেড়েক আগের পানামা পেপার্সের পর আবার আমরা জানতে পারছি দুনিয়ার বড় বড় ধনীরা কিভাবে গণতান্ত্রিক দেশের কর ফাঁকি দিয়ে নিজেদের গুপ্তধন কোথায় লুকিয়ে রাখে। গত কুড়ি বছরে উদারনৈতিক গণতন্ত্র কি দারুণ সফল হয়েছে সম্পদের সুষম বন্টনে, সেটাও বুঝতে পারছি। কেমন স্বর্গ নেমে এসেছে পৃথিবীতে তাও দেখতে পাচ্ছি। স্পষ্টতই পুঁজিবাদের কোন বিকল্প নেই। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চেসেস্কুর মত বাথরুমে সোনার কল লাগানোর সাহস কারো হয় না, তাই বারমুডা দ্বীপে যক্ষের কাছে গুপ্তধন রাখা হয়। গুপ্তধন, যক্ষ, রানী, মহানায়ক, খলনায়কের বউ — সব মিলিয়ে জমজমাট রূপকথা একেবারে। আহা! একেই তো বলে স্বর্গসুখ। সত্যিই পুঁজিবাদ পথ দেখাচ্ছে। প্যারাডাইস মানেটা যেন কী?

বেচারাথেরিয়াম ডাক্তার

এই তারতম্য সরকারকে এবং আমাদের মত রুগীদের, তাদের বাড়ির লোকেদের কী বার্তা দিচ্ছে? শুধু সরকারী হাসপাতালের যাঁরা ডাক্তারি করেন তাঁদের যোগ্যতা কম নাকি কম রোজগার করেন বলে গুরুত্ব কম? এই বার্তা গেলে কোন রুগী কোন ডাক্তারকেই শ্রদ্ধা করবে কি? নাকি সরকার কোন ডাক্তারকে গুরুত্ব দেবে?

একমাস হতে চলল বিছানায় পড়ে আছি — এক সপ্তাহ নার্সিংহোমে, তারপর থেকে বাড়িতে। সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা, ধুম জ্বর — এসব নিয়ে নার্সিংহোমের দিনগুলো শোচনীয়ভাবে কেটেছে প্রথমদিকে। তারপর আস্তে আস্তে একটু সুস্থ হলাম। হয়ে দেখলাম আমার চেয়েও খারাপ অবস্থা ডাক্তারদের। মুখে বলছেন ডেঙ্গু কিন্তু লিখতে হচ্ছে “এন এস ১ বাহিত ভাইরাল জ্বর” কারণ স্নেহময়ী দিদির রাজ্যে শুধু যে সাংবাদিক কী লিখবেন সেটা দিদি এবং তাঁর ভাইদের চোখরাঙানিতে ঠিক হয় তা নয়, ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে কী লিখবেন সেটাও নবান্নে ঠিক হয়। ডাক্তারের দুর্গতিটা ভাবুন — পুজোমন্ডপে অসুরও হতে হবে আবার প্রেসক্রিপশনও লিখতে হবে হুজুরের হুকুমমত, নইলেই টানাটানি। এক ডাক্তার তো বেচারাথেরিয়ামের মত মুখ করে বলেই দিলেন “মাঝেমাঝে মনে হয় প্র্যাকটিস করা ছেড়ে দিই।”
এসব দেখে মনে পড়ে গেল ডাক্তার গড়াইয়ের কথা। ডাক্তার এস পি গড়াই, যিনি বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজির কর্তা ছিলেন এবং মিডিয়াবাহিনী নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দেশোদ্ধারে আপত্তি জানিয়ে, অপারেশন ফেলে মহাকরণে জো হুজুরি করতে পারবেন না বলার জন্যে সেই ২০১১র মে মাসে সাসপেন্ড হয়েছিলেন। সেইসময় অনেকেরই খুব আহ্লাদ হয়েছিল কারণ “সি পি এম আমলের আবর্জনা সরানো হল।” কোন কোন ডাক্তারেরও যে এমন উল্লাস হয়নি তা বলা যাবে না। ডাক্তারবাবুরা সংগঠিতভাবে কোন প্রতিবাদ করেছিলেন কি? মনে করার খুব চেষ্টা করছি, মনে পড়ছে না।
আমার বাবার জন্যে কয়েকবার এবং একবার আমার নিজের জন্যেও মমতা ক্ষমতায় আসার আগে বাঙ্গুরের ঐ হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। তখন দেখেছি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদির দিক থেকে সরকারী হাসপাতাল বললেই যে ভয়াবহ ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বাঙ্গুর ঠিক তেমনটা ছিল না। নিশ্চয়ই তার কৃতিত্ব ডাক্তার গড়াইয়ের মত লোকেদেরই। কিন্তু পরিবর্তন সেসবের ধার ধারেনি।
আরেকজন ডাক্তারের কথাও মনে পড়ল — ডাক্তার অরুণ সিং। শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালের এই ডাক্তারকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। এনার সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছিলাম। ওরকম ব্যস্ত হাসপাতালে নিও ন্যাটালজির মত একটা সুপার স্পেশালাইজড বিভাগ বানিয়ে ফেলেছিলেন ভদ্রলোক। সেই বিভাগে যেতে হয়েছিল আমাকে। গিয়ে দেখি কি আশ্চর্য মেশিনের মত কাজ হয় সেখানে, হাজারটা অপ্রাপ্তির মধ্যেও! একজন নার্স ডাক্তার সিংকে উদ্ধৃত করে যেরকম স্বরে কথা বললেন আমার আর আমার স্ত্রীর সাথে, অতখানি শ্রদ্ধা নিয়ে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পর্কে অন্য কর্মীদের কথা বলতে শেষ শুনেছিলাম যখন আমার স্কুলের মাস্টারমশাইরা আমাদের হেডস্যার সম্পর্কে কথা বলতেন। ডাক্তার সিংকে যেদিন সামনাসামনি দেখলাম, দেখে মনে হল কোন ধ্যানমগ্ন ঋষিকে দেখছি। এমন একটা লোক যাকে এককথায় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে ইচ্ছা করে। আমার সামান্য দেখায় ভুল থাকতে পারে কিন্তু তথ্য বলছে এস এস কে এমের পেডিয়াট্রিকস এবং নিও ন্যাটালজি বিভাগকে দেশের অন্যতম সেরা করে তোলায় ডাক্তার সিং অনস্বীকার্য অবদান। সেই লোকটিকেও কি এক অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই এমন এক হাসপাতালে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল যেখানে তাঁর গবেষণার কোন দাম নেই। ডাক্তারবাবুরা কতটা প্রতিবাদ করেছিলেন? মনে করতে পারছি না।
হ্যাঁ, প্রতিবাদ একটা হয়েছিল, একেবারে রাস্তায় নেমে। যখন মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী হাসপাতালের জোরজুলুম, দু নম্বরীর একটা হিসাবকিতাব করলেন প্রকাশ্যে, তারপর যখন হাসপাতালগুলোয় পেশিশক্তির আস্ফালন চলল একের পর এক। তখন ডাক্তাররা রাস্তায় নেমেছিলেন বটে।
তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কী বুঝব? সরকারী হাসপাতালের ডাক্তারবাবুদের পাশে বেসরকারীর ডাক্তারবাবুরা নেই নাকি বেসরকারীর ডাক্তারবাবুদের পাশে সরকারীর ডাক্তারবাবুরা নেই? আমাদের অভিজ্ঞতা তো বলে ঘুরেফিরে একই ডাক্তারদের সরকারী, বেসরকারী দুরকম জায়গাতেই দেখা যায়। তাহলে প্রতিবাদের এহেন তারতম্য হয় কেন? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এই তারতম্য সরকারকে এবং আমাদের মত রুগীদের, তাদের বাড়ির লোকেদের কী বার্তা দিচ্ছে? শুধু সরকারী হাসপাতালের যাঁরা ডাক্তারি করেন তাঁদের যোগ্যতা কম নাকি কম রোজগার করেন বলে গুরুত্ব কম? এই বার্তা গেলে কোন রুগী কোন ডাক্তারকেই শ্রদ্ধা করবে কি? নাকি সরকার কোন ডাক্তারকে গুরুত্ব দেবে? দিচ্ছে না যে সে তো বোঝাই যাচ্ছে। নইলে ডাক্তার রোগনির্ণয় করে কী লিখবেন তা মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করেন কোন অধিকারে? তিনি পাশ করা উকিল, ডক্টরেট, কবি, চিত্রশিল্পী — এসব জানতাম। তিনি ডাক্তারও হয়ে উঠলেন নাকি? ইন্ডিয়ান মেডিকাল এসোসিয়েশন বলে কিছু এরাজ্যে আছে?

%d bloggers like this: