সাচ্চা মুসলমান

কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা মারার সময়ে, কোন স্যারের ক্লাস করার সময়ে, কোন ক্রিকেটারের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হওয়ার সময়ে আমি সতর্ক হয়ে তাঁদের মুসলমানত্ব খেয়াল করিনি কারণ তাঁরা আমার হিন্দুত্ব সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন না। সরস্বতীপুজোর দিন আমি আর আমার বন্ধু মন দিয়ে খিচুড়ি আর ঘ্যাঁট সাঁটাচ্ছিলাম। ও মুসলমান হয়ে এই প্রসাদ খেয়ে ইসলামবিরোধী কাজ করছে কিনা এই গুরুতর সমস্যাটা নিয়ে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়নি

মহম্মদ শামির বউ কেন হিজাব ব্যবহার করেন না? মীর কেন সপরিবারে বড়দিন পালন করেন এবং অন্যদের শুভেচ্ছা জানান? এসব তো সাচ্চা মুসলমানের কাজ নয়।
এইসব কথাবার্তা শুনে যা বুঝছি, বহু মুসলমান বন্ধুর সাথে মেশা সত্ত্বেও, বহু মুসলমান মাস্টারমশাইয়ের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও, বহু মুসলমান অভিনেত্রীর প্রেমে পড়া সত্ত্বেও, বহু মুসলমান ক্রিকেটারের খেলা দেখা এবং প্রতিবেদন লেখায় যুক্ত থাকা সত্ত্বেও, মুসলমান কবিদের কবিতা পড়ে পাগল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখন অব্দি একজনও সাচ্চা মুসলমানকে আমি চিনি না। অবশ্য আমার দিক থেকে একটা বড় ভুল হয়েছে। কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা মারার সময়ে, কোন স্যারের ক্লাস করার সময়ে, কোন ক্রিকেটারের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হওয়ার সময়ে আমি সতর্ক হয়ে তাঁদের মুসলমানত্ব খেয়াল করিনি কারণ তাঁরা আমার হিন্দুত্ব সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন না। সরস্বতীপুজোর দিন আমি আর আমার বন্ধু মন দিয়ে খিচুড়ি আর ঘ্যাঁট সাঁটাচ্ছিলাম। ও মুসলমান হয়ে এই প্রসাদ খেয়ে ইসলামবিরোধী কাজ করছে কিনা এই গুরুতর সমস্যাটা নিয়ে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়নি।
ম্যাকবেথ পড়ানোর সময়ে আমাদের মাস্টারমশাই শেক্সপিয়ারেই বুঁদ ছিলেন, আমার গায়ে পৈতে আছে কিনা সে ভাবনা ওঁর মাথায় আসেনি। আমিও ওঁর কন্ঠে উচ্চাকাঙ্ক্ষায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলা একজন মানুষকেই খুঁজছিলাম। তিনি দিনে পাঁচবার নমাজ পড়েন কিনা এ প্রশ্নটা আমার মনে জাগেনি।
কি অদ্ভুতই না হত যদি ওয়াহিদা রহমান বোরখায় ঢেকে রাখতেন ঐ রহস্যময় সৌন্দর্য! কোন গীতিকারের মনেই আসত না পূর্ণিমার চাঁদের সংগে তাঁর তুলনা চলে। একবার ভাবুন, মহম্মদ রফি গানটা গাইতে গিয়ে যদি বলে উঠতেন “বলি হচ্ছেটা কী? ওয়াহিদার তো পর্দার নীচে থাকা উচিৎ। তার বদলে এসব কী ধ্যাষ্টামো? এই যে ভাই শাকিল, বলি তোমার কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই? নিজে মুসলমান হয়ে আরেকজন মুসলমান মহিলাকে নিয়ে এইসব গান লিখেছ? বলি নবীকে কী জবাব দেবে ভেবেছ?”
কান্ডটা সত্যিই ঘটলে আমি অন্তত কিছুটা দরিদ্র হয়ে থাকতাম। আমার বউ যখন রেগে যায় তখন তাকে মানানোর জন্যে যে যে গান বেসুরো গলায় গাই তা থেকে একটা কম পড়ে যেত। তা এই রফি সাহেব, ওয়াহিদা আর গীতিকার শাকিল বাদাউনি দেখছি সাচ্চা মুসলমান নন। নির্দেশক মহম্মদ সাদিক তো কাফের টাফের হবেন বোধহয়।
মধ্য কলকাতার এক বারে ভাল চিলি পর্ক পাওয়া যায়। আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে ঐ অপূর্ব জিনিসটি যিনি প্রথমবার খাইয়েছিলেন তাঁকেও দেখছি সাচ্চা মুসলমান বলা চলে না, যদিও ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাঁর অনেক পড়াশোনা।
যা-ই হোক আমার জীবনে এরকম মেকি মুসলমানদের যা অবদান তাতে এদের সাচ্চাই নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না। গন্ডগোল পাকালেন আরেক মুসলমান। কাজী নজরুল নামের এই ভদ্রলোক বেশকিছু রসোত্তীর্ণ শ্যামাসংগীত লিখে বসে আছেন। অতএব এনাকেও ঐ মেকিদের দলেই ধরেছিলাম। তারপর দেখি ও বাবা! “ক্ষমা কর হজরত” বলে একখানা কবিতাও লিখেছেন। সে কবিতাটা পড়লে কেমন যেন যারা শামি আর মীরের পেছনে লেগেছে তাদেরকেই মেকি মুসলমান বলে মনে হচ্ছে যে! কি বিপদ!
তারপর ভাবলাম, যাকগে! এসব ওদের ধর্মের ব্যাপার। হিন্দুরা কিন্তু এরকম গোলমেলে নয়। হিন্দুরা ভীষণ উদার। এই যে সবাই মিলে চার হাত পা তুলে সান্টাক্লসের টুপি মাথায় দিয়ে বড়দিন পালন করছে, এতে একজনও কিছু বলেছে? বলেনি তো। এই ভেবে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে গিয়ে বিষম টিষম খেয়ে একাক্কার।
আসলে ফোনে ফেসবুকটা খোলা ছিল। এক বন্ধুর ওয়ালে দেখলাম কোন অভিনেত্রী নাকি টিভি সিরিয়ালে পার্বতী সাজে। সে বেড়াতে গিয়ে কেন বিকিনি পরেছে তাই নিয়ে বহু হিন্দু গোঁসা করেছে। তারপর দেখি সঈফ-করিনা কেন ছেলের নাম তৈমুর রেখেছে তা নিয়ে অনেক হিন্দুর অনেক বক্তব্য। কয়েকটি বরাহনন্দন আবার ঐ দুধের শিশুর ক্যান্সার কামনা করেছে। তারপরে আরো দেখলাম ইরফান পাঠানের ছেলে হওয়ায় কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছে “ভাই, ছেলের নাম কিন্তু দাউদ বা ইয়াকুব রেখো না।”
গর্বে বুকটা ফুলে উঠল, চোখে জল এসে গেল। বুঝলাম সব ধর্মের ইতরদের শ্রেষ্ঠ মিলনতীর্থ আমাদের এই ভারতবর্ষ। সম্যক বুঝলাম রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, নেহরু, আম্বেদকর, মৌলানা আজাদ — সব্বাই ভুল। সবার উপরে ডি এল রায় সত্য তাহার উপরে নাই। “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।”

যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয়

যদি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা আলাদা করে বলেন তাহলে বলি ভারতবর্ষে ঐ অপরাধে কঠোর শাস্তি কারোরই হয় না। উল্টে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোক হলে নায়ক হয়ে যাওয়া যায়, মন্ত্রীও হওয়া যায়। বলুন তো বাল ঠাকরে শিয়া না সুন্নি? বাবু বজরংগি কি মুসলমান? মায়া কোদনানি? জগদীশ টাইটলার? সজ্জন কুমার? লালকৃষ্ণ আদবানি? উমা ভারতী?

আমি হিন্দু। কিন্তু আমি আজহারের ব্যাটিং দারুণ ভালবাসতাম। ও ফিক্সিং করেছে শুনে ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। মহম্মদ রফি আমার খুব ভাল লাগে, অনেকসময় কিশোরের চেয়েও বেশি। বিরিয়ানি আমার সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য। আমার অনেক মুসলমান বন্ধু আছে। অতএব প্রমাণিত হল যে আমি সাম্প্রদায়িক নই। সুতরাং আমি একথা বলতেই পারি যে আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকে সব রাজনৈতিক দলই সংখ্যালঘু তোষণ করে এসেছে। সবেতেই ওদের বেশি সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, ওদের দোষগুলো সব ঢেকে রাখা হয়। এখনো ওরা যা ইচ্ছে মারদাঙ্গা করে, তাতে দোষ হয় না। মিডিয়া পর্যন্ত ওদের দোষ চেপে দেয়।

উপর্যুক্ত কথাগুলো যদি আপনার মনের কথা হয় তাহলে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি মোটেই অসাম্প্রদায়িক নন। বরং আপনি যুক্তি বা তথ্যের ধার না ধারা একজন মানুষ যিনি আবেগ দিয়ে সবকিছু বিচার করেন। আর্থসামাজিক মানদন্ডগুলোর প্রায় সবকটাতে মুসলমান সম্প্রদায় দেশের সবথেকে পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়। সরকারী চাকরিতেও। আমি বলছি না। ভারতের একমাত্র প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ পার্টির মন্ত্রী সংসদে বলেছেন। এই দেখুন https://www.google.co.in/…/muslim-working-proportion…/lite/…

এই যখন ঘটনা তখন সংখ্যালঘু তোষণটা হল কখন আর তার সুবিধাটা পেল কে?
এই যে বলছেন ওরা মারদাঙ্গা করলে কোন দোষ হয় না সেই নিয়েও বলা যাক তাহলে। ২০০১ এর জনগণনা অনুযায়ী আমাদের জনসংখ্যার ১৩% মুসলমান অথচ ঐসময়ে বিভিন্ন জেলে বন্দী ছিল যারা তাদের ২২% মুসলমান। নিজেই পড়ে দেখুন http://m.timesofindia.com/…/Muslim…/articleshow/45253329.cms

যদি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা আলাদা করে বলেন তাহলে বলি ভারতবর্ষে ঐ অপরাধে কঠোর শাস্তি কারোরই হয় না। উল্টে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোক হলে নায়ক হয়ে যাওয়া যায়, মন্ত্রীও হওয়া যায়। বলুন তো বাল ঠাকরে শিয়া না সুন্নি? বাবু বজরংগি কি মুসলমান? মায়া কোদনানি? জগদীশ টাইটলার? সজ্জন কুমার? লালকৃষ্ণ আদবানি? উমা ভারতী?

এবার আসুন মিডিয়ার কথায়। প্রথমত মিডিয়া কোন একটি সংস্থা নয়। প্রত্যেক মিডিয়া হাউসের নিজস্ব মতামত, কার্যপদ্ধতি, স্বার্থ আছে। সকলেই সেই অনুযায়ী খবর পরিবেশন করে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে সেটাকেই বোঝায়। ফলে খবরের সত্যতা যাচাই না করে যা ইচ্ছে লিখে, দেখিয়ে বাজার গরম করে এমন কাগজ এবং চ্যানেল যেমন আছে তেমনি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমও আছে। ভারতীয় সাংবাদিকতার যে অবনমন হয়েছে তা নিয়ে আজ কোন ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। তবু এখনো প্রায় সব কাগজ বা টিভি চ্যানেলই সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে কয়েকটা নিয়ম মেনে চলে। যেমন কোন সম্প্রদায়ের লোক কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ করেছে তা উল্লেখ না করা, কাদের বেশি ক্ষয়ক্ষতি, কাদের কম এসব আলোচনা না করা, সর্বোপরি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ পরিস্থিতি যতক্ষণ না প্রশাসনের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে ততক্ষণ তেমনভাবে রিপোর্টই না করা। কারণ দেখা গেছে তাতে উত্তেজনা নতুন নতুন এলাকায় ছড়ায় এবং দাঙ্গাবাজদের কাজ সহজ হয়। আজকাল অবশ্য অনেকেই মনে করছেন সোশাল মিডিয়ার এই যুগে এই পদ্ধতি অচল। এতে বরং যা নয় তাই গুজব ছড়ানোর ফাঁকা ময়দান তৈরি হয়। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কিন্তু মনে রাখবেন মিডিয়া দেখাচ্ছে না মানে কিন্তু শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংখ্যাগুরুদের কুকর্মগুলোও চাপা পড়ে থাকছে। আপনি হোয়াটস্যাপে যে ভিডিওটা দেখে লাফাচ্ছেন সেটাই একমাত্র সত্য নয়।
এত কথা বলছি মানে যে আমি আপনাকে দাঙ্গাবাজ বলছি তা নয়। এমন হতেই পারে যে আপনি যা বলছেন সরল বিশ্বাস থেকেই বলছেন। মানে আপনি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে কথাগুলো সাম্প্রদায়িক নয়। আমি আপনার সেই বিশ্বাসটাকেই প্রশ্ন করছি। ভেবে দেখুন তো আপনি সেই জার্মানদের মত হয়ে যাচ্ছেন না তো যারা নাজিদের এই প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাস করেছিল যে ইহুদীরাই জার্মানির সমস্ত দুর্দশার কারণ? তারপর কী হয়েছিল সেটা ইতিহাস। রক্তাক্ত, লজ্জাকর ইতিহাস। সে ইতিহাস ভুলে যাচ্ছেন না তো? জার্মান ভাষায় একটা প্রবাদ আছে “যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয়, তারা অভিশপ্ত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তারা করবেই।”

সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক

সে তখন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুসলমান প্রধান এলাকার গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। চাকরিটা নিয়েছিল কলেজের চাকরি পাওয়া পর্যন্ত নমো নমো করে করবে বলে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ওকে এমনভাবে ভালবাসায় বেঁধেছে যে ও পড়েছে দোটানায়। আমাকে ফোন করার কারণ ঐ স্কুলের পরিচালন সমিতির দুর্নীতি। স্কুলের উন্নয়নের জন্য আসা সরকারী টাকা অন্য খাতে খরচা করা হচ্ছে। প্রধানশিক্ষক ভাল মানুষ, পণ্ডিত। কিন্তু ঐ গ্রামেরই বাসিন্দা। ফলে জলে থেকে কুমীরের সাথে বিবাদ করতে ভয় পান। সেই সুযোগে স্কুলের উন্নতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুনেছে আমি সাংবাদিক। তাই ফোন করেছে। যদি কাগজে এই দুর্নীতির খবর ছাপা যায়, দোষীদের শাস্তি হয়

৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২ এবং তারপরের কয়েকদিন এখনো ছবির মত মনে আছে। খুব চেনা কোন কোন মানুষের ভেতরের পশুকে সেই প্রথম দেখতে পেয়েছিলাম। আমার বয়স তখন দশ। বড় হওয়ার গতিটা ঐ বয়সে বাড়তে শুরু করে। বলা যায় ৯২-৯৩ সালের ঐ দিনগুলো সেই গতিটাকে কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এর প্রায় ছবছর পরে, ২৬শে জুলাই, ১৯৯৮ আমি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরে ভর্তি হই। আবাসিক কলেজ হওয়াতে বাড়ি ছেড়ে নিজ দায়িত্বে থাকার সেই শুরু। তার আগে ধর্মের আমার জীবনে কোন দৈনন্দিন ভূমিকা ছিল না। বাবা নাস্তিক, মা আস্তিক হলেও নিয়মিত পূজার্চনার পাট ছিল না বাড়িতে। রামকৃষ্ণ মিশনের ধর্মীয় পরিবেশ যে আমার বিশেষ ভাল লাগত না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দেদার আড্ডা দেওয়ার সুযোগ সে অস্বস্তি ভুলিয়ে দিত। কিছুটা সেইজন্যেই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে কলেজের তিনবছরও দিব্যি ওখানে কাটিয়ে দিয়েছি।
ঘটনাচক্রে বিদ্যামন্দিরে আমার পাঁচ বছর বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রথম এনডিএ সরকারের পাঁচ বছরের মধ্যেই পড়ে। সব ব্যাপারেই ধর্মের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা তখন শুরু হয়ে গেছে। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও ধর্ম নিয়ে, ধর্মের ঝান্ডাধরা রাজনীতি নিয়ে প্রচণ্ড তর্কবিতর্ক হত। অবশ্য তখন মতান্তর মানেই মনান্তর ছিল না। যা-ই হোক আমার এক সহপাঠী ছিল যে মুসলমানদের দুচক্ষে দেখতে পারত না। সে বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসা হিন্দু। তাকে আমি এবং আরো কয়েকজন কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারতাম না যে তার মত অভিজ্ঞতা অনেক মুসলমানেরও বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। তার মানে যেমন সব হিন্দু খুনে নয়, তেমনি সব মুসলমানও তার পরিবারের উপর অত্যাচার করা লোকেদের মত নয়। সে কিছুতেই মানত না। সে ঘুরেফিরেই বলত “ওরা ঐরকমই”। ২০০৩ এ কলেজ ছাড়ার পর থেকে আর তার সাথে যোগাযোগ নেই।
২০১০ সালের এক সকাল। নাইট ডিউটি করে এসে আমার তখন মাঝরাত। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। আমার পেশায় এরকম হলে প্রথমেই লোকে ভাবে বসের ফোন। চাকরিটা গেছে হয়ত। আমি সেকথা ভেবেই ধড়মড়িয়ে উঠে ফোনটা ধরেছি। দেখি অজানা একটা নম্বর। বসের ফোন নয় যখন তখন কেটে দেব ভেবেছিলাম। তারপর মনে হল মিটিয়ে দেওয়াই ভাল, নইলে আবার করতে পারে। কথা বলতে গিয়ে দেখি এ আমার সেই বন্ধু।
আমার বন্ধু প্রতিবাদ করতে গিয়ে গালাগালি খেয়েছে ছাত্রছাত্রীদের সামনে। আমাদেরই কোন সহপাঠীর থেকে। সে তখন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুসলমান প্রধান এলাকার গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। চাকরিটা নিয়েছিল কলেজের চাকরি পাওয়া পর্যন্ত নমো নমো করে করবে বলে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ওকে এমনভাবে ভালবাসায় বেঁধেছে যে ও পড়েছে দোটানায়। আমাকে ফোন করার কারণ ঐ স্কুলের পরিচালন সমিতির দুর্নীতি। স্কুলের উন্নয়নের জন্য আসা সরকারী টাকা অন্য খাতে খরচা করা হচ্ছে। প্রধানশিক্ষক ভাল মানুষ, পণ্ডিত। কিন্তু ঐ গ্রামেরই বাসিন্দা। ফলে জলে থেকে কুমীরের সাথে বিবাদ করতে ভয় পান। সেই সুযোগে স্কুলের উন্নতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুনেছে আমি সাংবাদিক। তাই ফোন করেছে। যদি কাগজে এই দুর্নীতির খবর ছাপা যায়, দোষীদের শাস্তি হয়।
আমি তাকে বোঝালাম যে বহু গ্রামের স্কুলেই এই জিনিস ঘটে। ফলে বেশ বড় অংকের আর্থিক দুর্নীতি না হলে কাগজ ছাপতে রাজি হবে না। যদি হয়ও, শাস্তি দেওয়া তো কাগজের হাতে নয়। প্রশাসনিক নড়াচড়া না হলে দোষীদের রোষ এসে পড়বে ওরই উপরে। তাতে ওর ভীষণ বিপদ ঘটতে পারে। তাতে সে আমায় বলল “ঠিকই বলেছিস। কো এড স্কুল তো। কখন কি বদনাম দিয়ে দেবে! কিন্তু দুঃখটা কী জানিস তো? এই স্কুলের ছেলেমেয়েরা কি গরীব তুই ভাবতে পারবি না। এত গরীব আমি তুই চোখে দেখিনি। তাদের জন্য স্কুল। কত কষ্ট করে একটু লেখাপড়া করে এরা। অধিকাংশ মুসলমান আর কিছু আদিবাসী। এদের জন্য সরকারের স্কিম আছে। সেই টাকা ছোটলোকগুলো মেরে নিচ্ছে! আমার আর কি? নেট পাশ করে গেছি, বেশি পেছনে লাগলে চলে যাব। কিন্তু এই ছেলেমেয়েগুলোর কী হবে বল তো, প্রতীক?” আমি পরামর্শ দিলাম গোপনে ডি আই প্রমুখের সাথে যোগাযোগ করতে। বন্ধু বারবার বলে গেল ছেলেমেয়েগুলো কত কষ্ট করে, ঐ গ্রামের লোককে কি প্রচণ্ড পরিশ্রম করে বেঁচে থাকতে হয়। গ্রামের সরল সোজা মানুষের উপর মাতব্বররা কিভাবে ছড়ি ঘোরায় সেকথাও বলল। কিন্তু একবারও বলল না “মুসলমান তো। ওরা ঐরকমই।”
বন্ধুটি ধর্মান্ধ — এই ধারণা নিয়েই কলেজ ছেড়েছিলাম। সেদিন ভুল প্রমাণিত হলাম। সেই আনন্দে আমার সেই সকালে আর ঘুম এলো না

মৌলবাদী বনাম মৌলবাদী

এদেশে আমরা তো পারিনি এমন কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে যা দাবি করে ১৯৮৪র দেশজোড়া শিখ গণহত্যার নাটের গুরুদের শাস্তি, ২০০২ এর গুজরাটে মুসলমান গণহত্যার খলনায়কদের শাস্তি। বরং ভারতে তো উল্টোটাই হয়ে চলেছে। গণহত্যার পুরস্কারস্বরূপ মন্ত্রিত্ব পাওয়া যাচ্ছে — যেমন কংগ্রেস আমলে, তেমনি বিজেপি আমলে। গুজরাটের ঘটনায় তবু যে কজনের শাস্তি হয়েছিল তারাও মে ২০১৪র পরে গারদের বাইরে এসে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণপিটুনিতে অভিযুক্ত রোগভোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকাশোভিত হচ্ছে

বাংলাদেশের হিন্দুদের উপরে অত্যাচার হলে বোধহয় সবচেয়ে উল্লসিত হয় ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা। কারণ তখন ওটা দেখিয়ে তারা বলতে পারে “কিছু বাঞ্চোদ তবুও বলবে ভারতে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে” (ভাষাটা দেখে কেউ নাক সিঁটকোবেন না দয়া করে। এই ভাষাতেই ওরা লেখে এগুলো)। কদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা ফেসবুক পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় মন্দির, বিগ্রহ ভাঙা হয়েছে। হিন্দুবাড়িতে লুঠতরাজ, খুন, জখম ইত্যাদি করা হয়েছে। সেই ঘটনা নিয়েও উপরে যেমন বললাম তেমন পোস্ট দেখতে পাচ্ছি। যে মানসিকতা নিয়ে এই জাতীয় পোস্ট করা হয় তারমধ্যে অনেকগুলো মনুষ্যেতর যুক্তি কাজ করে। যেমন:

১) হিন্দুরা করলেই দোষ হয়ে যায়। এখন যে ওরা (মুসলমানরা) করছে!

২) আমরা তো এখনো কিছুই করিনি (দাদরি ফাদরি ভুলে যান)। দেখাব মজা, দাঁড়াও না (অর্থাৎ গোটা দেশটাকে গুজরাট বানিয়ে দেবো। যদিও বলার সময় বলব গুজরাট নিয়ে মোদীকে মিথ্যে অভিযুক্ত করা হয়। আদালত নির্দোষ ঘোষণা করেছে, ইত্যাদি)।

৩) আমাদের দেশের পাকিস্তানী এজেন্টগুলো (মানে কিছু রাজনৈতিক দল, ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী এবং কিছু সাংবাদিক যারা এখনো সংঘচালিত নয়) বাংলাদেশ, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার নিয়ে তো কিছু বলে না। যত দরদ খালি মুসলমানদের জন্য, না? কই বাংলাদেশের কেউ তো হিন্দুদের জন্য চোখের জল ফেলছে না, এদের এত মড়াকান্না কিসের জন্য?

এক এক করে উত্তর দেওয়া যাক।

১) দোষ হিন্দুরা করলেও হয়, মুসলমানরা করলেও হয়। পৃথিবীর কোথাও এমন আইন আছে শুনেছেন যে খুনীকে মাপ করে দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে আরো অনেকে খুন করেছে? এই যুক্তি একমাত্র সে-ই দেখায় যার উদ্দেশ্যই খুন করা।

২) এই যে তুলনামূলক আলোচনা করে বলছেন আমরা সহিষঞু, এতেই আপনারা নিজেরাই প্রমাণ করছেন সহিষঞু নন। তর্জনী উঁচিয়ে বলছেন “খবরদার অসহিষঞু বলবি না। কিছুই তো করিনি এখনো।” এ সেই সুকুমার রায়ের কবিতা হয়ে গেল “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে। সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে এমন ভয় পেলে।” কবিতাটা পড়ে যেমন সবাই হাসে, আপনাদের কথাবার্তাও হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত আপনাদের হাতে ক্ষমতা না থাকলে। বস্তুত নেহরু এবং প্যাটেল আপনাদের হেসেই উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং সেটাই ভুল হয়েছিল।

৩) এবার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে আসা যাক। প্রথমত, “পাকিস্তানী এজেন্ট” কথাটা ভীষণ বোকাবোকা। চীনা এজেন্ট বললে তাও ভেবে দেখা যেত। পাকিস্তান ভারতের রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক — এদের হাতখরচই দিয়ে উঠতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, ভারতের অগ্রগণ্য সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিলক্ষণ লেখালিখি, আলাপ আলোচনা হয়। আপনারা যথারীতি সেটা চেপে যান। রাজনৈতিক দলগুলোও সময়ে সময়ে ওদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলে। নিঃসন্দেহে এদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যতটা বলে ততটা বলে না। কেন বলবে? দলগুলো এদেশের। সংবিধান তাদের এদেশের মানুষের ভালমন্দের দায়িত্ব দিয়েছে। তারা এদেশের মানুষের দুর্দশা নিয়ে হইহল্লা না করে সারাক্ষণ বাংলাদেশ, পাকিস্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকবে? মৌলবাদী মস্তিষ্ক ছাড়া এরকম চিন্তার উর্বর ক্ষেত্র পাওয়া মুশকিল।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের খবর আপনি জানছেন
কি করে? জানাচ্ছে তো সেদেশের সংবাদমাধ্যম। সেগুলো চালায় কারা? সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংবাদিক কারা? সেদেশের মুসলমানরা। হিন্দুদের আক্রমণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে, বাকস্বাধীনতার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সামনের সারিতেই আছেন মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা। কতজনের প্রাণ গিয়েছে, কতজন দেশছাড়া হয়েছে জানেন না? নাকি না জানার ভান করছেন?
চতুর্থত, সাধারণ মানুষের কথা যদি বলেন, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ঘটনার পরেও দেখলাম ফেসবুকে সবচেয়ে সরব আমার বাংলাদেশি মুসলমান বন্ধুরাই। আমি তো ঘটনাটার কথা প্রথম জানলাম তেমন এক বন্ধুর দেয়াল থেকেই। বন্ধুর কোন দেশ হয় না, ধর্ম হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে বন্ধুদের এই দুটো পরিচয় উল্লেখ না করে উপায় থাকল না, এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। শাহবাগে দিনের পর দিন যারা মৌলবাদীদের শাস্তির দাবিতে হত্যে দিয়ে পড়েছিল তাদের অধিকাংশও মুসলমান। আমার অন্তত একজন বন্ধু তার মধ্যে ছিল, একথা বলতে আমি গর্ববোধ করি।
এদেশে আমরা তো পারিনি এমন কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে যা দাবি করে ১৯৮৪র দেশজোড়া শিখ গণহত্যার নাটের গুরুদের শাস্তি, ২০০২ এর গুজরাটে মুসলমান গণহত্যার খলনায়কদের শাস্তি। বরং ভারতে তো উল্টোটাই হয়ে চলেছে। গণহত্যার পুরস্কারস্বরূপ মন্ত্রিত্ব পাওয়া যাচ্ছে — যেমন কংগ্রেস আমলে, তেমনি বিজেপি আমলে। গুজরাটের ঘটনায় তবু যে কজনের শাস্তি হয়েছিল তারাও মে ২০১৪র পরে গারদের বাইরে এসে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গণপিটুনিতে অভিযুক্ত রোগভোগে মারা গেলে তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকাশোভিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন। কারোর দিকে আঙুল তোলা আমাদের সাজে না।

জল পড়ে। পাতা নড়ে

এরপরে যা খেয়াল হওয়ায় চমকে উঠলাম তা হল বিশ্ববরেণ্য হয়ে ওঠার পরেও নিজের মানবিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সচেতনতা

vidyasagar

দুটো অতিপরিচিত লাইন সেদিন ঘোল খাইয়ে দিল ।
সন্ধ্যেবেলা এক অগ্রজ সাংবাদিকের ফোন “জল পড়ে । পাতা নড়ে । কার লেখা রে ?” অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পত্রপাঠ জবাব দিলাম “বিদ্যাসাগর । বর্ণপরিচয়ে আছে ।”
প্রতিপ্রশ্ন “ঠিক তো ? রবীন্দ্রনাথ নয় তো ?”
বাঙালির ছেলে । যে কোন বিষয়েই রবীন্দ্রনাথের নামটা চলে এলে একটু বেশি সতর্ক হতেই হয় । আমি তাই বললাম “আচ্ছা চেক করে জানাচ্ছি ।” সহকর্মীদের দু’একজনকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে দেখি দুটো নামই উঠে আসছে । অগত্যা বিপদে পড়লে সমস্ত বুদ্ধিমান পুরুষের যা করা উচিৎ ঠিক তাই করলাম । গিন্নীর শরণ নিলাম । তিনি কন্যার বর্ণপরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ ঘেঁটে জানালেন “জল পড়ে । পাতা নড়ে ” কোথ্থাও নেই । প্রথম ভাগের তৃতীয় পাঠে আছে “জল পড়ে । মেঘ ডাকে ।” আর অষ্টম পাঠে আছে “জল পড়িতেছে । পাতা নড়িতেছে ।”
রহস্য ঘনীভূত হল দেখে এক অধ্যাপক বন্ধুকে ফোন করলাম । সে একবাক্যে “রবীন্দ্রনাথ” বলল । কিন্তু কোন্ বইতে আছে মনে করতে পারল না । আমারই মনে হল হয়ত সহজ পাঠ হবে । নিশ্চিত হওয়ার জন্যে আবার সহধর্মিনীর সাহায্য নিতে হল । তিনি জানালেন রবীন্দ্রনাথ রচিত সহজ পাঠের প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ তো বটেই এমনকি বিশ্বভারতী সংকলিত তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগেও জল পড়েনি, পাতা নড়েনি ।
রহস্যের সমাধান যে দূর অস্ত সেকথা সেই অগ্রজকে জানাতেই তিনি মনে করিয়ে দিলেন জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ‘শিক্ষারম্ভ’ অধ্যায়ে লিখেছেন
“আমরা তিনটি বালক একসঙ্গে মানুষ হইতেছিলাম । আমার সঙ্গীদুটি আমার চেয়ে দুই বছরের বড়ো । তাঁহারা যখন গুরুমশায়ের কাছে পড়া আরম্ভ করিলেন আমারও শিক্ষা সেই সময়ে শুরু হইল । কিন্তু সে-কথা আমার মনেও নাই ।
কেবল মনে পড়ে, “জল পড়ে পাতা নড়ে ।’ আমার জীবনে এইটেই আদিকবির প্রথম কবিতা ।”
অতএব লাইনদুটো রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা হতেই পারে না ।
অকাট্য যুক্তি । কিন্তু তাহলে রহস্য উদ্ঘাটন হবে কী করে ? কবিগুরুর আদিকবিটি তাহলে কে ? বিদ্যাসাগর না হলেও অন্য কেউ তো বটে ? নাকি জীবনস্মৃতি লেখার সময়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করায় নিত্য বর্তমান ঘটমান বর্তমানের চেহারা নিয়েছে ? এই সেদিন পর্যন্তও তো বঙ্গসন্তানদের লেখাপড়া বর্ণপরিচয় দিয়েই শুরু হত । আর রবীন্দ্রনাথের তো শিক্ষারম্ভ বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশাতেই ।
কোথায় পাব উত্তর ? গুগল জ্যাঠাকে জিজ্ঞেস করে দেখলাম বিন্দুবিসর্গ জানে না এব্যাপারে । আমার সিধুজ্যাঠা নেই বলে আফশোস করতে করতে বাড়ি পৌঁছলাম । তারপর হঠাৎ ক্যাপ্টেন স্পার্কের মত মস্তিষ্কে একটা স্পার্ক হল । মনে পড়ল প্রশান্ত পাল রচিত রবিজীবনীর কথা । কী যেন পড়েছিলাম এই ব্যাপারে ! খুলে বসলাম ।
দেখি প্রথম খন্ডের চতুর্থ অধ্যায়ে (রবীন্দ্রজীবনের চতুর্থ বৎসর) আছে
“যদিও রবীন্দ্রনাথের জন্য বিশেষ করে বর্ণপরিচয় — প্রথম ভাগ কেনার উল্লেখ পাওয়া যায় না, তবু এই বইটিও তাঁর প্রথম শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেই মনে হয় ।” এরপর জীবনস্মৃতির উপর্যুক্ত অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে প্রশান্ত পাল লিখছেন “এই বর্ণনা বর্ণপরিচয় — প্রথম ভাগকেই মনে করিয়ে দেয় । অবশ্য সে ক্ষেত্রেও আমাদের দ্বিধা সম্পূর্ণ কাটে না । কারণ উক্ত গ্রন্থের তৃতীয় পাঠে ‘জল পড়ে’ বাক্যটি থাকলেও ‘পাতা নড়ে’ বাক্যটি নেই এবং অষ্টম পাঠে বাক্যদুটিকে পাওয়া যায় একেবারে গদ্যাত্মক চেহারায় — ‘জল পড়িতেছে । পাতা নড়িতেছে ‘ — যাকে আদিকবির প্রথম কবিতা বলা শক্ত ।”
এরপর আছে আরেকটা বইয়ের আলোচনা যে বইতে রবীন্দ্রনাথ পড়েন “হিরণ্যকশিপুর পেট চিরছে নৃসিংহ অবতার” । অধ্যাপক প্রবোধচন্দ্র সেন সিদ্ধান্ত করেছেন এইটা শিশুবোধক নামে একটা বই এবং এটাকেই তিনি রবীন্দ্রনাথের পড়া প্রথম বইয়ের মর্যাদা দিয়েছেন । কিন্তু প্রশান্ত পাল ভিন্নমত । তিনি ঠাকুরবাড়ির ক্যাশবই দিয়ে প্রমাণ করেছেন ওটা রবীন্দ্রনাথের পড়া প্রথম বই নয় । তিনি লিখছেন “এই পর্বে দু-দফায় যে বই কেনা হয়েছে, তাতে আমরা ‘প্রথম ভাগ’ [দাম দেখে বর্ণপরিচয় — প্রথম ভাগ হওয়াই সম্ভব বলে মনে হয়], বর্ণপরিচয় ও শিশুশিক্ষা-র কথাই জানতে পেরেছি, শিশুবোধক কেনা হয়েছে এমন কোন ইঙ্গিত মেলেনি ।”
এর কিছু পরে প্রশান্ত পাল লিখছেন
“রবীন্দ্রনাথের শিক্ষারম্ভ হয়েছিল শিশুশিক্ষা দিয়ে এবং তার পরে সম্ভবতঃ বর্ণপরিচয়ের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটেছিল । তারও পরে পড়েছিলেন শিশুবোধক, আর এই শিশুবোধকেই পেয়েছিলেন মূলপাঠসহ চাণক্যশ্লোকের বাংলা পদ্যানুবাদ । আর এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পুরো ইতিহাসটিকে গুছিয়ে আনতে পারি এইভাবে : বর্ণপরিচয় — প্রথম ভাগ দিয়ে সোমেন্দ্রনাথ ও সত্যপ্রসাদ যখন ভাদ্র [Sep 1864] থেকে শিক্ষারম্ভ করেন, রবীন্দ্রনাথ তখন তাঁদের সঙ্গী ছিলেন না ; তিনি পাঠশালায় যেতে শুরু করলেন পৌষ মাস [Jan 1865] থেকে, শিশুশিক্ষা অবলম্বনেই তাঁর অক্ষর পরিচয় হয়, কিন্তু বর্ণযোজনা শেখেন বর্ণপরিচয় থেকে — ‘কর খল’ এবং ‘জল পড়িতেছে । পাতা নড়িতেছে” পাঠই তিনি গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ভাবী মহাকবির সমস্ত চৈতন্য গদ্যের সেই সাদাসিধে রূপের অন্তরে নিহিত ছন্দটুকু আবিষ্কার করে গদ্যের ঘটমান বর্তমানকে কবিতার নিত্য বর্তমানে পরিণত করেছে ।”
রহস্যের সমাধান হল । আমাদের সকলের পরিচিত লাইনদুটো বিদ্যাসাগরের রচনা নয়, রবীন্দ্রনাথের রচনাও নয় ; একটা ভুল উদ্ধৃতিমাত্র ।
কিন্তু এরপরে যা খেয়াল হওয়ায় চমকে উঠলাম তা হল বিশ্ববরেণ্য হয়ে ওঠার পরেও নিজের মানবিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সচেতনতা । জীবনস্মৃতির মুখবন্ধে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন
“জীবনের স্মৃতি জীবনের ইতিহাস নহে — তাহা কোন্-এক অদৃশ্য চিত্রকরের স্বহস্তের রচনা । তাহাতে নানা জায়গায় যে নানা রং পড়িয়াছে তাহা বাহিরের প্রতিবিম্ব নহে — সে-রঙ তাহার নিজের ভান্ডারের, সে-রঙ তাহাকে নিজের রসে গুলিয়া লইতে হইয়াছে ; সুতরাং পটের উপর যে ছাপ পড়িয়াছে তাহা আদালতে সাক্ষ্য দিবার কাজে লাগিবে না ।”
আমরা ওঁকে ঠাকুর বানিয়েছি কিন্তু উনি কখনোই আমাদের পাল্লায় পড়ে ভুলে যাননি যে আর পাঁচজনের মত ওঁরও ভুল হওয়া স্বাভাবিক এবং অনিবার্য।

ফিরে আসে বৃষ্টির পাখিরা — যে সাহিত্য পাঠককে পড়িয়ে নেয়

কিন্তু শুধু কি একটা রেলনগরীর রোম্যান্টিক ছবি সাজানো এই উপন্যাসে ? আদৌ তা নয় । আছে লোহার ছাঁটের চোরা কারবার, মাফিয়া, তোলাবাজ । ইন্দার বাসস্টপের সন্ধ্যা, যেখানে “রোজ নতুন নতুন দেরি করে ফেলা যাত্রী” দেখা যায়, মেসবাড়ির জানলা দিয়ে দেখতে পাওয়া পরমাসুন্দরী বউটির কথার পর যখন এসব প্রসঙ্গ এসে পড়ে তখন মনে পড়ে টি এস এলিয়টকে, যেখানে অ্যালফ্রেড জে প্রুফ্রক প্রেয়সীকে বলছেন চলো, তোমাতে আমাতে সেইখানে যাই যেখানে সন্ধ্যেটা আকাশে ছড়িয়ে আছে । কার মত ? অপারেশন টেবিলে শোয়ানো অজ্ঞান রুগীটার মত

ছোটবেলায় ‘শুকতারা’, ‘কিশোর ভারতী’ দিয়ে শুরু করে কৈশোরে ‘আনন্দমেলা’ হয়ে শারদ সাহিত্য পড়ার অভ্যেসটা যৌবনে ‘দেশ’, ‘আজকাল’, ‘নন্দন’ পর্যন্ত দিব্যি চলে এসেছিল । কিন্তু পরপর কয়েকবছর থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের স্বাদ নিতে হওয়ায় এবং কিছুটা জীবনের চাবুক খেয়ে ওসব পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করেছিলাম । গতবছর এক বন্ধুর কথায় জয় গোস্বামী আর শঙ্খ ঘোষের কবিতাদুটো পড়ব বলে শারদীয় দেশ কিনেছিলাম । কিনে দেখলাম ঐ দুজন বাদেও কবিতা বিভাগটা তবু পড়া যায়, গল্প উপন্যাসে পাতা পাঁচেকের বেশি এগোতেই পারছি না । তাই এবছরে আবার বিখ্যাত শারদসংখ্যাগুলোকে ত্যাগ করেছি । তারপর, সাহিত্যিক বন্ধু থাকলে যা হয়, মেদিনীপুর জেলার ‘আমার কাগজ’ পত্রিকায় বেরোনো একটি উপন্যাস পড়ার বড্ড ইচ্ছা হল । পত্রিকাটা না হলেও উপন্যাসটা লেখকের ভালবাসায় আমার ইনবক্সে চলে এল আব্দার করামাত্রই ।
আমরা গত কয়েক দশক ধরে যেসব বাংলা গল্প উপন্যাস জনপ্রিয় পত্রপত্রিকায় পড়তে অভ্যস্ত, যেসব বাংলা ছবি মাল্টিপ্লেক্সে দেখতে অভ্যস্ত তা ভীষণভাবেই নাগরিক । স্থান, কাল, পাত্র, বিষয়, সম্পর্কের টানাপোড়েন — কোনটাই আমার মত মফঃস্বলের গেঁয়ো ভূতকে টানে না । অফিসের সময়টুকু বাদ দিলে আমার যে জীবন, আমার পরিপার্শ্ব, সেসবের গন্ধ কোথাও পাই না ।
কিন্তু ‘ফিরে আসে বৃষ্টির পাখিরা’ নামে এই যে উপন্যাস তার পটভূমি কলকাতা থেকে বেশ দূরে — খড়গপুর, যেখানে আপনি দ্রুতগামী শতাব্দী এক্সপ্রেসে উঠলেও ঘন্টা দেড়েকের আগে পৌঁছবেন না । কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্র গ্রাম থেকে খড়গপুরে পড়তে আসা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে । আমার বড় চেনা । এমন কতজনের সঙ্গেই না হোস্টেলজীবন কাটিয়েছি যাদের কাছে কলকাতা তো বটেই, বেলুড়ও শহর ।
কিন্তু সত্যি বলতে কলকাতা বা তার আশেপাশের মফঃস্বলে যারা বেড়ে উঠেছে আমার মত, তারা মফঃস্বল আর তার কাছেদূরের গ্রামকে জানতেই পারে না কখনো । পৃথিবীর সব রং কলকাতায় — এমন একটা বিশ্বাস চেতনে বা অবচেতনে গড়ে ওঠে । এই উপন্যাসে লেখক যখন খড়গপুরের অলিগলি চেনাচ্ছিলেন, গিরি ময়দান স্টেশনের গুলমোহর গাছটার কথা বলছিলেন তখন আমার নবগ্রামের এমন সব পথ আর পুকুরঘাটকে ভালবাসতে ইচ্ছা করছিল যাদের ধারকাছ দিয়ে বহুকাল যাওয়া হয় না ।
কিন্তু শুধু কি একটা রেলনগরীর রোম্যান্টিক ছবি সাজানো এই উপন্যাসে ? আদৌ তা নয় । আছে লোহার ছাঁটের চোরা কারবার, মাফিয়া, তোলাবাজ । ইন্দার বাসস্টপের সন্ধ্যা, যেখানে “রোজ নতুন নতুন দেরি করে ফেলা যাত্রী” দেখা যায়, মেসবাড়ির জানলা দিয়ে দেখতে পাওয়া পরমাসুন্দরী বউটির কথার পর যখন এসব প্রসঙ্গ এসে পড়ে তখন মনে পড়ে টি এস এলিয়টকে, যেখানে অ্যালফ্রেড জে প্রুফ্রক প্রেয়সীকে বলছেন চলো, তোমাতে আমাতে সেইখানে যাই যেখানে সন্ধ্যেটা আকাশে ছড়িয়ে আছে । কার মত ? অপারেশন টেবিলে শোয়ানো অজ্ঞান রুগীটার মত ।
আধুনিক হওয়ার সাথে কলকাতালগ্ন হওয়ার যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা তো ভুলতেই বসেছিলাম ।
উপন্যাসটা আমার আরো আপন হয়ে ওঠে যখন এমন একজনের প্রসঙ্গ আসে যাকে দেখতে “অনেকটা আত্মগোপন করে থাকা নকশাল” এর মত । লোকটা আসলে সম্পাদক । এমন একজন সম্পাদক যে বড় শহরের বড় কাগজের চাকরি ছেড়ে এসেছে ছোট শহরে তৃণমূল স্তরের সাংবাদিকতা করবে বলে, যে বাতিলযোগ্য লুনা মোপেডে চড়ে খড়গপুর চষে বেড়ায় খবর আর সম্ভাবনাময় সাংবাদিকের খোঁজে । প্রেমের গল্প বলতে বলতে ঔপন্যাসিক আমায় শুনিয়ে দিলেন সেই গল্প — বড় শহরের মত ছোট শহরেও কিভাবে সাংবাদিকতা বদলে গেল খবরের ব্যবসায়, কিভাবে দুর্নীতিই হয়ে উঠল নিয়ম আর সৎ সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়াল বোকামি, কিভাবে বড় কাগজের জেলার পাতা সাড়ে সর্বনাশ করল জেলার সাংবাদিকতার । দেশজুড়ে এই ইতিহাস যে কত কাগজের !
কাদের নিয়ে ‘খবর খড়গপুর’ চালাতেন এই সম্পাদক —- শুভ্রর রণজয়দা ? আশ্চর্য কিছু চরিত্র । একজন আপাদমস্তক কবি, যে শ্মশান থেকে আহরণ করে তার বেশিরভাগ কবিতার লাইন । কেমন সে লাইনগুলো ? “তুমি সড়ক রমণীর আগুনতলে আশ্চর্য, দুর্বল / তুমি হাওয়ার গল্প, জুনের দিকে তীব্র যাওয়া… / তুমি পঠিত হচ্ছ বায়ুহারাদের দেশে, মুখে / হারিয়ে যাচ্ছ নিঃশব্দে ভ্রমিত কোন প্রেমে…”। বাসুদা, এই কবি, শ্মশানে মড়া পোড়াতে আসা একজনেরই প্রেমে পড়ে আর শ্মশানের মাটিতে শুয়েই বলে “জীবন, জীবনই শেষ কথা ।”
আরো ছিল রঘুদা — আশাহত কমিউনিস্ট বাবার আশাবাদী কমিউনিস্ট ছেলে । শহরের খালি দেওয়াল খুঁজে খুঁজে স্লোগান, কবিতার লাইন আর মার্কস, লেনিনের উক্তি লিখে বেড়ায় । সেইসব উক্তি যেগুলো তার পার্টি লোককে বলা বন্ধ করে দিয়েছে । রেলবস্তিতে বসে রঘুদা অবধারিত বিপথগামিতার আগে কিছু শিশুকে আঁকতে শেখায় ।
এছাড়াও ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নির্লজ্জ, অসাধু সৌমাল্যদা । এতই অসাধু যে মৃত বন্ধুর কবিতার খাতা চুরি করে নিজের কবিতায় জুড়ে দিতেও দ্বিধা বোধ করে না ।
ছিল সুপুরুষ, নির্ভীক সাংবাদিক, আমির খসরুভক্ত মাসুদদা, যার সঙ্গে অদ্ভুত এক সম্পর্কের বিপ্রতীপ কোণে দাঁড়াতে হয় শুভ্রকে ।
সবাইকে ছাপিয়ে ছিল কুন্তলা — খাঁচায় বন্দি এক মেয়ে যে আসলে কী চায় সম্ভবত তা-ই ভুলে গিয়েছিল, যেমনটা আমরা অনেকেই যাই । ফলে সে শুভ্রকে দিল দাগা, হয়ত নিজেকেও । কিন্তু তার আগে সে শুভ্রকে উপহার দিয়ে ফেলেছে এক অমর মুহূর্ত ।
শুভ্র। অপাপবিদ্ধ, সুলেখক, স্বপ্নালু শুভ্র । তারও অধঃপতন হয়, হলুদ সাংবাদিকতা তার মনের সমস্ত শ্যামলিমা কেটে সাফ করে দেয় অনবরত । কিন্তু শিকড়টা রয়েই যায় । একটি আত্মহত্যা কিংবা হত্যার পর গিরি ময়দান স্টেশনের বৃষ্টিতে পুনর্জীবন লাভ করে মনুষ্যত্ব । কী করে ? সেটা রহস্য হয়ে থাক ।
আরো অনেক রহস্য, অনেক একান্ত ব্যক্তিগত ভাললাগা অনেকেই খুঁজে পাবেন ‘বৃষ্টির পাখি’ তে । গল্পটা বিষাদে শেষ হয়নি, হয়েছে নতুন আশার সঞ্চারে । কিন্তু আমার মন বিষণ্ন হয়ে গেল এই ভেবে যে বাসুদার মতই খড়গপুরে বা অন্য কোন মফঃস্বল শহরে কি গ্রামে হয়ত কত কবি, কত ঔপন্যাসিক মরে যাচ্ছেন, আমরা কেউ জানতে পারছি না । “উড়ে যাচ্ছে প্রসবকাতর এক শালিখ / ঠোঁটে নিয়ে আমাদের ব্যর্থ মনস্কাম ।”
অন্তত এই উপন্যাসটা যে আমার পড়া হল সেজন্য ঔপন্যাসিক এবং আমার বন্ধু মৃণালকে ধন্যবাদ দিলেও ছোট করা হবে । অরিন্দম দাসের লেখা অমন কবিতার লাইনগুলোই বা পেতাম কোথায় এই উপন্যাসটা না পড়লে ? কবি চলে গেছেন অকালে, নিঃশব্দে । কিন্তু জীবনই যে শেষ কথা তাতে ভুল নেই । নইলে মৃত্যুর দেড় দশক পরে মৃণালের হাত ধরে তাঁর লাইনগুলো আমার কাছে পৌঁছালই বা কী করে আর এভাবে আমাকে নাড়িয়ে দিলই বা কী করে ?

বয়স হচ্ছে

ইতিমধ্যে এক মনোযোগী ছাত্রী হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ পা পিছলে রাস্তার হাঁটুজলে ঝপাং । হাতের খাতা “ভেসে যায় অলকানন্দা জলে”। সে প্রথমে লজ্জিত পরে হর্ষিত । তারস্বরে সঙ্গী ছেলেটাকে ডাকছে ” অ্যাই, কোথায় গেলি ? শিগগির আয় ।” ছেলে অমনি দৌড়ে এসে হাত ধরে তুলতে গেছে । কিন্তু মেয়ের চিৎকৃত নির্দেশ “আগে খাতা আগে খাতা ।” রোগা প্যাংলাটি দেখলাম কোন শালপ্রাংশু মহাভুজ বলীর চেয়ে কোন অংশে কম নয় । একহাতে পৃথুলা সঙ্গিনী আর অন্য হাতে তার হৃদি, থুড়ি খাতা, সে দিব্যি তুলে নিল

বয়সটা যে চল্লিশের দিকে এগোচ্ছে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম গত পরশু বিকেলে । অফিস যাওয়ার পথে কলেজ স্ট্রিট গেছি গোটাদুয়েক বইয়ের খোঁজে । যেতে হবে ন্যাশনাল বুক এজেন্সিতে । আমার পরিষ্কার মনে পড়ল ওটা সূর্য সেন স্ট্রিটে । বীরবিক্রমে পুঁটিরাম পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন প্রায় রাস্তার শেষ মাথায় পৌঁছে গেছি তখন মনে হল এবার স্মৃতি ব্যর্থ হয়েছে এটা মেনে নেওয়া উচিৎ । নিজের স্মৃতির উপর গর্বটাকে লক্ষ্মী ছেলের মত পিঠের ব্যাগে লুকিয়ে ফেলে এক প্রবীণার কাছে পথনির্দেশ চাইলাম । তিনি জানালেন দোকানটা কফি হাউসের আশেপাশে । প্যারামাউন্টের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, তখনও দোকানটার চেহারা কিছুতেই মনে পড়ছে না । অগত্যা একজন নবীন দোকানকর্মীর সাহায্য চাইলাম । তিনি একেবারে কোন্ বাড়িটা তা-ও বলে দিলেন ।
আমি যখন ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলের সামনে তখন ঝুপ করে নেমে পড়ল বৃষ্টি । ব্যাগ থেকে লটঘটে ছাতাটা বার করে খুলতে খুলতেই একটু ভিজে গেলাম ।
এন বি এ তে ঢুকতে গিয়ে দেখি তার সামনে একগাদা তরুণ তরুণী ভিড় জমিয়েছে । আমার মত তাদের অফিস যাওয়ার তাড়া নেই । তাই বৃষ্টি থেকে বাঁচবার তাগিদও তাদের যৎসামান্য । কোন একটা ছাউনির নীচে দাঁড়ানো যতটা না প্রয়োজনে তার চেয়ে বেশি ঘন হয়ে বৃষ্টি উপভোগ করতে করতে আড্ডা দেওয়ার জন্যে । ঐ ভাবনাহীন প্রাণগুলোকে এড়িয়ে ঢুকে পড়লাম দোকানে । সেখানে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন আগলে বসে আছেন কয়েকজন প্রায় বৃদ্ধ ভদ্রলোক যাঁদের চোখ ঢেকে ফেলেছে সিঁড়িতে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েগুলো । বৃষ্টি দেখার আর উপায় নেই । আমার প্রবেশে ওঁরা একটু নড়েচড়ে বসেছিলেন কিন্তু আমি এমন একটা বই চেয়ে বসলাম যে হতাশ গলায় ওঁদের একজনকে বলতে হল “ও বই আর পাওয়া যায় না । অনেকদিন হল ।”
যা-ই হোক এক বন্ধুর জন্যে উপহার কেনার ছিল । সে বইটা শেলফের উপরেই রাখা ছিল । সেইটে কিনে বেরিয়ে দেখি বৃষ্টি আরো বেড়েছে, সেইসঙ্গে ছেলেমেয়েদের সংখ্যাও । ভাবছি অনুজ অনির্বাণকে কফি হাউসে আসতে বলি, বহুবার প্রতিশ্রুত আড্ডাটা মারা যাবে । তারপর ভাবলাম এত বৃষ্টিতে আসবেই বা কী করে ? ভাবতে ভাবতে কফি হাউসের দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি । বাইরের চেহারাটা দেখেই বুঝতে পারছি ভেতরে আমাকে আরো বেমানান, এমনকি হাস্যকর, দেখাবে । তাই বাইরেই কোনমতে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম ।
বৃষ্টি কমার নাম নেই । রাস্তা দিয়ে বহু ছেলেমেয়ে ছাতা ছাড়াই দিব্য হেঁটে যাচ্ছে আমার কেজো জীবনকে মুখ ভেঙচিয়ে । কেউ কেউ ভিজতে ভিজতে হঠাৎ বৃষ্টি থেকে বাঁচার ভান করে ফুটপাথে এসে উঠছে । তাদের জায়গা ছাড়তে ছাড়তে আমি ক্রমশ কোণঠাসা । এমন সময়ে দেখি কফি হাউস থেকে একলাফে রাস্তায় নেমে পড়ে একটি মেয়ে তার প্রেমিকটিকে ভিজতে ডাকছে । ছোঁড়া এমন আহাম্মক (অথবা সাইনাসের রুগী) যে হাতের ছাতাখানা দেখিয়ে বলছে “তোর ছাতাটা বার কর না ।” দেখেই আমার মনে হল এ শালা শঙ্খবেলা দ্যাখেনি । শেষ অব্দি অবশ্য মেয়েটিরই জিৎ । সে বিজয়গর্বে গদগদ হয়ে প্রেমিককে বগলদাবা করে সংস্কৃত কলেজ পেরিয়ে উধাও হল ।
এইসব দেখতে দেখতে কখন এক ফুটপাথস্থ বই বিক্রেতার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি ! তিনি ঝাঁজিয়ে উঠলেন । আমি দেখলাম এখানে আমার না দাঁড়ানোই শ্রেয় । ময়ূরদের পাড়ায় দাঁড়কাকের দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই অন্যায় । অতএব ঐ বৃষ্টিতেই রাস্তায় নেমে পড়লাম ।
জায়গা খুঁজতে খুঁজতে মনে হল হিন্দু স্কুলের সামনের পাঠ্য বইয়ের দোকানগুলো, যেগুলোকে বরাবর বইপাড়ার সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় দোকান বলে মনে হয় আমার, সেগুলোর ছাউনিই আমার উপযুক্ত আশ্রয় । কারণ সেখানে দেখি পড়াশোনা ছাড়া কিচ্ছু জানে না এমন ছেলেমেয়ে আর তাদের বাবা-মায়েদের ভিড় । আমার মত বা আরেকটু বড় মাপের ভুঁড়ি নিয়ে অনেকেই সেখানে আছে ।
সবে ওখানে দাঁড়িয়ে ছাতাটা বন্ধ করেছি, কোথা থেকে বেগুনী আর নীল শাড়ি পরা দুটো মেয়ে একটা ছাতায় আধাআধি ভিজতে ভিজতে এসে হাজির । একজন আরেকজনকে প্রচন্ড বকছে “তোকে বললাম শাড়ির ঝামেলা করিস না । এখন কী হবে ? হাঁটাও যাচ্ছে না ঠিক করে । কী ভারী হয়েছে শাড়িটা !”
অন্য বেচারির উত্তর “আমি কী করে জানব এরকম বৃষ্টি হবে ? সকাল থেকে রোদই ছিল ।”
এদের ঝগড়া উপভোগ করতে করতেই ভাবছি এত বৃষ্টিতে জল ঠেঙিয়ে অফিস যাব কী করে । হোয়াটস্যাপ গ্রুপে সেই দুশ্চিন্তার কথা লিখেও ফেলেছি । ইতিমধ্যে এক মনোযোগী ছাত্রী হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ পা পিছলে রাস্তার হাঁটুজলে ঝপাং । হাতের খাতা “ভেসে যায় অলকানন্দা জলে”। সে প্রথমে লজ্জিত পরে হর্ষিত । তারস্বরে সঙ্গী ছেলেটাকে ডাকছে ” অ্যাই, কোথায় গেলি ? শিগগির আয় ।” ছেলে অমনি দৌড়ে এসে হাত ধরে তুলতে গেছে । কিন্তু মেয়ের চিৎকৃত নির্দেশ “আগে খাতা আগে খাতা ।” রোগা প্যাংলাটি দেখলাম কোন শালপ্রাংশু মহাভুজ বলীর চেয়ে কোন অংশে কম নয় । একহাতে পৃথুলা সঙ্গিনী আর অন্য হাতে তার হৃদি, থুড়ি খাতা, সে দিব্যি তুলে নিল ।
ততক্ষণে আমার নিজেকে আবার পাতিকাক মনে হচ্ছে । দুঃখে কা কা করে ডেকে উঠতে যাব, অমনি ফোনটা বেজে উঠল । সহকর্মী অর্ণবের ফোন “তুমি আমহার্স্ট স্ট্রিট ক্রসিং এ চলে আসতে পারবে ? আমি ওলাতে আছি । তোমায় তুলে নেব তাহলে ।” আমাকে তখন হেঁটে আন্দামান যেতে বললেও চলে যেতাম, আমহার্স্ট স্ট্রিট তো কোন্ ছার । Damsel না হলেও আমি তখন প্রবল distressed । সহকর্মীটি shining ওলায় আমাকে উদ্ধার করল ।

শিয়রে শমন

বিপদটা আরো বড় কেন জানেন ? সরকারপক্ষ না হয় ডেকে এনেছিল । বিরোধীরা আপত্তি করল না কেন ? কত কারণে কত ওয়াক আউট হয় আইনসভাগুলোতে । এই অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদে হল না কেন ? না হওয়ার মানে হচ্ছে সব দলই ধর্মের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, হিন্দুস্তান তৈরির পথ প্রশস্ত হচ্ছে

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ এর পর থেকে বরাবরই ভারতে দারিদ্র্য ছিল, দুর্নীতি ছিল, অশিক্ষা ছিল, জাতের নামে বজ্জাতি ছিল, ধর্মান্ধতা এবং তজ্জনিত হিংসা ছিল । তবু যে ভারত পাকিস্তানের মত সর্বৈব ব্যর্থ এবং সন্ত্রাসবাদীচালিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি তার বড় কারণ — আমরা সেনাবাহিনীকে ব্যারাকের বাইরে এবং ধর্মগুরুদের ধর্মস্থানের বাইরে আসতে দিইনি । এক কথায় আমাদের সরকার, প্রশাসন কারোর গুরুর কথায় চলেনি, কোন সেনাপ্রধানের কথাতেও চলেনি ।
কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা যাবে কোথায় ? সেই স্বাধীন হওয়ার সময় থেকে এক শ্রেণীর ভারতীয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা “ওরা পাকিস্তান বানিয়েছে, আমরা হিন্দুস্তান বানাব । উন্নত, ভাল দেশ হওয়ার দরকার নেই । পাকিস্তানের উল্টোপিঠ বানানো চাই ।” এই দাবি হতভাগা মহাত্মা গান্ধী আর তার চ্যালাচামুন্ডারা বানচাল করে দিয়েছিল । সেই রাগে ব্যাটাকে সাবড়ে দিয়েও লাভ হয়নি । গান্ধীর পয়লা নম্বর চ্যালা নেহরু আর পয়লা নম্বর বিরোধী আম্বেদকর তো বটেই এমনকি দেশের অন্য পার্টিগুলোও হিন্দুস্তানের দাবিকে পাত্তাই দেয়নি । শেষ অব্দি তাই এরা নিজেরাই একটা পার্টি বানিয়ে নেমে পড়ল । তা অনেকবছর ঘষটানোর পরে বছরদুয়েক হল বেশ হাত পা ছড়িয়ে গ্যাঁট হয়ে এরা সরকারে বসতে পেরেছে আর বসেই শুরু হয়ে গেছে হিন্দুস্তান নির্মাণ । তারই এযাবৎ সবচেয়ে বড় ব্যবস্থা হল নাগা সাধুকে বিধানসভায় বাণী দেওয়ার সুযোগ দেওয়া ।
জ্ঞানের সাগর বাবা সেখানে বলেছেন ধর্ম আর রাজনীতি হল স্বামী স্ত্রীর মত । তাই স্ত্রীকে স্বামীর কথা শুনে চলতেই হবে । নারীবাদীরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট ।তাঁদের আপত্তি বাবার নগ্নতা এবং যে রূপকটা ব্যবহার করেছেন সেটা নিয়ে । কিন্তু সেসবের চেয়ে ঢের বেশি বিপজ্জনক বাবা যা বলেছেন তার নিহিতার্থ । “রাজনীতিকে ধর্মের কথা শুনে চলতেই হবে ।” অর্থাৎ সংবিধান ভুলে যান । ভারতকে বিজেপি বাবার সম্পত্তি করবার দিকে এগোচ্ছে । আইনসভায় একজন ধর্মগুরুর বক্তৃতা দেওয়ার কোন অধিকারই যেখানে নেই সেখানে একজন এসে বক্তৃতা তো দিলই আবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বলে দিয়ে গেল “এখন থেকে আমরা যা বলব তাই শুনে চলতে হবে ।” জল যে আমাদের গলা অব্দি উঠে এসেছে বুঝতে পারছেন কি ? এরপরে দাবিদাওয়া নিয়ে এমপি এমএলএ নয়, হরিসভায় ছুটতে হবে । গণতন্ত্রের বস্ত্রহরণ শুরু হয়েছে । বাবার নগ্নতা আসলে প্রতীকি ।
বিপদটা আরো বড় কেন জানেন ? সরকারপক্ষ না হয় ডেকে এনেছিল । বিরোধীরা আপত্তি করল না কেন ? কত কারণে কত ওয়াক আউট হয় আইনসভাগুলোতে । এই অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদে হল না কেন ? না হওয়ার মানে হচ্ছে সব দলই ধর্মের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, হিন্দুস্তান তৈরির পথ প্রশস্ত হচ্ছে ।
আপনি নির্ঘাৎ বলবেন “জৈনরা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় । তাদের গুরুকে ডেকে আনা একটি ধর্মনিরপেক্ষ পদক্ষেপ । এতে হিন্দুত্ববাদীদের চক্রান্ত দেখা অন্যায় এবং হাস্যকর ।” যদি বলেন তাহলে আপনি হয় গোবেচারা নয় হাড়েবজ্জাত কারণ জৈনরা সংখ্যায় কম হলেও প্রচন্ড প্রভাবশালী । আপনি চোখ বুজে এক মিনিটে ভারতের যে কজন ধনী লোকের নাম মনে করতে পারবেন তাদের অধিকাংশ জৈন । আর জৈন সম্প্রদায়ের গুজরাতি, মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীরা ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল । মমতা হাওয়ার মধ্যেও বড়বাজারে বিজেপি কত ভোট পেয়েছিল খোঁজ নিয়ে দেখুন না । জৈন বলতেই যদি আপনি মহাবীর প্রতিষ্ঠিত সেই ব্রাক্ষ্মণ্যবাদবিরোধী ধর্মের কথা এখনো ভাবেন তাহলে আপনি ঘুমোচ্ছেন । শিগগির জাগুন ।
এত কথার পরে বলবেন না “ভারত হিন্দুস্তান হয়ে গেলে ক্ষতি কী ?” উত্তরে ধর্মনিরপেক্ষতা কেন প্রয়োজন তা নিয়ে অনেক কথা বলা যায় । আমি সেসব বলব না । শুধু অনুরোধ করব একবার গুগল করে ১৯৭০-৮০র ইরান, লেবানন, আফগানিস্তান এইসব দেশের ছবি (আলোকচিত্র) দেখুন । তারপর এখনকার ছবিগুলো দেখুন ।

নিভৃতে যতনে

ধরা পড়ে গিয়ে প্রচন্ড ঘাবড়ে গেছি তখন । ভাবছি বাবা কি জানতে পেরে গেছে এক সহপাঠিনীর সম্পর্কে আমার দুর্বলতা ? আমি তো আমার দুই ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছাড়া কাউকে বলিনি ! এমনকি মেয়েটাকেও কিছু বলিনি । বলার সাহসই নেই । সে আমার চেয়ে লেখাপড়ায় অনেক ভাল, কি সুন্দরী কি সুন্দরী !

তখন সবে খিস্তি শিখছি । রোজ বিকেলে আর কেউ না থাকলেও আমরা দুজন মিলেই ক্রিকেট খেলতাম । একদিন শুনি বন্ধুটি উইকেট পুঁততে পুঁততে গুনগুন করে গাইছে “হাসপাতালের বেডে টি বি রোগীর সাথে খেলা করে শুয়োরের বাচ্চা । তবু রেডিওটা টিভিটার সাথে সুর ধরে সারে জাঁহা সে আচ্ছা” । আমি এরকম আজব গান জম্মে শুনিনি । গানে খিস্তি ! ভাল লাগল বললে ভুল হবে তবে নতুন লাগল নিঃসন্দেহে । রাতে খেতে বসে বললাম “জানো এরকম নাকি একটা গান বেরিয়েছে ।” মা শুনেই ছ্যা ছ্যা করে উঠল । বাবা বলল “আমিও কোথায় একটা শুনলাম ! মাইকে বাজছিল । এসব হুজুগের গান । দুদিন খুব চলবে । তারপর আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ।” আমার কৌতূহল কমল না ।
স্কুলে অনেক সহপাঠী দেখলাম গায়কের খুব ভক্ত । একজন আমাকে ক্যাসেটের নাম (অ্যালবাম বলতে তখন শুধু ছবি সাঁটার বই-ই জানতাম), অন্যান্য গানগুলো সম্পর্কে তো বললই, নচিকেতার অতীত বর্তমান সম্বন্ধেও বেশ কিছু জ্ঞান দিয়ে দিল । আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে গানগুলো শুনতে । কী করে যে শুনি ! তার কিছুদিন আগেই কয়েকটা গানহীন বছর কাটানোর পর বাবার বকেয়া মহার্ঘ ভাতার কিছুটা দিয়ে ফিলিপসের টু ইন ওয়ান কেনা হয়েছে । বাড়িতে নিয়ে এসে চালানো উচিৎ হবে না বুঝতে পারছি । ভাবছি বন্ধুটার বাড়ি একদিন যাওয়া যায় কিনা ।
হঠাৎ একদিন বাবা বলল “দ্যাখ তো বড়দার কাছে নচিকেতার ক্যাসেট আছে কিনা ?”
আমার অবসরপ্রাপ্ত বড়দাজেঠু গান আর বইয়ের পোকা । বোধহয় সেইজন্যেই মনটা আশ্চর্যরকমের জোয়ান । জগন্ময় মিত্রও শোনে আবার সুমন, নচিকেতাও শোনে । দৌড়ে নিয়ে এলাম । বাবার ভাবান্তরের কারণ জানার চেয়ে গানগুলো শোনার আগ্রহ ছিল অনেক বেশি । তারপর একঘন্টা ধরে দু পিঠের গানগুলো বাপ ছেলে মিলে শুনলাম । মা তিতিবিরক্ত । বাবাকে বলল “তুমিও বসে বসে এইসব গান শুনছ ?”
বাবা বলল “শুনতেই হবে । সময়ের ধ্বনি । কান না পাতলে যে সময়টাকে চেনা যাবে না । আমাদের যুব ফেডারেশনের শঙ্কর খুব জোর দিয়ে আজকে বলল ‘আপনি শুনে দেখুন, হাবুলদা । আপনার যদি খারাপ লাগে আমি নিজে শোনা ছেড়ে দেব ।’ তাই ভাবলাম শুনে দেখি । ভাল গান । হতাশায় ভরপুর । এত হতাশ যে খিস্তি দিচ্ছে । বেশ করছে । খিস্তি দেওয়ার মত হলে দেবে না ? ছেলেপুলেদের চাকরি নেই বাকরি নেই । খিস্তি দেবে না তো কি ? কিন্তু গলায় সুর আছে, গানে প্রাণ আছে ।”
“সে তো সুমনের গানও সময়ের গান । ওর তো খিস্তি দিতে লাগে না ?” মা বলল ।
“ওর গান সুন্দর করে সত্যি কথা বলে তাই ভাল । এর গান কর্কশ করে সত্যি কথা বলে তাই ভাল । দুটোই ভাল ।”
মা নাক সিঁটকে বলল “কিন্তু এ গান বেশিদিনের নয় । সুমনের গান থাকবে ।”
“হতে পারে । কিন্তু সে বিচার ইতিহাস করবে । আমি কে ?”
তারপরেই বাবা আমায় জিজ্ঞেস করল কোন্ গানটা সবচেয়ে ভাল লাগল । সত্যি কথাটা লজ্জায় বলতে পারলাম না । বললাম “শুধু বিষ শুধু বিষ দাও ।” বাবা বলল “বাজে কথা বলিস না । তোর সবচেয়ে ভাল লেগেছে “লাল ফিতে সাদা মোজা । আমি তোর বাপ রে ।”
ধরা পড়ে গিয়ে প্রচন্ড ঘাবড়ে গেছি তখন । ভাবছি বাবা কি জানতে পেরে গেছে এক সহপাঠিনীর সম্পর্কে আমার দুর্বলতা ? আমি তো আমার দুই ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছাড়া কাউকে বলিনি ! এমনকি মেয়েটাকেও কিছু বলিনি । বলার সাহসই নেই । সে আমার চেয়ে লেখাপড়ায় অনেক ভাল, কি সুন্দরী কি সুন্দরী ! ওরকম একটা মেয়ের যে আমাকে পছন্দ হতেই পারে না তা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই । তাছাড়া ও কাউকে বলে দিলে আমার বাবার মানসম্মান থাকবে না । বাবা আমায় বকবে কি মারবে সে তো পরের কথা । ফলে কায়দা করে তার নাম না লিখে কিছু বোগাস কবিতা লেখা ছাড়া আর কিছুই তো আমি করিনি ! তাও বাবা বুঝে গেল !
এইসব সাত-পাঁচ ভাবছি, তখনই বাবা বলল “এই বয়সে সব কথা বাড়ি এসে আমাদের বলবি । বন্ধুর মত । মাকে হোক বা আমাকে হোক । তাহলে আমরা তোকে অনেক বিপদ থেকে বাঁচাতে পারব । তবে একটা কথা আমাদেরও বলবি না । নীলাঞ্জনার কথা । তাকেও বলবি না । শুধু নিজের মনে তার সাথে কথা বলবি । এই বয়সে প্রেমে পড়লে স্বভাব ভাল থাকে যদি প্রেম ‘করা’ ব্যাপারটা মাথায় না ঢোকে । ভালবাসার চেয়ে ভাল জিনিস তো নেই । প্রথমবার এটা হলে নিজের মধ্যে প্রাণভরে অনুভব করতে হয় । বিশেষ করে প্রথম প্রেমের অনুভূতি আর ফেরত পাওয়া যায় না । এটা বলাবলি করতে গিয়ে নষ্ট করে ফেলিস না । ভালবাসাটা তোর । সে ভালবাসে কি না বাসে তাতে কী এসে গেল ?”
আজকে মনে হচ্ছে বাবা হওয়ার একটা বড় শিক্ষা আমার বাবা আমাকে সেদিনই দিয়েছে।

রজত জয়ন্তী — গাঁটে গাঁটে

বলছি এই ২৫ বছরে কোন্ কোন্ শিল্পে আমরা খুব এগোলুম আর প্রচুর চাকরি দিতে পারলুম? কত কারখানা বন্ধ হয়েছে সে হিসাবটা আমার কাছে নেই বলে আমি দুঃখিত। আসলে আমি বরাবর অঙ্কে কাঁচা। বড় বড় সংখ্যা দেখলেই ভিরমি খাই। তবে ঐ নাম করা শিল্প আমাদের যা ছিল, পাবলিকের সম্পত্তি, তার মধ্যে এইচ এম টি লাটে, চিত্তরঞ্জন খাবি খাচ্ছে। বি এস এন এল তথৈবচ ওদিকে তাদেরই টাওয়ার ব্যবহার করে ভোডাফোন, এয়ারটেল লালে লাল। থ্রি জি বলে টু জি দিয়ে আমাদের দিব্যি টুপি পরাচ্ছে, মধ্যে মধ্যে আবার কর ফাঁকিও দিচ্ছে। আদালত জরিমানা করলে “এরম করলে খেলব না” বলে ঠোঁট ফোলাচ্ছে আর সরকার সব মিটমাট করে নিচ্ছে

ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের রজত জয়ন্তী পালনে জোর কদমে নেমে পড়েছে কংগ্রেস। কিন্তু এখানেও তাদের টেক্কা দিল বিজেপি। মনমোহনকে যতই গালাগাল দিক না কেন, তাঁরই দেখানো পথে এগিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা, ওষুধপত্র, খুচরো ব্যবসা সবকিছুতে জমিয়ে ব্যবসা করার জন্য দরজা হাট করে খুলে দিল নরেন্দ্র মোদীর সরকার আর প্রধানমন্ত্রী সদর্পে ঘোষণা করলেন ভারত এখন পৃথিবীর সবচেয়ে মুক্ত অর্থনীতি। উদারীকরণের এর চেয়ে বড় উদযাপন আর কী হতে পারে?
চমৎকার পদক্ষেপ। যে মুষ্টিমেয় সংবাদমাধ্যম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য, প্রতিশোধমূলক রাজনীতির জন্য সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছিল তারা একবাক্যে স্বীকার করল এতদিনে একটা কাজের মত কাজ হয়েছে। উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও ভারত এবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবেই এটা বলতে বাধ্য হলেন। এখানে মনে রাখতে হবে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বুদ্ধিজীবী হলেন ধনী বিক্রেতারা। মার্কিন দেশে বিল গেটস, স্টিভ জোবস হলে এদেশে মুকেশ আম্বানি, নারায়ণমূর্তি, ফিকি, অ্যাসোচেম ইত্যাদিরা। তবে সবচেয়ে বড় লাভ হল লেখাপড়া শেখা মধ্যবিত্ত, যারা আচ্ছে দিনের গাজরটা খুড়োর কলে ঝোলানো দেখে খচে বোম হয়েছিল, তারা মহা খুশি। তারা এক ধাক্কায় গ্যাসের ভর্তুকির দুঃখ ভুলে গেছে, ডাল, টমেটোর দামও ভুলে গেছে। কারণ তারা জানে বিদেশী পুঁজি আসা মানেই হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি চাকরি আর ভুরিভুরি মাইনে। গত সপ্তাহে মলে যে স্টোরটার ব্র্যান্ডেড শার্টটা দূর থেকে দেখে চলে আসতে হয়েছে সেটাই এবার নাগালে চলে আসবে। জয় নরসিমার জয়, জয় মনমোহনের জয়, জয় মোদীর জয়, জয় জেটলির জয়।
এই বাজারে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। মানে আমি বামপন্থী লোক তো। বামপন্থীদের কাজই হল বাজে বকা। সেইটুকুই করতে চাইছি আর কি। সকলে ক্ষমা ঘেন্না করে নেবেন আর কারো কাছে উত্তর থাকলে দিয়ে দেবেন। প্রতিপ্রশ্ন করলে অ্যান্টি ন্যাশনালও বলতে পারেন।
বলছি এই ২৫ বছরে কোন্ কোন্ শিল্পে আমরা খুব এগোলুম আর প্রচুর চাকরি দিতে পারলুম? কত কারখানা বন্ধ হয়েছে সে হিসাবটা আমার কাছে নেই বলে আমি দুঃখিত। আসলে আমি বরাবর অঙ্কে কাঁচা। বড় বড় সংখ্যা দেখলেই ভিরমি খাই। তবে ঐ নাম করা শিল্প আমাদের যা ছিল, পাবলিকের সম্পত্তি, তার মধ্যে এইচ এম টি লাটে, চিত্তরঞ্জন খাবি খাচ্ছে। বি এস এন এল তথৈবচ ওদিকে তাদেরই টাওয়ার ব্যবহার করে ভোডাফোন, এয়ারটেল লালে লাল। থ্রি জি বলে টু জি দিয়ে আমাদের দিব্যি টুপি পরাচ্ছে, মধ্যে মধ্যে আবার কর ফাঁকিও দিচ্ছে। আদালত জরিমানা করলে “এরম করলে খেলব না” বলে ঠোঁট ফোলাচ্ছে আর সরকার সব মিটমাট করে নিচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পে কত লোকের চাকরি গেছে সে প্রশ্ন তুলছি না। ওসব নির্ঘাৎ অযোগ্য লোক ছিল তাই চাকরি গেছে। পুঁজিবাদে যোগ্যতমের উদ্বর্তন হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই কত লোকের চাকরি হয়েছে জানতে চাইছি। বেকার টেকার আর নেই তো? মানে চারদিকে তো তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া আর প্রযুক্তি দেখি না। যে পড়েছিল খনি প্রযুক্তি সে-ও দেখি সফটওয়্যারে আর যে ছিল কম্পিউটার সায়েন্সের ভাল ছাত্র সে-ও সফটওয়্যারে। তারও আবার বেশিরভাগ কাজই বিদেশি কোম্পানির কাজ এদেশে বসে হচ্ছে। কোনদিন এই কাজগুলো আসা বন্ধ হলে যে কী হবে! কোথায় থাকবে যোগ্যতমের উদ্বর্তনের তত্ত্ব!
ও হ্যাঁ। আরেকরকম শিল্পেও চাকরি হচ্ছে বটে — কর্তাশিল্প। এম বি এ পাশ করে বিভিন্ন কোম্পানির কর্তা হওয়ার শিল্প। এছাড়াও আছে কথাশিল্প। সারারাত জেগে লোকের গালমন্দ শুনে মাস গেলে হাজার দশ-পনেরো টাকা আয় করা, যা দিয়ে আজকের বাজারে আড়াই জনের সংসার চালানোও শক্ত। এরও অনেকটাই বিদেশের কাজ।
তাহলে পঁচিশ বছর ধরে দেশের কোন্ উন্নতিটা হল? এত শিল্পোন্নত দেশ হল আমাদের যে এখন মনমোহনের সুযোগ্য ছাত্র নরেন্দ্রকে বলতে হচ্ছে #MakeInIndia? মানে আসলে কিস্যু হয়নি এখানে? তাহলে ব্যবস্থাটা ব্যর্থ তো?
উহুঁ। তা নয়। ব্যবস্থাটা কংগ্রেস ঠিক করে চালাতে পারেনি। কাছাটা পুরো না খুললে কি আর বিশ্ব বাজারে সাঁতার কাটা যায় বাপু? এই সবে আমাদের মিত্র দিলেন খুলে। এবারেই দেশটা পুরো ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা হয়ে যাবে। আর পঁচিশটা বছর ধৈর্য ধরুন।
আচ্ছা কাছা আমাদের আগেই যারা খুলেছিল তারা এখন কেমন আছে? দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো খুলেছিল। এই সহস্রাব্দের গোড়াতেই রক্তাক্ত অবস্থায় জল থেকে উঠে আসে। উদারীকরণের পিরানহা শুধু হাড়গুলো বাকি রেখেছিল। তারা বামদিকে হাঁটতে শুরু করে। অধুনা সঙ্কট সত্ত্বেও উদারীকরণের রাস্তায় তারা এখুনি ফিরছে না। গ্রীসের অবস্থা আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি। এতই করুণ যে “আর পারছি না, চলে যাব” বলে চিৎকার করেও শেষ অব্দি “দু বেলা দু মুঠো দিস” বলে ফের নির্যাতন মেনে নিয়েছে।
আর যে দেশ প্রথমে নিজে বিবস্ত্র হয়ে জলে নেমে অন্যদের ডেকেছিল খোদ সেই দেশে বেকারত্ব বেড়ে চলেছে। অনেকে দেউলিয়া হয়ে গেছে।
তা হোক গে। মনমোহন আর মোদীর দেখানো পথই আমাদের পথ। পুঁজিবাদেরও যে রকমফের হতে পারে তা আমরা শুনব কেন? এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই। আম্বানি, আদানি খাবে খাক না। চুঁইয়ে এসে যেটুকু পড়বে তাতেই আমাদের যথেষ্টর চেয়ে অনেক বেশি হবে। গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্তের যা হয় হোক। দেশে আর গরীব যদি না-ই থাকে সেটা কি খারাপ? বামপন্থীদের খালি “গরীব গরীব” করে চেল্লানো স্বভাব। আসলে গরীব না থাকলে আমাদের পাত্তা দেবে কে? যত্তোসব।

পুনশ্চ: অবাম বন্ধুরা আশা করি স্বীকার করবেন আমার মত হদ্দ বোকা বামপন্থীরা এখন এদেশে অনুল্লেখ্য। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু সবেতে বাগড়া দেওয়ার বদনাম ঘোচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বড় বামপন্থী দলটাকেই দেখুন না। এসব আলোচনায় তারা নেই। আন্দোলনে নামার হুমকি-টুমকিও দিচ্ছে না। তাদের বৃহত্তম সমস্যা এখন কংগ্রেসের সঙ্গে প্রেম করব না ঝগড়া করব। তাই নিয়ে তিনদিন ধরে মিটিং করছে, কেউ এই প্রেম অবৈধ বললে তাকে বার করে দিচ্ছে। এক কথায় (ফ্যাতাড়ুদের ভাষায়) “ছিঁড়ছে”। ভারতবর্ষের মত এত বড় মাঠে ফাঁকায় গোল দেওয়ার সুযোগ বহুজাতিকগুলো পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের সময়ও পায়নি।

%d bloggers like this: